সাময়িকী

ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

আগের সংবাদ

তার ভূমিকা ছিল আধুনিক ফোকলরবিদদের মতোই

পরের সংবাদ

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

ঐতিহ্য-অন্বেষার অদম্য পথিক

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৭:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৯, ৭:৫০ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

বাঙালির ঐতিহ্য-অন্বেষার অন্যতম প্রধান পুরুষ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)। সাহিত্য-গবেষণা ও তার তথ্যোপকরণ সংগ্রহে তিনি যে শ্রম, নিষ্ঠা ও মনোযোগ নিবেদন করেছেন তা যথার্থই বিস্ময়কর ও অনেকাংশে তুলনারহিত। দুর্লভ ও অজ্ঞাত প্রাচীন পুথি সংগ্রহ, সম্পাদনা ও তার ভিত্তিতে মধ্যযুগের কবি ও কাব্য সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ভূগোল সম্প্রসারিত করেছেন। ফলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রচলিত ইতিহাস পুনর্বিচার ও তার কাঠামো পুনর্নির্মাণের সুযোগ মিলেছে। এ-ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়াস ও অবদান অনন্য ও স্মরণীয়। সাহিত্যবিশারদের রচনা ও সংগৃহীত পুথি আমাদের মূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যের নিদর্শন।

দুই.
উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে বাঙালি বিদ্বজ্জন পুথি-সংগ্রহে মনোযোগী হন। এই কাজে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১), ড. দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) ও নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব (১৮৬৬-১৯৩৮) পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। আদিপর্বের পুথি সংগ্রহ প্রয়াসে এঁদের পাশাপাশি সাহিত্যবিশারদের নামও স্মরণযোগ্য।
প্রাচীন পুথি সংগ্রহ, সম্পাদনা, তার বিবরণ-লিপিবদ্ধ ও আলোচনা সাহিত্যবিশারদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে এই পুথি সংগ্রহের প্রয়াস সহজ ও নির্বিঘ্ন ছিল না। এ-কাজে কখনো কখনো তাঁকে বিপত্তিতে পড়তে হয়েছে। এমন কী একবার চাকরি হারিয়ে চরম মূল্যও দিতে হয়। এ-ছাড়া হিন্দু-পরিবারে সংরক্ষিত পুথি ব্যবহার বা সংগ্রহে তাঁকে কম বিব্রত ও অসম্মানিত হতে হয়নি। অক্লান্ত শ্রম ও নিরন্তর প্রয়াসে, বিশেষ করে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম-প্রয়াসের অজ্ঞাত ও প্রায় লুপ্তধারাকে তিনি পুনরুদ্ধার করেন। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যবিশারদ ‘অজ্ঞাতপূর্ব, অশ্রুতনাম, কৌতূহলোদ্দীপক বিস্ময়কর বহু প্রাচীন বাঙ্গলা পুথির বিবরণ’ প্রকাশ করে মধ্যযুগের সাহিত্য গবেষণায় একটি নতুন অধ্যায় সংযোজন করেন।
সাহিত্যবিশারদের জীবিতকালে তাঁর সংগৃহীত ও সম্পাদিত নয়টি পুথি প্রকাশিত হয় (১৩০৮-১৩২৪) বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ থেকে। সাহিত্যবিশারদ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হকের যৌথ নামে প্রকাশিত ‘আরাকান-রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’ (১৯৩৫) গ্রন্থটি মূলত সাহিত্যবিশারদ-সংগৃহীত উপকরণের সাহায্যে এবং তাঁরই তত্ত্বাবধানে রচিত হয়। সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুর ২৪ বছর পর (১৯৭৭) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য সমিতির পক্ষ থেকে তাঁর সম্পাদিত আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ পুথির খণ্ডিত অংশ প্রকাশিত হয়। তবে সাহিত্যবিশারদের অনেক শ্রম, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ও সাধনাই ফলপ্রসূ হয়নি। তাঁর সম্পাদিত অনেক পুথিই অপ্রকাশিত থেকে গেছে। কিছু বা গেছে হারিয়ে। তাঁর কোনো কোনো রচনা বা সম্পাদিত পুথি কেউ কেউ আত্মসাৎ করেছেন, এমন খবরও মেলে।
কেবল পুথিসংগ্রহ নয়, পুথি সম্পাদনাতেও সাহিত্যবিশারদ যে অসামান্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন তা পণ্ডিত-গবেষকদের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি ও প্রশংসা লাভ করে। পুথি-পাঠ বা সম্পাদনা-বিষয়ে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। বলা যায়, এ-বিষয়ে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তাঁর সম্পাদিত প্রথম পুথি নরোত্তম ঠাকুরের ‘রাধিকার মানভঙ্গ’ (১৩০৮)-এর মুখবন্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে মন্তব্য করেন তাতে সাহিত্যবিশারদের কৃতীর সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় :
“তিনি [আবদুল করিম] এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদনকার্য্যে যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহৃদয়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাঙ্গালায় কেন, সমস্ত ভারতেও বোধহয় সচরাচর মিলে না। এক-একবার মনে হয়, যেন কোন জর্মান এডিটর এই গ্রন্থ সম্পাদনা করিয়াছেন।”
এই মন্তব্য সাহিত্যবিশারদের অন্যান্য সম্পাদনাকর্ম সম্পর্কেও সমান প্রযোজ্য।
সাহিত্যবিশারদের পুথি সংগ্রহ, সম্পাদনা ও গবেষণাকর্মের সামগ্রিক মূল্যায়ন আজও হয়নি। অথচ তাঁর মধ্যযুগের সাহিত্য-সংক্রান্ত আলোচনা-গবেষণা যে কতো গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান তা সাহিত্যের গবেষক ও ইতিহাসকার সহজেই স্বীকার করবেন। এ কথা সত্য যে :
… মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের সাত-আটটি অধ্যায় আবদুল করিম আবিষ্কৃত কবি-কাব্য, তথ্য-তত্ত্ব ও নতুন বিষয় নির্ভর করেই লিখতে হয়, যেমন নাথসাহিত্য, সুফীসাহিত্য, প্রণয়োপাখ্যান, জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য, মুসলিম ধর্মসাহিত্য, লোকশিক্ষা লক্ষ্যে রচিত প্রশ্নোত্তরে লিখিত সওয়াল সাহিত্য, মুসলিম কবি রচিত বৈষ্ণব-তত্ত্বরিক্ত রাধাকৃষ্ণপদ এবং অবৈষ্ণব চরিতসাহিত্য…।
তাই ড. দীনেশচন্দ্র সেন থেকে ড. আহমদ শরীফ পর্যন্ত যাঁরাই মধ্যযুগের সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা-গবেষণা করেছেন, তথ্যোপকরণের জন্যে তাঁরা সাহিত্যবিশারদের কাছে গভীরভাবে ঋণী।

তিন.
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাঙালির ঐতিহ্যচর্চার এক নিরলস সাধক। তাঁর অনুসন্ধিৎসা ও আগ্রহ ছিল বহুমুখী ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত। স্বচ্ছ ও গভীর ছিল তাঁর দৃষ্টি। এই জ্ঞানতাপস জীবিতকালেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ-চর্চার প্রবাদপুরুষ হয়ে উঠেছিলেন। তবে মধ্যযুগের ধূসর পাণ্ডুলিপির অভ্যন্তরেই কেবল তাঁর মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল না, স্বদেশ-সমাজ ও লোকজীবনও তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। অসম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত, উদার মতাবলম্বী, মুক্তবুদ্ধির মানুষ সাহিত্যবিশারদ সারাজীবনই ঐতিহ্য-সন্ধান ও জ্ঞানের সাধনায় ছিলেন নিবেদিত। সাহিত্য ও সংস্কৃতিসাধনা ছিল তাঁর জীবনচর্চারই আর-এক রূপ। তাই একবার তাঁর এক সুহৃদকে বলেছিলেন, ‘স্বদেশ ও মাতৃভূমির প্রাচীন পুণ্যময়ী গাথা গাহিতে গাহিতে আমার এ তুচ্ছ জীবন অতিবাহিত হইয়া যাউক, ঈশ্বরকে প্রার্থনা করিবেন।’
সংস্কৃতির শেকড় যে ঐতিহ্যের জমিনের গভীরে প্রোথিত, আমাদের অস্তিত্বের প্রেরণাও যে সেখানেই নিহিত- জীবন সায়াহ্নে গভীর প্রত্যয়ে সে-কথা ঘোষণা করেছিলেন সাহিত্যবিশারদ :
সংস্কৃতির জন্ম-প্রেরণা যেখান হইতেই হউক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসার পরিবেশ-নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার অর্থ ভিত্তিকে অস্বীকার করা। মাটি ভিত্তি করিয়া তাজমহল দাঁড়াইয়া আছে। সেই মাটির গুরুত্ব অনেকখানি। ইহা ছাড়া তাজমহল তৈরি সম্ভব ছিল না। তেমনি ঐতিহ্য-সম্পর্ক-বিহীন সংস্কৃতি-সাধনাও অসম্ভব। ঐতিহ্যে যাহা কিছু ভাল তাহার অনুসরণ এবং যাহা কিছু নিন্দনীয় তাহার বর্জনেই নূতন জীবনাদর্শের সন্ধান মিলে। সংস্কৃতির রূপান্তরও এইভাবেই ঘটে, অগ্রগতিও আসে এই পথে।

চার.
সাহিত্যবিশারদের আগ্রহ ও সন্ধিৎসা কেবল পুথির জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বিচিত্রমুখী অনুরাগ ও কৌতূহল প্রসারিত হয়েছে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, ধর্মতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য-সমালোচনা, রাজনীতি, এমন কী আধুনিক সাহিত্যের প্রতিও। ঐতিহ্য-অন্বেষার সূত্রেই তাঁর লোকসংস্কৃতিচর্চার সূচনা। একদিকে তিনি ছিলেন ফোকলোর-উপকরণের সংগ্রাহক, অপরপক্ষে এই বিষয়ের প্রাজ্ঞ আলোচক। অজ্ঞাত-লুপ্ত ঐতিহ্য-উপাদানের সন্ধান, জন্মভূমির মহিমা-প্রচার ও স্বদেশ-আবিষ্কারের চেতনা থেকেই সাহিত্যবিশারদ ফোকলোরচর্চায় ব্রতী হন। তাই বলা চলে, তাঁর পুথি সংগ্রহ ও আলোচনার পরিপূরক কাজ ছিল এই লোকসংস্কৃতিচর্চা।
সাহিত্যবিশারদের জন্ম, জীবনযাপন, সংগ্রহকর্ম, সাহিত্যসাধনা ও জীবনাবসান- সবই গ্রামীণ পরিবেশে। লৌকিক জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় যোগ। বাঙালির ফোকলোরচর্চার আদিপর্বে রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় তিনি লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ, আলোচনা ও প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হন। এ-বিষয়ে তাঁর প্রথম সংগ্রহ, ‘চট্টগ্রামী ছেলে-ভুলান ছড়া’ প্রকাশিত হয় ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় (শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩০৯)। কালের হিসেবে সাহিত্যবিশারদের লোকসংস্কৃতিচর্চার বয়স শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। এ-পর্যন্ত হদিশপ্রাপ্ত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সাহিত্যবিশারদের ৪১২টি প্রবন্ধের মধ্যে লোকসংস্কৃতি-বিষয়ক রচনার সংখ্যা ২৫। তিনি মূলত শিশুতোষ ছড়া, হেঁয়ালী বা ধাঁধা, লৌকিক মেয়েলী ব্রত, লোকভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, কৃষকগীতি, গ্রাম্যগান, মরমীসঙ্গীত, বারমাসি, লোকক্রীড়ার বিবরণ প্রভৃতি সংগ্রহ এবং সে-সম্পর্কে আলোচনা করেন।

পাঁচ.
লোকসংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সাহিত্যবিশারদ গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। এ-বিষয়ে তাঁর ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। লোকসংস্কৃতিচর্চা যখন বাঙালিসমাজে বিকাশলাভ করেনি, সেই উন্মেষপর্বে তিনি বলেছিলেন :
… বঙ্গের বিশাল প্রাচীন সাহিত্য কেবল হস্তলিখিত পুথিরাজিতেই সীমাবদ্ধ নহে। লিখিত সাহিত্যের বাহিরেও এমন সকল জিনিষ আছে যে, তাহাদের রক্ষণ এবং উদ্ধারও নানা কারণে বিশেষ প্রয়োজনীয়। সে সকল জিনিষ কাগজের মত জড়পদার্থে লিখিত না হইয়া প্রায়ই লোকের হৃদয়পটে অঙ্কিত রহিয়াছে এবং ক্রমশ বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। বলিয়াছি ত, প্রাচীনের অঙ্গীভূত অতি তুচ্ছ পদার্থও আমাদের আদরের অনুপযুক্ত নহে। নিম্নে সেইরূপ কয়েকটা জিনিষের নাম প্রদান করিতেছি:- ১. মৌখিক প্রাচীন গীত ২. ছড়া ও বারমাস্যা ৩. হেঁয়ালী বা ধাঁধা ৪. প্রবচন ৫. প্রবাদ ৬. ব্রতকথা ৭. উপকথা ৮. ডাক ও খনার বচন ৯. পালা ১০. রহস্য-কথন ১১. নীতি-কবিতা ১২. সারিগান ইত্যাদি।
তাঁর ‘চট্টগ্রামী ছেলে-ঠকান ধাঁধা’য় (‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’, মাঘ ১৩১২) এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন :
বাঙ্গালা অভিধান ও ব্যাকরণের উপাদান-সংগ্রহের জন্য বঙ্গের প্রাদেশিক শব্দ, গ্রাম্যগীত এবং কবিতাদির সংগ্রহ ও প্রকাশ নিতান্ত আবশ্যক। ভাষাতত্ত্বের অন্যান্য উদ্দেশ্য সাধনকল্পেও উহাদের প্রয়োজনীয়তা সামান্য নহে। অধিকন্তু, গ্রাম্য কবিতাদি প্রচার দ্বারা যুগে যুগে মানবহৃদয়ের রুচি ও গতিবিধির পর্যবেক্ষণও একান্ত সহজসাধ্য হয়।
অন্যত্রও (‘প্রাচীন সাহিত্যের যৎকিঞ্চিৎ’, ‘অবসর’, অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩১৪) তিনি ফোকলোরচর্চার বহুমাত্রিক তাৎপর্য ও উপযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন:
ইতিমধ্যে আরও বহু হেঁয়ালী, ছড়া ও প্রাচীন গীত আমাদের হস্তগত হইয়াছে। প্রাচীন সাহিত্যের অন্তর্গত এইসকল আপাততুচ্ছ ক্ষুদ্র পদার্থগুলির প্রকাশ দ্বারা নানা উদ্দেশ্য সংসাধিত হইতে পারে। সেকালের লৌকিক জীবনের একটা অস্পষ্ট ছায়া উক্তরূপ পদার্থরাজিতে যেন সংমিশ্রিত দেখায়। … বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসের এক অধ্যায়ে এ সকল বিষয়ের সমাবেশ নিতান্ত আবশ্যক। সেই অধ্যায় সঙ্কলনের সাহায্যকল্পে আমরা এযাবৎ নানাবিধ প্রাচীন ছড়া প্রভৃতির সংগ্রহ করিতেছি।
লোকসংস্কৃতির নানা উপকরণ সংগ্রহে সাহিত্যবিশারদ স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিকভাবে প্রয়াসী হয়েছিলেন। ‘আমাদের এই নিজস্ব সম্পত্তিগুলি ক্রমশ বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে’ বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এবং ‘ইহাদের রক্ষণের জন্য আমাদের যে একান্ত যত্নপর হওয়া আবশ্যক’- সে-বিষয়ে করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েছেন। তিনি এ-ও উপলব্ধি করেছিলেন যে, একক প্রচেষ্টায় এই কাজ সম্ভব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন সামষ্টিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ :
ব্যক্তিগত চেষ্টায় যাহা সাধ্য, আমরা তাহাই করিয়া যাইতেছি। দুঃখের বিষয় যে, অদ্যাপি আমাদের কার্য্যরে প্রতি কাহারো সুদৃষ্টি পতিত হইল না। একের চেষ্টায় এরূপ কাজ সুসম্পন্ন হওয়ার নহে বলিয়াই আমরা আক্ষেপ করিতেছি; নতুবা মাতৃভূমির পুরাকীর্ত্তির সমুদ্ধারে আমাদের এই তুচ্ছ জীবন উৎসৃষ্টই হইয়াছে। কাহারো উৎসাহে বা অনুৎসাহে আমাদের উদ্যম ভঙ্গ হওয়ার নহে।
ঐতিহ্য-অনুসন্ধানের প্রয়াস সাহিত্যবিশারদের স্বভাবের অন্তর্গত ছিল। তাই কী পুথি কী লোকসাহিত্য- এর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রকাশ ও আলোচনায় তিনি নিত্য অন্তরের তাগিদ অনুভব করেছেন- আবেগে উত্তেজিত হয়ে অন্যকেও প্রাণিত করতে চেয়েছেন :
… সেকালে বঙ্গের প্রায় প্রতি গ্রামেই একজন না একজন পল্লীকবির আবির্ভাব হইয়াছিল। মুসলমানদের মধ্যেও বিস্তর কবির অভ্যুদয় হইয়াছিল, এরূপ অনুমান কিছুই দুঃসাহস নহে। তাহার খোঁজ করা হিন্দু-মুসলমান সকলেরই কর্ত্তব্য ও গৌরবের বিষয় বটে। অধঃপতিত মুসলমান সমাজের মধ্যে এই আত্মগৌরব হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন, এমন কি কেহ নাই? এই কার্য্যে সামান্য স্বার্থহানি করিয়া জাতীয় কীর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত করিবার লোক আমাদের সমাজে নাই কি? আজ এতদিন ধরিয়া আমরা তারস্বরে আন্দোলন করিয়া আসিতেছি, তাহার ফলে কি একটি মুসলমান হৃদয়ও মোহনিদ্রা হইতে জাগিয়া উঠিবে না? তাহা যদি না হয়, তবে বঙ্গের ‘মুসলমান’ নাম কর্ম্মনাশার অতল তলে বিলীন হইয়া যাইলেই বা ক্ষতি কি?
সাহিত্যবিশারদ তাঁর কোনো কোনো অভিভাষণেও জনগণকে ঐতিহ্যচেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে তিনি অতীতের ইতিহাস ও সাহিত্যের উপকরণের সাহায্যে নতুন সাহিত্যসৃষ্টির আহ্বান জানান। প্রসঙ্গক্রমে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে তিনি বলেন :
রবীন্দ্রনাথ ত প্রাচীন বাংলার ছেলেভুলানো ছড়াকেও বাদ দেন নাই। মহাকবি প্রাচীন বাংলার বাউলসঙ্গীত হইতেও দুই হাতে সংগ্রহ করিয়াছেন সাহিত্যের রস। আপনারা শুনিয়া হয়তো বিস্মিত হইবেন ভারতীয় দার্শনিক সম্মেলনের সভাপতি হিসাবে প্রাচীন বাউলকবি শেখ মদনের-
‘নিঠুর গরজি, তুই মানসমুকুল ভাজবি আগুনে
তুই ফুল ফুটাবি, বাস ছুটাবি, সবুর বিহনে?’
– এই সঙ্গীত উদ্ধৃত করিয়া তাঁহার অভিভাষণ আরম্ভ করিয়াছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যবিশারদের মনন-মানসে মধ্যযুগের পুথি সাহিত্য ও তার অনুষঙ্গী বিষয় হিসেবে লোকসাহিত্যেরও একটি বড়ো আসন ছিল।

ছয়.
ঐতিহ্য-অন্বেষা, স্বদেশ-চেতনা ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি অনুরাগের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-পত্রিকা’য় (বৈশাখ-আষাঢ় ১৩০১ এবং কার্তিক-পৌষ ১৩০২) শিশুতোষ ছড়া সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন এবং সেইসঙ্গে এইসব ছড়া সংগ্রহের জন্যে পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বান সাহিত্যবিশারদকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। পুথি সংগ্রহের পাশাপাশি বা অবসরে তিনি ছড়া-সংগ্রহেও উদ্যোগী হন। সাহিত্যবিশারদ-সংগৃহীত এই ‘চট্টগ্রামী ছেলেভুলান ছড়া’ ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় (শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩০৯, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩১০, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩১৩) প্রকাশিত হয়। এই সংগ্রহের প্রথম কিস্তির শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেছেন : ‘মাননীয় শ্রীযুক্ত বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের আহ্বানে চট্টগ্রাম আনোয়ারা অঞ্চল হইতে নিম্ন-প্রকাশিত ছড়াগুলি সংগৃহীত হইল।’ পত্রিকায় মোট ১৯৮টি ছড়ার ক্রমিকের উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ছড়ার সংখ্যা ১৪৮। কেননা দ্বিতীয় কিস্তির শেষ ছড়ার সংখ্যাক্রম ১০১, কিন্তু তৃতীয় কিস্তির প্রথম ছড়া শুরু হয়েছে ১৫১ সংখ্যক ক্রমিক থেকে। সাহিত্যবিশারদের ছড়া-সংগ্রহের বৈশিষ্ট্য এইভাবে নির্দেশ করা যায় :
ক. ছড়াগুলো তিনি পল্লীবাসীর কাছ থেকে সরাসরি নিজে সংগ্রহ করেন।
খ. বাংলার অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে বোধগম্যের জন্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘দুর্বোধ্য’ চট্টগ্রামী ভাষার ‘কিঞ্চিৎ রূপান্তর’ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
গ. যে-সব ছড়ায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের কথ্যবুলি তিনি অবিকৃত রেখেছেন, সে-ক্ষেত্রে ‘ব্যাকরণ ও উচ্চারণ-ঘটিত নিয়ম’ এবং শব্দার্থের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছেন। এইসব ছড়া প্রকাশের মাধ্যমে ‘প্রাদেশিক শব্দ সংগ্রহের সুবিধাও হইতেছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
ঘ. একই ছড়ার ভিন্ন পাঠকেও তিনি গুরুত্ব দিয়ে তা সংকলিত করেছেন।
ঙ. তাঁর সংগৃহীত ছড়া বিষয়-বৈচিত্র্যের দিক দিয়েও উল্লেখযোগ্য।
নমুনা হিসেবে সাহিত্যবিশারদ-সংগৃহীত দু’-একটি ছড়া এখানে পেশ করছি, যার ভেতরে গ্রামীণ রূপ ও মূল ভাষা-বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয়েছে :

ঘুঙ্গা উন্দুর ঘুঙ্গা উন্দুর,
নল বনেতে বাসা।
আমার গোলার ধান খায়,
হেমা লোচা লোচা।
আড়্ কাডিল বেড়্ কাডিল,
এক্কৈ রাইতে কাডি নিল
তের রত্তি সোণা ॥
(১৫৩ সংখ্যক ছড়া)
এই ছড়াটিতে গার্হস্থ্য জীবনের ছবি পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে ইঁদুরের ক্ষতিকর স্বভাব-প্রবণতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। কৌতুক-রসের ছড়াও আছে। আবার ঘুমপাড়ানি ছড়ার একটি নমুনা, ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে যার বিস্তর পাঠান্তর মেলে :
আয় চান্দ আয় আয়।
আইলা দেম্, বাইলা দেম্,
মাছ কুঠি মেজা দেম্
চূড়া ঝারি কুরা দেম্
কলা ছুলি বাকল দেম্,
চান্দ কপালে পুডুস্ ॥
(৬ সংখ্যক ছড়া)
সাহিত্যবিশারদ লোকসাহিত্যের এইসব লুপ্তপ্রায় মূল্যবান উপকরণ সংগ্রহের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ‘চট্টগ্রামের ছেলেভুলান ছড়া’ সংগ্রহ উপলক্ষে তিনি আফসোসের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন :
চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান হইতে এরূপ বিস্তর ছড়া সংগৃহীত হইতে পারে। চট্টগ্রামের ভাল জিনিসেরই আদর করিবার লোক নাই; এরূপ আপাতমন্দ জিনিসের আদর কে করিবে?

সাত.
শিশুতোষ ছড়ার পর সাহিত্যবিশারদ গ্রাম্য ধাঁধা বা হেঁয়ালী সংগ্রহে মনোযোগী হন। ‘প্রকৃতি’ (অগ্রহায়ণ, মাঘ ১৩১০) পত্রিকায় প্রথম তাঁর সংগৃহীত ধাঁধা বা হেঁয়ালী প্রকাশিত হয়। এরপর ‘অবসর’ (জ্যৈষ্ঠ, ভাদ্র ১৩১২) পত্রিকায় ‘সেখ আজিজর রহমান’ নামে ১৫টি প্রাচীন হেঁয়ালী প্রকাশ পায়। তবে ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় (মাঘ ১৩১২) ‘চট্টগ্রামী ছেলে ঠকান ধাঁধা’ শিরোনামে যে ১৫০টি ধাঁধা সংকলিত হয়, তা সুধীজনের বিশেষ মনোযোগ লাভ করে। এর পরেও যে তাঁর ধাঁধা সংগ্রহের প্রয়াস থেমে থাকেনি তার প্রমাণ মেলে ‘বিজয়া’ (শ্রাবণ, আশ্বিন ১৩২০) পত্রিকায় প্রকাশিত ধাঁধাগুচ্ছে।
ধাঁধা লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলেও নাগরিক শিষ্টজনেরা গ্রামীণ ধাঁধার বিষয়ে বরাবরই উদাসীন ছিলেন। ‘প্রকৃতি’ (অগ্রহায়ণ ১৩১০) পত্রিকায় কয়েকটি নমুনা-ধাঁধা প্রকাশ করতে গিয়ে সাহিত্যবিশারদ উল্লেখ করেছিলেন :
মুদ্রিত গ্রন্থে অনেকেই হেঁয়ালী দেখিয়াছেন। সে সকলের রচনাতে কম বিদ্যাবুদ্ধি খরচ হইয়াছে, এ কথা কেহই বলিতে পারেন না। ঐগুলি ত শিক্ষিত লোকের জন্য শিক্ষিত লোকের রচিত; কিন্তু নিরক্ষর লোকেরাও যে- হেঁয়ালী বা ধাঁধা রচনা করিয়া গিয়াছে, তাহা কেহ দেখিয়াছেন কি? চট্টগ্রামে এমন বহু হেঁয়ালী আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি।
এই ধাঁধাগুলোতে ‘বুদ্ধিমত্তার ও স্বাভাবিকতার পরিচয় আছে’ এবং ‘অনেকগুলিতে উপমাদিও সুসঙ্গত হইয়াছে’- বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় (মাঘ ১৩১২) ১৫০টি লোক-ধাঁধা প্রকাশ করেন সাহিত্যবিশারদ। তিনি এর নাম দেন ‘চট্টগ্রামী ছেলে ঠকান ধাঁধা’। এই ধাঁধার সৃষ্টি ও এর বিষয়-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন :
এই হেঁয়ালীগুলি বিশেষত কৃষক-বালকদেরই সম্পত্তি। অন্তত হেঁয়ালীগুলির ভাষা ও রচনাপ্রণালী দেখিয়া উক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। গৃহস্থালীর এবং সাধারণ দ্রব্যগুলি সম্বন্ধেই অধিকাংশ ধাঁধা প্রস্তুত হইয়াছে। অনেকগুলি ধাঁধাতেই শিক্ষিত হস্তের স্পর্শচিহ্ন বিদ্যমান নাই; এরূপ স্থলে আমরা অনুমান করিতে পারি, ধাঁধাগুলির অধিকাংশই নিরক্ষর কৃষকমণ্ডলীর রচিত।
সাহিত্যবিশারদের সংগ্রহ থেকে এখানে কয়েকটি লোক-ধাঁধা উদ্ধৃত হলো :
ক. কাঁধে আইএ, কাঁধে যায়।
বিনা দোয়ে মারণ খায় ॥ – উঃ ঢোল।
খ. ঝাড়ুর্থুন নিকল্যে ঠুঠ্যা।
ভাত ভরি দিএ মুত্যা ॥ – উঃ কাগজি লেবু।
গ. বনে থাকে সুবোল বোলে
নয় পাখীর ছা।
হাতে নইলে ছটক মারে
ভূমিতে না দেয় পা ॥ – উঃ সারিন্দা।

ধাঁধাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক ভাষাকে কোনোরূপ মার্জিত করার প্রয়াস নেই। শেষের ধাঁধাটিতে ছন্দবদ্ধ সৌকর্যের পরিচয় মেলে। আর তাঁর নিজের ভাষায় ‘নাসিকায় কুরুচির দুর্গন্ধ’ লাগার অজুহাতে তিনি কৃষকসমাজের সাংস্কৃতিক প্রয়াসকে অগ্রাহ্য বা বর্জন বা সংশোধন করেননি, – তার দৃষ্টান্ত এখানে উদ্ধৃত দ্বিতীয় ধাঁধাটি।

আট.
লোকসংস্কৃতির অন্যান্য উপকরণের মধ্যে সাহিত্যবিশারদ মৌখিক প্রাচীন গীত, বারমাস্যা, প্রবাদ-প্রবচন, মেয়েলী লৌকিক ব্রতকথা, গ্রাম্যখেলার ছন্দবিবরণ, বাতুলের গান প্রভৃতি সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছেন। তিনি ‘মৌখিক প্রাচীন গান’ যাকে বলছেন, তা মূলত মরমী বা দেহতত্ত্বের গান, আবার কখনো তাকে ‘দরবেশি গান’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। অবশ্য এই ধরনের গান খুব বেশি তিনি সংগ্রহ করতে পারেননি। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গানের নমুনা পেশ করা হলো এখানে :
১. গুরু বেলা গেল সন্ধ্যা হ’ল পার কর আমারে।
মুই যার সঙ্গে পার হই যাব, চিন্লি না মন তারে ॥
পার কর মোরে মাঝি ভাই
সঙ্গে আমার পয়সা নাই
সঙ্গে নাই গো কড়ি, মনবেপারি চেয়ে রইলাম তোরে।
রাত্রি হৈল ভোর, আমার পন্থ বহুদূর
সঙ্গের সঙ্গী নহে গো কেহ যাইব কেমনে ॥

২. পরাণ-বেদনি সই!
জনম বিফলে গেল বৈইআ ॥
বস (বয়স?) নিলা রস নিলা রূপ নিলা হরি।
মিছা মিছা মায়াজালে বন্দী হইয়া মরি ॥
ন চিনিলাম ঘাটের ঘাটিয়াল কেমন জনা।
এ তন ভেদিআ দেখ কেহ নহে আপনা ॥
দুঃখ নিবারণ-বাণী কহে আবদুল মালী।
বিচারিলে কি ধন পাইবা ভাণ্ড হৈল খালি ॥

ভণিতাবিহীন প্রথম পদটি কোনো অনামা সাধককবির। পদটির সূচনা-পঙ্ক্তির সঙ্গে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাউলাঙ্গের- ‘ওহে, দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার কর আমারে’- গানটির আশ্চর্য মিল লক্ষ করা যায়। পরের দুটি গীতের পদকর্তা আবদুল মালী ও ‘জ্ঞানসাগর’-খ্যাত আলি রাজা। মায়াবদ্ধ জীব, জীবনের নশ্বরতা, দেহবিচার, সুকৃতির অভাব, সাধন-ভজনে অনীহা, পারাপারের পাথেয় সংগ্রহের তাগিদ- মরমী গানের প্রচলিত এইসব সাধন-প্রসঙ্গই উদ্ধৃত পদাবলির মূল বক্তব্য। সাহিত্যবিশারদ এই পদগুলো সম্বন্ধে বলেছেন :
সেকালের কবিতাগুলি রাগরাগিণী-নিবদ্ধ গীতবিশেষ। আমাদের সংগ্রহের মধ্যে অনেকগুলি গীত কবিত্ব হিসেবে সুন্দর। গীতগুলিতে কি তীব্র মাদকতা রহিয়াছে, তাহা গীত হইতে না শুনিলে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। সৌন্দর্যের কথা না ধরিলেও, ঐতিহাসিক হিসাবেও এই সকল গীত সযত্নে রক্ষিতব্য, বোধকরি, তৎসম্বন্ধে কাহারো মতদ্বৈধ হইবে না।

নয়.
সাহিত্যবিশারদ তাঁর কালেই লুপ্ত লোকক্রীড়া ‘গেরোয়া খেলা’র বিবরণ উদ্ধার করে প্রকাশ এবং সেইসঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘আমাদের অলিখিত সামাজিক ইতিহাসে এসব খেলার বিবরণ স্থান পাওয়ার উপযুক্ত’ (‘কাফেলা’, ১৩৫৮)। সমাজ-ইতিহাসের আর-এক নিদর্শন বাংলার মেয়েলী ব্রত। তিনি চট্টগ্রাম-অঞ্চলে প্রচলিত ৩০ রকমের মেয়েলী ব্রতের উল্লেখ করেছেন (‘সৌরভ’, ভাদ্র ১৩২০)। এর বাইরে অনেক ব্রতই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ব্রত-শিক্ষার প্রভাবে, সাহিত্যবিশারদ মন্তব্য করেছেন, ‘বস্তুত তৎকালে অধিকাংশ বাঙ্গালীর গৃহ এক একটী শান্তিনিকেতন ছিল বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।’
সাহিত্যবিশারদ লোকসংস্কৃতির উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক অভিনব লোকসাহিত্য-সামগ্রী আবিষ্কার করেছিলেন, যা তিনি ‘বাতুলের গান’ নামে প্রকাশ করেন (‘প্রতিভা’, অগ্রহায়ণ ১৩২২)। এক ধরনের আপাত-অর্থহীন প্রহেলিকাপূর্ণ এই পদগুলো হয়তো বা ‘পরিহাস-রসিকের উদ্ভট কল্পনা’ থেকে জন্ম নিয়েছিল। এ-বিষয়ে তাঁর নিজের ভাষ্য এইরকম :
উহাদিগকে কেহ কেহ উল্টা ‘বাউলের গান’ বলিয়া থাকে। বাস্তবিক পক্ষে তাহাদিগকে আপাতদৃষ্টিতে বাউলেরই (বাতুলেরই) কাণ্ড বলিয়া বুঝা যায়। বাতুল ভিন্ন এমন সত্যের বিরোধী কথা ত আর কেহ বলিতে পারে না। এজন্য আমি ইহাদিগকে আপাতত “বাতুলের গান” নামেই অভিহিত করিলাম।
‘বাতুলের গানে’র কয়েকটি নিদর্শন এখানে পেশ করা হলো :
১. বিলের মাঝে চিলের বাসা, কুত্তা বিয়ায় গাছে।
সেই চিল ধরিয়া খাইল রাম দাড়িকা মাছে ॥
২. পাতা পড়ি বাতাস মৈল, বৃক্ষ ধাইল উড়ি।
সাগরের পানি মরে আগুনেতে পুড়ি ॥
৩. মার গর্ভে স্বামীর জন্ম, স্ত্রীর জন্ম জলে।
মাঝির পেটে শাস্ত্র জন্ম নানান কথা বলে ॥
৪. মশার পেটে হাতীর জন্ম, বেঙ্গে হাতী খায়।
সেই মশার দুধ দোহাইলে এক শ মণ পায়॥

দশ.
লোকভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা, সাহিত্যবিশারদ যাকে ‘প্রাদেশিক ভাষা’ বলে অভিহিত করেছেন, সে-সম্পর্কেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর ‘ইসলামাবাদ’ গ্রন্থে তিনি বিস্তৃতভাবে চট্টগ্রামের কথ্যভাষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনিই প্রথম চট্টগ্রামের কথ্যবুলির ‘ব্যাকরণ-সূত্র সঙ্কলন’ করেন। গ্রাম্য শব্দ-সংগ্রহ এবং তাঁর অর্থনির্দেশ ও ব্যুৎপত্তি-নির্ণয় তাঁর এই কাজেরই অনুষঙ্গী বিষয়। কথ্যভাষা-সম্পর্কিত তাঁর বিশ্লেষণধর্মী ও উদাহরণযোগে আলোচনা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করে।
সাহিত্যবিশারদের সমগ্র কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল চট্টলভূমি। তাই তাঁর পুথি বা লোকসংস্কৃতির নানা উপকরণ সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্রও ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রাম। বঙ্গদেশের প্রান্তভূমি ‘তালতমালতরুরাজিনীলা শস্য-শ্যামলা … অনন্ত বিস্তৃত বারিধি এবং পর্বতশ্রেণী’-বেষ্টিত এই অঞ্চল সঙ্গত কারণেই তাঁর অধিক, বলা যেতে পারে একমাত্র মনোযোগ পেয়েছিল, তাঁর ঐতিহ্য-অন্বেষার ক্ষেত্র হিসেবে। তাঁর গৌরব ও অহংকারও ছিল এই অঞ্চল নিয়েই। চট্টগ্রামের মানুষ ও প্রকৃতি, জনজীবন ও সংস্কৃতি সাহিত্যবিশারদকে মৃত্তিকাসংলগ্ন করেছে- তারই সূত্রে ও প্রেরণায় ঐতিহ্য-অন্বেষা ও লোকসংস্কৃতিচর্চায় সমর্পিত হয়েছেন তিনি।
সাহিত্যবিশারদের সংগৃহীত লোকসাহিত্যের উপকরণ অনেকেই ব্যবহার করেছেন। ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় (মাঘ-চৈত্র ১৩১২) প্রকাশিত ‘চট্টগ্রামী ছেলে ঠকান ধাঁধা’ ও এর সংযোজনী অবলম্বনে যথাযথ স্বীকৃতিসহ বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ শরৎচন্দ্র রায় (১৮৭১-১৯৪২) ‘Journal of the Anthropological Society of Bombay’ (1917-28)-তে ‘Riddles Current in the District of Chittagong’ শিরোনামে প্রায় ১২ বছর ধরে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধে দীর্ঘ আলোচনা করেন। পরে বিশ্ব-বিশ্রুত লোকতত্ত্ববিদ Archer Taylor তাঁর ‘English Riddles from Oral Tradition’ (1951) সংকলনে শরৎচন্দ্র রায়ের তথ্যোপকরণ ব্যবহার করেন। ঞধুষড়ৎ শরৎচন্দ্রের ঋণ-স্বীকার করলেও সেখানে মূল সংগ্রাহক সাহিত্যবিশারদের স্বীকৃতি অনুপস্থিত।

এগার.
আধুনিক ফোকলোর-চিন্তার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যবিশারদের লোকসাহিত্য-সংগ্রহের গুরুত্ব ও মূল্য অপরিসীম এই কারণে যে, তিনি নিজে এইসব উপকরণ সংগ্রহ করেছেন, তাঁর সংগ্রহের ক্ষেত্র ছিল প্রত্যন্ত পল্লী-অঞ্চল এবং প্রকাশের সময়ে সংগৃহীত উপকরণের মূল বৈশিষ্ট্য ও ভাষা অবিকৃত রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণ, বিশেষত শিশুতোষ ছড়ার তুলনায় সাহিত্যবিশারদের সংগ্রহ অকৃত্রিম, মূল্যবান ও অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বলে ফোকলোর-বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ-সম্পর্কে বিশিষ্ট ফোকলোর-গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য (১৯০৯-১৯৮৪) এই দু’জনের সংগ্রহের তুলনামূলক আলোচনার পরে যে সিদ্ধান্ত করেছেন তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ :
Munshi Abdul Karim Sahitya Visarad himself spoke the dialect from which he made his collections; he knew the country and its people and himself made his collections directly from the villagers’ oral traditions alone. Unlike Tagore’s appointed collectors who had no genuine interest and knowledge of the subject, Munshi Abdul Karim Sahitya Visarad made the collections personally from the remote corners of the villages with genuine interest and being fully aware of the implications and importance of the subject. Therefore, from scientific point of view his collections are more dependable than the collections made by Tagore through the employees of his zamindari estate.

বার.
সাহিত্যবিশারদের পুথিচর্চার বিষয়টি সর্বজনবিদিত এবং তা সুধীজন ও গবেষকদের মনোযোগ লাভ করলেও তাঁর লোকসংস্কৃতিচর্চার প্রসঙ্গ প্রায় অনালোচিতই থেকে গেছে,- ফোকলোরবিদদেরও তেমন দৃষ্টি পড়েনি এদিকে। অথচ বাঙালি মুসলমান সমাজে তিনিই ফোকলোরচর্চার পথিকৃৎ এবং বাংলার ফোকলোরচর্চার ইতিহাসেও তাঁর একটি সম্মানজনক আসন নির্দিষ্ট।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা