নিউইয়র্কে নারায়ণগঞ্জ জেলা সমিতির অভিষেক সম্পন্ন

আগের সংবাদ

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নতুন কর্মসূচি দেবে আজ

পরের সংবাদ

শহীদ ছবুরের জন্মবার্ষিকী

যে দামাল ছেলেটি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরেনি

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১৫, ২০১৯ , ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০১৯, ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

Avatar

শহীদ গাজী আবদুস ছবুর চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ৪নং ওয়ার্ডের শেয়ানপাড়ায় গাজী বাড়িতে ১৯৫১ সালে ১৪
অক্টোবর জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা গাজী আলী চাঁন সওদাগর আর মা শবমেরাজ খাতুন। তাদের দুই পুত্র ও দুই
কন্যার মধ্যে ছবুর দ্বিতীয় সন্তান। ছোটবেলা থেকে ছিলেন বেশ দুরন্ত ও দস্যি। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ছিল প্রিয়
খেলা। কৈশোরে পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হৈচৈ করে ছুটে বেড়াতেন।

শেয়ানপাড়ার পশ্চিম পটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনি শেষ করে বোয়ালখালীর সরোয়াতলী
উচ্চবিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়েছিলেন। পরে পটিয়া আবদুস্ সোবহান রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯
সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর পটিয়া সরকারি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন।

সে সময় পটিয়া কলেজে কাণ্ডারি ও দিশারী নামে দুটি সংগঠন ছিল। এর মধ্যে কাণ্ডারি ছিল মূলত ছাত্রলীগের
একটি গ্রুপ। ছবুর ছিলেন কাণ্ডারির প্রধান। খেলাধুলার পাশাপাশি গানও গাইতো বেশ। কণ্ঠ ছিল অসাধারণ।
সহপাঠিরা জানান, ছেলেবেলায় ছবুর গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে বাড়িতে ফিরতেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও
নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন।

শহীদ ছবুরের ছোট ভাই গাজী সেলিম ও ছোট বোন জরিনা খাতুন জানান, ছোটবেলায় মেজ ভাই বন্ধুবান্ধব
নিয়ে বাঁখখালী গ্রামের খোলা মাঠে চড়ুই ভাতির আয়োজন করতেন। রাতভরে চড়ুইভাতি খেলে মজা করে বাড়ি
ফিরতেন। বাড়ির পুকুর ঘাটে জোছনা রাতে বসে গানের আসর বসাতেন।

এমনি টগবগে তারুণ্যে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময়ই তার জীবনে আসে একাত্তর। সেসময় পাকবাহিনী
আক্রমণ করলে ছবুর সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অসীম বীরত্বের সঙ্গে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে
মুক্তিবাহিনীর কাছে বেশ সুনাম অর্জন করেন। তবে যুদ্ধ শেষে বীরের বেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বাড়ি ফিরলেও
গাজী আবদুস ছবুর আর ফিরে আসেনি।

ছবুরের খুব কাছের বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী মাহবুব জানান, তখন ১৯৭১ সালের ২ অক্টোবর। ছবুর গিয়েছিলেন
পটিয়া কেলিশহরের ভট্টাচার্য হাটে রাজাকার অপারেশনে রাজাকার রশীদ ও তার ভাই মনু মিয়াকে ধরার জন্য।
মনু মিয়া পটিয়া থানা হাটের হাসিল উঠাতো। রশীদ ও মনু মিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর
যোগসাজশ ছিল। তারা পাকহানাদার বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য ফাঁস করে দিত। সেদিন ছবুরের সঙ্গে
মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী মাহাবুব, এসএম ইউসুফের ভাই মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ছফা
চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিনসহ আরও অনেকে ছিল। সুঠাম লম্বা দেহের অধিকারী ছবুর ছিল খুব শক্তিশালী
বীর।

মুক্তিযোদ্ধা নাছিরের থলেতে তখন বৃটিশের তৈরি কাটের বাটের স্টেনগান। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সামসুদ্দিন
আহম্মদ হঠাৎ চিৎকার করে বলেন, ঐ মউন্না শালারে ধর। ছবুর তখন মনু মিয়াকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরে
ফেলে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সামসুদ্দিন নাছিরের থলে থেকে স্টেনগান হাতে নিল,
ভট্টাচার্য হাটের অনিল বাবুর চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সামসুদ্দিন আহাম্মদ ফায়ার করা শুরু করলো।
১৮টি গুলি বের হয়েছিল। তার মধ্যে দালাল মনু মিয়ার শরীর ভেদ করে চারটি গুলি লেগেছিল ছবুরের দেহে।
তিনটি বুকে ও একটি ডান হাতের কনুইতে। মনু মিয়ার সঙ্গে ছবুরও মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধারা
দৌঁড়ে আসে, এ কি ঘটল? এ কি ঘটল? বলে চিৎকার করতে থাকেন। মনু মিয়ার দেহ ভেদ করে কীভাবে যে
ছবুরের বুকে গুলি লেগেছে তা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না।

ছবুরের চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায়, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। বন্ধুদের হাত
বাড়িয়ে বলেন, তোরা আমাকে বাঁচা। আমাকে হাসপাতালে অথবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা। আমি আর পারছি
না। আমার মাকে একটু দেখা। ওহ মা, মা রে তুমি কোথায়? বন্ধু তোরা আমার মাকে একটিবারের জন্য হলেও
দেখা। ছবুর তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় রক্তাক্ত দেহে হাত পা ছুঁড়ছিল পাগলের মতো। মাকে দেখার সে কি আর্তনাদ।
মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ভুড়িপাড়ায় নিয়ে যান। সেখানে গনি খাইতং নামে এক পল্লী চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ ছবুরকে
স্যালাইন দেন।

সেদিন থানা হেড কোয়ার্টারে কারফিউ ছিল বলে ছবুরকে হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। মৃতুর আগ পর্যন্ত
বন্ধুদের বার বার বলছিল, তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাও। হাত থেকে অস্ত্র ছেড়ো না। আমি মরে গেলেও দেশ স্বাধীন
হবে। খবরদার তোরা বেঈমানী করিস না। আমার ছোট বোন জরিনা আর জাহেদাকে নিজের বোনের মতো
দেখবি। তাদের বিয়ের কথা চলছে। তোরা একটু খেয়াল রাখিস। আমার মাকে বলবি, আমি ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি
ট্রেনিং নিতে। আমার মৃত্যুর খবর আমার মাকে জানাবি না। তিনি সহ্য করতে পারবেন না। গনি হাইথং ছবুরের
চিকিৎসার জন্য খুব সাহায্য করেছিলেন। ছবুর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রায় ৯ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন। এক সময় শাহাদাত
বরণ করে। চিরতরে না ফেরার দেশে চলে যায়।

শহীদ ছবুরের রক্তে ভেজা জামা আর লুঙ্গিসহ লাশটা মাটিতে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী
মাহাবুব, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ছফা, মুক্তিযোদ্ধা নাসির, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম, মুক্তিযোদ্ধা কবির,
মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর, মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর আবু জাফর এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদসহ পাহাড়ি এলাকার
আরো কিছু লোক মিলে ছবুরের লাশ বাঁশের তৈরি মাচাংয়ে তুললো।

ছবুরের নিথর দেহ মাচাংয়ে তুলে সবাই মিলে কাঁধে করে, গুড়টিলা পাহাড় থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভুঁড়ি
পাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। কেলিশহরের খিল্লাপাড়া গোরস্তানে পাহাড়ের লেকের পানিতে শেষ গোসল দেয়া হয়।
পরনের লুঙ্গি দিয়ে কাফন বানানো হয়। রাত ১২টার পরে ছোট পরিসরে গণি হাইথংয়ের পরিচালনায় জানাজা
হয় গুড়টিলা পাহাড়ের কাছে। জানাজায় অংশ নেন ১৪ বা ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার আরো কয়েকজন
ব্যক্তি।

শহীদ ছবুরের মৃত্যু নিয়ে আজো কৌতুহল রয়ে গেছে। ছবুরকে কেন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পরনের লুঙ্গি দিয়ে দাফন
করা হয়েছিল? হাসপাতালে নেয়া হয়নি কেন? কেনই বা তার পরিবারকে জানানো হয়নি? কেউ বলে এটা মিস
ফায়ার। কেউ বলে এটা সেমসাইড। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার শামসুদ্দিন বলেন, এটা আসলে
একটা দুর্ঘটনা।

মুক্তিযোদ্ধা গবেষক শামসুল হক বলেন, একাত্তরের সময়টা এমন ছিল যে, চারিদিকে রাজাকার আলবদর ওঁৎ
পেতে থাকতো। হাসপাতালে কীভাবে নিয়ে যাবে? পাকবাহিনী যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান পেয়ে যায়। এই ভয়ে
কেউ সাহস করেনি। আসলে ঐ সময় চারিদিকে পাকিস্তানিরা ঘেরাও করে রাখতো। তার মধ্যে ছিল
রাজাকারদের উৎপাত। হাইদগাঁও এলাকায় সেসময় ৪১ জনেরও বেশি রাজাকার ছিল। হাসপাতালে নিয়ে গেলে
আবার যদি মুক্তিযোদ্ধারা ধরা পড়ে যায় সেই ভয়ও কাজ করছিল। হাসপাতলে নেয়ার মতো পরিবেশেই ছিল
না।

ছবুরের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, আসলে তাকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মারেনি। রাজাকার সন্দেহে
মনু মিয়াকে মারতে গিয়ে ছবুর সেমসাইডে নিহত হয়। পটিয়ার প্রাণকেন্দ্র থানারমোড়ে তার নামে একটি সড়ক
যা শহীদ ছবুর রোড নামে পরিচিত। ২০১৮ সালে পটিয়া ভট্টাচার্য হাটে খিল্লাপাড়া গোরটিলা পাহাড় এলাকায়
শহীদ ছবুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ মার্চ শহীদ ছবুর শিশুতোষ পাঠাগার
প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মৃত্যুর ৪৮ বছর পেরিয়ে আজও শহীদ ছবুরের কবরটি অরক্ষিত অবস্থায় গুরটিলা পাহাড়ে রয়ে গেছে। তার
গ্রামে “একাত্তরের শহীদ ছবুর ফেইসবুক গ্রুপ” এর উদ্যোগে “একাত্তরের শহীদ ছবুর” স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করার
জোর দাবি জানিয়ে এলেও তা আজও হয়নি। শহীদ ছবুরের ৬৮তম জন্মবার্ষিকীতে (১৪ অক্টোবর, ২০১৯) তার
প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, শহীদ ছবুর শিশুতোষ পাঠাগার । ৪নং ওয়ার্ড, পটিয়া পৌরসভা, চট্টগ্রাম।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা