বন্ধ হোক বিবেকহীন নৃশংস ছাত্ররাজনীতি

আগের সংবাদ

আমরা জনগণের বন্ধু হতে চাই: আইজিপি

পরের সংবাদ

এ কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৯:০৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৯, ৬:১১ অপরাহ্ণ

রণেশ মৈত্র

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

বিভাগোত্তর এ দেশের রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ যাদের অকুতোভয় সংগ্রাম ও অবদানে সমৃদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে থাকলেও স্বৈরাচার পতনের পরবর্তীকাল থেকে তাদের যে অবক্ষয় ঘটেছে তা দেশে সমগ্র রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলেছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ বা তাদের মতো সংগঠনের অস্তিত্বের কতটুকু প্রয়োজন তাও ভাবা দরকার। জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়াও অপরিহার্য। উল্টো যে পথে হাঁটছে বাংলাদেশ, সেটি বড্ড ক্ষতিকর।

যে মাসটি আমরা অতিক্রম করে এলাম অর্থাৎ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ এবং যে মাসটি আমরা অতিক্রম করছি অক্টোবর তা ভয়ঙ্কর। এই সময়কালে যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি তা কল্পনাতীত সব কল্পনাকে হার মানানো। এক কথায় মারাত্মক ও বীভৎস।
দেখলাম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে (তার নির্দেশ কেন প্রয়োজন তা দুর্বোধ্য) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই দুই শীর্ষ নেতাকে হঠাৎ করেই ওই সংগঠনের নিজ নিজ পদ থেকে পদচ্যুত করা হলো বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির চালানোর অভিযোগে। আবার এটাও দুর্বোধ্য, অমন মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ করা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে আজো কোনো থানায় কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের হলো না বা তারা কেউ গ্রেপ্তারও হলো না। শুধু জানা যায়, তাদের সয়-সম্পত্তি কী আছে না আছে তার খোঁজখবর করা হচ্ছে।
এরপর দিন দুয়েক যেতে না যেতেই প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, ‘ছাত্রলীগের পর এবার যুবলীগকে ধরা হবে।’ আর যায় কোথা? আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৎপর হলো, র‌্যাব অভিযান শুরু করল কয়েকজন যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার হলো। সন্ধান মিলল তাদের আস্তানায় শতাধিক কোটি টাকার বাংলাদেশি মুদ্রা, হাজার হাজার মার্কিন ডলার, আইনি, বেআইনি অস্ত্র, অসংখ্য মদের বোতল ইত্যাদি। আর আবিষ্কার হলো ক্যাসিনোর- যার নাম আমি জীবনে এই প্রথম শুনলাম। ক্যাসিনোতে জুয়া খেলে তারা নাকি দিনে-রাতে কোটি কোটি টাকা আয় করত, যার সবটাই বেআইনি। মানুষ এগুলো দেখে বিস্মিত ও স্তম্ভিত। কীভাবে বিগত দশটি বছর ধরে প্রকাশ্যে দিবাভাগে ও রাত্রিকালে, রীতিমতো সব মহলের জ্ঞাতসারে, এমন অবৈধ কাজ কারবারে বছরের পর বছর ধরে দলে দলে লিপ্ত থাকতে পারল, বিন্দুমাত্র গোপনীয়তা রক্ষা না করলেও তাদের বিরুদ্ধে সামান্যতম আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হলো না।
কারণ যদি এটা হয়ে থাকে যে এর সঙ্গে বহুসংখ্যক রুই-কাতলা জড়িত, বহু মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ কর্মকর্তা এবং অপরাপর নানা প্রভাবশালী মহল জড়িত তা হলে তো বলতেই হয় দুর্বলরা অপরাধ করলে শাস্তি পাবে- সবলরা নয়। দেশবাসী নিশ্চিতভাবে দেখতে চান আমাদের পেনাল কোডের কত নম্বর ধারায় এমন বৈষম্যমূলকভাবে আইনের ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া আছে। নতুবা ওইসব প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া হোক। আর যদি তেমন কোনো বৈষম্যমূলকভাবে আইনের ব্যবহার করার কোনো বিধান পেনাল কোডে না থেকে থাকে এবং পেনাল কোডের অবশ্য পালনীয়। অবাক বিস্ময়ে দেখা গেল কুখ্যাত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটের বিস্তর অপরাধের খবর নানা সূত্র থেকে সংগ্রহ করে সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিলই না। তার হদিস সম্পর্কে কোনো তথ্যও জানা যাচ্ছিল না। সবাই ভাবছিলেন সম্রাট হয়তো কোন ফাঁকে দেশ থেকে অন্য কোথাও পালিয়ে গেছে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে। এমন সময় হঠাৎই পাওয়া গেল তার গ্রেপ্তারের খবর, তাও প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর শেষে দেশে ফেরার দিন কয়েক পর। অনুমান করতে আদৌ কোনো কষ্ট হয় না যে, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করার সাহস কেউ পাননি। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং বলেছিলেন যে, ‘সম্রাট গোয়েন্দা নজরদারিতে আছে।’ যদি তাই হয় তবে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ গ্রেপ্তার করা হলো না কেন? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সঙ্গত প্রশ্নটির জবাব না দিয়ে নিশ্চুপ থাকতে পারে না।
সম্রাটকে ধরা হলো কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক জামায়াতে ইসলামীর নেতার বাড়ি থেকে মস্ত বড় এক অভিযান চালিয়ে সম্রাটের সব অপকর্মের এক সহযোগী আরমানসহ। যুবলীগ নেতা আশ্রয় নেন এক জামায়াতে ইসলামীর নেতার বাড়িতে। সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত ভেবে আবার জামায়াত নেতাও যুবলীগ নেতাদের আশ্রয় দেন, নিরাপত্তা দেন, নিশ্চিতই বিপুল পরিমাণ প্রাপ্তিযোগের কল্যাণে। এতে বুঝি ওই জামায়াত নেতার যথেষ্ট ‘সওয়াব’ও হয়।
আবার যুবলীগ নেতারা- যারা দিবারাত্র ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক’ বলে গলা ফাটাতে কসুর করেন না তারা দিব্যি জামায়াত নেতার বাড়িতে এভাবে বঙ্গবন্ধুর সুমহান আদর্শের প্রতি ইচ্ছাকৃত অবমাননা এবং তার দ্বারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা আর কত? তথ্য হলো, এই সম্রাটই আওয়ামী লীগ, যুবলীগের বড় বড় সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর নামে ও জয় বাংলা বলে স্লোগান দিয়ে লাখো লোক সরবরাহ করে নেতাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সেভাবেই যুবলীগ নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। কী কলঙ্কজনক ঘটনাবলিই না ঘটছে এবং প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে মানুষকে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটল বুয়েটে। ভয়াবহ নৃশংস ঘটনাই বটে এবং তা ঘটাল ছাত্রলীগ নেতারা। এ ব্যাপারে একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র তাদের ৮ অক্টোবরে প্রকাশিত সংখ্যায় লিখেছে- কোনো কিছুতেই থামছে না ছাত্রলীগ, চাঁদাবাজি আর নির্মাণকাজ থেকে কমিশন।
বেআইনিভাবে চাঁদার দাবিসহ নানা অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে বাদ দেয়া হয়েছে। ক্যাসিনো, জুয়া আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে যুবলীগ, কৃষকলীগসহ অন্য সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
প্রায় ১১ বছর ধরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা টেন্ডারবাজির কারণে। গত রবিবার রাতে একইভাবে মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যা করে আবারো শিরোনামে এলো ছাত্রলীগ। ভালো কাজের জন্য ছাত্রলীগ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে এমন নজির নিকট অতীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির অতীতকালের সংগ্রামের বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বহুল প্রচারিত ওই পত্রিকাটিকে বলেন, ফেসবুকে কোনো একটা মত প্রকাশের কারণে বুয়েটের একজন শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হয়ে থাকলে তা খুবই হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তা হলে আর কী বাকি থাকল? তার মতে ছাত্রলীগ এখন যা করছে এটা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি কাজ থেকে কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যদের দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হচ্ছে অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িতরা নৃশসংতা করছে। আমরা তো অন্ধকারেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। এভাবে তো চলতে পারে না।
আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ। প্রকাশ্যেই তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অনুষ্ঠানে তাদের সতর্ক করেছেন। কিন্তু ছাত্রলীগ ও যুবলীগের এই জাতীয় কর্মকাণ্ড তাদের বন্ধ হয়নি। ২০০৯ সালে এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কয়েকটি নিষ্ঠুর ও নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের নাম। এক হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ৩৯ জন। আর এই সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কাজে ছাত্রলীগকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও বারবার তাদের ন্যায্য আন্দোলনে হামলা চালিয়েছে সংগঠনটির কর্মীরা। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে পরিচালিত জনপ্রিয় আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করার অসংখ্য অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি নুরুল হকের ওপর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত সাতবার হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। আরো অসংখ্য অভিযোগ তথ্য-প্রমাণসহ হাজির করা যায় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। মূল দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুযোগে ছাত্রলীগ ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তারা নানা অপকর্ম করছে। তারা আসলে ছাত্রলীগ কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কেমন ধরনের ছাত্র-যুব-কৃষক সংগঠন, কেমন ধরনের সহযোগী বা অঙ্গ সংগঠনের প্রয়োজন দেশের রাজনীতির স্বার্থে, এ ভাবনাকে উপেক্ষা করার আর সময় নেই। ইতোমধ্যেই অনেক বিলম্ব ঘটে গেছে।
বিভাগোত্তর এ দেশের রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ যাদের অকুতোভয় সংগ্রাম ও অবদানে সমৃদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে থাকলেও স্বৈরাচার পতনের পরবর্তীকাল থেকে তাদের যে অবক্ষয় ঘটেছে তা দেশে সমগ্র রাজনীতিকে কলুষিত করে ফেলেছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ বা তাদের মতো সংগঠনের অস্তিত্বের কতটুকু কীভাবে প্রয়োজন তাও ভাবা দরকার। জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়াও অপরিহার্য। উল্টোপথ যে পথে হাঁটছে বাংলাদেশ, সেটি বড্ড ক্ষতিকর।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।