সাময়িকী

অচেনা আলোকের অন্বেষণ

আগের সংবাদ

ঋণের বোঝা বইতে পারছিলেন না বায়েজিদ...

পরের সংবাদ

অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতার কথাও বলছে- ‘লঙ্কাবি যাত্রা’

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৬:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৯, ৬:৪৯ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

কবি ‘মজিদ মাহমুদ’ই প্রতিটি কবিতার জন্য আলাদা পথ তৈরি করে দিয়েছেন। দেবেনই-বা না কেন! তিনি তো প্রতি মুহূর্তেই ভাঙছেন নিজেকে।

কবি ‘মজিদ মাহমুদ’র কবিতা নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। ‘মজিদ মাহমুদ’ চলমান সময়ে চলন্ত এক ট্রেন। নতুন কোনো সড়কে নতুন কোনো যানবাহন তিনি নন, নন তিনি নতুন কোনো চালক। পুরনো সড়কে, পুরনো বাহন তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন কৌশলে। এক সড়ক থেকে অন্য সড়কে উঠিয়ে দিচ্ছেন অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞান। কবি ‘মজিদ মাহমুদ’র ড্রাইভিং নিয়ে কারো কোনো কথা আছে বলেও মনে হয় না। ব্যক্তি ‘মজিদ মাহমুদ’কে নিয়ে ব্যক্তি বিশেষের বলার থাকতে পারে, কবি ‘মজিদ মাহমুদ’কে নিয়ে বলার বা কোনো ছবি আঁকার ব্যর্থ চেষ্টা করাটা মায়ের কাছে মামা-বাড়ির গল্পের মতো শোনাবে। কেননা, কবি ‘মজিদ মাহমুদ’ এমন একটি নাম যা নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অথবা তার কবিতা সম্পর্কে নতুন করে নতুন ভাবভঙ্গিমায় বলার অধিক সুযোগ কম- তিনি প্রতিষ্ঠিত, সফল ও পরিশ্রমী এমন এক কবিতাচাষি যিনি ইতোমধ্যেই সবার অধিত। এখন তিনি নতুন নতুন কৌশলে তার কবিতার গাড়িটি উঠিয়ে দিচ্ছেন মাত্র সড়কে, আর আমরা তার ড্রাইভিং দেখছি; দেখি আর খুঁজি গতকালের চেয়ে আজকের চালনায় নতুন কী আছে। নতুন নিয়ে কথা বলা বা আলোচনা ছাড়া ‘মজিদ মাহমুদ’ নিয়ে, তার কাব্যচর্চা বা কব্য নিয়ে বলার অবকাশ নেই বা প্রয়োজনও নেই।
কবি ‘মজিদ মাহমুদ’র একটি নতুন কবিতার বই ‘লঙ্কাবি যাত্রা’। প্রকাশ-২০১৯ইং ফেব্রুয়ারি। বইটি হাতে এসেছে কয়েক হাত ঘুরে। পূর্ববর্তী পাঠকদের কয়েকজন জানালেন তাদের ভালোলাগার কথা। সে কথা কানে নেইনি। মানুষের মত, পথ, রুচি, স্বাদ ও ইচ্ছার ধরন ভিন্ন। একেক জনের ভালোলাগা, মন্দলাগা ভিন্ন। ভিন্ন বলেই একজনের কাছে যা খাদ্য, অন্যজনের কাছে তা অখাদ্য। কথায় যেমন বলে, এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি, তেমন। নিজের স্বাদ নিজে চেখে দেখার ইচ্ছায় নতুন খাদ্য নিয়ে বসি। অনেক সময় না লাগলেও একবার পাঠে কিছুই বুঝা হলো না (এটা আমার ব্যক্তিগত দোষ হতে পারে, সাধারণত কবিতার পাণ্ডুলিপি একবার পড়ে কিছুই বুঝি না। পড়তে হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার)। এবারো ব্যতিক্রম হলো না। দ্বিতীয়বার পড়তে বসলাম। মনে হতে লাগলো প্রথমবারের ব্যর্থতা। চোখের সামনে থেকে একে একে যেন উড়ে যাচ্ছিল ছোট ছোট বস্তুবাদের উপাদানগুলো। যেন ডুবে যাচ্ছিলাম ভাববাদের ধাঁধার ভেতর আর ফুটতে দেখছিলাম উদয়-অস্তের সহস্র গলি ডিঙিয়ে ভ্রƒণকাল থেকে পূর্ণ বয়সপ্রাপ্ত হওয়া এক কবির কবিতা বর্ণনার অমৃত কোরকগুলো। এক একটি কবিতা যেন এক একটি তরুর আত্মজীবনী; অঙ্কিত শব্দ-সমষ্টির বয়ানে। কবিতার ভাষা, চিত্র, ভাব, ছবি কবি বসিয়েছেন আপন জগতের আপন গুন-ভাগের প্রাপ্ত ফলাফলের নিরিখে। সেই বসানোটি কবির স্বেচ্ছাচারিতা নয়, নিয়মের সীমারেখায় থেকে নিজের পারঙ্গমতা প্রদর্শন আর আত্মোপলব্ধিকে ভাগ করে দেয়া হয়েছে সমাজ-সংসারের হাজার বর্ণের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে। পাঠক মাত্রই জানেন, ‘মজিদ মাহমুদ’ বাস্তব ও পরাবাস্তবের এক কঠিন আরক। সহজ, সরল, সস্তা আবেগের নিমিত্তে তিনি নির্মিত করেন না কোনো নিষ্ঠুরতা। পোড়খাওয়া সত্যাভাবের কাঠ-কয়লা নিংড়ে তিনি সবসময়ই কবিতায় তুলে আনেন সেই উপাদান যা গণমানুষের চোখ এড়িয়ে যায় অথবা গণমানুষের কণ্ঠে চুপ খেয়ে থাকে; হোক সে রাজনীতি, হোক সে প্রকৃতি, হোক সে চিরায়ত প্রেম বা অনশ্বর ভালোবাসা। নৈঃশব্দ্যকেই তিনি রূপ দেন শব্দে, অব্যক্ত কথাকেই তিনি ব্যক্ত করেন উচ্চারণে, সাহসে। ‘লঙ্কাবি যাত্রা’ বইটিতে তার চির স্বভাবের ছাপ পাওয়া যায়। এই কাব্যগ্রন্থটিতে তিনি গতানুগতিক বিষয়ের উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে বলতে চেয়েছেন ঘর, সংসার, সমাজ আর রাষ্ট্রের কথা। বলতে চেয়েছেন নিজের কথা, স্মৃতির কথা। বলতে চেয়েছেন ঢাকনার নিচে ঢেকে থাকা সাদা, ধূসর ঘাসের কথা।
অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতার কথাও তিনি বলতে চেয়েছেন তার এই গ্রন্থস্থ কোনো কোনো কবিতায়। কোনো একটি কবিতার কোনো একটি ইঙ্গিতের সাথে কোনো একটি কবিতা ধাক্কা খায় না, যার যার বাঁয়ে চলে নিজস্ব খেয়ালে। কবি ‘মজিদ মাহমুদ’ই প্রতিটি কবিতার জন্য আলাদা পথ তৈরি করে দিয়েছন। দেবেনই-বা না কেন! তিনি তো প্রতি মুহূর্তেই ভাঙছেন নিজেকে। প্রতিটি মুহূর্তেই পৃথিবীর পাঠশালা থেকে আহরণ করছেন যোগ-বিয়োগের রেণু, তা দিয়ে মগজ পরিশুদ্ধ করে দৃষ্টির কথা টুকে রাখছেন মলাট ভাঁজে। কবি ‘মজিদ মাহমুদ’ কবিতা লেখেন দায় থেকে। নাম, সুনাম বা কবি হওয়ার জন্য নয়; সমাজের, পৃথিবীর সন্তান হিসেবে পৃথিবীর প্রতি, তার চারপাশের সমাজ, সংস্কারের প্রতি দায়িত্ব থেকে তিনি তার কথাগুলো লিখে রাখেন শব্দের অক্ষরে। যেন পরের কেউ অথবা পূর্বের কেউ চাইলেই আলোচনা করতে পারেন, মত বা বিমত দেখাতে পারেন অথবা তার শব্দসমগ্র থেকে অনুধাবন করতে পারেন সময়কে। পূর্বকে, পরকে। কবি সমাজের দর্পণ, কবিতা তার প্রতিবিম্ব- ‘মজিদ মাহমুদ’কে নিয়ে জ্যেষ্ঠজন কবি ‘নূরুল হুদা’ এই ‘লঙ্কাবি যাত্রা’ গ্রন্থের মুখবন্ধে বলেছেন- ‘মজিদ মাহমুদ’ সচেতনভাবে কাব্যচর্চা করছেন। এই সচেতনতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর বা প্রকাশভঙ্গি নির্মাণ করতে পেরেছেন। সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, কবিতায় ‘মজিদ মাহমুদ’ আমাদের অভিজ্ঞতার বৃত্তের বাইরে একটা অচেনা জগৎকে যেন নতুন করে চিনিয়ে দিতে চাইছেন, উসকে দিচ্ছেন নতুনতর ভাবনা, যাপিত জীবন থেকে তুলে আনছেন এই মুহূর্তের সময়-সংকট, ঘৃণ্য রাজনীতি, সম্পর্কের বৈষম্য, অমানবিক যুদ্ধের বাতাবরণ, অসহায় প্রাণের আর্তি। ‘লঙ্কাবি যাত্রা’য় কথাগুলোর সাক্ষ্য স্পষ্ট। মানুষ, জীবন, সৃষ্টি, প্রকৃতি নিয়ে আমাদের জন্ম ও মৃত্যু; এর মধ্যে সংকট উত্তরণ, এর এপিঠ ওপিঠ নিয়েই একটা জীবন কাটিয়ে দেয়া- এই জীবন পারাপারে সচেতন ‘মজিদ মাহমুদ’ এঁকে চলছেন নদী ও সাঁকো। যারা ‘মজিদ মাহমুদ’-এ নেমেছেন, একরোখা হয়ে দেখছেন, তারা দেখেছেন ‘মজিদ মাহমুদ’ তাদের কাছে কতটা সহজ; তার কবিতা সাধকের নির্দেশ মতো, মুক্তির দর্শন মতো, পিঁপড়ার পূর্বাভাস মতো। যদিও বিরামচিহ্নহীন কিছু কবিতার ভাব ও ভাবার্থ ধরতে বেশ ভাবতে হয় তথাপি নতুন এই কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি কবিতা পাঠককে একটা ভাবের ঘোরের ভেতর ঘুরপাক দিয়ে বহু প্রশ্নের সমাধান শেষে বোধের মজমাকে মজবুত করবে বলে ধারণা। পড়া যাক ‘লঙ্কাবি যাত্রা’ গ্রন্থটির ১টি কবিতার অংশ-
‘আমি এখনো কিছুটা ধরে রেখেছি/ এখনো পুরোটা ভেঙ্গে পড়তে দিইনি/ আমার পানাহার ঠিক-ঠাক চলছে/ বন্ধুরা আসছে, আড্ডা দিচ্ছে/ অফিসের কলিগরা দেখছে সব ঠিক/ তবু আমি জানি এক প্রাণঘাতী রোগ/ আমার মধ্যে বাসা বাঁধছে/ কেউ বাইরে থেকে এখনো তা দেখতে পাচ্ছে না/ তবু কিছুটা মনোযোগের অভাব রয়েছে নিশ্চয়/ বুকের বাম পাশটায় কেমন যেন চিনচিন ব্যথা/ আমি এখন জানি-/ নিয়মিত শিরোপীড়ার কারণ/ আমি যদিও জানি এ রোগের প্রতিকার/ তবু এ চিকিৎসা ব্যয়বহুল/ হয়তো কিছুটা আমার সাধ্যের অতীত/ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কিংবা সাধারণ ডাক্তার/ জানি না তারা কি-ই বা করতে পারবেন/ তবু চিকিৎসার দরকার আছে… (অংশবিশেষ, কবিতা : আমি এখনো)।
রঙিন মোড়ক, প্রলোভিত বাজারজাতকরণ চক্রান্ত আর প্রকাশমুখর স্খলিত ভঙ্গুর সময়ে শুদ্ধ চেষ্টার এই কাব্যগ্রন্থটি পৌঁছুক শুদ্ধ পাঠকের হাতে, সে কামনায় শুভকামনা ‘লঙ্কাবি যাত্রা’র প্রতি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা