জয় পেল বার্সেলোনা

আগের সংবাদ

এমসিসি প্রেসিডেন্ট সাঙ্গাকারা

পরের সংবাদ

‘মৃত্যুর আগে ভাত খেতে চেয়েছিল লিজা’

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ , ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

Avatar

মৃত্যুর আগে সারাক্ষণ কথা বলতে চাইত লিজা। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভাত খেতে চাইত। কিন্তু আমরা দিতাম না। কথা বললেই ও বলত, আমি জানি আমি আর বাঁচবোনারে আপু। কিন্তু সাখাওয়াতসহ যাদের কারণে আমি মারা যাচ্ছি তাদের যেন আল্লাহ ভালো না রাখেন। গতকাল সকালেও লিজা বলছিল, আমি মারা যাচ্ছি, এরপরেও তোমরা ভাত খেতে দিলে না। এর কিছুক্ষণ পরেই মারা যায় লিজা, বলতে বলতে বিলাপ করতে থাকেন লিজার বড় বোন মোছা. রানী।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যু হয় রাজশাহীতে থানায় মামলা না করতে পাড়ায় থানার সামনে নিজের শরীরে আগুন দেয়া লিজা আক্তার (১৮)। ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে।
ঢামেক বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, লিজার শরীরের ৬৩ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তার অবস্থা প্রথম থেকে খুব আশঙ্কাজনক ছিল। এ ধরনের দগ্ধদের রিকোভারি করা খুব কম সময়েই সম্ভব হয়।
এদিকে এ ঘটনা তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক আল মাহমুদ ফয়জুল কবীরের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাজশাহীতে অবস্থান করছেন। গত মঙ্গলবার তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছেন। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন বলে জানা গেছে।
নিহত লিজার বড় বোন রানী ঢামেকে বিলাপ করতে করতে বলেন, কি দোষ ছিল আমার বোনের। বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে জায়গা পায়নি। থানায় গিয়েও মামলা করতে পারেনি। কোথাও কোনো আশা না দেখে ও মারা গেছে। থানায় মামলা নিলে হয়ত এ ঘটনা ঘটত না। সুতরাং এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত সবার বিচার চাই আমরা।
লিজার বাবা আলম মিয়া জানান, তাদের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে। গ্রামেই বাঁশের ব্যবসা করেন তিনি। দুই মেয়ের মধ্যে লিজা ছিল ছোট। বড় বোন রানীর বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, লিজার যখন তিন মাস বয়স তখন তার মা মফেলা বেগম মারা যায়। তখন তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েন। কোনো উপায় দেখে একপর্যায়ে ওই গ্রামের আবদুল লতিফের কাছে দত্তক দেন লিজাকে। সেখানেই বড় হতে থাকে লিজা।
ঢামেক হাসপাতালে লিজা আক্তারের পালক মা শিরিন আক্তার বলেন, তিন মাস বয়সে লিজাকে দত্তক নেই। সে আমার কলিজার টুকরা। অনেক আদরে ওরে বড় করেছি। গোবিন্দগঞ্জের গার্লস স্কুল থেকে পাস করার পরে ওকে রাজশাহী মহিলা কলেজে ভর্তি করি। পড়ালেখায়ও মোটামুটি ভালোই ছিল। জানতাম না সে পড়া অবস্থাতেই একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে। কিছুদিন আগেই আমরা জানতে পারি।
লিজার খালু ইকরামুল ইসলাম বলেন, কলেজে পড়া অবস্থাতেই চলতি বছরের শুরুতে রাজশাহী কলেজের ছাত্র সাখাওয়াতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে লিজার। এরপর তারা বিয়েও করে। তবে এই বিয়ের কথা কেউই জানত না। এক সময় লিজা সাখাওয়াতকে বাড়িতে বিয়ের কথা জানাতে বললে সাখাওয়াত তাতে রাজি হয়নি। এরপর লিজা বিয়ের তিন মাস পর একদিন নাম্বার জোগার করে শ্বশুর শাশুড়িকে ফোন দিয়ে সব কথা বলে। বড়লোক পরিবার হওয়ায় তারা লিজাকে মেনে না নিয়ে রাগারাগি করতে থাকে। এরপর তারা সাখাওয়াতকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার খান্দুরা গ্রামের বাড়িতে ডেকে নিয়ে অনেকদিন আটকে রাখে।
পরে একদিন লিজা তাদের ওই বাড়িতে যায়। সেখানে তার শাশুড়ি ননদ মিলে তাকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এরপর লিজা রাজশাহী এসে সাখাওয়াতকে ফোন দেয়। তখন সাখাওয়াত লিজাকে বলে, তুমি আমাকে তালাক দিয়ে দাও, তুমি কত টাকা চাও বলো, আমি পাঠিয়ে দেব।
সর্বশেষ গায়ে আগুন দেয়ার এক সপ্তাহ আগেও লিজা তার শ্বশুর বাড়িতে যায়। সেখানে তাকে আবার মারধর করা হয়। পরে লিজা শাহ মখদুম থানায় যায় মামলা করতে। পুলিশ ছেলের নাম ঠিকানা জানার পরে আর মামলা নেয়নি। যদি পুলিশ তার মামলা নিত তাহলে তো আর লিজা এই কাজ করত না। মারাও যাইত না মেয়েটা।
উল্লেখ্য, গত শনিবার দুপুরে রাজশাহীর শাহ মখদুম থানার পাশে নিজের গায়ে আগুন দেয় কলেজ শিক্ষার্থী লিজা রহমান। এর পর ওইদিন রাতেই তাকে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।