জিপির কাছে বিটিআরসির পাওনা আদায় শুনানি ২৪ অক্টোবর

আগের সংবাদ

ভোলার ঘটনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র

পরের সংবাদ

ভালোবাসায় কালিদাস কর্মকারকে বিদায়

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: October 21, 2019 , 6:36 pm

যার চিত্রকলায় ঘুরে ফিরে এসেছে আবহমান বাঙালির নিঃশ্বাসের ধ্বনি। বর্তমান সময়, অবিশ্রান্ত, মানবীয় অভিজ্ঞতার সম্পর্কের ভাষা মূর্ত করে তুলতেন তিনি। এ ভূখ-ের যাপনপ্রণালী, নানা ধর্মের সমন্বয়, লোকশিল্পের নানা প্রতীক উপাদান হিসেবে এসেছে। শিল্পী হিসেবে কালিদাস কর্মকার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন।

প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙতেন তার ক্যানভাস আর শিল্পকর্মে। তার চিত্রকলায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন আন্দোলনের অনুষঙ্গে এসেছে তাবিজ, কবজ আর কড়ি। কাগজের মন্ডের পটভূমিতে কখনও চকিতে ধরা পড়েছে মৃত্যুমুখ মুক্তিযোদ্ধার যন্ত্রণাকাতর হাতের ইঙ্গিত। তার উচ্ছাস, অভিব্যক্তি, শুদ্ধতা, বেদনা, স্মৃতি আর একাকিত্ব এ সবই যেন তার পাললিক অনুভব। যার ছবির শেকড় গাঁথা ছিল এ জনপদেরই মাটিতে। আজ সে মাটির মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে বিদায় নিলেন তিনি। যিনি মানুষ হিসেবে সবসময় ছিলেন হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত।

শেষ বিদায় জানাতে এসে সবাই সেই কথাগুলোই বলছিলেন। বিদায় বেলায়ও সবাই তাকে জানিয়েছেন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছেন তার কফিন। চারুকলা অনুষদ ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সবুজবাগে বরেদশ্বরী কালি মন্দিরে শ্মশানে তাকে দাহ করা হয়।

শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে চিত্রশিল্পী কালিদাস কর্মকারকে ঢাকার বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এর পর ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসকরা কালিদাসকে মৃত ঘোষণা করেন। তারপর তার মরদেহ রাখা হয় বারডেমের হিমাগারে।

সোমবার (২১অক্টোবর) সকালে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ও পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।

সকাল নয়টায় রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের হিমঘর থেকে কালিদাস কর্মকারের মরদেহ নিয়ে আসা হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। সেখান থেকে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় চারুকলা প্রাঙ্গণে। শিল্পী, চারুশিক্ষক ও চারুশিক্ষার্থীরা ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বরেণ্য এ চিত্রশিল্পীকে।

এখানে কালিদাস কর্মকারের প্রতি চারুকলা অনুষদের পক্ষে শ্রদ্বা নিবেদন করেন অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। এছাড়াও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ, ছাপচিত্র বিভাগ, ভাস্কর্য বিভাগ, কারুশিল্প বিভাগ, গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ, প্রাচ্যকলা বিভাগ, মৃৎশিল্প বিভাগ এবং শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। আরো শ্রদ্ধা জানায় বিটিভি, গ্যালারি কসমস, ঢাবি ভাস্কর্য বিভাগ প্রাক্তনী সংঘ, ঢাকা আর্ট সার্কেল, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।

এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে কালিদাস কর্মকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী, সৈয়দ আবুল বারক্ আলভী, কনকচাঁপা চাকমা, রোকেয়া সুলতানা প্রমুখ।

এরপর শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয় নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তার দুই মেয়ে কঙ্কা কর্মকার ও কেয়া কর্মকার। সাংগঠনিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গ্যালারি কসমস, ঢাকা গ্যালারি, বিসিক নকশাকেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।

ব্যক্তিগতভাবে কালিদাস কর্মকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, শহীদ কাজী, রোকেয়া সুলতানা, ফরিদা জামান, নেপালি বন্ধু ডি প্লামা, ডাকসুর সাবেক ভিপি আখতারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান ও উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ, নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী, প্রাবন্ধিক মফিদুল হক প্রমুখ।

মেয়ে কঙ্কা কর্মকার বলেন, বাবা প্রতি মুহুর্তে দেশ ও দেশের শিল্পকর্মকে প্রচার করেছেন। এখন থেকে প্রতিবছর বাবার নামে প্রদর্শনী করবো। তার সৃজনশীল কাজের কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে। এ সময় বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য তিনি সবার সহযোগিতা চান তিনি।

এক মিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ এ শ্রদ্ধানুষ্ঠান। শহীদ মিনার থেকে কালিদাস কর্মকারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাজধানীর সবুজবাগের বরেদশ্বরী কালি মন্দিরে।

ড. গওহর রিজভী বলেন, আমরা শুধু একজন শিল্পীকে নয়, পরম বন্ধুকে হারিয়েছি।

শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, কালিদাসের চলে যাওয়াটা আকস্মিক। আমি তার শিক্ষক ছিলাম। চারুকলায় বেশ কয়েক বছর আমি তাকে দেখেছি। সব সময় এক ধরণের কর্মব্যস্ততা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। এত এত মাধ্যমে কাজ করেছে যে, মাঝে মাঝে নিজের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতো। তার চলে যাওয়াটা শিল্পকলার জন্য অপূরণীয় এক ক্ষতি।

হাশেম খান বলেন, কালিদাস কর্মকার বাংলাদেশের শিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করার জন্য নিরলস কাজ করেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এ বিষয়টি তাকে কেউ বলে দেয়নি। সে নিজেই কাজটি করেছেন।

নিসার হোসেন বলেন, কালিদাস কর্মকার বহু ধরণের কাজ করতেন। সেটিকে একটি ভিন্নামাত্রা দিতেন। নিজে যেমন চিত্রকর্মের ফর্ম গড়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে সেটিকে ভেঙে আবার নতুন কিছু করেছেন। শিল্পমাধ্যমের এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে তিনি কাজ করেননি।