গুরুতর অসুস্থ অভিনেতা হুমায়ুন সাধু

আগের সংবাদ

অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতার কথাও বলছে- ‘লঙ্কাবি যাত্রা’

পরের সংবাদ

অচেনা আলোকের অন্বেষণ

মহীবুল আজিজ

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৯ , ৬:৪৩ অপরাহ্ণ

মনে হতে পারে এটা আত্মজীবনী কিংবা ডায়েরি অথবা উপন্যাস। আমরা একে উপন্যাসই বলতে চাই- অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী। উপন্যাসের উপাদান হতে পারে আত্মজীবনী- অথবা মনে হবে যে আত্মজৈবনিক ঢংয়েই লেখা সেটি। আবার, ডায়েরির আঙ্গিকে লেখা বলে এটিকে সরাসরি দৈনন্দিনতার বাস্তব থেকে তুলে আনা বলে প্রতিভাত হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ঔপন্যাসিক যখন ঘটা করে বা আয়োজন করে তাঁর বক্তব্যে নিহিত থাকা মানুষজনকে চরিত্রে গড়ন দিতে তত আগ্রহী হ’ন না। তাঁর কথকতার মধ্য দিয়েই চরিত্রগুলো তৈরি হয়ে যায়- মানে যতটা হওয়া দরকার ঠিক ততটাই, তার কমও না বেশিও না। কাহিনীতে যে খুব মসলাদার জমাটি ভাব আছে তাও না, কিন্তু এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠ করে যাওয়া যাবে। অন্যভাবে বলা যায় উপন্যাসের আয়োজন না করেই আকিমুন রহমান তাঁর এই বৃত্তান্তটিকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এখন এটিকে আমরা উপন্যাস বলি কিংবা না বলি তাতে তাঁর বা তাঁর গ্রন্থটির কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। আমি বরং এমনভাবে লিখবার জন্যে তাঁকে জানাই অভিনন্দন।
তবে কোনো পাঠক যদি এটিকে আত্মজীবনী, ডায়েরি এবং বর্ণনের সমন্বয়ে গড়া এক ধরনের সাহিত্যকর্ম হিসেবে দেখতে চায়, তাকে দোষ দেয়া যাবে না। এটুকু বলবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো, আকিমুনের কথকতায় সায়েন্স ফিকশনের খানিকটা স্পর্শও কি নেই! হ্যাঁ, সে-ফিকশন বিজ্ঞানের সূত্র-তাত্ত্বিকতা কি প্রায়োগিকতার ভারে আক্রান্ত নয়, তবু তাতে বিজ্ঞান-অতিরেক এক জ্ঞানের বিদ্যমানতা আছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আছে এক অনিঃশেষ রক্তক্ষরণ। কথকতার শেষ হয়ে গেলেও সেই ক্ষরণের শেষ হয় না। প্রথম থেকে যাকে আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটি বলে মনে হয়, মাটির পৃথিবীর সমান্তরাল এক ‘প্রক্সিমা ওয়ান’ জগতের কল্পনাও আমাদের ছিন্ন করতে পারে না দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা-সন্ত্রাস-নিরানন্দে ভরা বৃত্তের সংযোগ। আলোকুমার আসে এক অচিন ভুবন থেকে, নাকি সে চেনা-ই কিন্তু তার পৃথিবীটা ‘অচিন’। এই ধূলিমাটিময় সোঁদা গন্ধময় ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ পরিপ্রেক্ষিত থেকে উদ্গত প্রাণ এক অনুপম অস্তিত্বে পরিণত হয়ে শেষে ‘অচিন’ হয়ে উঠতে পারে না! বলতে ইচ্ছে করে আকিমুনের আলোকুমার যেন তা-ই। হয়তো এ-পৃথিবী বার-বার তাকে পায় না, পায় শত-হাজার বছরের ব্যবধানে একেকবার। সেজন্যেই সে রূপকথার নায়কের স্মারক- যেন পৃথিবীতে সে আগন্তুক, যেন পৃথিবীতে সে বেমানান। পৃথিবীটা আসলে কাদের- আকিমুনের বৃত্তান্ত পড়লে মনে হবে, মানুষ নামের অতি সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকা এক জীববিদ্যাগত সত্তা সে। সেই আটক থেকে তার বা অজস্র তাদের বেরোবার প্রণোদনাও দুর্লক্ষ্য। যদিবা সেই আটককে অস্বীকার করে ঘটনার বিপরীতে কেউ দুর্ঘটনা হয়ে যায় তাদের দিকে আগন্তুকের দৃষ্টি মেলে তাকায় আটকের মধ্যে পড়ে থাকা মানুষেরা। সেরকম এক নায়ক আকিমুনের আলোকুমার। কিন্তু যাকে তিনি নগণ্য মানবী বলতে চান তাকে আমরা বলবো আলোকুমারী- অন্তত তাঁর উপন্যাসের (এখন আমরা এটিকে সুবিধের জন্যে উপন্যাসই বলি) অচেনা আলোকুমারের চেতনা থেকে ছিটকে আসা রশ্মিপাতে উপন্যাসের নায়িকা মরিয়ম হুসনা জাহানকে আর নগণ্য বলে বিবেচনা করা যাবে না। এই ক্লিষ্ট জীবনের চিরচেনা বা আটপৌরে পরিধির মধ্যে থেকেই সে হুসনা জাহান তাঁর সমস্ত রক্তক্ষরণ নিয়েই আলোকের বিন্দুতে পরিণত।
উপন্যাসে ব্যক্ত কাহিনীটি নিতান্তই সাদামাঠা, কাহিনীঘেরা আবর্তনটি সাদামাঠা নয়। জিজ্ঞাসা, দার্শনিকতা, সংশয়, সামাজিক-রাষ্ট্রিক বৈরী পরিস্থিতি, ব্যক্তি অবস্থান এবং সর্বোপরি সামাজিক সংখ্যালঘুরও সংখ্যালঘু যাকে বলে, মানে নারী, তার অবস্থান এইসব নানা বিষয় ও বিষয়-বিশ্লেষণ আকিমুন রহমানের জীবনচিত্রটিকে প্রচলিত উপন্যাসের চাইতে অন্যবিধ করে তুলেছে। বলেছি, এর নায়িকা আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটি। রোজ তাকে দেখা যায়, কিন্তু আমরা তাকে দেখি হয়তোবা পুরুষচক্ষু দিয়ে। সে ব্যক্তি হয়ে ওঠে না প্রথাগত দৃষ্টিতে। অথচ এই দেশ, দেশের পরিবার সমাজ রাষ্ট্র সর্বত্র এদের নিয়ে কথাবার্তার শেষ নেই। এত কথার পরেও ধরা যাক মরিয়ম হুসনা জাহানের কথাই বলি- তিনি তাঁর অন্তরে জমে থাকা কথাগুলো প্রকাশ করতে পারছেন না। বলবেন কাকে? সেরকম পুরুষ দুর্লভ, এমনকি নিকটের নারীও তাঁর সামনে শত্রুত্বের দেয়াল খাড়া করে রাখে। তাই, তাঁর কথাই শোনা যাক- ‘নিজের কথাগুলা তো এই খাতার কাছে বলা ছাড়া- আমার বলার আর কোনো জায়গা নাই! তাই খাতাটাকেই জানায়ে রাখছি আমার মনের অবস্থাটা।’ ১৯৯৫ সালের ১৬ এপ্রিল এ কথা ডায়েরির পাতায় লেখা হয়। এর ঠিক দুই যুগ পরে আজ সকালেও যদি একই কথা কেউ লেখে, লেখে এমনই অপ্রকাশ্য বেদনা নিয়ে, সেই ব্যক্ততাকে অসঙ্গত মনে হবে না।

অচিন আলোকুমার ও নগণ্য মানবী উপন্যাসের মূল চরিত্র হুসনা বা হেনা এবং তার বেড়ে ওঠার ইতিহাস তার নিজেরই সচেতন চোখে আমরা পরখ করি। তার জীবনকাহিনীটি হয়তো এই বাংলার বহু পরিবারের কাহিনী, অর্থাৎ এটি পরিচিত প্রতিনিধিত্বের গল্প। আইএ পাস করতে না করতেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায় এক প্রবাসী ‘ম্যাট্রিক ফেল’-এর সঙ্গে। বিয়ে হয়ে যায় কিন্তু মেয়েটিকে থাকতে হয় পিতৃপরিবারে। একদিন স্বামীটি বিদেশ থেকে এলে তবেই তাকে তুলে নেয়া হবে শ্বশুরালয়ে। যেহেতু বিয়ে সারা এবং স্বামীটি ‘ম্যাট্রিক ফেল’ সেহেতু হুসনা এমনিতেই বাড়তি যোগ্যতাসম্পন্ন, তার আর লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই। পরিবার এবং সমাজের রেখাটা ঠিক এই বিন্দুটিতে প্রগাঢ়ভাবে টেনে দেয়া হয়। আর এখান থেকেই আরম্ভ হতে থাকে একটি ব্যক্তিক রেখা, সে-রেখা আঁকেন ‘নগণ্য’ হুসনা জাহান। সেটি তাঁকে আঁকতে হয় নিজের প্রয়োজনে, নিজের অস্তিত্বের অর্থবহতার প্রয়োজনে। ফলে, তাঁকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করতে হয় দীর্ঘকালের বিদ্যমানতাকে। তা না করলে তাঁর জীবন স্থির-বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয় কিন্তু তাঁর চোখে স্বপ্ন, যে-স্বপ্ন সমুদ্রের। সেই স্বপ্ন আপনা থেকে এসে ধরা দেয় না, তার জন্যে প্রয়োজন পড়ে সংগ্রামের- হুসনা জাহান সংগ্রামী হয়ে ওঠেন। এটি তাঁর অন্তঃক্ষরণ ও সংগ্রামের কাহিনী। সব সংগ্রামেরই যেমন কোনো না কোনো অনুপ্রেরণা থাকে, হুসনারও থাকে সেরকম। তা না থাকলেও সম্পূর্ণ আত্মচেতন নারীটিকে আমরা আমাদের প্রচলিত প্রতিবেশিত্বের মধ্য থেকে আচমকা ঋজুত্ব নিয়ে ছিটকে আসা আলোকরেখা রূপে চিনে নিতাম নিশ্চয়ই। হুসনার পিতা আবদুল আলী ক্যান্সার-রোগী, তিনি মারাও যান কিন্তু তিনিই আত্মজার সংগ্রামের আগুনে প্রথম দেশলাইটি ঠুকে দিয়ে যান। স্বামীপক্ষ যেখানে স্ত্রীর উচ্চশিক্ষার ঘোরবিরোধী সেখানে কন্যাকে তিনি স্ব-উদ্যোগে ভর্তি করান ঢাকা শহরের নামকরা নারীশিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ইডেন গার্লস কলেজে বাংলা অনার্সে। হয়তো আবদুল আলীকেও আপস করতে হয় খানিকটা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সহশিক্ষার সেরা কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করান না।
সব উপন্যাসের নায়ককেই সংগ্রাম করতে হয়। অন্যভাবে বলা যায়, সংগ্রাম ব্যতিরেকে উপন্যাসের নায়ক হওয়া মুশকিল। সেই সপ্তদশ শতাব্দীর দোন কিহোতে কি উনিশ শতকের আঁতোয়াঁ কিংবা বাঙালি গোবিন্দলাল কি পূর্ববাংলার মুহাম্মদ মুস্তাফা যার কথাই বলি না কেন সংগ্রাম অনিবার্য। হ্যাঁ, হুসনা নায়ক-ই- নাম তাঁর নারীবাচক হলেও। গোটা কাহিনীটি তাঁর দ্বিবিধ সংগ্রামের চিত্র ও ভাষ্য- একটি তাঁর অভ্যন্তরীণ জীবনের এবং অন্যটি তাঁর বহিঃজীবনের। পারিবারিক জীবনে হুসনা রুদ্ধতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ। নিজেরই অগ্রজ ‘দাদাভাই’-এর গঞ্জনা আর অবহেলার শিকার। একই সঙ্গে দাদাভাই-স্ত্রী ভাবির গার্হস্থ্য সন্ত্রাসের শিকার হুসনা এ দেশের অসংখ্য নারীর নির্যাতনক্লিন্ন সত্তার প্রতিনিধি। বাংলায় অনার্স পড়াটা ছিল তার সংগ্রামের প্রাথমিক প্রতীক।
অস্তিত্বের জটিলতা, সত্তার অবরুদ্ধতা ও আত্মমুক্তি আকিমুন রহমানের উপন্যাসটির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। নায়িকার পরিপার্শ্ব হতাশাপ্রদ এবং বর্তমানতার চাপে তার সত্তা সংকুচিত। যেসব উপায় ব্যক্তিকে সমুখগামী করে, ব্যক্তিকে এমন অনুভব দেয় যে সে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যে যত ক্ষুদ্রই হোক এক প্রয়োজনীয় উপাদান, সেসব উপায় উপন্যাসের নায়িকার অর্জিত কিন্তু অদ্ভুত এক বর্তমান তার- সমস্ত অর্জনের বিনিময়ে এক নিরর্থক গন্তব্য যাকে শূন্যই বলা যাবে, তার জন্যে প্রতীক্ষা করে। অথবা হয়তো শূন্যও নয়, কী যে সেটা তা-ও অজানা। তাই পিতা-চরিত্র হুসনার আশ্রয়। পিতা ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করলেও পিতার সংযোগটি হারাতে রাজি নয় হুসনা। কেননা, একমাত্র পিতাই (পূর্বপ্রজন্মের প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও) তার প্রকারান্তরে মানবসত্তার অর্থবহতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিল। আর তার প্রবাসী স্বামী এবং তার পক্ষের লোকেরা বর্তমানের প্রতিনিধি হয়েও রক্ষণশীলতার নিগড়বন্দি। এরকম দ্বন্দ্ব, বলে না দিলেও টের পাওয়া যাবে। হুসনা স্বয়ং আলোকের অনুসারী এবং আলোকের খানিকটা সন্ধান সে পেয়েছেও, যদিও ভবিতব্যের অবলম্বন মানে বিবাহসূত্রে তার যে নতুন জগতের বাসিন্দা হওয়ার কথা সেটা আসলে তার অন্ধকারে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি। সেটা হুসনা বোঝে এবং বুঝতে পারে বলেই সে সংগ্রামী হওয়ার প্রথম শর্ত পূরণ করে এবং বাস্তবে যা হয় পরিপার্শ্বে সহায়ক অবলম্বন নাগালের মধ্যে থাকে না। ফলে, হুসনার অন্তর্জগতে চলে সমস্ত উথাল-পাতাল। সেটা টের পাই আমরা পাঠক হিসেবে। আমরা দেখি, হুসনার সত্তায় অস্বীকৃতি, প্রত্যাখ্যান, বিতৃষ্ণা, ক্ষোভ এবং বিদ্রোহ এসব কিছুর জন্ম নিচ্ছে। এগুলোর অধিকাংশই জীবনবিরোধী নয় কিন্তু তার জন্যে সবচাইতে নেতিবাচক হলো তারই অন্তর্গত হতাশা। নিজের নির্ণয়-অসম্ভব অসুস্থতাকে তার কাছে মনে হয় ক্যান্সার, যে-রোগে তার পূর্বসূরি পিতার মৃত্যু ঘটেছে। এমনকি একপর্যায়ে এই কর্কট রোগটাকেই হুসনার কাছে মনে হয় আশীর্বাদ। এই মনে হওয়ার কারণ তার পিতার প্রতি ভালোবাসা। আবার এই রোগটা হতে পারে (নিশ্চিত মৃত্যুর কারণহেতু) হুসনার হতাশা থেকে বর্তমানের দুর্বিষহতা থেকে মুক্তির একটি পথ। অস্তিত্ববাদী উপন্যাসগুলোতে যে-বিবমিষার প্রভাব দেখি সেটা আকিমুনের এ-উপন্যাসে আছে। সার্ত্র, বেকেট কিংবা সিমঁ প্রমুখের উপন্যাসে আমরা দেখবো, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মধ্যে একটা স্থায়ী দুরারোগ্য অস্বস্তি সৃষ্টি হয় যা কিনা বর্তমানকে প্রত্যাখ্যান বা বর্তমানকে সইতে না পারার বহিঃপ্রতিক্রিয়া। হুসনার মধ্যে সেটি আসে প্রবল প্রদাহ হয়ে। তার দেহের চামড়ার অবিরাম প্রদাহ, রক্তিমাভা ধারণ এগুলো তার প্রত্যাখ্যান-ঘৃণা-বিতৃষ্ণার প্রতিক্রিয়া। আবার, সমস্ত হতাশার মধ্যে থাকে সুসংবাদও।