‘ছোটরা সবসময় একটা গল্প খুঁজে’

আগের সংবাদ

যাত্রাবাড়ীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু

পরের সংবাদ

শিশুতোষ চলচ্চিত্রের গল্পকথা

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৯, ২০১৯ , ২:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০১৯, ২:৩৯ অপরাহ্ণ

Avatar

শিশু-কিশোরদের মনন জগতের মানসিক বিকাশ ও নির্মল বিনোদনের জন্য নির্মিত সিনেমাই মূলত শিশুতোষ চলচ্চিত্র। বিভিন্ন দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মতো বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেও বিভিন্ন সময়ে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

স্বাধীনতার আগে ফজলুল হক পরিচালিত ‘সান অব পাকিস্তান’ (১৯৬৬) একমাত্র শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের গল্প নিয়ে নির্মিত অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীভিত্তিক এই ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর। সিনেমাটি তেমন সফল না হলেও বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৮ সালে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর স্কুলপাঠ্য গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’কে ‘ডুমুরের ফুল’ নামে চলচ্চিত্রায়ন করেন খ্যাতিমান পরিচালক সুভাষ দত্ত। তবে ছোটদের জন্য এটি নির্মিত হয়নি। কিন্তু দারিদ্র্যক্লিষ্ট এক কিশোরের জীবনকাহিনী বর্ণিত হওয়াই এটি শিশু-কিশোরদের বিশেষ আকর্ষণ করেছে।

তবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ চলচ্চিত্র ধরা হয় ১৯৮০ সালে নির্মিত বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দাবাহিনী’কে। এটি ছিল সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র। গোয়েন্দাভিত্তিক এই ছবিটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট ৫টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। একই বছর মুক্তি পায় আজিজুর রহমানের কালজয়ী ছবি ‘ছুটির ঘণ্টা’। ছবিটি এখনো দর্শকপ্রিয়। মূলত এই ছবির পরই বাংলা চলচ্চিত্রে শিশুরা বিশেষ স্থান করে নেয়। ১৯৮০ সালে শিশুতোষ ছবি আরেকটি মুক্তি পায়। খান আতাউর রহমান পরিচালিত ছবিটির নাম ‘ডানপিটে ছেলে’। ছবিটি তখন আলোচিত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় সি বি জামানের জনপ্রিয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘পুরস্কার’। এটি ছিল কিশোর অপরাধ নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম ছবি। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি এটি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট ৫টি পুরস্কার লাভ করে। আশির দশকে শিশুদের অন্যতম প্রধান চরিত্র করে বেশ কয়েকটি ছবি নির্মিত হয়। এর মধ্যে মাসুম, এতিম, রামের সুমতি, ক্ষতিপূরণ, রাঙা ভাবী অন্যতম।

আশির দশকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে শিশুদের বিশেষ স্থান দেয়া হয়েছিল, তা নব্বই দশকে এসে ক্রমশ কমতে থাকে। এর মাঝেও ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দীপু নাম্বার টু’ বেশ আলোচিত হয়। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি সরকারি অনুদানে নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম। শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে এই ছবিটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। প্রথম ছবি নির্মাণের ২০ বছর পর বাদল রহমান ১৯৯৯ সালে নির্মাণ করেন শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’। হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণি (১৯৯৪) সিনেমার শিশু চরিত্র দুটি দর্শকদের নজর কাড়ে, দুটি চরিত্রের শিশুশিল্পী শীলা আহমেদ ও পুতুল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

২০০০ পরবর্তী সময়ে আবার বাংলা চলচ্চিত্রে শিশুদের নিয়ে ভাবা শুরু হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। সত্তরের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কার লাভ করে। বাংলাদেশের অস্কারযাত্রা এই ছবির মাধ্যমে। ২০০৪ সালে হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী নিয়ে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘দূরত্ব’। একে একে নির্মিত হয় লিলিপুটরা বড় হবে, কাবুলিওয়ালা, দূরবীনসহ বেশকিছু শিশুতোষ চলচ্চিত্র। বাণিজ্যিক ধারায় ও শিশু চরিত্রের প্রভাব পড়তে থাকে, এর মধ্যে ‘চাচ্চু’ উল্লেখযোগ্য।

২০১০ এর পর শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ তুলনামূলক বেড়ে যায়, তবে বেশিরভাগ ছবিই অজ্ঞাত থেকে যায়। এই সময়ে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে আলোচিত ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১)। ড. জাফর ইকবালের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি সরকারি অনুদানে নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম। ২০১৫ সালে নির্মিত আশরাফ শিশিরের ‘গাড়িওয়ালা’ ছবিটি বেশ আলোচিত হয়। শিশুতোষ চলচ্চিত্র না হলেও হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য় প্রধান ভ‚মিকায় ছিল শিশু চরিত্র কমলা। এ ছাড়া জালালের গল্প, বৈষম্য, শোভনের স্বাধীনতা, মুক্তি, আকাশ কত দূরে, আঁখি ও তার বন্ধুরা, পাঠশালা শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তির অপেক্ষায় আছে পঞ্চসঙ্গী, সত্যযুগসহ আরো কিছু শিশুতোষ চলচ্চিত্র।

বাংলা চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় শিশুশিল্পীর নাম নিলে প্রথমেই নাম আসে মাস্টার শাকিল, মাস্টার সুমন ও দিঘি। শাকিল ও দিঘি জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। সুমন জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে একবার। দীপুখ্যাত অরুন সাহা একটি ছবিতে অভিনয় করলেও রয়েছে দারুণ জনপ্রিয়তা, জাতীয় পুরস্কার ও অর্জন করে। ঘেটুপুত্র কমলায় অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান মামুন। এ ছাড়া দোদুল, জয়া, প্রিয়াঙ্কা বেশ আলোচনায় ছিলেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

১৯৭৮ সালে সরকারি অনুদানের নীতিমালায় প্রণয়ন করা হয় অনুদানপ্রাপ্ত তিনটি সিনেমার মধ্যে একটি হবে শিশুতোষ। যদিও সেই নীতি টিকেনি। পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকার ২০১০ সালে নব্য অনুদান নীতিমালায় সাতটি ছবির মধ্যে তিনটি হতে হবে শিশুতোষ। সেই ধারাবাহিকতায় কিছু নির্মাণ বাড়ছে, এই ধারার চলচ্চিত্রকে উৎসাহ দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শিশুতোষ চলচ্চিত্র উৎসবেরও আয়োজন করা হয়। তবে শিশুতোষ চলচ্চিত্র সঠিক পৃষ্ঠপোষকের অভাবে দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিচ্ছে না, প্রায় সব সিনেমাই দর্শকদের অগোচরে মুক্তি পায়।