বায়ুদূষণ নীরবে কেড়ে নেয় প্রাণ

আগের সংবাদ

জাতীয় প্রেসক্লাবের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

পরের সংবাদ

শিক্ষার্থীদের আবাসিক নিরাপত্তা

মূল সমস্যা নিহিত ব্যবস্থাপনায়

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ২০, ২০১৯ , ৮:৩৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৯, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

ড. এম এ মাননান

উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয় যেন অবশ্যই হয়ে ওঠে সত্যিকারের জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ আর সৃজনশীল মুক্তবুদ্ধি চর্চার আদর্শ স্থান। থাকবে এমন পরিবেশ যেখান থেকে আপনা-আপনি সৃষ্টি হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। ছাত্ররাজনীতি থাকবে শুধু শিক্ষার্থীদের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে। এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশা করা কি অনেক কিছু চাওয়া? আমরা চাইলে সবকিছু পারি। প্রয়োজন শুধু সৎ মানসিকতা, মানবিক মন, ভালো কিছু করার তাগিদ আর সর্বোপরি অপরের প্রতি নির্মল ভালোবাসা।

মায়ের বুকে চলছে নীরব রক্তক্ষরণ। বাবার বিহ্বল চেহারা। ভাইবোনরা নির্বাক। প্রতিবেশীরা বিমূঢ়। এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। সচেতন নাগরিকরা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। গাছতলায়, রাস্তার পাশের চা-দোকানের আড্ডায়, পুকুরঘাটের আলাপচারিতায়, হাটে-বাজারে সর্বত্র বিষয়টি নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা। বিষয়টি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছাত্রনেতা-কর্মী তকমা লাগানো দুর্বৃত্তদের নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যাকাণ্ডের খবর। টেলিভিশন আর সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৌঁছে যায় বর্বরোচিত খবরটি শহরে-বন্দরে-নিভৃত পাড়াগাঁয়ে। খবরটি আমিও দেখেছি পত্রিকায়, যখন অবস্থান করছিলাম নিজ গ্রামে পূজার ছুটিতে। সহপাঠী/সিনিয়রদের হাতে জীবন দিতে হলো একজন ছাত্রকে শুধু র‌্যাগিং কালচারের শিকার হয়ে, ভাবতেও কষ্ট লাগে। সভ্য জগতে এমনটা কীভাবে সম্ভব?

পত্রিকায় দেখলাম, বুয়েটের যে হলে আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেখানে অনেক আগে থেকেই ছিল টর্চার রুম আর মদের আড্ডার প্রচলন। হল প্রশাসন নিয়মিত রুম পরিদর্শন করলে, খবরাখবর নিলে, আবাসিক ছাত্রদের সঙ্গে মাঝে মাঝে মতবিনিময় সভায় একত্রিত হলে এবং হলগেটে অভিযোগ বাক্স রাখার ব্যবস্থা করা হলে দুর্বৃত্তপনা করার মতো সুযোগই কেউ পেত না। মাসে প্রভোস্ট অন্তত দুবার এবং উপাচার্য একবার হল ঘুরে ঘুরে দেখলে (যাকে ম্যানেজমেন্টের ভাষায় বলা হয় ‘ম্যানেজমেন্ট বাই ওয়ান্ডারিং এরাউন্ড’), আবাসিক ছাত্ররা যারা মা-বাবাকে ছেড়ে গ্রামগঞ্জ থেকে এসে আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে হলে নিরানন্দ জীবনের একটি ঘাসহীন মাঠে বসবাস করে, তারা কিছুটা হলেও মনে করতে পারে যে তারা অভিভাবকহীন নয়। বাস্তবে চিত্রটা উল্টো কেন? ভেবে কোনো কারণ পাই না।

আমি চার বছর জহুরুল হক হলের প্রভোস্ট ছিলাম অনেক বছর আগে, ১৯৯৭-২০০০ সাল পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহে রুটিন করে একবার রাত ১১টার দিকে হলের প্রতিটি করিডোরে ঘুরে আসতাম, দৈবচয়ন ভিত্তিতে কয়েকটা রুমে দরজায় টোকা দিয়ে ছাত্রের অনুমতি নিয়ে ঢুকে পড়তাম, কথা বলতাম, তার কোনো অসুবিধা আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করতাম, মতামত শুনতাম এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতাম। সঙ্গে থাকতেন একদল চৌকস হাউস টিউটর। তারা রোল কল করতেন প্রত্যেক রুমে গিয়ে। একবার তো তিনতলায় গিয়ে দেখি, ৮-১০টা রুম দখল করে আছে কয়েকজন ‘বিগত’ ছাত্রনেতা, যারা বিভিন্ন অফিসে চাকরি করে, দুয়েকজন নিউমার্কেট-নীলক্ষেত এলাকায় গু-ামি করে টাকা রোজগার করে (শোনা অভিযোগ)। সব হাউস টিউটরকে নিয়ে সবগুলো রুম থেকে খাট-লেপ-তোশক বের করে পাশের পুকুরে ফেলে দেয়ার ব্যবস্থা করলাম তাৎক্ষণিকভাবে। জানতাম প্রতিক্রিয়া হবে। মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদের ‘বন্ধু মাস্তানরা’ হাজির। প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে শুরু হম্বিতম্বি। নেতাগোছের যেটা ওটাকে কলার ধরে যখন বললাম, তুমি তো এ হলের কেউ নও; এখানে রাত সাড়ে বারোটায় এসেছো কেন? সদম্ভ জবাব: প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে কোনো হলে যে কোনো সময় ঢোকার অনুমতি দিয়েছেন। কলার ছেড়ে দিয়ে তার বাম হাত ধরে যখন বললাম : চলো, কোন প্রধানমন্ত্রী তোমাকে এ রকম অনুমতি দিয়েছেন তা তার সামনে গিয়েই জানব। হাত ধরে টানতে টানতে গেট পর্যন্ত আসার পর যখন গাড়িতে উঠতে যাব তখনই সুর পাল্টে গেল। ক্ষমা চেয়ে চলে গেল। আর কখনো তাদের দেখিনি। এসব উটকো ঝামেলা সময়মতো মোকাবেলা করা না হলে দুর্বৃত্তরা পেয়ে বসে। আমার সঙ্গে থাকা সিনিয়র হাউস টিউটররাও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। প্রভোস্ট হিসেবে আমার দৃঢ়তা দেখে তারাও উৎসাহিত হয়েছিলেন। সে হাউস টিউটররা এখন অনেক সম্মানজনক বড় পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করছেন। তারা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রো-ভিসি, প্রক্টর এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি যথাক্রমে কবি ড. মোহাম্মদ সামাদ, ড. গোলাম রাব্বানী এবং ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন। প্রভোস্ট এবং হাউস টিউটররা দৃঢ় মনোবল নিয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে হলগুলো দুর্বৃত্তমুক্ত করা কোনো ব্যাপারই নয়। উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রভোস্ট আর হাউস টিউটরদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার কারণেই বুয়েটের শেরেবাংলা হলে প্রাণ দিতে হলো একজন নিরীহ শিক্ষার্থীকে কয়েকটা ছাত্রনেতা-কর্মী পরিচয়ধারী দুর্বৃত্তের হাতে- যারা শুধু অমানুষই নয়, মনুষ্য পদবাচ্যের অযোগ্যও বটে।

দেশে যা কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। অবস্থাটা এমন, সবকিছু তাকেই দেখতে হয়ে, সবকিছু তাকেই সমাধান করতে হয়। যদি এমনটাই চলতে থাকে তাহলে দায়িত্ব গ্রহণ করে যারা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন তাদের থাকার দরকারটা কী? জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় তাদের পোষার দরকার কেন? তারপরও বিশাল হৃদয়ের মানুষটি রাগ করেন না। বাবার মতো সমগ্র অন্তর দিয়ে মমতাভরে দায়দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। যেমনটি নিয়েছেন ইদানীংকালের অনেক ক্ষেত্রে- ছাত্রলীগ-যুবলীগের বেপরোয়া কিছু কর্মকা- এবং ক্যাসিনোবাজদের ব্যাপারে গৃহীত পদক্ষেপ, যা পেয়েছে দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন। তিনি শুরু করেছেন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ৬ অক্টোবর রবিবার রাতে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নামধারী ছাত্রনেতা তকমা লাগানো ১৯-২০ জন দুর্বৃত্তের পিটুনিতে নিহত কুষ্টিয়ার মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে প্রশাসন রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি, কিন্তু দুর্বৃত্তপনার কঠোর বিচারে এগিয়ে এসেছেন জননেত্রী, মমতায় ভরা সেই প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তাকে আসতেই হলো। হলের প্রভোস্ট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সময়মতো আসেননি। এ ব্যর্থতার লজ্জা তারা রাখবেন কোথায়? খবরে দেখলাম, প্রায় ৪১ ঘণ্টা পর প্রকাশ্যে এসে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। উপাচার্য আর প্রভোস্টের ব্যর্থতা একেবারেই অমার্জনীয়। ভীরু, কাপুরুষ, অথর্ব লোকদের প্রশাসনের উচ্চপদে থাকতে হবে কেন তা আমি বুঝি না, বিশেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় যেখানে অভিভাবকরা কর্তৃপক্ষের ওপর কত ভরসা নিয়ে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়ার জন্য পাঠান। ভরসা পাচ্ছি এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা অভাবনীয় ঘটনাটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন, যা তার কয়েকটি ঘোষণা এবং কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট। তিনি ঘোষণা করেছেন- ‘আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কে কোন দল, কী করে না করে, আমি সেটা দেখি না। আমার কাছে অপরাধী অপরাধীই’ (যুগান্তর, ১০ অক্টোবর ২০১৯)। তিনি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর হলে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সবকিছু দেখেশুনে মনে হয়, তিনি সব কিছুর খবর রাখেন, কারণ তিনি দেশটাকে অনেক ভালোবাসেন, দেশবাসীর কল্যাণের কথা ভাবেন, দেশটাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে চান আর চান সবাই মিলে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাধা হয়ে দাঁড়ালে তা তিনি শক্ত হাতে নির্মূল করবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমাদের প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর কন্যার হাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে যেখানে কোনো গোষ্ঠীর কাছে শিক্ষাঙ্গন জিম্মি হয়ে থাকবে না, গণরুম আর র‌্যাগিং/বুলিং নামক নারকীয় প্রথা চিরকালের জন্য জাদুঘরে চলে যাবে, আবাসিক হলগুলো হবে শিক্ষার্থীদের ‘আপন ঘর’, যেখানে থাকবে একটি বড়সড় লাইব্রেরি যাতে রাত-বিরাতে সবাই লেখাপড়া করতে পারে, থাকবে জিমন্যাশিয়াম আর সংস্কৃতিচর্চার জন্য উপযুক্ত অডিটোরিয়াম, গেস্টরুম থাকবে না কোনো দুর্বৃত্তের কবলে, আবাসিক শিক্ষকরা প্রতি রাতে নিয়মিত ছাত্রদের চলাফেরা মনিটরিং করার পাশাপাশি শিক্ষণীয় কাজে সহযোগিতা করবেন, প্রভোস্ট করবেন অভিভাবকের দায়িত্ব পালন, সর্বোপরি উপাচার্য মাথার ওপরে থেকে একটি প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়মিত সবকিছু মনিটরিং করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় যেন অবশ্যই হয়ে ওঠে সত্যিকারের জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ আর সৃজনশীল মুক্তবুদ্ধি চর্চার আদর্শ স্থান। থাকবে এমন পরিবেশ যেখান থেকে আপনা-আপনি সৃষ্টি হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। ছাত্ররাজনীতি থাকবে শুধু শিক্ষার্থীদের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে, কোনো প্রকার মাতব্বরি করার জন্য নয়, যেমনটি ছিল ষাটের দশকে। এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশা করা কি অনেক কিছু চাওয়া? আমরা চাইলে সবকিছু পারি। বাঙালি পারে না এমন কিছু আছে বলে মনে হয় না। প্রয়োজন শুধু সৎ মানসিকতা, মানবিক মন, ভালো কিছু করার তাগিদ আর সর্বোপরি অপরের প্রতি নির্মল ভালোবাসা।

ড. এম এ মাননান: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা