বোরো-ইরির পর আমনের মূল্য নিয়ে সংশয়

আগের সংবাদ

শুরু হলো মাসব্যাপী ‘মোবাইল অ্যাপ ও গেম এডভান্স ট্রেনিং’

পরের সংবাদ

আদর্শের লড়াইতে ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থান: একটি পর্যালোচনা

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ২১, ২০১৯ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০১৯, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রতিটি সংগঠনই মহৎ আদর্শের রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। এমন এক কঠিন এবং জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো। এ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে বিপরীত বিরুদ্ধ শক্তিরাই ১৯৭৫ সালের পর থেকে যেভাবে মাঠে উদিত হয়েছে, ছাত্ররাজনীতির মোড়কের ভেতর অবস্থান নিয়েছে, আষ্টেপৃষ্ঠে ছাত্ররাজনীতিকে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে জাতি এবং আমাদের রাষ্ট্র কীভাবে বের হবে- সেটি বড় প্রশ্ন।

দেশে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্ররাজনীতির পক্ষে তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করছে। রাজনৈতিক দলগুলোও তাই। ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে মূলত শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের একটি অংশ মতামত ব্যক্ত করছেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে যে ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে তা দেখে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্ররাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এরপরও ছাত্ররাজনীতির নামে ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থান কতটা নিজেদের সাংগঠনিক রাজনীতির পক্ষে জনমত গঠনের সুবিধা লাভ করবে- সেটি মস্তবড় প্রশ্ন। কোনো ছাত্র সংগঠনই বলছে না যে, এ পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতির নামে যে অপরাজনীতি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শাসক দলের সমর্থক হিসেবে ছাত্র সংগঠন অন্যায়ভাবে করে সেটি তারা করবে না। শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা, দেশে জাতীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সেটিতে সংগঠন নির্বিশেষে সবাই একযোগে অবস্থান নিতে কার্পণ্য করবে না- এমন প্রতিশ্রুতি কোনো ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়নি। দেয়ার কারণও নেই, কারণ এখন পর্যন্ত দেশে যেসব ছাত্র সংগঠন রয়েছে সেগুলো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা সমর্থনপুষ্ট সংগঠন হিসেবে পরিচিত। ফলে মূল রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হয়ে কোনো ছাত্র সংগঠনই অন্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে একমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করে থাকে।

মূলত ১৯৭৫ সালের পর থেকে ছাত্ররাজনীতি তথা ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকা- বড় ধরনের বাঁক নেয়। অতীতের আদর্শের রাজনীতি থেকে এই সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলো ক্রমেই নতুনরূপে আবির্ভূত হতে থাকে। বিশেষত ১৯৭৮ সালে ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে নাম লেখানোর বাধ্যবাধকতায় আনার পর ছাত্ররাজনীতিতে আগের ঐতিহ্যের সঙ্গে বড় ধরনের ছেদ ঘটে। ছাত্রলীগ (জাসদ) ১৯৭৫ সালের আগে যেভাবে দেশব্যাপী একচ্ছত্র হয়ে উঠেছিল সেটিও ১৯৭৬, ১৯৭৭ সালে ভেঙে তছনছ হতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৭৮ সালে দুভাগে বিভক্ত হয়। ছোট একটি অংশ ছাত্র সমিতি নামধারণ করে ন্যাপ মোজাফফরের অঙ্গসংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। মূল ছাত্র ইউনিয়নও সেই সময় বড় ধরনের কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান দেশে নিজের দল গঠন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্য দলের জন্য ‘ঘরোয়া রাজনীতি’র বেশি কাউকে রাজনীতি করতে দেননি। দেশে সান্ধ্য আইন বলবৎ ছিল। ছাত্রনেতারাও অনেকেই সীমিত পর্যায়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করত। প্রশ্ন জাগে, ছাত্ররাজনীতি যদি জাতির জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কেন আগের আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠনগুলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেনি। অধিকন্তু এই সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আবির্ভাব সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কীভাবে গড়ে উঠেছিল, সেটি সবারই জানার কথা।

১৯৭৫ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপক্ষে দেশে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকে দাঁড় করানোর পূর্বপরিকল্পনা হিসেবে রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন এবং অন্যান্য অঙ্গ সংগঠন গড়ে তোলার যে গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছিল সেটি না জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো, না ছাত্ররাজনীতির পোড় খাওয়া ছাত্র সংগঠনগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছিল। এটি স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারার বিপরীতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল ছাত্র সংগঠন এবং অন্যান্য সংগঠন সমান্তরালভাবে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৭৯-৮০ দিকে তৎকালীন সরকার সমর্থিত ছাত্রদল অন্য সংগঠনগুলোকে ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ করার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। সেটি করতে গিয়ে ক্যাম্পাসে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘাত, সংঘর্ষের মতো ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পূর্ববর্তী সামরিক শাসকের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। এটি একই ধারার রাজনীতি অপরাজনীতির নতুন সংস্করণ মাত্র। এখানেও সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন তৈরি করা হয়েছিল। তারাও সরকারি মদদে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিল। তবে ১৯৮৩ সাল থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ যে উদ্যোগটি গ্রহণ করে তার সঙ্গে বেশ পরে ছাত্রদলও যুক্ত হয়। ছাত্রদলের যুক্ত হওয়াটি একেবারেই বিএনপির অবস্থান থেকে এরশাদকে ক্ষমতায় না দেখার মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া মৌলিক রাজনৈতিক বা জাতীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছিল না। এই আন্দোলনে বিএনপি, ছাত্রদলের অংশগ্রহণ অনেকটাই প্রতিপক্ষ হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং শাসন করার বিরুদ্ধে অবস্থা নেয়া থেকেই। কোনো অবস্থাতেই এটি মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অংশ ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নামের ভেতরে কত ধরনের রাজনৈতিক বিভাজিত শক্তির সন্নিবেশ ঘটেছিল সেটির শেষ পরিণতি আদৌ বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের অগ্রযাত্রা রক্ষা করবে কিনা সেই জিজ্ঞাসা রাজনৈতিক সচেতন মহলে খুব বেশি তখনো ছিল না, এখনো অনেকের কাছেই বোধগম্য বলে মনে হয় না। ফলে মধ্য আশির দশকে রাজনীতির আদর্শের বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলা হলো, স্বৈরাচারবিরোধী তকমায় সবাই একাট্টা হলো। কিন্তু এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আদর্শের রাজনীতি একাকার হয়ে গিয়েছিল। গোটা আশির দশকে দেশের শিক্ষাঙ্গনে একদিকে যখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আদর্শের ধারক বেশকিছু ছাত্রসংগঠন ‘গণতন্ত্র মুক্তিপাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগানে আন্দোলন জোরদার করছিল তখন ছাত্রশিবির দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকে। ছাত্রশিবির মূলত জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা (ইসলামী বিপ্লব সম্পন্ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল) বাস্তবায়নে একাগ্রচিত্তে কাজ করছিল। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ থেকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন তখন প্রায় বিতাড়িত, অনেক নেতাকর্মী ছাত্রশিবিরের হামলায় নিহত বা আহত হয়েছিল। সেই সময় ছাত্রদল শিক্ষাঙ্গনে ততটা প্রভাব বিস্তার করার অবস্থানে ছিল না।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের সময় রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ যে অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল তার একটি ক্রেডিট পেয়েছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পরিচিত নেতারা। এই সুযোগটি অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছিল। সেই সময়ে অনেক ছাত্রনেতাই ক্ষমতা ও বৃত্তের সুযোগ গ্রহণ করেছিল। অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ছাত্রনেতারা দেশে ফিরে এসে এমন কোনো কৃতিত্বের বিনিময় নেয়নি। যা নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের একটি অংশ নিয়েছিল। সেখান থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ১৯৭৫ সালের পরবর্তী ছাত্র সংগঠনে আদর্শের রাজনীতির তকমা খুব একটা যুক্তিযুক্তভাবে গ্রহণ করা যায় না। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর দেশের জাতীয় রাজনীতি দুভাগে বিভক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের অসাম্প্রদায়িক ধারা-যা ১৯৯১-এর নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেনি। অন্যপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ও বিভ্রান্ত তত্ত্বের অনুসারী জাতীয়তাবাদী ধারা- যার অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারী শক্তিও যুক্ত হয়, সেটি ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল তাদের যৌথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ধারার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা মস্তবড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। দেশের শিক্ষাঙ্গনে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, উগ্র হঠকারী মতাদর্শ আস্তানা গেড়ে বসে, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা চিন্তা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উচ্ছেদের যাবতীয় আয়োজন সম্পাদন করেছিল ছাত্রশিবির। ছাত্রদল এসবে মাথা ঘামায়নি, তাদের পাহারা বড়জোর ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ছিল। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। তৈরি হয় ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রশিবির-ছাত্রদলের দ্বন্দ্ব। এখানে আদর্শ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব গভীরে নিহিত থাকলেও ছাত্রলীগের একটি অংশ আদর্শের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত পদ-পদবি, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। সে কারণে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ছাত্রশিবিরকে সরিয়ে দেয়ার লড়াইতে তারা সফল হয়নি, তবে ছাত্রদল রণে ভঙ্গ দিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল।
২০০১ সালের পর ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৯৪৭ সালের আদর্শ বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করেছিল। সেই সময় ছাত্রলীগ এবং অন্য বামধারার ছাত্রসংগঠনগুলোও শিক্ষাঙ্গনে থাকতে পারেনি। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পর ছাত্রলীগ আবার ক্যাম্পাসে ফিরে এলেও ছাত্রশিবিরকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পুরোপুরি তারা সফল হয়নি। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হলে ছাত্রদল এর সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ছাত্রশিবিরের যুক্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তারা বরং গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে জামায়াত এবং বিএনপির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। জামায়াত-বিএনপি তখন হেফাজতকে সরকার উৎখাতে ব্যবহার করেছিল। দেশে আস্তিক-নাস্তিকের বিতর্ক জুড়ে দিয়ে শাহবাগ আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগে- ছাত্রদল দেশে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ইত্যাদির মতো আদর্শের ধার ধারে কিনা? ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কোনোভাবেই বলা যাবে না যে, ছাত্রদল এসব আদর্শের কোনো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, আছে, থাকবে বা সেসব আদর্শ ধারণ করবে। ছাত্রশিবির সম্পূর্ণরূপেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী ছাত্র সংগঠন। ছাত্রলীগ ক্রমাগতভাবে আদর্শের চর্চা থেকে সরে গিয়ে পদ-পদবি, ব্যক্তিস্বার্থ ইত্যাদিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সে কারণে গত ১০ বছরে ছাত্রলীগ দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের চর্চা, অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীতে নিজেদের দলীয় আদর্শের চর্চা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে না করে বরং যা করেছে তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ছাত্রলীগেই শুধু নয়, ছাত্ররাজনীতির প্রতিও বীতশ্রদ্ধ হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্টসহ অন্যান্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলো আদর্শের লড়াইতে এসব উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে অনেক বেশি নুইয়ে পড়েছে। অনেকেই উগ্র হঠকারী ভাবাদর্শে ডান-বামের মিশ্রণে যুক্ত হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় কোনো একটি ছাত্র সংগঠনই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ধারাকে সমুন্নত রাখার আদর্শ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার রণকৌশল ও রণনীতি নিয়ে কাজ করার পর্যায়ে নেই।

প্রতিটি সংগঠনই মহৎ আদর্শের রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে আবার কয়েকটি তো সম্পূর্ণরূপেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মতাদর্শের ছাত্র সংগঠন হিসেবে শিক্ষাঙ্গনে ক্রিয়াশীল রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির কী হবে বা ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনীতিকে একধারায় বিবেচনা করার আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি- এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া আবেগের বশবর্তী হয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্ররাজনীতির নামে যে শক্তি অবস্থানকে টিকিয়ে রাখা হবে তা দিয়ে না হবে শিক্ষা, না হবে গণতন্ত্রের মূল আদর্শের রাজনীতি, না হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। এমন এক কঠিন এবং জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো। এ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে বিপরীত বিরুদ্ধ শক্তিরাই ১৯৭৫ সালের পর থেকে যেভাবে মাঠে উদিত হয়েছে, ছাত্ররাজনীতির মোড়কের ভেতর অবস্থান নিয়েছে, আষ্টেপৃষ্ঠে ছাত্ররাজনীতিকে বেঁধে ফেলেছে তা থেকে জাতি এবং আমাদের রাষ্ট্র কীভাবে বের হবে- সেটি বড় প্রশ্ন।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা