জাতীয় প্রেসক্লাবের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

আগের সংবাদ

ওমর ফারুককে বহিষ্কার

পরের সংবাদ

শুদ্ধি অভিযানের সার্থকতা তার ফলাফলে

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ২০, ২০১৯ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৯, ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

আহমদ রফিক

লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

দেরিতে হলেও শুরু হওয়াটা শুভ লক্ষণ সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা শুভ ফল দেবে তখনই যখন এ অভিযান ব্যক্তিনির্বিশেষ, নিরপেক্ষ, পৃষ্ঠপোষকতাহীন সততার সঙ্গে পরিচালিত হবে, দলীয় হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় আসবে না, বহু কথিত ভাষ্য- ‘বিরাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে’ নির্মোহভাবে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, অভিযুক্তদের যথাযথ বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হবে।

চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ একাধিক অনৈতিক অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতায় সম্ভবত বিরক্ত হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজ দলের অঙ্গ সংগঠন, বিশেষ করে যুবলীগকে কেন্দ্র করে এসবের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে সংবাদপত্র মহলে, রাজনৈতিক মহলে, অংশত সমাজে তোলপাড়। পুলিশ নয়, র‌্যাবের অভিযানই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে মহলবিশেষে। সংশ্লিষ্ট দুয়েকজন নামি যুব-ছাত্রনেতা আটক, রিমান্ড, অনেকের ওপর নজরদারি, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় কঠোর অবস্থান, কারো কারো ব্যাংক একাউন্ট জব্দ ইত্যাদি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিউইয়র্কে নতুন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা সংবাদ সম্মেলনে: ‘অভিযান অব্যাহত থাকবে’। এর আগে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছিলেন যে, একটার পর একটাকে ধরবেন, দুর্নীতিবাজ কেউ বাদ পড়বে না।

কিন্তু পুলিশের ঢিলেঢালাভাব, দুর্দান্ত জুয়াড়ি সম্রাটকে নিয়ে দোলাচল অনেকের মনে প্রশ্ন তোলে, অভিযান কি তাহলে সীমিতবৃত্তে বিশেষভাবে একমুখী ধারায় চলবে? অনেকে এবং নেপথ্য নায়ক গডফাদাররা কি অধরা থেকে যাবেন। ক্যাসিনো বাণিজ্যের ব্যাপকতা, দুর্নীতির সর্বত্রগামিতা, দলীয় নেতৃত্বের একাংশের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি যে রাজনৈতিক কম্প তৈরি করেছে তাতে বিশ্লেষকদের লেখায় বিশেষ সম্ভাবনার আভাস-ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। সে কারণে বা অন্য যে কারণেই হোক পূর্বোক্ত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোনো প্রকার রাখঢাক না করেই বলে ফেলেছেন: ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়। সেই কাজটি আমি নিজের ঘর থেকেই শুরু করেছি। এটি অব্যাহত থাকবে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো অনেক সদর্থক কথা বলেছেন তা শ্রোতা বা পাঠকমাত্রের মনে আশার সঞ্চার ঘটাবে যে, এবার কিছু পরিবর্তন হয়তো দেখা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি আস্থা রেখেই আমরা বলতে চাই, মাঠপর্যায়ে তথা কার্যক্ষেত্রে সবকিছু যেন প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্য ও ইচ্ছানুযায়ী ঘটে। এ কথা বলার কারণ, প্রায়ই দেখা যায় যাদের হাতে দায়িত্ব সম্পাদনের ভার, সেই তৎপরতায়, সদিচ্ছা বা দক্ষতার অভাব, কখনো সর্ষের মধ্যে ভূত। সব মিলিয়ে ঘোষণা ও কাজের মধ্যে বাস্তবতায় বেশ ফারাক। আমরা লক্ষ করছি, ক্যাসিনো সম্রাটকে নিয়ে সংবাদপত্রে অনেক সমালোচনা, অনেক আভাস-ইঙ্গিত উঠে আসছে। ইতোমধ্যে সম্রাটকে ধরাও হয়েছে।

দুই.
প্রধানমন্ত্রী তার রাজনৈতিক বাস্তবতাবোধ থেকেই অভিযান প্রসঙ্গে ওয়ান-ইলেভেনের কথা খোলাখুলিভাবে উল্লেখ করেছেন। কোনো কোনো লেখায় যা আকারে-ইঙ্গিতে, কিংবা ড্রয়িং রুম আলাপে সীমাবদ্ধ তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এসেছে। এই পরিপ্রেক্ষিত যদি বিবেচনাতেই রাখা যায় তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে সফল করে তুলতে সেই মাত্রায় শুদ্ধ ও সর্বত্রগামী হতে হবে যাতে এক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন বা সমালোচনার সুযোগ না থাকে। শুদ্ধি অভিযানে যখন ‘ঘর থেকেই শুরু’ হয়েছে তখন চারকোণা পরিষ্কার না করে অভিযানে শিথিলতা বা তা বন্ধ করার পদক্ষেপ যেন না নেয়া হয়।

কোনো কোনো লেখক এ প্রসঙ্গে অপারেশন ক্লিনহার্টের মতো ভয়ঙ্কর সূচনার বেহাল পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা কয়েক দশক পিছিয়ে গেলে দেখতে পাই, আইয়ুব খাঁর সামরিক শাসনের সূচনালগ্নের (১৯৫৮) কঠোর তৎপরতা- আরব সাগরে চোরাচালানিবিরোধী অভিযান, দুর্নীতিবাজদের মারাত্মক দ- বেত্রাঘাত ইত্যাদি কীভাবে কিছুদিনের মধ্যে শেষ হয়েছিল। বেত্রাহত এক রাজনীতিক আইয়ুবী মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীও হয়েছিলেন। সমস্তটাই ছিল ক্ষমতা দখলের ধোঁকাবাজি। সামরিক শাসনে এমনটাই ঘটে থাকে। জনচিত্তে ধোঁকা।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এমন বহুবিধ ঘটনার উদাহরণ ধরে রেখেছে। আর এ কারণেই তোলপাড় করা অভিযান সত্ত্বেও লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট থেকে সাধারণ মানুষ সবাই অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছে না। লেখকদের বক্তব্যও তেমন ধারার। তারা বারবার বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে সতর্ক বাণী উচ্চারণ করছেন।

তারা সম্ভবত এ অভিযানের নির্দেশক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন অভিযান সংশ্লিষ্ট ঘাটতিগুলোর দিকে। অভিযানের শুরুতে একটি সংবাদ পড়ে অবাক হয়েছিলাম: কাকরাইলে ভূঁইয়া ম্যানসনে তার অফিসের সামনে তার নিরাপত্তায় শতাধিক মোটরসাইকেল- অর্থাৎ কর্মীর উপস্থিতি। এসব তো পুলিশের চোখের সামনেই ঘটছে। এরকম অনেক ঘটনা রাজনৈতিক স্বৈরাচারের পরিচায়ক। নেতারা নিরাপত্তারক্ষী দল নিয়ে ঘোরাফেরা করেন, এমনকি মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও। কথাটা আমার নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর। শেষোক্ত কথাটি তিনি তার পূর্বোক্ত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন তীর্যক ভঙ্গিতে। এমন সব ঘটনা থেকে বিরাজমান সামাজিক অবস্থার রাজনৈতিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়, যা হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে ওয়ান-ইলেভেনের সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে থাকবে।

তিন.
একদিকে প্রধানমন্ত্রী বলছেন : ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, চলবে’। অরদিকে পুলিশের পক্ষে চলছে অভিযানের পাশাপাশি টানাপড়েন। ইতোমধ্যে ক্যাসিনোকাণ্ডে কোনো কোনো পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয়েছে এবং হচ্ছে।

তাই মোটা হরফে মোটা সংবাদ শিরোনাম : ‘পার পাবে না পুলিশও’। ‘ক্যাসিনো সহযোগী পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে গোয়েন্দারা মাঠে নেমেছে’। কীসব কা- ঘটছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীতে- সামাজিক সুস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদেরই কোনো কোনো সদস্য সে দায়িত্বের রক্ষক না হয়ে ভক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অগাধ অর্থের লোভ সংবরণ করা একটু কঠিন তো বটেই। আর সে জন্যই সমাজের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির এত ব্যাপক বিস্তার!
সমস্যা হলো ঘটনা তো শুধু যুবলীগে বা ছাত্রলীগে সম্রাট বা খালেদে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত দলীয় নেতাদেরও কেউ কেউ। সে সংখ্যাটি আমাদের জানা নেই। সম্ভবত জানা নেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরও হয়তো বা জানা থাকতে পারে গোয়েন্দা বিভাগের, অথবা জানবে অনুসন্ধান শেষে।

তাই এমন সংবাদে আমরা অবাক হই না: ‘আ.লীগ-বিএনপি নেতাদের ভাগ দিতেন লোকমান’। এরা তো চুনোপুঁটি। মাসে ২১ লাখ টাকা, কিছুই না, যেখানে আসল ক্যাসিনো ব্যবসায় আসে কোটি কোটি টাকা। এসব বিশাল দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির মূল উৎস পর্যন্ত কি পৌঁছাতে পেরেছে গোয়েন্দা পুলিশ বা র‌্যাব?
তাই এমন একাধিক সংবাদ শিরোনামের একটি উদ্ধৃত : ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে/নেপথ্য নায়করা’। এখানে বলা হয়েছে যে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনো ব্যবসাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ‘জড়িত রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা না হলে মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।’ এ বক্তব্য যথার্থ এবং তা সবারই কথা- যারা লিখেছেন, যারা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন তাদের সবার আকাক্সক্ষার কথা।

এ বিষয়ে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব চমৎকার ভাষ্যে বলেছেন: ‘অভিযান অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। বীজ থেকে বেরিয়ে আসা চারাগাছ যখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে, অনেক ডালপালা ছড়িয়েছে, তখন অভিযান শুরু করা হয়েছে।’ এটাও বিচক্ষণ মন্তব্য এবং যুক্তিবাদী চরিত্রের, এমন কথাও ইতোপূর্বে লেখা হয়েছে, বলাবলি তো হচ্ছেই। তবু আমরা বলি, দেরিতে হলেও শুরু হওয়াটা শুভ লক্ষণ সন্দেহ নেই।

কিন্তু এটা শুভ ফল দেবে তখনই যখন এ অভিযান ব্যক্তিনির্বিশেষ, নিরপেক্ষ, পৃষ্ঠপোষকতাহীন সততার সঙ্গে পরিচালিত হবে, দলীয় হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় আসবে না, বহু কথিত ভাষ্য- ‘বিরাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে’ নির্মোহভাবে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, অভিযুক্তদের যথাযথ বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হবে। তখন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সদিচ্ছার পরিণতিতে পৌঁছাবে এবং জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে সার্থকতা অর্জন করবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জন্য এটা এক মস্ত চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন থেকে ভূত তাড়ানোটা হবে প্রাথমিক শর্ত।

আহমদ রফিক: লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা