চট্টগ্রামে জহুর হকার্স মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড

আগের সংবাদ

পা পিছলে কপাল খুলল বিএনপি নেতার

পরের সংবাদ

ওয়ার্ডের ‘রাজা’ কাউন্সিলর

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৯, ২০১৯ , ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০১৯, ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ

Avatar

ফরিদুর রহমান খান ইরান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ফার্মগেট এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কোচিং বাণিজ্য সবকিছুই তার একক নিয়ন্ত্রণে। তার ক্ষমতার কাছে সবাই ধরাশায়ী। তার ইচ্ছার বাইরে গেলেই চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ভয়ে মুখ খোলেন না কেউ। অনেকের মতে ফার্মগেট এলাকার ‘অঘোষিত রাজা’ ইরান। তার কথাই সেখানে আইন, তিনিই সর্বেসর্বা। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় দোকানে চাঁদাবাজি করে তার বাহিনী।

তেজগাঁও কলেজেও তার একক আধিপত্য। কাউকেই তোয়াক্কা করেন না। ফার্মগেট এলাকায় যত কোচিং সেন্টার আছে, সবগুলোই ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এখান থেকে প্রতি মাসে কামাই লাখ লাখ টাকা। জামাই কাউন্সিলর- সেই প্রভাবে ইরানের শাশুড়ি আহসানউল্লাহ পলিটেকনিক সংলগ্ন সুপার স্টার হোটেলের পাশের একটি বাড়ি দখলে নিয়েছেন। সেটি ভেঙে বর্তমানে একতলা ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। ইরানের ক্যাডার বাহিনী আড্ডা দেয় সেখানে।

এভাবে ঢাকার দুই সিটির অর্ধশতাধিক কাউন্সিলর নিজ নিজ এলাকায় একক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করেছেন। নিজ এলাকায় নিজেকে ‘অঘোষিত রাজা’ মনে করেন তারা। তোয়াক্কা করেন না নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও। অনেকেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন। অনেক সময় মেয়রকেও তোয়াক্কা করেন না। যেন তারাই সর্বেসর্বা।

ঢাকা দক্ষিণের ৫৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক। কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি। ১০ বছর আগেও ছিলেন তরকারি বিক্রেতা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রীর ছত্রচ্ছায়ায় রাতারাতি বদলে যায় তার জীবনযাত্রা। লেখাপড়া খুব একটা না থাকলেও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে তিনি ছিলেন অন্যতম। এ বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের নতুন ওয়ার্ডের নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে বিজয়ী হন। এরপর থেকে ভ‚মি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় তার দাপট আরো বেড়ে যায়। তার ক্যাডার বাহিনীর অত্যাচারে এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ। ক্ষুব্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকার প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি করে আকাশ ভৌমিকের ক্যাডার বাহিনী। তার বাহিনীর অন্যতম ছাত্রলীগ নেতা জিহাদ, মুন, ফজুসহ অনেকেই। ফজু ‘ঢাকা মেস’ ও শিল্প এলাকায় প্রতিমাসে কোটি টাকার উপরে চাঁদা কালেকশন করেন আকাশের পক্ষ থেকে। চাঁদাবাজি, মাদক ও টেন্ডারের টাকা দিয়ে রাজধানীর আফতাবনগরে ২০ কাঠা প্লট, বউয়ের নামে ১০ কোটি টাকার এফডিআর, সিদ্বেশ^রীতে দুটি ফ্ল্যাট, এমনকি ভারতেও ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে জানা গেছে। এলাকার কোনো রোড কাটিং করতে গেলেও তাদের কাছে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নেন তিনি। আকাশের ব্যক্তিগত সহকারী ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি নাদিম ওয়াসার ভাণ্ডার থেকে শুরু করে স্থানীয় কাজকর্ম তদারক করেন। এ ছাড়া ফুটপাত ও লেগুনা স্ট্যান্ড থেকেও চাঁদাবাজি করেন তার লোকজন।

ক্যাসিনোকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ও দখলবাণিজ্য করে রাতারাতি কোটিপতি

৫২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নাসিম টাকা ছাড়া কোনো কাজই করেন না। প্রতিটি প্রত্যয়নপত্র বাবদ ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা নিয়ে থাকেন। রোড কাটিংয়ের অনুমতিপত্র নিতে গেলেও ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা করে নেন। নিজ দলের নেতাকর্মীরাও তার ওপর ক্ষুব্ধ। বিএনপির লোকদের নিয়ে চলাফেরা করেন। লেগুনা স্ট্যান্ড ও ফুটপাত থেকে চাঁদা নেন। স্থানীয় থানার তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীরা তার প্রশ্রয়ে দেদার মাদক কেনাবেচা করেন।

৫৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি নূর হোসেনও টাকা ছাড়া কোনো প্রত্যয়নপত্র দেন না। রোড কাটিংয়ের অনুমতি দেয়ার আগে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে বুঝে নেন। এসব নিয়ে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। প্রতিবাদ করলে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়। এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি, লেগুনা স্ট্যান্ড ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন তার মেয়ের জামাই মাহমুদুল হাসান মামুন।

৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান পিল্লু। ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ভাগনে তিনি। পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাটসহ পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। ওই এলাকায় যত প্লাস্টিক কারখানা আছে, সব তার নিয়ন্ত্রণে। চাঁদাবাজি, জমি ও বাড়ি দখল, মাদক ব্যবসা- সব তার নিয়ন্ত্রণে। তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলার সাহস রাখেন না।

৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের ওপর এলাকায় কেউ কথা বলার সাহস পায় না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাউন্সিলর হোসেনের বাইরে কেউ কথা বললেই তার ওপর নির্যাতন নেমে আসে। এলাকায় মাদক বিক্রি, বাড়ি দখল, চাঁদাবাজি সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে। এলাকায় কাউন্সিলর যাই বলবেন, সেটাই আইন বলে তিনি নিজেই প্রচার করেন।

ঢাকা উত্তরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি তারিকুজ্জামান রাজিবের বাবা মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। রাজিব ছিলেন মুদি দোকানদার। ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর দ্রুতই তার ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন তিনি। গড়ে তুলেছেন ঢাকায় আলিশান বাড়ি। রায়েরবাগে কুরবানির পশুর হাটও নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

ঢাকা উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন যেন ওই এলাকার অঘোষিত রাজা। রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তি থেকে অবৈধ গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও ডিশলাইন থেকে মাসে আয় হতো অন্তত দুই কোটি টাকারও বেশি। রূপনগর ও আশপাশ এলাকার পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা ও মাদক কারবারিদের সহায়তারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডেও তার নাম আসে। ওইসময় কয়েকজন সাংবাদিককেও নির্যাতনের অভিযোগ আসে তার লোকজনের বিরুদ্ধে। একসময় পরিবহন শ্রমিক থেকে এখন বিপুল সম্পদের মালিক রজ্জব। তার মালিকানাধীন একাধিক সুরম্য বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে। অল্প সময়ে এত সম্পদের নেপথ্যে রয়েছে তার দখলদারিত্ব আর চাঁদাবাজি।

দক্ষিণের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু রাজধানী সুপার মার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট থেকেই মাসে কোটি টাকারও বেশি আয় করেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০১১ সাল থেকে টানা আট বছর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন টিকাটুলীর এই মার্কেটের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি তিনি। তার বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে বছরের পর বছর অভিযোগ ও মামলা করেও কোনো ফল পাননি।

২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন। তাকে অনেকেই ‘ম্যাজিক রতন’ বলে অভিহিত করেন। গুলিস্তান এলাকায় তার একক আধিপত্য। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব থেকে ক্যাসিনোর বড় একটা ভাগ পেতেন তিনি। সিটি করপোরেশনের কয়েকটি মার্কেটে দখল, চাঁদাবাজিসহ বহু অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে আছেন এই কাউন্সিলর। র‌্যাবের হাতে আটক যুবলীগ নেতা খালেদ ভুঁইয়া, জি কে শামীম ও সম্রাটের সঙ্গে তার সখ্যতা এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এক সময় ফুটপাত থেকে উঠে আসা রতন এখন শত কোটি টাকার মালিক।

ঢাকা উত্তরের চার নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল মোস্তফার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এসময় তার ছেলে মাদকসহ র‌্যাবের হাতে আটক হন।

উত্তরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় জনগণকে ভীতি প্রদর্শন, মাদক, জবরদখল ও চাঁদাবাজির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ ছাড়া নানা অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণের ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।

নানা অভিযোগ আছে দক্ষিণের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিকের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের কাজে বাধা দিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়, এলাকার দোকান, মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে চাঁদা আদায় ও মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা করাসহ বহুবিধ অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি তারিকুল ইসলাম সজীব। এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা তিনি করেননি। অল্প বয়সে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ পেয়ে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। হাজারীবাগ কোম্পানিঘাট মসজিদ মার্কেট দখল করে ভাড়া-বাণিজ্য, ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়, ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

এরকম অসংখ্য অভিযোগ আছে দুই সিটির আরো বেশকয়েকজন কাউন্সিলের বিরুদ্ধে। তাদের অপকর্মের কারণে সরকারের নজরদারিতেও আছেন তারা। এ তালিকায় আছেন ঢাকা দক্ষিণের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আশ্রাফুজ্জামান ফরিদ, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম, ৫৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইদুল মাদবর। এ তালিকায় ঢাকা উত্তরের কাউন্সিলরদের মধ্যে আরো আছেন সাত নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবাশ্বের হোসেন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফোরকান হোসেন, ৫১নং ওয়ার্ডের কাজী হাবিবুর রহমান হাবু, ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের শফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ বেশ কয়েকজন।

ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের এমন অপকর্মে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল ভোরের কাগজেকে বলেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের চোখে যারা অপরাধী, তারা কেউ ছাড় পাবে না। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার যে নির্দেশনা, আমরা সে অনুযায়ী এগোতে চাই। আমার স্পষ্ট কথা, আমি নিজে দুর্নীতি করি না। কারো দুর্নীতি সহ্যও করব না। আমার কোনো কাউন্সিলর বা কর্মকর্তা যদি দুর্নীতি করে তাকে ছাড় দেব না।