যেভাবে আটক হলেন সম্রাট

আগের সংবাদ

সম্রাটের উত্থান: পরশুরাম থেকে ক্যাসিনো

পরের সংবাদ

সেলিম প্রধানের ‘রঙমহলে’ ছিল অপ্সরীদের আনাগোনা

আজিজুর রহমান জিদনী :

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৬, ২০১৯ , ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

ক্যাসিনো ব্যবসা ও নারীঘটিত বিষয় ছাড়াও নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন মাফিয়া ডন সেলিম প্রধান। তার ‘রঙমহলে’ ছিল অপ্সরীদের নিত্য আনাগোনা। সেখানে আসতেন অনেক রাজনীতিক, সমাজের প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা। রাতভর চলত মাস্তি। বেপরোয়া ও অনাচারী সেলিম প্রধান তার মালিকানাধীন ‘প্রধান গ্রুপে’র কর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, বেতনভাতা পরিশোধ না করা ও দেশের বাইরে মারামারি করে আটক হওয়াসহ এমন নানা কুকীর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল তার জীবন।

সেলিম প্রধান ছিলেন শোষক চরিত্রের। তার অধীনস্থ কর্মীদের সঙ্গে কথা হলে উঠে আসে এমন তথ্য। তার এক সময়ের গাড়িচালক মো. আলমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, আগের বছর কুরবানির ঈদ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে তিনি সেলিম প্রধানের গাড়িচালক হিসেবে কাজ নেন। তবে শুরুর দুই মাস ঠিকমতো পরিশোধ করলেও এরপর থেকে বেতনভাতা অনিয়মিত হতে শুরু করে। যা কাজ ছাড়ার দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সেলিম আটকের একমাস আগে কাজ ছেড়ে দেন তিনি। এখনো কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলে দাবি করেন আলম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেলিমের আরেক গাড়িচালক জানান, শুধু বেতনভাতা অনিয়মিতই নয়, সেখানে বেশিরভাগ সময় অনেক রাত পর্যন্ত ডিউটি করতে হতো।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে কাজ ছেড়েও চলে গেছেন। কারণ হিসেবে সেলিম প্রধানের নারীঘটিত কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে এ গাড়িচালক বলেন, গুলশান ২-এর ৯৯ নম্বর সড়কের ১১/১ নম্বর বাসার চারতলার সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি ছিল তার অফিস-কাম রঙমহল। সেখানে দেশি-বিদেশি অপ্সরীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। আসতেন প্রভাবশালী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও। আর অপ্সরীদের সন্ধ্যার দিকে আনা হলেও পৌঁছে দিতে হতো গভীর রাতে। এ চালকের দাবি, বাড্ডার সুবাস্তু টাওয়ার ও এর বিপরীত পাশের একটি গলির বাসা থেকে নিয়মিত আসা যাওয়া করত অপ্সরীরা। এ ছাড়াও ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও হোটেল আমারির সামনে থেকেও আসতেন তরুণীরা। বিশেষ করে

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত ওই ফ্ল্যাটটি রূপান্তরিত হতো রঙমহলে। এ ছাড়াও ওই ফ্ল্যাটের অধিকাংশ কক্ষেরই প্রবেশদ্বার ছিল সয়ংক্রিয় ফিঙার প্রিন্ট সিস্টেমের। ফলে তার কক্ষে চাইলেও যে কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। পুরো অফিসটি ছিল সিসি টিভি ক্যামেরার আওতায়। এমনকি নিচে গাড়ি রাখার গ্যারেজের স্থানেও ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন সেলিম। গত ছয় মাস আগে চালকদের ওপরে ওঠা নিষিদ্ধ করে দেন সেলিম প্রধানের অনেক কুকর্মের সাক্ষী ও তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কর্মরত মো. রোমান। ওই ব্যক্তি অভিযানের সময় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।

গাড়িচালক আরো জানান, জাতীয় সংসদের স্টিকার খচিত নিশান সাফারি ও পেট্রল মডেলের দুটি গাড়িই বেশি ব্যবহার করতেন সেলিম প্রধান। তবে গাড়ির কাগজপত্র চালকদের কাছে দেয়া হতো না। আগে অনেক নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও এখন তিনজন নিরাপত্তারক্ষী ছিল তার। তারা হলেন- রাজবাড়ির সিরাজ এবং আখাউড়ার মামুন ও মিরাজুল। তবে বর্তমানে সেলিম প্রধানের গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছিলেন বাড্ডার নূরের চালার বাসিন্দা কামাল। একটি সূত্র জানায়, সেলিম প্রধানের সেলুন-স্পার আড়ালেই নারীঘটিত অপকর্ম হতো। তবে সেই সেলুনে অজানা কারণে অভিযান হয়নি কখনো। এ ছাড়াও স্বর্ণব্যবসা ও খাটাল ব্যবসায় জড়িত ছিলেন সেলিম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, সেলিম প্রধানের একাধিক সম্পর্কের বিষয় থাকলেও তার তিন স্ত্রীর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী বিদেশি হলেও তৃতীয়জন ছিলেন দেশি। তিনি পুরান ঢাকার মেয়ে। তবে তার কোনো সন্তান নেই। গুলশানের ওই বাসারই পাঁচতলায় থাকতেন তিনি। তবে সেলিমের এ ধরনের অপকর্ম নিঃসন্তান হওয়ায় মুখ বুজে সহ্য করতেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ কর্মকর্তা আরো জানান, সেলিমের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ পর্ন সিডি ও যৌনসংক্রান্ত জিনিস পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনেও ১২টি পাসপোর্ট হোল্ডার সেলিম প্রধান ছিলেন উগ্র। থাইল্যান্ডে আমেরিকার ভিসা আবেদন করতে গিয়ে সেখানে মারামারিতে জড়িয়ে আটক হন তিনি। এ ছাড়াও জাপানেও কোনো এক ঘটনায় মারামারিতে জড়িয়ে ছিলেন তিনি।

র‌্যাব লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, সেলিম প্রধানসহ তিনজনকে মাদক মামলায় চারদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর আদালতের হাকিম মইনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার দুপুরে এ আদেশ দেন। অন্য দুই আসামি হলেন- আখতারুজ্জামান ও রোমান। সেলিমের আরো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে খোঁজা হচ্ছে। তাদের মধ্যে একাধিক দেশি-বিদেশি নারীও আছেন।