শক্তি ও শান্তির প্রতীক দেবী দুর্গা

আগের সংবাদ

বাঙালির দুর্গাপূজা ও অসাম্প্রদায়িকতা

পরের সংবাদ

শারদীয় শুভেচ্ছা

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ , ৮:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ৮:১৬ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

ইতোপূর্বে পূজা-পার্বণে যে ধরনের সন্ত্রাসী ও জঙ্গিতৎপরতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আজ তা অনেকটাই কমে গেছে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, সনাতন ধর্মের মানুষ নতুন নিরাপদ পরিবেশে আগের চাইতে অনেক বেশি পূজা-পার্বণে মনোনিবেশ করেছে। তাইতো এবারে পূজামণ্ডপের সংখ্যা ৩১  হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে। এ অপরূপ বাংলার চিরন্তন দৃশ্য। ছোটবেলা থেকে গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে দেখে এসেছি কত না আনন্দ উৎসবের বিপুল আয়োজন। দেখেছি উচ্ছ্বসিত মানুষের ভক্তিপূর্ণ নিবেদন। মুসলিম জনগণের ঈদ উৎসবের মতোই শারদ উৎসব অথবা সার্বজনীন দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু জনগণের কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং বড় উৎসব।
ব্রিটিশ আমলে দেশের লোকসংখ্যা কম ছিল তবুও শারদীয় উৎসব আয়োজন ছিল নিরাপদ ও আন্তরিকতাপূর্ণ। সৌভ্রাতৃত্বের মিলনমেলা বসতো উৎসব ঘিরে। আবালবৃদ্ধবনিতা ছুটতো প্রতিমা দর্শনে। আবার উৎসবের মেলা প্রাঙ্গণে পসরা সাজিয়ে বসা নানান দোকানির কাছ থেকে নিজেদের চাহিদা পূরণের মতো কিছু কিনতো। দেশ হলো বিভক্ত, বাংলাও দ্বিখণ্ডিত হলো। আমরা পূর্ববঙ্গের মানুষÑ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান চাইলাম এক হয়ে বাস করতে আনন্দ উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে। পাকিস্তানি দুঃশাসনের বৈরী মনোভাব দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘সংখ্যালঘু’ বলে চিহ্নিত করলো। তবু দুর্গোৎসবের ঐতিহ্যকে ম্লান করতে পারেনি। মানুষ ছিল উচ্ছল। ভীতি বা বিপন্নতা থাকলেও জনগণের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে তারা টপকে গেছেন সে প্রতিবন্ধকতা। এখন আমরা মুক্ত স্বদেশে বাস করি। বাংলা এখন সাড়ে ৪ কোটি নয়, সাড়ে ৭ কোটিও নয়, ১৬ কোটি গণমানুষের দেশ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেরকালে আমরা দখলদার পাকিস্তানিদের পরাজিত করে পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করেছি ত্রিশ লাখ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসীদের রক্তে। এখানে স্মরণীয়, আমরা যারা ভারতবর্ষে আশ্রিত শরণার্থী ছিলাম কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ নানা শহরে বাস করেছি, তারা তো স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি শহরগুলোর শারদীয় দুর্গা উৎসবের মণ্ডপে দেবী অর্চনার মঞ্চ তৈরি হয়েছে বিশাল। কিন্তু সেই মণ্ডপে ঢোকবার মাঝ পথে দেখেছি বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি টাঙানো এবং তাতে দর্শনার্থী সব মানুষ একবার দাঁড়িয়ে হয় পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করছেন, নয় তো মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। আজো সেই স্মৃতি আমাদের অনেকের মনে গেঁথে আছে। পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামে প্রাণ বিসর্জনে প্রস্তুত কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধাভাজন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কীভাবেই প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন তারা। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং মুক্তিফৌজ তথা মিত্রবাহিনী বিজয় অর্জন করেছে। আর তাই আমরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের স্লোগানে অর্জন করেছি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। এ অর্জনের আগে ও পরে কত না চক্রান্ত একে ম্লান করতে চেয়েছে। দেশি-বিদেশি হাত খর্ব করতে চেয়েছে মুক্তিসংগ্রামকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সে অপপ্রয়াস। আমরা বিজয়ী বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্ত স্বদেশে বসবাস করছি আজ প্রায় ৫০ বছর। হয়েছি ১৬ কোটি। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার যে স্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শানিত করেছিলাম শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে, তা আজ যেন কেমন ফিকে হয়ে গেছে। পাঠক, মনে আছে বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন আর গড়ে তুলছিলেন রাষ্ট্রের মৌলিক চাহিদা, সাড়ে তিন বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করতে ব্যর্থ সেই চক্রান্তের হোতা খন্দকার মোশতাক ও সেনাবাহিনীর কতিপয় বিশ্বাসঘাতক তরুণ অফিসার ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে রাজনীতির পট পরিবর্তন করে দিলো। মোশতাক থাকতে পারলো না কিন্তু সেনাবাহিনীর জেনারেল জিয়াউর রহমান পাল্টা ক্যু করে ক্ষমতাই শুধু দখল করলো না, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতা আরোহণ করলো। এরপর এরশাদ, তারপর খালেদা জিয়া এদের সাম্প্রদায়িক জিঘাংসার শিকার হলেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরকে ক্ষমতা রক্ষার জন্য শুধু জোটভুক্ত করলো না; খালেদা যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দিল।
জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর ওপর নানা ধরনের অত্যাচার, ভূমিগ্রাস, সম্পদ লুট, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটালো, এক নয় একাধিক। এই তিন আমলে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বাড়াবাড়িতে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতায় মন্দিরে, গির্জায় এমনকি প্যাগোডাতেও হামলা করতে দ্বিধাবোধ করলো না। একের পর এক এই ধরনের সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের ফলে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। ফলে দেশত্যাগ করতে থাকলেন তারা। উল্লেখ্য, শারদীয় দুর্গা উৎসব আয়োজনের পরিমাণ অনেক কমে গেল। যারা এ দেশেই থেকে গিয়েছেন তারা সাহসে ভর করে পূজামণ্ডপ নির্মাণ ও দেবী প্রতিমার উদ্বোধন ঘটিয়ে পূজা অর্চনা করতে চেষ্টা করেছেন। সরকার তাদের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তারপরও বেশকিছু জায়গায় দুর্বৃত্ত ও ভূমিগ্রাসী লুণ্ঠনকারীর দল রাতের অন্ধকারে মন্দিরে সাজানো দেবী প্রতিমাকে ভেঙে পূজার আয়োজনকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। আবার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হিন্দু বাড়িঘর, দোকানপাট যেমন লুট করেছে, তেমনি গির্জার ধর্মযাজককে হত্যা করেছে অথবা হত্যার হুমকি দিয়েছে। ফলে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শঙ্কা সব সময় বিরাজ করেছে। কিন্তু আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সরকার ক্ষমতাসীন এবং তাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পর অমুসলিম জনগণের অনেকেই স্বদেশে ফিরে এসেছেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অজুহাতে হিন্দুদের বিষয় সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে আইয়ুব সরকার দখল করে নিয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজয়ের পর দখলকৃত এইসব সম্পত্তি তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেয়া হবে। দেশে অর্পিত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার যে নির্বাচনী ওয়াদা ১৪ দল করেছিল, শেখ হাসিনার আমলে তার খানিকটা বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এখনো অর্পিত সম্পত্তি বিষয়টি আদালতে ফায়সালা হওয়ার পরও প্রশাসন থেকে নানা ধরনের বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকে অর্পিত সম্পত্তি অর্থাৎ আইয়ুবী আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি’ মামলা করে ফেরত পেয়েছেন। আর সেই সুবাদে যে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে তার কারণে অনেকে আবার দেশে ফিরে এসেছেন। ইতোপূর্বে পূজা-পার্বণে যে ধরনের সন্ত্রাসী ও জঙ্গিতৎপরতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আজ তা অনেকটাই কমে গেছে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, সনাতন ধর্মের মানুষ নতুন নিরাপদ পরিবেশে আগের চাইতে অনেক বেশি পূজা-পার্বণে মনোনিবেশ করেছে। তাইতো এবারে পূজামণ্ডপের সংখ্যা ৩১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসীরা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যেভাবে অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয় তবু দেশের মানুষকে ভালোবেসে যে শান্তির পরিবেশ আজ সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের স্বস্তি দেয়। সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি সুদৃঢ় হয়েছে বলেই এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
তবু সরকারকে বলবো, যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত-শিবিরের মতো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি স্বনামে হয়তো তৎপরতা দেখাচ্ছে না কিন্তু তারা গোপনে ও অন্যান্য দলে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে তাদের অপকর্ম করে যাচ্ছে। এই তো সেদিন পাবনা সদরে এক দম্পতিকে জামায়াতের ক্যাডাররা রাতের অন্ধকারে নানাভাবে নির্যাতন করে জখম করেছে। ওরা এভাবেই গোপনে ছড়িয়ে পড়ে ওদের ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ উদ্ধারে মারমুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। আমরা তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোবিন্দগঞ্জের কথা ভুলে যাইনি, ভুলে যাইনি সাঁথিয়ার কথাও। এমনইভাবে ভোলা কি সম্ভব এ ধরনের কুৎসিত অপতৎপরতাকে? তাই সরকার বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তার জন্য সাধুবাদ জানাই। তারপরও অনুরোধ জানাব, মণ্ডপে মণ্ডপে নজরদারিটা বাড়ানোর জন্য। আর সেইসঙ্গে পূজা বা উৎসব কমিটির কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও অনুরোধ করবো, স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এতসব শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যেও যারা পূজাপার্বণের আয়োজন করেছেন তাঁদের জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা