ভোলার ঘটনা ধর্মান্ধদের মদদ

আগের সংবাদ

ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের অভিন্ন রূপ

পরের সংবাদ

প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি অবহেলা আর নয়

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ২২, ২০১৯ , ৯:৪৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০১৯, ৯:৪৩ অপরাহ্ণ

গত তিন বছরে বিদেশে গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি ৩৩১ জন নারী মৃত্যুবরণ করেছে নির্যাতনের শিকার হয়ে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন আত্মহত্যা করেছে। গত ছয় মাসে ৬০ বাংলাদেশি গৃহকর্মী নারী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে লাশ হয়ে ফেরত এসেছে। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ২৬ জন। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। হোক সে প্রবাসী পুরুষ কিংবা নারী। তাদের কারো প্রতি অবহেলা, উদাসীনতা, বঞ্চনা কোনোভাবেই কাম্য নয় আমাদের।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীরা মোটেও নিরাপদ নয়। চরম অবহেলা, নির্যাতন, নিগ্রহে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে চাকরি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পরপরই। নিয়োগকর্তার বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করতে গিয়ে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, আবার অনেকে নির্যাতন সইতে না পেরে চাকরি ছেড়ে শূন্য হাতে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এখন প্রায়ই পত্রিকার পাতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি নারী কর্মীদের দুর্বিষহ জীবনযাপন এবং তাদের দলে দলে দেশে ফিরে আসার খবর চোখে পড়ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পড়তে গিয়ে শিউরে উঠতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিভিন্ন বাড়িতে নারী কর্মীর চাকরি নিয়ে যাওয়া বাঙালি তরুণী, গৃহবধূদের ওপর নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ আমাদের খুব স্বাভাবিকভাবেই আলোড়িত করছে। আমরা এ ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে সৌদি আরব থেকে নির্যাতন, নিগ্রহ, বঞ্চনার শিকার হয়ে ফেরত আসা ১ হাজার ৩৬৫ জন এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৯১০ জন গৃহকর্মীকে বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। অনেকেই অমানুষিক নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। এ রকম ১৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীনকে চিকিৎসা এবং অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। ব্র্যাকের দেয়া তথ্যমতে গত তিন বছরে বিদেশে গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি ৩৩১ জন নারী মৃত্যুবরণ করেছে নির্যাতনের শিকার হয়ে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন আত্মহত্যা করেছে। গত ছয় মাসে ৬০ বাংলাদেশি গৃহকর্মী নারী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে লাশ হয়ে ফেরত এসেছে। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ২৬ জন।
দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের অধিকাংশই দেশে বাস্তুভিটা বিক্রি করে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনতে উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণের আশায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে যখন নিজ বাসভূমে ফিরে আসছে তখন তারা আপনজনের তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, অপবাদের শিকার হওয়ার পাশাপাশি নিজের পরিবার থেকে, বাড়ি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে তাদের কেউ কেউ ঘৃণা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নিপীড়ন, অপবাদ সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে কত অসহায় বঞ্চিত নারীর জীবন। অপেক্ষাকৃত সুখী, সুন্দর, সচ্ছল, সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে এ দেশের অনেক কন্যা-জায়া-জননী সংসারের সব মায়ার বন্ধন ত্যাগ করে প্রবাসী হচ্ছে। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। শ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থে সংসারের অভাব-অনটন, দুঃখ, দারিদ্র্য, কষ্ট ও অসহায়ত্ব দূর হয়ে যাবে। তেমন প্রত্যাশায় তারা আপনজন, সন্তান-স্বামী, বাবা-মাকে ফেলে দূর দেশে পাড়ি জমায়। তাদের এই চাওয়াটা তো অন্যায় কিংবা বাড়াবাড়ি কিছু নয়। কিন্তু বিদেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমের বিনিময়ে লাঞ্ছনা, যৌন নির্যাতন, বঞ্চনাই শুধু পায় তারা। তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পাশে কেউ থাকে না। তাদের সর্বস্ব হারানোর আর্তনাদ বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে গুমরে গুমরে ওঠে। বাইরের কেউ তা শুনতে পায় না। বীভৎস-বিকৃত নির্যাতন দুঃসহ হয়ে ওঠায় এক সময় তারা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা তাদের কুরে কুরে খেলেও তা প্রকাশ করতে পারে না। অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে তাদের অনেকেই আত্মহননে বাধ্য হয়। কত ভয়ঙ্কর দৈহিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে তারা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে- তা এখান থেকে অনুমানও করা যায় না। কেবল ভুক্তভোগী নারীটিই জানে তা। যা মুখ ফুটে আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জনকেও বলতে পারে না তারা নিজের মর্যাদাহানির আশঙ্কায়। বিদেশে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসার পর তাদের আরো দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। মা-বাবা, ভাইবোন, স্বামী-সন্তান তাদের গ্রহণ করছে না। তাদের দুঃখ-বেদনার কথা শোনার মতো কেউ পাশে থাকে না। নির্যাতিত প্রবাসী নারী কর্মীদের প্রতি সমাজের সবাই উন্নাসিক মনোভাব দেখায়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নির্যাতিত নারী কর্মীরা তাদের ওপর অন্যায় আচরণ, নির্যাতন, নিপীড়নের অভিযোগ দায়ের করলেও তার কোনো সুরাহা হচ্ছে না। বরং নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলেছে ক্রমেই। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা আমাদের স্বাভাবিকভাবে চিন্তিত করে তোলে। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। হোক সে প্রবাসী পুরুষ কিংবা নারী। তাদের কারো প্রতি অবহেলা, উদাসীনতা, বঞ্চনা কোনোভাবেই কাম্য নয় আমাদের। যথাযথ অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে প্রবাসে চাকরি নিয়ে যাওয়া নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতন এবং অমানবিক আচরণের অবসান ঘটাতে হবে। নারী নির্যাতনের এ ভয়াবহ অবস্থার যে কোনো মূল্যে অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সবাইকে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। বিদেশে চাকরি নিয়ে যাওয়া আমাদের নারী কর্মীদের যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বিদেশি নিয়োগকর্তা যাতে কোনোভাবেই নারী কর্মীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের জৈবিক লালসার শিকার না করতে পারে, কোনোভাবেই অমানবিক, অশালীন আচরণ করতে না পারে, প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে বাধ্য থাকে তেমন শর্ত পরিপালনে আমাদের সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবাসী নারী কর্মীরা দরিদ্র-অসহায় বলে তাদের প্রতি অমানবিক আচরণের অভিযোগ পাওয়ার পরও আমাদের নারী সংগঠনগুলোসহ অন্যান্য অনেকের অবহেলা এবং এ বিষয়ে নীরবতা আমাদের মর্মাহত করে বৈকি।

রেজাউল করিম খোকন : ব্যাংকার।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা