সমতায় ফিরল মিঠুনরা

আগের সংবাদ

ফেনীতে বাড়ির সামনে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা

পরের সংবাদ

দাবি না মানলে ‘তালা’

কাগজ প্রতিবেদক ও ঢাবি প্রতিনিধি :

প্রকাশিত হয়েছে: October 11, 2019 , 10:26 am

ক্ষোভে ফুঁসছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ১০ দফা দাবি আদায়ে বেঁধে দেয়া হয়েছে নতুন সময়সীমা। আজ শুক্রবার দুপুর ২টার মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা না বললে এবং বিকেল ৫টার মধ্যে দাবি মেনে নেয়ার লিখিত ঘোষণা না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষে তালা ঝুলবে। এমনকি আগামী সোমবার (১৪ অক্টোবর) বুয়েট ভর্তি পরীক্ষাও যে কোনো মূল্যে ঠেকানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে গতকাল বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন করেন তারা। সকাল থেকেই বুয়েটের শহীদ মিনারে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’, ‘বহিষ্কার বহিষ্কার, খুনিদের বহিষ্কার’, ‘এক আবরার কবরে, লক্ষ আবরার বাহিরে’, ‘যাব না, যাব না, ফাঁসি ছাড়া যাব না’ এমন স্লোগানে প্রকম্পিত বুয়েট ক্যাম্পাস। এই পরিস্থিতিতে আজ বিকেল ৫টায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন বুয়েট উপাচার্য।
আন্দোলনকারীরা জানান, আজ শুক্রবার বিকেল ৫টার মধ্যে আবরারের খুনিদের বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ ১০ দফা দাবি মেনে প্রশাসন লিখিত নোটিস না দিলে আগামীকাল শনিবার থেকে সব একাডেমিক ভবনে তালা দেয়া হবে। সেই সঙ্গে আবরার হত্যাকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের পাশাপাশি আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলে র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় জড়িতদের ছাত্রত্ব বাতিল করে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট জাফর ইকবালের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চান তারা। এদিকে আগামী ১৪ অক্টোবর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই উত্তাল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা আদৌ হবে কিনা এ বিষয়ে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে তারা দ্রুত কাউন্সিলের বিবৃতির আশা করছেন। আন্দোলনকারীরা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে দুই ঘণ্টা সময় ধরে উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জানতে পেরেছেন, উপাচার্য কাউন্সিল অফিসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। তবে সেখানে কোনো গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার থাকবে না। কিন্তু খোলা জায়গায় গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতেই কেবল উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া আজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে আবার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। সংবাদ সম্মেলনের পর একটি মিছিল বুয়েট ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। গতকালও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে আবরার হত্যার প্রতিবাদ এবং দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তারা। আসরের নামাজের পর বুয়েট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ফাহাদের আত্মার শান্তি কামনায় এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা।
‘ইউ রিপোর্টার’ ওয়েবপেজ ব্লক করেছে বিটিআরসি : নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের চালু করা ওয়েবপেজটি ব্লক করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসি। বুয়েটের সিএসই বিভাগের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৬ সালের শেষে ওয়ান-স্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম সংক্ষেপে ‘ইউ রিপোর্টার’ নামে একটি সার্ভার গড়ে তোলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এতে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা নিজের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারেন। বুধবার পর্যন্ত সেখানে ১০৬টি অভিযোগ এসেছে, যার অনেকগুলোই জমা পড়েছে আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর। এসব অভিযোগের প্রায় সবগুলোই নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা। নির্যাতনের যে সব অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলোই ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে। গতকাল ওয়েবপেজটি বন্ধ প্রসঙ্গে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহুরুল হক বলেন, নিরাপত্তার জন্য যতদিন প্রয়োজন ততদিন ব্লক থাকবে ওয়েবসাইটটি। তবে কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং বিশ্লেষকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নির্যাতনের অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টায় কর্তৃপক্ষ ওয়েবপেজটি বন্ধ রেখেছে।
আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি ছাত্রলীগের : আবরারের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল এক শোক র‌্যালি শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন এই রকম মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এর আগে শোক র‌্যালিটি মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে। এতে সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যসহ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা মহানগরসহ অন্যান্য শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

প্রতীকী নাটকে আবরার হত্যাকাণ্ড : আবরারকে হলের রুম থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর কয়েকজন মিলে অমানবিকভাবে নির্যাতন করছে ফাহাদকে। নৃশংস নির্যাতনের ফলে চরমভাবে আহত আবরার ফাহাদ পানি পানি বললেও তাকে পানি খেতে দেয়া হয়নি। এ সময় ঘাতকরা উল্লাস করে ‘জামায়াত-শিবির’ বলতে থাকে। শেষদৃশ্যে মরদেহের সামনে চিৎকার করে কান্নাকাটি করছেন মা। আর খুনিদের শাস্তি ফাঁসির দাবিতে স্লোগান ধরেছেন সহপাঠী ও বন্ধুরা। গতকাল বুয়েট শহীদ মিনার চত্বর সংলগ্ন সড়কে নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী পথনাটক করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এদিকে আবরার হত্যাকাণ্ডের জেরে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের আন্দোলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ড ছাড়াও এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে, তখন শিক্ষক ও অ্যালামনাই এসোসিয়েশন কোথায় ছিলেন? তখন তারা কেন আন্দোলনে নামেনি? কেন এখন সবাই মিলে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন? এটি আমার কাছে রহস্যজনক। গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৯’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আবরার হত্যার ঘটনায় আমি লজ্জিত। মেধাবী এমন একজন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মারায় দেশের মানুষ মর্মাহত। তবে বুয়েটের ছাত্র সংগঠন থাকবে কি থাকবে না সেটি বুয়েট প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বুয়েটের চলমান অস্থিরতা বুয়েট প্রশাসনের মাধ্যমে নিরসন করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া হবে না। বুয়েট ভিসির পদত্যাগ করা না করাটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত।
জাতীয় প্রেসক্লাবে চট্টগ্রাম বিভাগ সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, আবরার হত্যাকে পুঁজি করে যারা মাঠে নামবেন, তারা সাবধান হয়ে যান। বাংলাদেশ থেকে আপনাদের রগ কাটা রাজনীতি বিদায় নিয়েছে, রগ কাটা রাজনীতি আর বাংলাদেশে ফেরত আসবে না। তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে হত্যাকাণ্ডের জন্য কখনো এত দ্রুততার সঙ্গে এত কঠিন ব্যবস্থা কেউ এর আগে নেয়নি। সেটা এবার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্দেশনা দিয়েছেন কেউ যেন পার পেয়ে না যায়। সবাইকে যাতে জেরা করে মূল ঘটনা বের করে আনা যায়, তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের। আমি সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বািন জানাব, আমাদের হারানো সন্তানকে পুঁজি করে নোংরা রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করবেন না। ভারত ইস্যুতে সস্তা রাজনীতি করার জন্য আমাদের সন্তানকে হারাইনি। একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, আমরা সবাই মর্মাহত। এর সুবিচার নিশ্চিত অবশ্যই করব। যারা পল্টনে বসে এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে ক্ষমতায় যাওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখছেন, তারা সাবধান হয়ে যান।
অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। গতকাল টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে উদ্ধৃত করে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে নির্দলীয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের দেয়ালে আজ পিঠ ঠেকে গেছে। শিক্ষকদের একাংশ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ছাত্রদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা জোগানোর দায়িত্বে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। অনেকে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও তথাকথিত ছাত্র নেতাদের যোগসাজশে সরাসরি দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। এই অসুস্থ অবকাঠামোকে ভেঙে দেয়া ছাড়া উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।
প্রসঙ্গত, গত রবিবার রাত ৩টার দিকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝ থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে চকবাজার থানা পুলিশ। ওই রাতে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা পিটিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাসহ ১৯ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত ১১ নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।