শান্তনু বিশ্বাসের ‘স্মৃতির শহরে’

আগের সংবাদ

শুভ চেতনা সঞ্চারিত হোক সবার মনে

পরের সংবাদ

শারদীয় নাট্যমঞ্চে দুই নাটক মঞ্চস্থ

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৫, ২০১৯ , ৭:৫৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

Avatar

উন্মুক্ত মঞ্চের তিন দিকেই লোকে লোকারণ্য। সবাই উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছে কখন পর্দা উঠবে? ঠিক সময় মতই পর্দা উঠল। মঞ্চকে সাজানো হয়ে স্বর্গরাজ্যের আদলে। মনে হচ্ছে দেবালোক। দেবতারা নানা বিষয় নিয়ে অবস্থান করছেন।

পরবর্তীতে দেবতারা চলে আসে মর্তে। মঞ্চে একটি গাছের উপর কালিদাস বসে ডাল কাটছে। সে আগায় বসে গোড়া থেকে ডালটি কাটছে, একই সঙ্গে সংলাপ বলছে। বাসর ঘরের দৃশ্যে দেখা যায় একটা মইকে বিছানার আদল করে দুটো মানুষ কালিদাস ও তার স্ত্রী বিদ্যাবতী একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে। কালিদাস মুর্খ বলে তার স্ত্রী বিদ্যাবতী এক পর্যায়ে কালিদাসকে আঘাত করে। ‘কালিদাস’ নাটকের শুরুটা ছিল এমনই এক স্বর্গ ও মর্তলোকের ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে।

মোঘল স¤্রাট মহামতি আকবরের প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক তীর্থ স্থান রাজধানীর রাজারবাগ বরদেশ্বরী কালী মন্দির প্রাঙ্গনে চলছে শারদীয় নাট্যোৎসব। ‘মঞ্চ মায়ায় মানবতার জয়’ স্লোগানে পাঁচ দিনব্যাপী এ নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে মন্দির ও শ্মশান পরিচালনা কমিটি। শনিবার ছিল এ উৎসবের দ্বিতীয় দিন।

এদিন সন্ধ্যায় উন্মুক্ত মঞ্চে মঞ্চায়ন হয় দুই নাটক। একটি নাট্য সংগঠন দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরান’ অন্যটি থিয়েটার ৫২’র ‘কালিদাস’। সহস্রাধিক দর্শকের উপস্থিতিতে ‘কালিদাস’ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয় এ সন্ধ্যায়। নাটকটি উদ্বোধন করেন মন্দির ও শ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি লায়ন চিত্তরঞ্জন দাস।

এ সময় তিনি বলেন, শারদীয় নাট্যোৎসবের প্রথম দিন আমরা নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার নামাঙ্কিত ‘স্টুডেন্ট এ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ প্রদান করেছি এবং শারদীয় নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেছি। অভয় বিনোদিনী স্কুলের শিক্ষকদের বিবেচনায় এবারের বেস্ট স্টুডেন্ট বুসরা নুসাইদ চৌধুরী।

এবার শারদীয় নাট্যোৎসবে পাঁচ দিনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনভূক্ত’সহ সব মিলিয়ে ১০টি দল নাটক মঞ্চায়ন করছে। আমি মনেকরি সাংস্কৃতিক জাগরনের ক্ষেত্রে ১৯৯৫ সাল থেকে এখানে আমরা যে নাটকের চর্চা শুরু করেছিলাম, ২০১৫ সালে এসে ফেরদৌসী মজুমদারের অভিনয়ের মধ্যদিয়ে ‘কোকিলারা’, ‘মুক্তি’, ‘কাননদেবী’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ সর্বশেষ শুক্রবার ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মঞ্চায়ন হয়েছে।

আমাদের জাতীয় এবং আঞ্চলিক দলগুলোর পাশাপাশি বিদেশ থেকেও নাট্যদল আমন্ত্রণের ইচ্ছা রয়েছে। অন্যদিকে এখানে গঙ্গা সাগর দিঘীর পাড়ে বসেছে লোকজ মেলা। সামাজিক জীবনে বিনোদনের খুবই অভাব।

এ নাট্যোৎসব বিনোদনের অভাব পূরনের পাশাপাশি এখান থেকে আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করার প্রয়াস রয়েছে।

থিয়েটার ৫২ প্রযোজিত ‘কালিদাস’ নাটকটি রচনা করেছেন অপূর্ব কুমার কুন্ডু এবং নির্দেশনা দিয়েছেন জয়িতা মহলানবীশ। নাটকে দেখা যায়, কালিদাস মূর্খ হিসেবে পরিচিত। সে পাঠশালা থেকে শিক্ষকের পিটুনী খেয়ে বেরিয়ে যায়। সে গাছের ডালে বসে তার গোড়া কাটে। এরকম নির্বুদ্ধিতা সম্পন্ন মানুষ হচ্ছে মুর্খ কালিদাস।

বিদ্যাবতী নামে এক মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যে জ্ঞান অন্বেষণ করে। কিন্তু বাসর ঘরে কালিদাসের নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ পায়। তখন তাকে স্ত্রী কতৃক পদাঘাত করা হয়। সে লজ্জায় আত্মাহুতি দিতে যায়। সেখানে দেবী সরস্বতীর সঙ্গে তার দেখা হয়। তার কাছ থেকে সাহিত্যের পথে দিক নির্দেশনা লাভ করে কলিদাস সাহিত্যে মনযোগ দেয়। সে বাল্মিকী রামায়ন অধ্যায়ন করে রচনা করেন রামায়নেরই এক বড় ভার্ষণ মহাকাব্য ‘রঘু বংশন’। সে ব্যাসদেবের মহাকাব্য মহাভারত থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে রচনা করেন ‘অভিজ্ঞান শকুনতলা’।

এছাড়া রাধাকৃষ্ণের যে ব্যাকুলতা, তাকে উপজীব্য করে সে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে লেখেন ‘মেঘদূত’। কালিদাস মহাকাব্য লিখেছেন, নাটক লিখেছেন এবং তিনি গীতিনাটকও লিখেছেন। শেষ দিকে দেখা যায় নদীর পাড়ে একটি ইটের ঘরে জলচৌকীতে বসে কালিদাস ময়ূরের পেখম দিয়ে তৈরি কলম দিয়ে সাহিত্যসৃজন করছে। মহামূর্খ মানুষ কি করে মহাকবি হয়ে ওঠে কালিদাস তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একজন পিছিয়ে পড়া মানুষ যে প্রয়োজনে সামনে এগিয়ে আসতে পারে সেটা ‘কালিদাস’ নাটকের মধ্যদিয়ে প্রকাশ পায়। কোন এক সময় বিদ্যাবতীর সঙ্গে তার দেখা হয় সে তাকে আঘাত করেনি আত্মঘাতি প্রেরণা হিসেবে সাহিত্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। জীবন্ত কিন্তু ঐতিহাসিক রচনা অপূর্ব কুমার কুন্ডুর ‘কালিদাস’ নামের এই নাটক।

নাট্যকার অপূর্ব কুমার কুন্ডু বলেন, একজন পিছিয়ে থাকা মানুষও যে যেকোন সময় একজন সঠিক মানুষের সঠিক দিক নির্দেশনায় সফলতা পেতে পারে, তার এক ঐতিহাসিক প্রমান মহাকবি কালিদাস। তিনি মুর্খ থেকে মহাকবি হয়েছেন এবং মহাকাব্য সৃজন করেছেন।

নাটকে কালিদাস ও বিদ্যাবতী চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে নজরুল ইসলাম সোহাগ ও রুমি প্রভা এবং সরস্বতি চরিত্রে নাটকের নির্দেশক জয়িতা মহলানবীশ। অন্যান্য শিল্পীরা হলেন আদিব মজলিশ খান, রুদ্র রায় অপু, দিপু আহমেদ প্রেম, এম পারভেজ পলাশ সহ আরও অনেকে। থিয়েটার ৫২ প্রযোজিত নাটক ‘কালিদাস’।

প্রথমে মঞ্চায়ন হয় দেশ নাটক প্রযোজনা নাটক ‘নিত্যপূরান’। মাসুম রেজার রচনা ও নির্দেশনায় নাটকটিতে অভিনয় করেন চুমকি, বন্যা মির্জা’সহ আরও অনেকে।

নাট্যোৎসবের তৃতীয় দিন আজ রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চায়ন হবে আরণ্যকের নাটক ‘ময়ূর সিংহাসন’। এতে বিশেষ দুটি চরিত্রে অভিনয় করবেন মামুনুর রশীদ ও তমালিকা কর্মকার। নাটকটি রচনা করেছেন মান্নান হীরা এবং নির্দেশনা দিয়েছেন শাহ্আলম দুলাল।