দুদকের সুপারিশ আমলে নিতে হবে

আগের সংবাদ

এ কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?

পরের সংবাদ

বন্ধ হোক বিবেকহীন নৃশংস ছাত্ররাজনীতি

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৯:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৯, ৬:১১ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

মনোয়ার হোসেন

আইনজীবী ও সাবেক ছাত্র নেতা, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

ছাত্ররাজনীতি যদি রাখতেই হয় তাহলে আইন করে ছাত্র সংগঠনগুলোকে দলীয় রাজনীতির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অঙ্গ হিসেবে থাকাটা বেআইনি করতে হবে এবং দলীয় রাজনীতি করতে হবে ক্যাম্পাসের সম্পূর্ণ বাইরে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতি যারা করেন বা মানবাধিকারের কথা যারা বলেন, সবারই কিন্তু কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে।

আমি বা আমরা একসময় ছাত্ররাজনীতি করেছি এবং নেতৃত্ব দিয়েছি। যে কোনো হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। নিজের সামনে অন্য কোনো সংগঠনের নেতা বা কর্মীকে আক্রান্ত হতে দেখলে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তাদের বাঁচাতে এগিয়ে গেছি। অবাক লাগে এখন, যখন শুনি ছাত্র নেতারাই হত্যা-হামলাতে বরং নেতৃত্ব দেয়। অথচ এখন তো সার্বিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তরুণরা আরো সভ্য ও মানবিক হওয়ার কথা।
আবরারের নির্মম হত্যা আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে, তার বাবা-মার মানসিক অবস্থা কী হতে পারে ভেবে কান্না চলে আসে। কারণ আমিও তো ঠিক তার বয়সেরই একজন ছেলের বাবা। আমার ছেলে ভিন্নমত পোষণ করা বা না করার কারণে সে কি শিক্ষাঙ্গনেই প্রাণ হারাবে? প্রত্যেকের দল, আদর্শ ও মতামত থাকবে, কিন্তু তার জন্য কাউকে হত্যা বা আক্রমণ করাটা দেশের সংবিধানের অবমাননা করা আর এর মানে পুরো জাতিকেই অবমাননা করা।
আমরা ক্যাম্পাসে আগেও হত্যা-হামলা দেখেছি। মনে পড়ে ১৯৮০ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের হাতে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের এজিএস ছাত্রলীগের তবারক হত্যা, ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রাবাসে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের হাতে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা, ১৯৯০ সালে ছাত্রদল কর্মীদের হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের আসলাম হত্যা, রাজশাহীতে শিবিরের হাতে ছাত্র ঐক্যের ফারুকসহ কয়েকজন হত্যা, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক কলেজে ১৯৮৬ সালে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের হাতে দুজন শিবিরকর্মী হত্যা ও শিবিরের হাতে ছাড়া দলের সাবেক নেতা ও নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের হামিদের হাত কাটা ও অনেকের রগ কাটা, ১৯৭৫ সালে ঢাবির ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলে মহসিন হলে কয়েকজন হত্যা, ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামে শিবিরের হাতে সাত ছাত্রলীগ কর্মী হত্যা, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাসদ ছাত্রলীগের ফারুক হত্যা, গত পাঁচ বছরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ বিভিন্ন স্থানে নিহত হয়েছে অন্তত ১০ জন, এর আগে ছাত্রদলের হাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী হত্যা ও একইভাবে বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রদল কর্মীর ওপর হামলা ও হত্যা ইত্যাদি। সব তালিকা দিতে গেলে বিশাল লেখা হয়ে যাবে। আমার প্রশ্ন, এতগুলো জীবনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট রাজনীতির কোনো সফলতা কি অর্জিত হয়েছে?
বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে যারা তারা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ছাত্রলীগ নেতাসহ অন্তত উনিশ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আবরারের হত্যাকারীরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাবে। নিহত হয়েছে একজন এবং তার পরিবার তো অনেক কষ্ট পাবে যদিও সে চলে গেছে আর তার কষ্ট করার কিছু বাকি নেই। তবে হত্যার সঙ্গে জড়িতরা এমনকি যাদের জড়িত বলে সন্দেহ করা হবে তাদের এবং তাদের পরিবারের দুঃখ-যাতনার শেষ হবে না অনেক বছর পর্যন্ত। আর আইনজীবীদের পেছনে পারিবারিক জায়গা-জমি বিক্রি করে অর্থ জোগান দিয়ে, অনেক বছর ধরে বিচারাধীন ও আপিলের কঠিন সময় কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ডাণ্ডা বেড়ি পরে জেলে থেকে বা পলাতক থেকে তাদের বাদবাকি জীবনটা এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। দল বা নেতা তাদের আর কোনো সাহায্যে তেমন আসবে না। কেউ খালাস পেলেও বাকি জীবন সমাজে হত্যার আসামি বা হত্যাকারী হিসেবেই পরিচিত হবে। এরশাদ আমলে এক মন্ত্রী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অনুসারীদের বলেছিলেন, ‘দেখ, তোমাদের জন্য আছি। আমরা আছি, থাকব, তবে মার্ডার কেইস নয়, ওটা আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়।’ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের প্রত্যেকেরই বাবা-মার স্বপ্ন ছিল তারা জীবনে বড় মাপের প্রকৌশলী হবে আর তাদের মানুষ করার আশায় তাদের জন্ম থেকে এ অবধি বাবা-মা কত পরিশ্রম করে, তাদের পেছনে কত না অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। বুয়েটে ভর্তি হয় কারা? যারা অনেক বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান তারাই তো এখানে ভর্তির সুযোগ পায়। এদের মাঝে কেউ এদেরই একজনকে খুন করতে পারল? হ্যাঁ, এটা সত্য, এখানে তাই ঘটেছে। তাহলে কি এসব ছাত্র মেধাবী ছিল, তবে আসলে বুদ্ধিমান বা বিবেকবান ছিল না? বিবেকহীন মানুষগুলোর বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে এদের সাহায্য করবে বা সমর্থন দেবে তারাও নিকৃষ্ট হিসেবে পরিগণিত হবে।
ভবিষ্যতে সবার মাঝে বিবেকের আলো ছড়াতে আজ এ ধরনের হত্যা আর হামলার বিরুদ্ধে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে এক মঞ্চ থেকে সরকারি ও বেসরকারি সব ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এক কণ্ঠে আর এক সুরে ধিক্কার জানানো উচিত। শিক্ষাঙ্গনে এমনকি দেশের যে কোনো স্থানে আর কোনো রাজনৈতিক বা দলীয়কারণে হত্যা ভবিষ্যতে যাতে ঘটতে না পারে তার জন্য কেন্দ্র, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সব দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিয়ে কনভেনশন করতে বাধা কোথায়? মনে রাখতে হবে, রাজনীতি যারা করেন বা মানবাধিকারের কথা যারা বলেন, সবারই কিন্তু কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে, শুধু সময়ের আর ঘটনার সুযোগে একটা বিবৃতি আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। এ ধরনের উদ্যোগ যে কেউ নিতে পারেন। এতে অন্যদের উপস্থিতি ও সমর্থন না পাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। এ ধরনের উদ্যোগে বরং প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া উচিত।
এর পাশাপাশি আবারো ভাবতে হবে- ছাত্ররাজনীতির আদৌ এখন আর প্রয়োজন আছে কিনা। অতীতে দেখেছি, বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছে। এর পেছনে কোনো ছাত্র সংগঠন দরকার হয়নি, যেমনটি ঘটেছিল নিরাপদ সড়কের সফল আন্দোলনে। ভবিষ্যতেও এভাবেই তারা প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে কোনো দল বা নেতার নেতৃত্ব ছাড়াই। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ৯ বছর আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে জয়যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতির গৌরবের ঐতিহ্য আবারো আমরা ফিরিয়ে এনেছিলাম, আর তার জন্য অনেক জেল-জুলুম-হত্যা ইত্যাদির সম্মুখীন হয়েছিলাম। বলা প্রয়োজন, আমি নিজেই দুবার দীর্ঘদিন কারাগারে বিনা বিচারে আটক ছিলাম ওই সময় ছাত্র-গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। কিন্তু আজ দুঃখের হলেও সত্য, সেই ত্যাগ ও ত্যাগের ফসল সবই যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ছাত্ররাজনীতি বলতে এখন আর কিছুই নেই। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল কেউই তাদের নেতা-সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন করতে পারেন না, তাদের নেতা নির্বাচন করেন মূল দলের নেতারা। যাদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই তারা আর দেশকেই বা কী দিতে পারেন? এরা এমপি-মন্ত্রী হতে পারবেন, তবে ভালো মানের ও মনের নেতা হতে পারবেন না ভবিষ্যতে। আর একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে যে, এই ছাত্র-যুব সংগঠনগুলোর কর্মী ও নেতারা যার যার দলের ও নেতার অন্ধ ভক্ত, কিন্তু তাদের মাঝে প্রকৃত জ্ঞানের ও কোনো আদর্শের আলো জ্বালানোর তেমন কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে এরা অন্য মত বা আদর্শকে আদর্শ বা যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা না করে অস্ত্র, পেশিশক্তি ও ক্ষমতা দিয়েই মোকাবেলা করতে শিখেছে মাত্র। কাজেই এই পরিস্থিতির জন্য মূল দলের নেতারাও এর দায় এড়াতে পারেন না।
আর ছাত্ররাজনীতি যদি রাখতেই হয় তাহলে আইন করে ছাত্র সংগঠনগুলোকে দলীয় রাজনীতির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অঙ্গ হিসেবে থাকাটা বেআইনি করতে হবে এবং দলীয় রাজনীতি করতে হবে ক্যাম্পাসের সম্পূর্ণ বাইরে। তবে বলা প্রয়োজন, একসময় ছাত্র ইউনিয়ন ছিল স্বাধীন একটি ছাত্র সংগঠন, কিন্তু পরবর্তীতে এই কারণেই এটি আর জনপ্রিয় থাকতে পারেনি। সম্প্রতি ডাকসুর নির্বাচনে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে; স্বতন্ত্র যারা নির্বাচিত হয়েছে তারাও দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতা ছিল। কাজেই সাধারণ ছাত্র সমাজের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতিকে সমর্থন করা থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী, আমার বিশ্বাস আপনি মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছেন এদের এসব কর্মকাণ্ড দেখে। কারণ এমনটি তো কথা ছিল না। আপনি ছাত্রলীগকে খুব ভালোবাসেন, এর নেতাদের সন্তানের মতো স্নেহ করেন। কয়েক দিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারবাজির দায়ে এদের দুই মূল কেন্দ্রীয় নেতাকে পদত্যাগে বাধ্য করে ইঙ্গিত দিয়েছেন আপনার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত ১০ বছর তো দেখলেন, আপনার কষ্টার্জিত সব উন্নতিকে যারা ম্লান করে দিচ্ছে তার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানের ছাত্রলীগের নেতারা অন্যতম। যুবলীগের ব্যাপারে আপনি বেশ দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন, এতে দেশবাসী বেশ খুশি হয়েছে। ছাত্রলীগ এখন আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে মনে হচ্ছে। সারাদেশেই সরকারি-বেসরকারি সব মহলেই তারা ভীষণভাবে সমালোচিত। কে যেন একসময় বলেছিলেন, ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের লোকরাই হয়তো বলতে পারেন এসব কি অনুপ্রবেশকারীরা ঘটাচ্ছেন নাকি আপনার স্নেহ-মমতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। আমার মতে, জরুরিভাবে আপনি কার্যকর কিছু করুন যাতে ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশকারী হোক আর না হোক, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা যেন আর সুযোগ না পায়। আর তা না পারলে সারাদেশের সুনির্দিষ্ট এলাকায় ও শিক্ষাঙ্গনে যেখানেই অভিযোগ রয়েছে সেখানেই আপাতত ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড সীমিত করে দেয়া প্রয়োজন।
আবরারের শোকাহত বাবা-মা আর পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবদের সহানুভূতি ছাড়া কিছুই তো দিতে পারবেন না সরকার এবং রাজনৈতিক নেতারা। তবে তার পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়াটার দায়িত্ব ছাত্রলীগের এবং ছাত্রলীগের অভিভাবক আওয়ামী লীগের। সারাদেশে ছাত্রলীগের সদস্যদের কাছ থেকে এ জন্য তহবিল সংগ্রহ করে সংগঠনের সতীর্থদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। এতে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার এবং অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে সদস্যদের মধ্যে কিছুটা হলেও মোটিভেশন আসতে পারে। সব শেষে আশা রাখি, আবরারের হত্যাকারীরা যেন কোনো অবস্থাতেই পার না পায়।

মনোয়ার হোসেন : আইনজীবী ও সাবেক ছাত্র নেতা, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।