দোহারের ছদ্মবেশ

আগের সংবাদ

পথনাটকে ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য

পরের সংবাদ

ভেতর থেকে তাগিদ না এলে লিখতে চাই না

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৭:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৯, ৭:১২ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

নিঝুম মফস্বল নেত্রকোনার মাতৃহীন শিশুটির হৃদয়বেদনা লাখো মানুষের হৃদয়ে সঞ্চারিত হবে একদিন, কে ভেবেছিল? গভীর নীল বেদনা-বিষাদ, নিঃসঙ্গ, উদার প্রকৃতির সীমাহীন সৌন্দর্য ছোট্ট শিশুটিকে কবি করে তুলেছে। তাঁর সৃজিত পঙ্ক্তিগুচ্ছের মর্ম ও সংবেদন, অন্তর্নিহিত লাবণ্যপ্রভা, নান্দনিক সৌরভ বৃহত্তর পাঠকসমাজকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মুগ্ধ, স্পন্দিত, আলোড়িত করেছে। কবি তাদের মনে প্রীতি-ভালোবাসার স্থায়ী ঠাঁই গড়ে নিয়েছেন অবলীলায়। কবি হেলাল হাফিজের (জন্ম: ৭ অক্টোবর ১৯৪৮) ৭১ বছর পূর্ণ হয়েছে। ৭২ শুরু হলো গত ৭ অক্টোবর থেকে। তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কে সাহিত্যবোদ্ধা ও অনুরাগীদের কৌতূহল, আগ্রহ অনেক। মাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র তুঙ্গস্পর্শী কদর ও প্রিয়তা তাঁকে আকাশপ্রতিম জনতুষ্টি দিয়েছে। এ এক বিস্ময় নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয়রহিত। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরুচ্ছে শীঘ্রই। ঢাকা ও কলকাতা থেকে একযোগে। প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নেয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর সৃষ্টি কর্ম ও সাম্প্রতিক হালচালের নানাদিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ

প্রশ্ন : অবসর জীবন চলছে। নিঃসঙ্গ মানুষ। দিনরাত্রি, হাতে অনেক সময়। এখন সেইসব সময় কেমন করে কাটে আপনার?
হেলাল হাফিজ : শরীর অসুস্থ। আগেকার মতো সহজে স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারি না। নানাদিক থেকে বহু দাওয়াত পাই। কিন্তু সেসব নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারি না। ইচ্ছা থাকলেও না। এমনকি বিমানে চলাফেরা করাও আমার জন্যে কষ্টকর। যদিও সে ভ্রমণে ঝকমারি অনেক কম। চোখ নষ্ট। বই পড়তে পারি না। প্রচুর সময়। সেই সময় কাটানো বড় ধরনের একটা সমস্যা ঠিকই। সকালে নাশতার পর খবরের কাগজগুলোতে চোখ বুলাই। একটু পড়লেই চোখে ব্যথা হয়। দিনের বাকি সময়টা ফেসবুকিং করে কাটে। বলতে পারো, ফেসবুকে সময় কাটানো আমার একপ্রকার নেশাই হয়ে গেছে।
প্রশ্ন : ফেসবুকে কী কী করেন? কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে কি আপনার ফেসবুকিংয়ের মধ্যে? একটু পষ্ট করে বলবেন কি?
হেলাল হাফিজ : ফেসবুকে একটা বিশেষ ঘরানা সৃজন করার চেষ্টায় ব্যাপৃত রয়েছি আমি। আমার ওয়ালে দেখবে প্রেমময় একটা আবহ তৈরি করার নিরন্তর একটা প্রয়াস রয়েছে। এখনকার সময় সমাজ খুবই অস্থির। অসহিষ্ণু। অপরিশীলিত। অনান্দনিক একটা বৈরী সময় আমরা পার করছি। এর বিপরীতে আমি ভালোবাসার চর্চা করছি। যতটুকু পারা যায় আর কি! ধরো, একটা মিষ্টি পঙ্ক্তি লিখলাম। কোনো ছবির একটা মায়াময় ক্যাপশন দিলাম। এতে দুই চারজনও যদি প্রভাবিত হয়, মন্দ কী। খুব বড়ো কিছু হয়ে যাবে, তেমনটা কখনোই আশা করি না।
প্রশ্ন : দিনে, সন্ধ্যায় তো ফেসবুক নিয়েই থাকেন। রাতে কী করেন? তখনও সে চর্চা করেন নাকি?
হেলাল হাফিজ : না। প্রেসক্লাব থেকে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে চলে যাই। রাতে ফেসবুকিং করি না। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট ছিল দুটো। সেগুলো বন্ধুদের দিয়ে দিয়েছি। এনালগ ফোন দিয়েই এখন কাজ চলে। রাতেও যদি ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকি, তাহলে ঘুমাবো কখন? কী জানো, ফেসবুকই হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেশা।
প্রশ্ন : ফেসবুক তো একরকম বিপজ্জনক নেশাও বটে। আজকালের তরুণ-তরুণীরা অনেক বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে ওতে। দিবারাত্র এ নিয়ে মত্ত হয়ে থাকছে। অভিভাবকরা মহাচিন্তিত, আতঙ্কিত এই বিষয়টি নিয়ে। আপনার কী অভিমত ও পর্যবেক্ষণ এ বিষয়ে?
হেলাল হাফিজ : আইটি, কম্পিউটার, মোবাইল- এসব ছাড়া তো তরুণ প্রজন্ম কোথাও দাঁড়াতে পারবে না। বর্তমান বিশ্ব কঠিন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব। এই মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে রেস থেকে পিছিয়ে পড়া। তরুণসমাজকে মায়া মমতা দরদ দিয়ে মিষ্টি করে ভালো দিক মন্দ দিক সম্পর্কে বিশদভাবে বোঝাতে হবে। উঠতি বয়েসের ছেলেমেয়েদের গালাগালি করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভবপর নয়। মারধর তো করা যাবেই না। তাতে হিতে বিপরীত হবে। ফেসবুক খুবই পাওয়ারফুল একটা মাধ্যম। আমরা যদি নিজেদের রুচি একটু উন্নত করি, সব পজিটিভলি দেখি, তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না। আমি খুব সচেতনভাবে ছবি পোস্ট করি। ভালোবাসার চর্চাটা বেশি রাখবার জন্য সচেষ্ট থাকি।
প্রশ্ন : ওয়ালে যে প্রেমময় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে চলেছেন, সেই প্রয়াসের ফিডব্যাক কেমন পান?
হেলাল হাফিজ : যথেষ্ট পাই। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বেশ রেসপন্ড করে। এ নিয়ে আমি খুবই আপ্লুত। খানিকটা আশাবাদীও বলতে পারো।
প্রশ্ন : ফেসবুকে আপনার কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কেমন আসে?
হেলাল হাফিজ : প্রচুর। পাঁচ হাজারের বেশি ফ্রেন্ড তো অ্যালাউ করে না ফেসবুক। আমার অত বন্ধু নেই অবশ্য। আগে তো সবাইকে নিতাম। না চিনলেও নিতাম। এখন অনেক ভেবেচিন্তে, যাচাই-বাছাই করে বন্ধু নির্বাচন করি। আমার নামে ৫/৬টা ফেক আইডি চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে আমি বিব্রত কম না। কমপ্লেইন করেছি ফেসবুকের কাছে। ওরা উত্তরে বলেছে, তাদের কিছু করার নেই। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে, জটিল এই প্রযুক্তি আমি বুঝি কম। জাতীয় প্রেসক্লাব মিডিয়া সেন্টারের যে দু’জন সহকারী আছে, নানা প্রয়োজনে সময়ে সময়ে ওদের সহায়তা নিয়ে থাকি সে কারণে।
প্রশ্ন : ফেসবুকে কি নতুন করে কোনো কবিতা লেখেন?
হেলাল হাফিজ : কয়েকটা অণু কবিতা এই ফেসবুকের কারণেই লেখা হয়েছে। ফেসবুক না থাকলে হয়তো সেগুলোর জন্মই হতো না। এমন কবিতা রচিত হতে পারে, সেই আইডিয়াই পেতাম না। যেমন একটা উদাহরণ দিই। ভিডিও চ্যাট করে অসাধারণ সুন্দরী এক মহিলার উদ্দেশে লিখলাম একটা অণু কবিতা। সেটা হলো- রোদ্দুরে ভেজাবো তোকে শুকাবো বৃষ্টিতে। এক পঙ্ক্তির কবিতা। এরকম ৫/৭টা লিখেছি। সিংহভাগ প্রণোদনা পেয়েছি ফেসবুক থেকে। আরেকটি কবিতার কথা বলি। সেটা দুই পঙ্ক্তির। আপনি আমার এক জীবনের যাবতীয় সব/ আপনি আমার নীরবতার গোপন কলরব। অচিন কোনো নারীর সঙ্গে আলাপচারিতার পর এই লেখার জন্ম। ভীষণ রূপসী সেই মহিলা। ফেসবুকে কথা বলে তার বৈদগ্ধ্য, রুচি, রোমান্টিক শালীনতার পরিচয় পেয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। হঠাৎই তো একজনকে তুমি করে বলা যায় না। বয়সে ছোট হলেও। সেজন্যেই আপনি করে লেখা।
প্রশ্ন : আচ্ছা, ৭১ বছরের জীবনে আপনি আরো আরো লিখলেন না কেন? এত কম কবিতা কেন লিখলেন? এ বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?
হেলাল হাফিজ : জোর করে লেখার লোক আমি না। কিছুতেই না। ভেতর থেকে তাগিদ না এলে লিখতে চাই না। জোরজার করে লিখলে হয়তো ২০/৩০টা কবিতার বই আমার বের হয়ে যেত এরই মধ্যে। কিন্তু আমি সেটা করিনি। করতে চাইনি। মনোমত একটি পঙ্ক্তির জন্যে অপেক্ষা করেছি দীর্ঘ সময়। কবি হওয়ার জন্য জন্মগত প্রতিভার প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি। সেই প্রতিভাকে লালনও করতে হয়। অপরদিকে দ্যাখো, পাণ্ডিত্যের জন্যে ব্যাপক পড়াশোনা করলেই চলে। একজন কবি পণ্ডিত হতে পারেন। কিন্তু একজন পণ্ডিত ইচ্ছা করলেই কিন্তু কবি হতে পারেন না।
প্রশ্ন : বিশ্বজোড়া তথ্যপ্রযুক্তির অনিবার্য ও সর্বগ্রাসী প্রভাবের কথা বললেন আপনি। আপনার কী মনে হয় যে সাম্প্রতিককালের কাব্যচর্চা ক্রমাগতই ফেসবুকভিত্তিক হয়ে পড়ছে?
হেলাল হাফিজ : আমাদের সময় প্রিন্ট মিডিয়ারই তো একচেটিয়া দাপট, প্রভাব ছিল। দৈনিক বাংলা, সমকাল কিংবা কণ্ঠস্বরে কারো কবিতা প্রকাশিত হলে পাঠক ধরে নিতেন যে লোকটা কবি। ওগুলো ছিল ব্যারোমিটার। তখনকার সময়ে সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীব, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো যোগ্য, ঝানু, প্রাজ্ঞ, নিবেদিতপ্রাণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁরা খুব মমতা ও যত্ন নিয়ে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতেন। নবীন উদীয়মান কারো লেখায় সামান্য ভুলচুক থাকলে সেটা শুধরে দিতেন। এখন তেমন সম্পাদক নেই। ওদের মতো হওয়া সম্ভবও নয় আর। পরিবেশ পরিস্থিতি একেবারেই পাল্টে গেছে। সুতরাং তরুণসমাজকে বিকল্প পথ তো খুঁজতেই হবে। ফেসবুক তেমন একটা বিকল্প। এটার প্রসার, চাহিদা, ব্যবহার আরো বাড়বে দিন দিন। সেসব লক্ষণ ক্রমাগত সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন : একদম ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?
হেলাল হাফিজ : বড় হয়ে খেলোয়াড় হওয়ার কথা ভাবতাম। ক্লাস নাইন টেন পর্যন্ত খেলাধুলা অন্তঃপ্রাণ ছিল আমার। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, দাড়িয়াবান্ধা। এমনকি লন টেনিসও প্রিয় ছিল আমার। ক্রিকেট অবশ্য অতটা নয়। কারণ, এখনকার মতো ক্রেজ ছিল না ক্রিকেটের। নেত্রকোনার মতো ছোট্ট শহরে তৎকালে লন টেনিস কারা খেলতেন? সমাজের এলিট লোকজন যারা, তারা। ডাক্তার, আমলা, শিক্ষক, উকিল। আমি প্রথমে ছিলাম বল বয়। তারপর খেলায় নিলেন ওঁরা। জনপ্রিয় শিক্ষকের ছেলে বলে সবাই আদর করতেন আমাকে। কোনো খেলোয়াড় না এলে আমি বদলি হিসেবে খেলতাম। টেনিসের র‌্যাকেট কিন্তু বেশ ভারী। আমি প্রথমদিকে সেটা ঠিকমতো ধরতে পর্যন্ত পারতাম না।
আমি ছিলাম খেলাধুলার মানুষ। মূলত ক্রীড়াবিদই বলতে পারো। যত বড় হতে থাকি, আমার হৃদয়ে মাতৃহীনতার বেদনা তত প্রবলতর হয়ে উঠতে থাকে। সে এক বিষাদিত অধ্যায় আমার জীবনে। ছোটবেলার কথা বলছিলাম। ওই সময়ে জানো, খেলাধুলায় বেশ কৃতিত্বও অর্জন করেছিলাম। সেই ছোট সময়ে। আমাকে হায়ারে খেলতে নিয়ে যাওয়া হতো অন্য সব জায়গায়। টাকাপয়সাও রোজগার করেছি খেলে।
প্রশ্ন : তারপর? খেলাধুলার প্রতি এই তীব্র আসক্তি বা নেশা কতদিন স্থায়ী হলো আপনার? ঢাকায় থিতু হওয়ার পরবর্তী সময়ের কথা জানতে চাইছি।
হেলাল হাফিজ : ঢাকায় আসার পর নিজে আর খেলতাম না, এটা ঠিক। তবে নেশা একেবারেই দূর হয়নি। রাতারাতি সেটা ছাড়ানোও শক্ত কাজ। ঢাকা স্টেডিয়ামের প্রেস গ্যালারিতে বসে লীগের সব খেলাই আমি দেখতাম। ফুটবল খেলার কথা বলছি। সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে বসে খেলা দেখতাম তখন। সত্তরের দশকে নিয়মিতই যাওয়া হতো স্টেডিয়ামে।
প্রশ্ন : আপনার প্রিয় দল ছিল কোনটা? আবাহনী ক্রীড়া চক্র নাকি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব? কোনটা?
হেলাল হাফিজ : এর কোনোটাই নয়। আমার প্রিয় দল ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। তবে আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনাপূর্ণ হাই ভোল্টেজ ম্যাচগুলো বেশ উপভোগ করতাম। স্বাধীনতার পর অবজারভার ভবনের ছাদ থেকে কত খেলা যে দেখেছি, তার শুমার নেই। আমি একা না। অনেকে দলবেঁধে তখন অবজারভার ভবনের ছাদ থেকে স্টেডিয়ামের খেলা দেখতো। স্টেডিয়াম থেকে অবজারভার ভবনের দূরত্ব বেশি নয়।
প্রশ্ন : সঙ্গীত ও কবিতা এক সময় হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। এখন হয়তো দূরত্ব বেড়েছে কিছুটা। বিষয়টি কবিতার জন্যে কতখানি মঙ্গলজনক হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
হেলাল হাফিজ : আগে যাঁরা গান লিখতেন, তাঁদের গীতিকবি বলা হতো। তাঁরাও কিন্তু কবি। একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের। বিরাট প্রতিভাবান গীতিকবি তিনি। উনার বড় একটা আক্ষেপ ছিল যে, মানুষ তাঁকে কবি বলে স্বীকৃতি দেয়নি। আমরা সকলেই জানি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার অনেক বড় মাপের গীতিকার। অনেক কালজয়ী, শিল্পোত্তীর্ণ গানের স্রষ্টা। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ তো গান-ই। কবিতাও গান এক অর্থে।
এখন যারা গীতিকার, তাদের কবিতা, ছন্দ সম্পর্কে ধারণা গভীর নয়। সে কারণে গানগুলো আপ টু দ্য মার্ক হয়ে উঠতে পারছে না। এই একটা ঊনতা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। সঙ্গীতের তো বেশ কয়েকটি স্তর আছে। মুখ, সঞ্চারী, স্থায়ী, অন্তরা ইত্যাদি। যারা গান লেখেন, ধ্রুপদী সঙ্গীতের কতটা জেনে বুঝে লেখেন, তা আমি বলতে পারি না। কবিতার তো পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ ঘটেছে। আমার মনে হয়, সাম্প্রতিক কালের অধিকাংশ গীতিকারেরই সে ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা নেই। আগেকার দিনে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী একসঙ্গে মিলেমিশে গানের চূড়ান্ত রূপ দিতেন। সকলে মিলে বিস্তর সিটিং হতো। ইন্টারঅ্যাকশন হতো। শৈল্পিক একটা সমন্বয় থাকতো। সে কারণে এক একটি গান আমাদের মনে স্থায়ী দাগ কাটতো।
আজকালের যেসব গান, তা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়ার মতো। ব্যান্ড সঙ্গীত বলে যা হচ্ছে, তার মধ্যে কাব্যের ছোঁয়া খুবই কম। দুঃখজনক। যতটা আমি শুনেছি, মনে কোনো স্থায়ী ছাপ ফেলেনি। বাদ্যযন্ত্রের উৎপাত খুব বেশি, যেহেতু সুর দুর্বল। আমাদের দেশের দু’জন গীতিকার একসময় খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একজন হলেন কে জি মোস্তফা। অপরজন খান আতাউর রহমান। কেজি মোস্তফার লেখা কিছু অসাধারণ গানের কথা বলতে পারি। সেসব যে কালোত্তীর্ণ হয়েছে, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
যদি আমার কাছে জানতে চাওয়া হয় কোনো মাত্র একটি গানের কথা, তাহলে আমি বলব খান আতার লেখা ও সুর করা সেই গানের কথা, এ কি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ওগো বন্ধু…। সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছিলেন। খান আতার আরো আরো ভালো গান আছে।
এখন যারা গান লেখেন, সুর করেন, তাদের সবই আছে। আয়োজন, পোশাক-আশাক। গান এখন দৃশ্যমান বিষয় প্রধান হয়ে উঠেছে। এসব প্রকট হয়ে উঠেছে দুর্বলতাকে আড়াল করার জন্য।
প্রশ্ন : কেমন বাংলাদেশ আপনি দেখতে চান?
হেলাল হাফিজ : সুন্দর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখবার স্বপ্ন নিয়েই তো আমাদের প্রিয় এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই স্বপ্ন পুরোটা বাস্তবায়িত হয়নি। সেটা করার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যদি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সততার সঙ্গে যার যার কাজটা করি, তাহলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। এই কাজ সম্পাদন করা শুধু সরকারের দায়িত্ব না। আমরা প্রত্যেকেই যদি যার যার অবস্থান থেকে কাজটা করি, তাহলে স্বপ্নের দেশ পাওয়া সম্ভব।
সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আমার মনে হয়, পুরো মাত্রায় এই সময়টা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। সময়ের অনেক অপচয় আমরা করে ফেলেছি। এখন সামনের দিনগুলোতে সবাই মিলেমিশে যদি দেশটাকে সুন্দর করে মনের মতো গড়ে তুলতে পারি, তাহলে কোনো অপূর্ণতা থাকে না। আফসোসও থাকে না।
প্রশ্ন : আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশ ও বাস্তবের বাংলাদেশ-এর মধ্যে পার্থক্যটা কেমন?
হেলাল হাফিজ : পার্থক্য তো অনেক। এজন্য আমরা সবাই কমবেশি দায়ী। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে আনতে যা প্রয়োজন, তা হলো প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে যার যার দায়িত্ব পালন করবেন। কবিদেরও দায়িত্ব আছে এ ব্যাপারে। কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যান, দেশ ও সমাজের জন্য সেটা কোনোক্রমেই মঙ্গলজনক হবে না। কবি এক সার্বভৌম সত্তা। তিনি যদি পোষা পাখি হয়ে যান, তাহলে ধরে নিতে হবে যে দেশ মারাত্মক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
প্রশ্ন : উপায়টা তাহলে কী হতে পারে?
হেলাল হাফিজ : যে যে কাজে নিয়োজিত, তিনি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কাজটা সম্পাদন করেন, তাহলে সমস্যা থাকে না। আমি মনে করি, আমাদের দেশে এ পর্যন্ত সর্বাংশে জনবান্ধব কোনো সরকার এ পর্যন্ত আমরা পাইনি। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো- ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কৃষক যে দেশে, সেই দেশে কৃষকবান্ধব কোনো সরকার আজ পর্যন্ত দেখলাম না।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এখন বলা হয় জনসংখ্যা ১৬ কোটি। আসলে আরো বেশি হবে হয়তো। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মুখে যারা খাদ্য তুলে দিচ্ছেন, সেই দেশে কৃষকবান্ধব সরকার অদ্যাবধি না পাওয়া খুবই পীড়াদায়ক একটি ঘটনা। বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর। এটা সম্ভব হয়েছে কৃষকের অবদানের কারণেই। খাদ্য রপ্তানির মতো অবস্থাও তৈরি হয়েছে। যাদের জন্য এটা সম্ভব হয়েছে, সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে বৃহৎ কোনো পরিকল্পনা, বিজ্ঞানসম্মত সময়োপযোগী কার্যক্রম কিন্তু দেখতে পাই না।
এখন আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হয়েছে। বিশালই বলতে হয়। কিন্তু এর সুফল পাচ্ছে বিত্তশালীরাই। আরো বিত্তশালী হওয়ার সুযোগ বাড়ছে তাদের। আমি মনে করি, সাংবাৎসরিক বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশটা বরাদ্দ থাকা দরকার কৃষির জন্য, কৃষকের জন্য। সেটা একান্তই প্রয়োজন।