সম্রাটের উত্থান: পরশুরাম থেকে ক্যাসিনো

আগের সংবাদ

সম্রাটের সহযোগী আরমান হাইব্রিড!

পরের সংবাদ

৫৪ বছরের অপেক্ষার অবসান কতদূর

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৬, ২০১৯ , ১২:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১২:১৬ অপরাহ্ণ

Avatar

ছয় দফা সংশোধনের পরও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়নে বাধা কাটছে না। এর জন্য দায়ী ভ‚মি মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি। এ ছাড়া ঘুষবাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), এসিল্যান্ড এবং তহসিলদার চক্র এই সমস্যা জিইয়ে রাখছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ৫৪ বছর ধরে আইনটি নিয়ে খেলছে সরকার। লিজ নেয়ার নামে যারা এই সম্পত্তি ভোগ করছেন তারা বেশির ভাগই রাজনৈতিক সুবিধাভোগী। ফলে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একে তো মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি, তার উপর রায় বাস্তবায়নে আরো ধীরগতি তাদের হতাশ করছে। আদতে তারা সেই সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই মামলা নিয়ে সরকার পক্ষের আইনজীবীর কোনো আগ্রহ নেই। কারণ এখানে আর্থিক লেনদেন নেই। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে সরকার পক্ষের আইনজীবীকে টাকা দিয়ে মামলার তারিখ নিতে হয়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রত্যর্পণযোগ্য অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ সোয়া দুই লাখ একরের মতো। এগুলো প্রত্যার্পণের জন্য বিভিন্ন আদালতে আবেদন পড়েছে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখের মতো। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গড়ে দুই থেকে তিন শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হতো। নির্বাচনের পর ১৯টি জেলার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিষ্পত্তির এই হার বেড়ে হয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে এই হার খুবই কম। এই হার পাঁচ থেকে সাত শতাংশ।

এই হার যে খুবই কম এ তথ্য উঠে এসেছে এডভোকেট মানিক কুমার মজুমদারের ফরিদপুর জেলার ক তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার মোট আটটি উপজেলার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে উপজেলা ওয়ারি আবেদন দায়ের হয় সদরে ৭৭, মধুখালীতে ৪৪৬, আলমডাঙ্গায় ১৪৫, বোয়ালমারীতে ৩৬০ এবং ভাঙ্গা সালথা নগরকান্দা ও সদরপুরের ৮২৩টি। সর্বমোট ২ হাজার ৫৫১টি। এরমধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায় হয়েছে মোট ৪৬১টি। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩২৮টি আপিলের মধ্যে সরকার পক্ষে দায়ের হয়েছে ১৯২টি এবং ভুক্তভোগীরা করেছে ১৩৬টি।

আপিল ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন কারণে খারিজ হওয়া ২২১ টিসহ মোট নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬১টি। আবেদনের আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী রায় বাস্তবায়ন হয়েছে ৩২টি। তবে নামজারিতে ভোগান্তি ছিল দুর্বিষহ ও অবর্ণনীয়। এই গতিতে চলতে থাকলে শুধু ফরিদপুর জেলার দায়েরকৃত আবেদনে নিষ্পত্তিতে সময় লাগবে ৪৫ বছর এবং রায় বাস্তবায়নে সময় লাগবে ৮৫ বছর।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, আমি আমার জায়গা থেকে যা যা করণীয় তা করেছি। খুব শিগগিরই এ আইন বাস্তবায়নে যে সব সমস্যা হচ্ছে সেই বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। আর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, আমরা চাইছি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে। অর্পিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি ভোগান্তি কমে আসবে।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের কোনো সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা আছে কীনা এ প্রসঙ্গে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত ভোরের কাগজকে বলেন, ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যে অস্পষ্টতা ছিল তা প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ছয় দফা সংশোধনের মধ্য দিয়ে অবসান হয়েছে। নতুন করে এই আইনের আর কোনো সংশোধন প্রয়োজন নেই। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, নতুন করে এই আইনের আর কোনো সংশোধনের প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও ভুক্তভোগী কাজল দেবনাথ ভোরের কাগজকে বলেন, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয় না। অথচ সরকার দ্রুত অর্পিত সম্পত্তি মূল মালিকদের কাছে ফেরত দেয়ার জন্য এই আইন করেছিল। নির্ধারিত সময়ে মামলা শেষ করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশও আছে। কিন্তু ওই নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির মামলা নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে কি না, তা মনিটর করার কেউ নেই। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এটি মনিটরিং করা হলে কাজে গতি আসবে।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল যার পক্ষে রায় দিয়েছে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মালিকানার বিষয়ে উত্তরাধিকার এবং সাকসেশন সার্টিফিকেট চাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসন তা শুধু বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু তা হচ্ছে না। আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের হয়রানি বন্ধ না করলে আদালত অবমাননা মামলা করতে বাধ্য হব।

জানা যায়, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস-১৯৬৫’ অনুসারে ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব নাগরিক পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল, তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ‘শত্রু সম্পত্তির’ নাম পরিবর্তন করে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ রাখা হয়। তাতে বলা হয়, ১৯৭৪ সালের পর থেকে নতুন করে কোনো অর্পিত সম্পত্তির তালিকা করা হবে না। এবং তা হবে আদালত অবমাননার শামিল।

অর্পিত সম্পত্তি মূল মালিক বা তাদের বৈধ উত্তরাধিকারীর কাছে ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেয় ২০০৮ সালে। কিন্তু চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সেই বিষয়ে সরকারি কোনো উদ্যোগ ছিল না। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ২০১২ সালে নতুন করে অর্পিত সম্পত্তির তালিকা হয় ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিলে। দুটি তফসিলের সম্পত্তি অবমুক্ত করতে লাখ লাখ মামলা হয় তখন। পরে সরকার ‘খ’ তফসিলের সম্পত্তি অবমুক্ত করে দেয়। জনসাধারণের দখলে থাকা এসব সম্পত্তি এমনিতেই ফিরিয়ে দেয়া হয়। এখন ‘ক’ তফসিলের সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলছে।