প্রচলিত সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন যিনি

আগের সংবাদ

সরকারি খাল অবৈধ ইজারা দিল ছাত্রলীগ নেতা

পরের সংবাদ

সাহিত্যের পথ ধরে চলচ্চিত্রের ঋত্বিক

অমিত গোস্বামী

প্রকাশিত হয়েছে: October 31, 2019 , 8:20 pm

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটকের জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার জিন্দাবাজারে। কবিতা, গল্প দিয়ে শুরু হলেও ঋত্বিক গণমানসে পরিচিত হয়ে ওঠেন নাট্যকর্মী হিসেবেই; বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা তার অনেক পরে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম অসহায় মানুষের অশ্রুর ইতিহাস। দেশ ভাগের ক্ষত, সাম্প্রদায়িক বিভেদ প্রভৃতির বিপ্রতীপে তিনি শুনিয়েছেন ভালোবাসার জয়গান। মানবতার অবক্ষয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর শিল্প ছিল প্রতিবাদের অন্যরূপ। আদ্যন্ত সংবেদনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক স্মরণে আয়োজন…

ঋত্বিক কুমার ঘটকের সাথে আমার প্রথম আলাপ মহাশ্বেতা দেবীর কথার মাধ্যমে। আমার লেখালিখির জগতে ভালো করে বিচরণের পূর্বেই তিনি অস্তমিত। দেখা হয়নি কখনো। মাত্র পঞ্চাশ অতিক্রম করে তার চলে যাওয়ার কথা ছিল না। অথচ তিনি থাকলেন না। চূড়ান্ত অভিমানী তীব্র বাঙ্ময় অনিয়ন্ত্রিত বোহেমিয়ান জীবন যেন এক মোচড়ে পাঠিয়ে দিলো মাঠের বাইরে। যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন আমরা তাকে এক বিপথগামী বিস্ময়কর প্রতিভা হিসেবে দেখেছিলাম। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে আলোচনা শুরু হলো তাকে নিয়ে। তার একটি গোটা ছবি পুরোটা না দেখেও কেউ কেউ লিখে ফেললেন তাকে নিয়ে বড় নিবন্ধ। আমরা জানতে শুরু করলাম মদ্যপ ধূমপায়ী আত্মম্ভরী গোল্লায় যাওয়া ঋত্বিককে। ঘটক পরিবারের সদস্য ও কাছাকাছি থাকা অনেকেই তার এই মূল্যায়ন চাননি। তাই এক বিকেলে মহাশ্বেতা দেবীর কাছে ঋত্বিক প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বলেছিলেন- ‘ভবাকে অন্যদের মত করে তুমি এঁকো না। ধরার চেষ্টা কর ওর বিপন্নতার দিকগুলি।’ বিপন্নতা বলতে? নিজস্ব ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী- ‘একজন সমকামী যেমন শারীরিক কারণে সমকামী, যেখানে তার কোনো ভূমিকা নেই, তার অবশ্যম্ভাবী নিয়তি সমকামী হওয়া। সেটা সমাজ মানতে না পারায় তারা যেমন বিপন্ন একইভাবে চলচ্চিত্রের ভাষায় বিক্ষোভকে রাজনৈতিক অভিঘাতকে প্রকাশ করতে না পারার মধ্যে একজনের শিল্পীসত্তা যে কতটা বিপন্ন হয় সেটা বোঝার কথা সাধারণ মানুষের নয়। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পী এই প্রকাশ না করতে পারার যন্ত্রণা যে তার বিপন্নতা সেটা বোঝেন। এই না পারার হতাশাই তাকে অস্থির করে তোলে। সেজন্যে সে সাময়িক স্বস্তি খোঁজে নেশায় বা উদ্দাম আচরণে। সেজন্যে তুমি তার চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে কথা বলো।’ নাহ, সে যোগ্যতা আমার ছিল না। মহাশ্বেতা দেবী আমাকে বেশ কিছু তথ্য দিলেন তার সম্পর্কে। চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ তার সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছিলেন সেটা দিয়েই শুরু করেছিলাম একটি নিবন্ধ। গৌতমদা বলেছিলেন- ‘ঋত্বিকদা ছিলেন যুগসচেতন চলচ্চিত্রকার, গল্পকার, নাট্যকার, অভিনেতা সেই মানুষ যে সারা জীবন ধরে আসলে ভেবেছেন মানুষের কথা। মানুষের হয়েই কথা বলে তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি, আজও।’ অথচ ঋত্বিক কাহিনী লিখতে গিয়ে দেখি তার সব অবিস্মরণীয় উক্তি- ‘বার্গম্যানের পুরোটাই জালিয়াতি, একশোভাগ জোচ্চুরি। শোনো, আরও আট-দশ বছর বাদে লোকে আমার ছবি নেবে। আমার ছবি পাগলের মতো খুঁজবে। তোমরা দেখে নিও!’ একে কী বলা যাবে? শিবতুল্য না কি আত্মম্ভরী? মেঘে ঢাকা তারা’র সেন্সর হচ্ছে। বোর্ডের সদস্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি দেখে বেরিয়ে ঋত্বিককে বললেন, ‘মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা ছাড়া কী আর ছবি হয় না?’ ঋত্বিকের উত্তর, ‘আপনার কাছে যা বাস্তব, তা হয়তো আমার কাছে নয়।’ হয়ত…হয়ত…। ‘এ কথা কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না যে ইন্ডাস্ট্রি ঋত্বিকের জন্যে কিছু করেনি বা সরকার ঋত্বিকের জন্যে কিছু করেনি। বরং বেশি করেছে। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, ইন্দিরা গান্ধী কে নয়? অথচ নিয়মের মধ্যে উনি থাকবেন না, মদে ডুবে থাকবেন, কাজের ন্যূনতম নিয়মানুবর্তিতা মানবেন না- এভাবে কিছু করা যায়?’- সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের আক্ষেপটা বারেবারে কানে বাজতে থাকে। আবিষ্কার করতে চাই কোথায় তার বিপন্নতা। তার কবিতায় এর একটা আভাস পাই- ‘মানুষ, তোমাকে ভালবাসি।/ এইভাবে,/ পৃথিবীর ইতিহাস বারবার/ বদলে গেছে,/ তবুও মানুষ, সবসময় বেঁচেছে। মানুষ, তোমাকে ভালবাসি।’ কিন্তু এই মানুষের মধ্যে তিনি পড়েন কি? হয়ত না। হয়ত এই পৃথিবীর ইতিহাস তিনি বদলাতে চেয়েছিলেন তার চলচ্চিত্রের ভাষায় একা হাতে।
রাজশাহীর বাড়িতে সুরেশচন্দ্র ঘটক সকালে গাইছেন ‘তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করো…’,
তার স্ত্রী ইন্দুবালা পিয়ানো বাজাচ্ছেন। পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ছেলেমেয়েরা। সে এক স্বর্গীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ। এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির নাম ভবা। ভালো নাম ঋত্বিক। রাজশাহীর সুরেশচন্দ্র ঘটক ও ইন্দুবালা দেবীর নয় সন্তান। শেষ যমজ সন্তান ঋত্বিক ও প্রতীতি। সুরেশচন্দ্র ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। বদলির চাকরি। অবসরের পর রাজশাহীতে গিয়ে বাড়ি করেন। সেই বাড়িটিই এখন ‘ঋত্বিক ঘটক হোমিওপ্যাথিক কলেজ’। ঋত্বিকের শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে রাজশাহীতে। সেখানকার কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, পরে রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বিএ পাস।
অল্প বয়সে ছোটগল্পকার হিসেবে ঋত্বিকের বেশ পরিচিতি ছিল। ‘অভিধারা’ নামের একটি কাগজও প্রকাশ করতেন। নিজের লেখা ছোটগল্প ‘অয়নান্ত’ অভিধারায় ছাপা হয়েছিল। ছাত্র থাকার সময়ে বাড়ি থেকে দু’তিন বার পালিয়েছেন ঋত্বিক। কানপুরে একটা টেক্সটাইল ডিপার্টমেন্টেও কাজ করেছেন কিছু দিন। শেষে ১৯৪২ সালে বাড়ির লোকজন ধরে ঘরে নিয়ে এলেন। কেন পালিয়েছিলেন? বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক বলেছিলেন, ম্যাট্রিক পাস করে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। ইঞ্জিনিয়ার বা ঋত্বিকের ভাষায় ‘মিস্তিরি’ হওয়া তার পোষাবে না। কাজেই দাও পড়াশোনা ছেড়ে। পালাও বাড়ি থেকে।
ফিরে এসে ফের পড়াশোনা। কিন্তু ১৯৪৩-৪৫ সালের দেশের নানা ঘটনার প্রতিবাদ ঋত্বিক করে তুললেন তার গল্পের প্রেক্ষাপট। ‘মাই কামিং ইনটু ফিল্মস’ শীর্ষক একটি লেখায় ঋত্বিক লিখছেন, ‘শুরুর দিকটায় লেখক ছিলাম। কেরিয়ার শুরুর সময়ে, সেই ১৯৪৩ সাল পরবর্তী সময়ে আমি প্রায় শ’খানেক ছোটগল্প ও দু’টি উপন্যাস লিখি। তখন চারদিকের নানা পরিস্থিতি আমায় সব সময় ভীষণ ভাবে অস্থির করে তুলত।’
১৯৪৭ সালে ঘটল দেশভাগ। তার অভিঘাতে ঘটক পরিবার চলে এল কলকাতায়। তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো ঋত্বিকের মনে। ঋত্বিকের বড়দা মণীশ ঘটক ছিলেন তখনকার নামকরা কবি। সেই সুবাদে বাড়িতে একটা সাহিত্যের পরিবেশ ছিল। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাড়িতে আসতেন। এখান থেকেই ঋত্বিক ‘নবান্ন’ নাটকের দিকে ঝুঁকলেন ও আইপিটিএ-র সদস্য হলেন।
১৯৪৮ সালে ঋত্বিক লিখলেন তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। অভিনয় করলেন বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় ‘গণনাট্য’ প্রযোজিত ‘নবান্ন’ নাটকে। বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘কলঙ্ক’ নাটকে অভিনয় করলেন উৎপল দত্তের সঙ্গে। ১৯৪৮-৫৪ সাল পর্যন্ত ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল ঋত্বিকের। লাভ করেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদও। হাজরার প্যারাডাইস কাফেতে সে সময় নিয়মিত আড্ডা হতো সিনেমা-নাটক নিয়ে। কে আসতেন না সেখানে? হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, নবেন্দু ঘোষ, মৃণাল সেন, বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, উমানাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ ভবিষ্যতের দিকপালরা। ১৯৪৯ সালে নিজের নাটকের দল গড়েন ঋত্বিক নাট্যচক্র। সেখানে নীলদর্পণ নাটকে অভিনয়ও করেন। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের প্রযোজনায় ঋত্বিক পরিচালনা করেছিলেন নাটক ‘ঢেউ’ (বীরু মুখোপাধ্যায়), ‘জ্বালা’, ও ‘ম্যাকবেথ’।
কিন্তু এটুকুতে ঋত্বিকের চিত্ত ভরার নয়। তার মাথায় তখন ঢুকে গেছে ‘একসঙ্গে লক্ষ মানুষের কাছে নিজের কথা এখুনি বলতে চলচ্চিত্রই একমাত্র মাধ্যম’। কাজেই পদযাত্রা শুরু চলচ্চিত্রের রাস্তায়। ঋত্বিকের চলচ্চিত্র নিয়ে এই ভালোবাসা ও প্রত্যাশার পিছনে আরো কিছু কারণ অনুঘটকের কাজ করেছে।
ঋত্বিকের মেঝদা সুধীশ ঘটক ইংল্যান্ডে ডকুমেন্টারি ক্যামেরাম্যান হিসেবে ছ’বছর কাজ করে দেশে ফিরে নিউ থিয়েটার্সে যুক্ত হন। বহু ছবিতে ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করেছেন। বাড়িতে আসতেন বড়ুয়াসাহেব থেকে বিমল রায় পর্যন্ত অনেকেই। আর পাঁচজন যেমন ওঁদের ছবি দেখেন তেমনই ঋত্বিক ওই সব ছবি দেখে বিশেষ উৎসাহ পেতেন। কারণ দাদার সঙ্গে তাঁদের আড্ডা চলত বাড়িতেই। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি উৎসাহী হয়ে পড়েন চলচ্চিত্রে। এভাবেই কিছুটা দাদার যোগাযোগে ১৯৪৯ সালে মনোজ ভট্টাচার্যের ‘তথাপি’ নামক ছবিতে ঋত্বিক সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫০ এ নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’-এ ঋত্বিক শুধু সহকারী পরিচালক নন, অভিনয়ও করলেন যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। ১৯৫২ সালে তিনি হলেন স্বাধীন পরিচালক। তৈরি করলেন ‘নাগরিক’ (১৯৫২)। তবে এ ছবি ঋত্বিকের জীবদ্দশাতে মুক্তি পায়নি। ১৯৭৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নিউ এম্পায়ারে ছবিটি মুক্তি পায়। ১৯৫৮ সালের মে মাসে ‘অযান্ত্রিক’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
অল্প ক’টি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, তবে ঋত্বিকের মুক্তিপ্রাপ্ত সব ক’টি ছবিই বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল- ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশে তার তৈরি ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি। ১৯৭৪ সালে নির্মিত তার শেষ ছবি স্বরচিত কাহিনী অবলম্বনে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে মিনার-বিজলি-ছবিঘরে মুক্তি পায়। পাশাপাশি মুম্বাইতে হিন্দি চিত্রনাট্য রচনার কাজও করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। বিমল রায়ের ছবি ‘মধুমতি’র চিত্রনাট্যকারও ছিলেন তিনি। ১৯৬৬-৬৭ সাল নাগাদ বেশ কিছু দিন তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ভাইস-প্রিন্সিপাল পদে কাজ করেছেন শিক্ষক হিসেবে।
ঋত্বিক ঘটক ১৯৫৫ সালের ৮ মে বিয়ে করেন। স্ত্রী সুরমা ঘটক ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। নবদম্পতি প্রথমে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে থাকার পরে ‘বোম্বে’র গোরেগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাটে এসে উঠেছিল। তাদের দুই কন্যা- সংহিতা ও শুচিস্মিতা এবং একমাত্র পুত্র ঋতবান।
মৃত্যুর আগের বেশ কিছু বছর লিভারের রোগে ভুগছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার শেঠ সুখলাল করোনারি হাসপাতালে এই বিশিষ্ট শিল্পীর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার সময় স্ত্রী সুরমাদেবী কাছে ছিলেন না। তিনি তখন সাঁইথিয়ার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন তাঁকে খবর পাঠান- ঋত্বিক নেই।
২০১৮-এর ৮ ফেব্রুয়ারির এই কাগজেই ঋত্বিক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লেখিকা সূচনা করেছেন এইভাবে- ‘ঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, গালভরা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধূলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা কিন্তু সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি।’ সত্যিই ঋত্বিক সম্পর্কে লিখতে গেলে প্রথমেই এই চিত্র আঁকেন সবাই। কিন্তু ‘ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল- আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি।’- কথাটা বলেছিলেন সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘একান্ত নিজস্ব এক সিনেমা ভাষা ছিল ঋত্বিকের। ঋত্বিকের ছবি দেখলে মনে হয়, হলিউড বলে যেন কখনো কিছু ছিল না!’
ঋত্বিকের ছবিতে নাটকীয় সংলাপ, চরিত্রদের মঞ্চ-নাটকীয় শরীরী ভাষা, উচ্চকিত অভিনয়, আপতিক ঘটনার অতিব্যবহার, এসব বৈশিষ্ট্য ওঁর ওপর গণনাট্যের দিনগুলির প্রভাব ছাড়াও যা তুলে ধরে, তা হচ্ছে, পশ্চিমী সিনেমার প্রভাব বলয় থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে রাখা। আবার একই সঙ্গে ইউরো-মার্কিন সিনেমার সর্বশেষ চালচলন সম্পর্কে ঋত্বিকের মতো ওয়াকিবহাল পরিচালকই বা ভারতে ক’জন ছিলেন! ঋত্বিক ঘটক যখন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তখন এ ব্যাপারে কুমার সাহনি, মণি কল বা আদুর গোপালকৃষ্ণনের কাছ থেকে শোনা নানা কথা সেই সাক্ষ্য দেয়। পশ্চিমী চলচ্চিত্র ভাষাকে পরিহার করা তাই অজ্ঞতাপ্রসূত কিছু ছিল না। ঋত্বিকের দিক থেকে তা ছিল এক সচেতন প্রয়াসই। যাঁরা শিল্প-সংস্কৃতিতে উত্তর-উপনিবেশ বিষয়টি নিয়ে চর্চা করেন, ঋত্বিকের সিনেমাশৈলীতে চিন্তার অনেক খোরাকই তারা পাবেন। একটা প্রতিতুলনা টানা যায়। কুরোসাওয়া জাপানি, আবার আন্তর্জাতিকও। কিন্তু ওজু একান্তই জাপানি। ওজুকে সঠিকভাবে বুঝতে জাপানি শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। ঋত্বিক ঘটকও যেন তেমনই আমাদের একান্তই বাঙালি এক শিল্পী যাঁর বিষয়বস্তু, গল্প বলার ধরন, বাংলা ভাষার নাটকীয় প্রকাশভঙ্গি অনুযায়ী নাটকীয় সংলাপ, বাংলা মঞ্চ-নাটকের ধারায় উচ্চকিত অভিনয়রীতি, এমন কী ওজুর লো ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের মতো নিজের আলাদা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ঋত্বিকের ছবির ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের শটগুলো স্মরণ করুন, এ সবই এক বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের একান্ত নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষার প্রকাশ। তাই ঋত্বিকের শিল্পউৎসকে খুঁজতে হবে পশ্চিমী চলচ্চিত্রভাষায় নয়, সেটা খুঁজতে হবে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও শিল্পমাধ্যমগুলির মাঝে। কিন্তু দেশভাগের বেদনার ভাষা কি আজও তৈরি হয়েছে? তবে ঋত্বিকের ছবি নিঃসন্দেহে বিষাদের সেই অতলান্ত গভীরতাকে ছুঁতে পেরেছে অনেক বারই। নিজে যন্ত্রণায় আকীর্ণ নীলকণ্ঠ এক একক শিল্পী হয়েও সমষ্টির প্রতিবাদী চেতনার প্রতি আস্থাটা ঋত্বিক অবিচল রেখেছিলেন আজীবন। ‘সুবর্ণরেখা’তে জন্মভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নবজীবন কলোনী’।
ব্যক্তিজীবনে শিলংয়ের মেয়ে সুরমাকে বিয়ে করে প্রথমে সোনার সংসার পাতলেও ক্রমে তার ছবি ফ্লপ করতে লাগল। নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়লেন তারা। ঋত্বিক অ্যালকোহলিক হয়ে পড়লেন দিনে দিনে। বাড়িতে মদের আড্ডা। ঋত্বিক একরোখা- পুরো ইন্ডাস্ট্রি তা জানে। রাজেশ খান্নার মুখের ওপর স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। নিজে জলে পড়েছেন সে নয় মানা গেল, মা হয়ে বাচ্চাদের জীবন অনিশ্চয়তায় ফেলেন কী করে সুরমা? ঋত্বিককে একা ছেড়ে দেবেন, সিদ্ধান্ত নিলেন। শিলংয়ে বাবার বাড়ি চলে গেলেন সুরমা। এই সেপারেশনেও দুজন দুজনকে চিঠি লিখেছেন মাঝেমধ্যেই।
ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে সুরমার রেফারেন্স এসেছে বারবার। মেঘে ঢাকা তারায় নীতাকে দেখানো হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন জন্মেছেন। আসলে সুরমা জন্মেছিলেন জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন। কোমল গান্ধার-এ কেন্দ্রীয় চরিত্র অনসূয়ার জীবনের সংকটগুলো ছিল আসলে সুরমার সংকট থেকে অনুপ্রাণিত। আর যুক্তি তক্কো গপ্পো তো আত্মজৈবনিক ছবিই। এটিতে সুরমার ছায়া ছিল প্রকট। ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি’ গানটি ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন ঋত্বিক। এই গানটি প্রেমের দিনগুলোতে সুরমাকে গুনগুনিয়ে শুনিয়েছেন যে কতবার! আর এর চিত্রায়নও করেছিলেন শিলংয়েই।
নিজের সম্পর্কে তার প্রকাশ সবসময়েই হতাশাবাদীদেরই উদ্বুদ্ধ করবে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “বাবার ইচ্ছে পূরণ হলে একজন ‘ইনকাম-ট্যাক্স অফিসার’ হতাম। কিন্তু সেই চাকরিটি পেয়েও আমি ছেড়ে দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিই। চাকরিতে থাকলে আজ কমিশনার বা অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হতাম, হয়তো। কিন্তু এখন আমি শুধুই একটি ‘রাস্তার কুকুর’।” ক্যারিয়ারকে সারা জীবন ভাঁওতাবাজি বলে জেনেছেন। বলেছেন, ‘বেদনা ও অন্ধকার সবার জীবনেই আসে। তা-ই নিয়ে যারা হারিয়ে যান তাদের মেরুদণ্ড নেই বলে আমি মনে করি। আমার জীবনেও এসব এসেছে। কিন্তু আজও আমি মাথা উঁচু করেই বেঁচে আছি। সেগুলি সম্পর্কে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প বলার অবকাশ নেই বলেই আমি মনে করি। দুঃখ-দুর্দশা না-হলে মানুষ কখনো শিল্পী হতে পারে না। আমি যা কিছু দুঃখ পেয়েছি তার দ্বারাই কিঞ্চিৎ মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি- অবশ্য যদি আমাকে মানুষ বলে আপনারা মানুষকুল ভাবেন। দুঃখকে ভালোবাসতে হবে। তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পরম প্রাণ, যেটাকে খুঁজে বার করার মতো মনুষ্যত্ব থাকার দরকার বলে আমি অন্তত মনে করি।’
এই আলোচনা শেষ করা যাক সুনীল’দার কাছ থেকে শোনা একটি গল্প দিয়ে। কলকাতার অটোমোবাইলস ক্লাবের পানশালা। সেখানে কৃত্তিবাসীরা মাঝেমধ্যেই বসতেন। একদিন কথা শুরু করলেন সুনীল’দা।
‘ঋত্বিকদা, দুই বাংলার ভাগ নিয়ে আপনার সব ছবিতেই বড্ড মাতামাতি!’
‘মাতামাতি! বাংলাকে ভেঙে চুরমার করে দিল, আর মাতামাতি! বিক্ষুব্ধ সময়ে মুজরো করব? এটা বদমাইসি! আমি ওই শুয়োরের বাচ্চাদের মুখে…! আমি চাই, খুব বেশি করে চাই দু’বাংলার সংস্কৃতিকে এক ফ্রেমে আঁটতে। তাতে তোমরা মার্কসবাদীই বলো আর যাই বলো। প্রতিবাদ করাটা দরকার। কিন্তু শালা বুঝল না কেউ।’
এই তাকে না বোঝার অভিমান নিয়ে শেষ বয়েসে ভালো ভাষায় সিজোফ্রেনিক আর চলতি ভাষায় বদ্ধ পাগল হয়ে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মেঘে ঢাকা পড়লেন বাংলা সিনেমার উজ্জ্বল তারা।