ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপূজা

আগের সংবাদ

স্টামফোর্ডে সাহিত্য ফোরামের 'শরৎ উৎসব' উদযাপন

পরের সংবাদ

স্বাধীনতা আন্দোলনে দুর্গাপূজা

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ , ৮:০৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ৮:০৩ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেবী দুর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর স্বাধীনতার পর এই পূজা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উৎসবের মর্যাদা পায়।

শরৎঋতুতে মূলত প্রকৃতি বন্দনাই শারদোৎসব। বাঙালিরা ধানের দেবী হিসেবেই দুর্গাপূজা শুরু করে। ধানই বাঙালির সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান শস্য। এককালে আমন ধানই ছিল প্রধান ধান। বাঙালি বরাবরই প্রকৃতির আশীর্বাদ নির্ভর কৃষিতে অভ্যস্ত ছিল। একটু-আধটু আউশ ধান হবে কি হবে না তার নিশ্চয়তা ছিল না। আমন ধানও তথৈবচ। বৈশাখ কি জৈষ্ঠ্যে জমিতে জো এলেই বুনে দেয়া হতো নানান জাতের আমন ধানের বীজ। তারপর দু’একবার নিড়ানি দেয়া হলো কি হলো না অমনি শ্রাবণধারায় খেত জলে ভরে যেত। এরপর যথারীতি নদী উপচে আমনের মাঠে মাঠে বন্যার ঘোলা জল ঢুকে যেত। বন্যাজলের সঙ্গে আমন ধানের বেঁচে থাকার লড়াই ছিল প্রায় অলৌকিক। একদিনে জল এক হাত বাড়লে ধান সোয়া হাত বেড়ে মাথা জাগিয়ে রাখত। কৃষকরা ধানের দেবী দুর্গাকে প্রতিমা গড়ে সাড়ম্বরে পূজা দেবে বলে মানত করত। আমন ধান ফি বছর ভালো না-হলেও পাটের ফলনে কৃষকরা সচ্ছল হয়ে উঠত। সদ্য পাট বিক্রির নগদ অর্থে দুর্গাপূজার উৎসব দারুণ জমে উঠত।
বাঙালির দেশে দুর্গাপূজার সামাজিক ইতিহাস এরকমই। কালে কালে কৃষিতে আকাশ নির্ভরতা কমে গেলেও বাঙালি হিন্দুরা শারদীয় দুর্গোৎসবকে সার্বজনীন চিরন্তন উৎসব করে তুলেছে।
দেহপ্রাণ পুষ্টিরক্ষার উপাদান হলো গাছপালা ফলমূল শস্য- পৃথিবীর সম্পদকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যও অনুষ্ঠিত হয় শারদোৎসব। যুগে যুগে শরৎকে বন্দনা করেছেন, শরতের আনন্দগান গেয়েছেন কবিরা-
শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি, ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।
প্রাচীনকালে প্রকৃতিই তো পূজিত হতো, কালে কালে প্রকৃতি দেবীরূপে দেবতারূপে মূর্ত হয়েছে মানুষের মধ্যে। এককালে দেবতার পূজা নয়, অনুষ্ঠিত হতো ঋতুযজ্ঞ। কালের বিবর্তনে অদৃশ্য অসীম শক্তির প্রতীক রূপ পেল প্রতিমায়। অসীম সসীমে এলো- নিরাকার হলো সাকার।
এগার শতকে রাজা বল্লাল সেনের রাজত্বকালে বাংলায় মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির প্রচলন হয়। বাংলাদেশে আজকের যে দেবী দুর্গা মূর্তি- এই মূর্তির সঙ্গে মহারাজা শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের সময়ে কৃষ্ণনগরে মৃন্ময়ী দুর্গা প্রতিমার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারো কারো মতে, রাজশাহীতে প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
ঐশ্বর্য, জ্ঞান, সিদ্ধি, বিজয়ের প্রতিমূর্তি মহাশক্তিরূপের দেবী দুর্গাকে বাঙালি পূজা করে। মহাশক্তির খণ্ডরূপ পৃথকভাবে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ আর কার্তিককেও পূজার আসনে দেয়া হয় দেবীদুর্গার সঙ্গে। আমরা অনেকেই মনে করি দুর্গার সস্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ আর কার্তিক। আসলে মহাশক্তি দুর্গারই খণ্ডিত রূপ এই মূর্তিগুলো।
ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে দুর্গাপূজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা লিখে ইংরেজদের রোষানলে পড়ে কারাভোগ করেছিলেন। বৃটিশ বাংলায় এই পূজা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেবী দুর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর স্বাধীনতার পর এই পূজা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উৎসবের মর্যাদা পায়।
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,

মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।
তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।…
(আনন্দময়ীর আগমনে : কাজী নজরুল ইসলাম)

দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া দশভুজা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই এই দেবীর নাম মহিষাসুরমর্দিনী। পৃথিবীর আদি থেকে কৃষিসম্পদই মানুষের ধনপ্রাণ। বাংলাদেশ আজো কৃষিপ্রধান দেশ। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার সুনাম সারা বিশ্বজুড়ে। দেবী দুর্গা বাংলাদেশে প্রথমত শস্যের দেবী হিসেবেই পূজিতা। সনাতনধর্মীদের কাছে দুর্গা পৃথিবীদেবী। পৃথিবীদেবীর আরাধনার প্রতীক শস্য, বৃক্ষ, নদী, পর্বত, গুহা, বন্যপশু, অস্ত্রশস্ত্র। দুর্গা তাই শক্তিরও দেবী।
সব কাজে বিজয়ের নিদর্শন বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গা অভীষ্ট পূর্ণকারিণী বিঘ্ননাশিনী, দুর্গতিনাশিনী, শান্তিরূপিণী। একেকটি শক্তিকেই মূলত শ্রদ্ধা করা হয়, পূজা করা হয়। অদৃশ্য-অসীম শক্তির কাছেই আমরা নতজানু হই। দেবী দুর্গার মহাশক্তির রূপ মূর্ত হয় মন্দিরে মন্দিরে, দেবী মৃন্ময়ীরূপে পূজিত হন।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন-
পুতুল পূজা করে না হিন্দু, কাঠ-মাঠি দিয়ে গড়া
মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে, হয়ে যায় আত্মহারা।
দেবী দুর্গার সাকার আসন মৃন্ময়ী মূর্তি, নিরাকার আসন প্রাণের মধ্যে। মাটি দিয়ে মায়ের মূর্তি গড়া, তাই তিনি মৃন্ময়ী। মৃন্ময়ীর মাঝেই আমরা খুঁজে পাই চিন্ময়ীকে। যিনি চৈতন্যময়, জ্ঞানময়, পরমেশ্বর তিনিই চিন্ময়। ঈশ্বরের মাতৃরূপই চিন্ময়ী রূপ। বাঙালি মাতৃমুগ্ধ জাতি। বাঙালি হিন্দুরা বিশ্বাস করে- ঈশ্বর সকল জীবের মা হয়ে বিরাজ করেন।
‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’- মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনাও তাই স্বাভাবিক। ‘কাজ ফুরালে সন্ধ্যাবেলায় মা করিবে কোলে, আমরা মায়ের ছেলে।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে জলের মধ্যে মূর্তি লীন হয়ে যাওয়াই চিন্ময়ীশক্তির সমস্ত সত্তার সূক্ষ্মভাবে অবস্থান সূচিত করে। বিজয়ার দিনে প্রতিমা বিসর্জনকালে ভেদাভেদের প্রাচীর ভেঙে, দূরের কাছের- সমাজের সব স্তরের- সব বয়সী মানুষই একটি মানুষ হতে চায়। অর্থাৎ শারদীয় উৎসব সমতা রচনার প্রেরণা জোগায়।

বাঙালি হিন্দুদের কাছে দুর্গা তথা উমার আরেক ব্যাখ্যা আছে। বাঙালি হিন্দুরা মনে করে মা দুর্গার ছেলে কার্তিক, গণেশ, মেয়ে লক্ষ্মী, সরস্বতী- এরা ভাইবোন। আমরা সকলেই ভাইবোন। জগজ্জনীর সন্তান।
সকল পূজার মূল লক্ষ্যই হলো প্রশান্তি। আর প্রশান্তির জন্য চাই মুক্ত মন। মনের মধ্যে এক বিন্দু কালো বা কুপ্রবৃত্তি থাকলেও মানুষ শুদ্ধ হতে পারে না। সকল প্রবৃত্তিকে নাশ করতে হলে মানুষকেই ভালোবাসতে হয়। গীতিকবিও তাই বলেন সবারে বাসরে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে।
দুর্গাপূজা আর সর্বজনীন শব্দ দুটি কালে কালে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। কারণ দুর্গাপূজা ঘিরেই বাঙালি হিন্দু সকলে মিলে এক হবার চেষ্টা করেছে। সকলের জন্য যা উদ্দিষ্ট তাই সার্বজনীন। সবার জন্য মঙ্গল কামনায় পূজিত হয়ে আসছেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা।

লক্ষ্মী ঘরে ঘরে পূজিত হন। কার্তিক গণেশকেও সামর্থ্যমতো গৃহস্থরা পূজা দেন। ঘরে, পাড়ার ক্লাবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা পান। কিন্তু দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার সঙ্গে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতীকেও পূজা দিতে হয়- এ এক মহা আয়োজন। ষষ্ঠীতে প্রতিমা স্থাপন, তারপর সপ্তমী অষ্টমী নবমী পূজা, দশমীতে বিসর্জন।
কোনো পূজা পার্বণই একলা একা জমে ওঠে না। উৎসব সবার জন্য। সবার অংশগ্রহণে দারুণ এক সম্মিলন ঘটে বলেই দুর্গাপূজা সত্যিকার অর্থেই সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। এই সার্বজনীনতা কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ঘিরে নয়। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য উৎসব।

সার্বজনীন শারদোৎসবের পূজাটুকু উপলক্ষমাত্র; তিথি মেনে পূজাটুকু খুব অল্প সময়ের জন্য; পূজার বাকি সবটুকু সময় সকল মানুষের জন্য কেবলই উৎসবের; সম্মিলনের, ভালোবাসার।