বিধাতার ছাড়পত্র

আগের সংবাদ

ইঞ্জিনের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গেল বগি

পরের সংবাদ

মহাপূজার আয়োজনে আমাদের জীবন উদার হোক

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ , ৭:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ৭:১৬ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

‘ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া।।’
(চণ্ডী-১১/৫)
হে দেবী, আপনি অনন্তবীর্যা বৈষ্ণবী শক্তি (বিষ্ণুর জগৎ পালিনী শক্তি)। আপনি বিশ্বের আদি কারণ মহামায়া।
মহামায়া দুর্গাদেবী, তিনি কে? তিনি কি ভগবান? কেন তাঁর পূজা করি। এই প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। ঋগবেদ (১০ম মণ্ডল ১০ অনুবাক ১২৫ সূক্ত) ‘দেবীসূক্ত’-তে আদ্যাশক্তি মহামায়াকে জগৎপ্রসবিনী মাতৃরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি পরমেশ্বর ভগবানেরই বহিরঙ্গা শক্তি। এই জড় জগতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। পরাক্রমশালী অশুভ শক্তি বিনাশের জন্যই দেবী দুর্গার পূজা করা হয়। সংসারাশ্রমী সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যই মহা বিপদ, ঐশ্বর্যই মহা সম্পদ আর জীবনযাত্রাই হলো যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মহাবিপদের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে মায়ের অনুগ্রহে মহাসম্পদ লাভ করার জন্যই আমরা তাঁর পূজা করি। শারদীয়া দুর্গাপূজা মাতৃপূজা। ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং অশুভশক্তি নাশের জন্য শরৎকালীন এই পূজার প্রচলন করেন। তাঁর সম্পর্কে মহর্ষি বাল্মিকী দেবর্ষি নারদমুনির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রীরামচন্দ্র সর্ব গুণে গুণান্বিত। তিনি ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব এই চতুর্বেদের অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। এ ছাড়া ষড়দর্শনের অন্তর্ভুক্ত জ্ঞানও তাঁর অধিগত। রাবণ বধ ও দেবী সীতা উদ্ধারের নিমিত্ত শ্রীরামচন্দ্র অকাল বোধন করে নবরাত্র ব্রতে দেবীদুর্গার পূজা করেছিলেন। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অশুভ মহাশক্তি দুর্যোধন বাহিনীকে পরাজিত করার সৌভাগ্য লাভ করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহামায়া দুর্গাদেবীর স্তবস্তুতি করে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অর্জুন মহাশয়কে উপদেশ প্রদান করেন। (মহাভারত)। তখন অর্জুন মহাশয় মহাদেবী দুর্গার স্তোত্র পাঠ করেন-
“ভদ্রকালি, নমস্তুভ্যং মহাকালি নমস্তুতে।
চণ্ডি, চণ্ডে, নমস্তুভ্যং তারিণি বরবর্নিনি।।”
দেবতা ও মানুষের মধ্যে আকৃতিগত মিল থাকলেও অন্যান্য অমিল বহুবিধ। এর মধ্যে অন্যতম হলো দিন ও রাত্রি পরিমাপের। মানুষের একদিন হয় বার ঘণ্টায়। দেবতাদের দিবা সমান মানুষের ছয় মাস। অর্থাৎ মাঘ মাস থেকে আষাঢ় এই ছয় মাস হলো উত্তরায়ণ। এ সময় দেবতাদের দিবাকাল। আর শ্রাবণ থেকে অগ্রহায়ণ এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন অর্থাৎ দেবতাদের রাত্রিকাল। এই সময় দেবদেবীগণ নিদ্রায় থাকেন।
শরৎকালের নির্মল আকাশ, বর্ষায় স্নাত পবিত্র প্রকৃতির রূপটি যেন আনন্দময়ীর আগমনী সুর আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। উদ্বেল হয়ে ওঠে অপেক্ষমাণ বাঙালির হৃদয়। শরৎকাল দক্ষিণায়নের মধ্যে পড়ে। দেবী ভগবতী তখন নিদ্রিতা। সেই জন্যই পূজা করতে হলে দেবীর জাগরণের জন্য বোধন করতে হয়। আর বসস্তকাল পড়ে উত্তরায়ণের মধ্যে। তখন দেবী জাগ্রত থাকেন। মহারাজ সুরথ করেছিলেন বাসন্তী পূজা। আর শ্রীরামচন্দ্র করেছিলেন শারদীয়া পূজা।
ব্রহ্মবৈবর্ত্য পূরাণে আছে-
‘পূজিতা সুরেথনাদৌ দেবী দুর্গতিনাশিনী।
মধুমাস- সিতাষ্টম্যাং নবম্যাং বিধিপূর্বকম্।।’
আদিতে সুরথরাজা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার অর্চনা করেছিলেন। চৈত্রমাসের শুক্লাষ্টমী ও নবমী তিথিতে সর্ব প্রকার শাস্ত্র বিধিমতে। সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য দুজনে একত্রিত হয়ে এই পূজা করেছিলেন ঋষির আদেশে। ঋষি বলেছিলেন-
‘তামুপৈহি মহারাজ শরণং পরমেশ্বরীং
আরাধিতা সৈব নৃনাং ভোগস্বর্গাপদবর্গদা।।’ (চণ্ডী ১৩/৪-৫)
অর্থাৎ ‘হে মহারাজ সেই পরমেশ্বরীর শরণ লও, যিনি আরাধিতা হলে মানুষকে ভোগ স্বর্গ ও মুক্তি প্রদান করেন।’
মায়ের আর্চনা করে সুরথ রাজা ভোগ ও স্বর্গ পেয়েছিলেন আর সমাধি বৈশ্য মুক্তিলাভ করেছিলেন। এই বাসন্তীপূজার কাহিনী মূল চণ্ডীতে সংক্ষেপে ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে।
শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে যে দুর্গোৎসব করেছিলেন তার কথা দেবীভাগবতে ও কালিকাপুরাণে বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। দেবী দক্ষিণায়নে নিদ্রিতা। তখন দেবতাগণ ব্রহ্মার সাথে দেবীর স্তব করতে লাগলেন। স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী কৌমারী মূর্তি রূপে আবির্ভূতা হলেন। সেই কৌমারী রূপের বর্ণনা শ্রীশ্রী চণ্ডীতে পাই-
‘ময়ূর কুক্কুট বৃতে মহাশক্তিরেহনঘে
কৌমারী রূপসংস্থানে নারায়ণী নমোহস্তুতে।।’ (চণ্ডী ১১/১৫)
কৌমারীদেবী কুমার কার্ত্তিকেয়ের শক্তি, মহাশক্তিধারিণী নিষ্পাপা। তিনি প্রকটিভূতা হয়ে ব্রহ্মাকে বললেন- বিল্বমূলে দেবীর বোধন করলে প্রার্থনায় তিনি প্রসন্ন হয়ে বোধিতা হবেন। তারপর জগন্মাতাকে যথাবিধি অর্চনা করলে শ্রীরামচন্দ্রের কার্য সিদ্ধি হবে। দেবতাগণসহ ব্রহ্মা বোধনস্তব করলেন-
‘জানে দেবীমীদৃশীং ত্বাং মহেশীং
ক্রীড়াস্থানে স্বাগতাং ভূতলেহ্ স্মিন্ ।।’
মহাদেবী তুমিই যে মহেশ্বরী এ কথা আমি নিশ্চিতরূপে জেনেছি। ভূতলে তোমার ক্রিড়াভূমি, তাই তুমি এখানে আগমন করেছ।
‘সা ত্বং শুদ্ধা রামমেকং প্রবর্ত্ত
তৎ ত্বাং দেবীং বোধয়ে নঃ প্রসীদ।।’
-‘তুমি সমস্ত শক্তি নিয়ে শ্রীরামচন্দ্রে প্রবর্তিত হও। সমগ্র শক্তি দ্বারা তুমি রামচন্দ্রকে সাহায্য কর।’ মহাদেবী দুর্গা ভগবানেরই বহিরঙ্গা শক্তি আর শ্রীরামচন্দ্র ভগবান স্বয়ং তাঁকে সাহায্য করার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তবুও জগৎবাসীদের শিক্ষা দেয়ার জন্যই শ্রীব্রহ্মা এই জড় জগতের অধীষ্ঠাত্রী মহামায়া দুর্গাদেবীর স্তুতি করলেন।
বোধনের ফলে দেবী সদ্য জাগরিতা হয়ে বললেন- ‘আমি সপ্তমী তিথীতে শ্রীরামচন্দ্রের দিব্য ধনুর্বাণে প্রবেশ করব। অষ্টমীতে শ্রীরাম-রাবণের যুদ্ধ হবে। আর অষ্টমী নবমীর মহাসন্ধি ক্ষণে রাবণের দশ মাথা ভূমিতে লুটাইবে। দশমীতে শ্রীরামচন্দ্র বিজয়োৎসব করবেন। এভাবে মহাদেবী বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত সমস্ত জানিয়ে দিলেন। রঘুনন্দন স্মৃতিতে দুর্গোৎসবের ছয়টি কল্প বিধান আছে। কৃষ্ণনবম্যাদি কল্প, ষষ্ঠাদি কল্প, সপ্তম্যাদি কল্প, মহাষ্টম্যাদি কল্প, মহানবমী কল্প। এর মধ্যে বঙ্গ দেশে, বিহার ও আসাম অঞ্চলে ষষ্ঠাদি কল্প প্রচলিত আছে। এই কল্পানুসারে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যাকালে বিল্ব বৃক্ষের শাখায় দেবীর বোধন হয়। তারপর আমন্ত্রণ ও অধিবাস করা হয় ঘটে। সপ্তমীর দিন থেকে চার দিন মৃন্ময়ী প্রতিমায় দেবীর পূজা করা হয়। আর কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পে, যথাক্রমে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা নবমীতে ও আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদে দেবীর বোধন করা হয়। প্রথম কল্পে পক্ষকালব্যাপী ও দ্বিতীয় কল্পে নবরাত্রি মায়ের অর্চনা হয়ে থাকে।
মহাশক্তির আবির্ভাবে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করে সীতা দেবীকে উদ্ধার করেন। মহাবিপদ কেটে গেল বলে এই অষ্টমীর নাম হলো মহাষ্টমী। মহা সম্পদ লাভ হলো তাই নবমীর নাম হলো মহানবমী।
‘মহাবিপত্তারকত্বাদ্ গীয়তে হসৌ মহাষ্টমী।
মহাসম্পদ্দয়কত্বাৎ সা মহানবমী মতা।’
শ্রীরামচন্দ্রের এই দুর্গোৎসবের স্মরণেই আমাদের এই শারদীয়া মহাপূজা। যিনি পূজক তিনি স্থিত শ্রীরামচন্দ্রের ভূমিকায়। সংসারাশ্রয়ী সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যই মহাবিপদ, ঐশ্বর্যই মহাসম্পদ, আর জীবন যাত্রাই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মহাবিপদের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে মহাসম্পদ লাভ মায়ের অনুগ্রহেই হয়ে থাকে।
‘দারিদ্র্যদুঃখভয়হারিণী কা ত্বদন্যা।’ – (চণ্ডী ৪/৭)
যারা জ্ঞানমার্গের সাধক অজ্ঞানতাই তাদের মহাবিপদ, ব্রহ্মজ্ঞানই পরম ধন। মহাদেবীর অর্চনায় সাধন যুদ্ধে তাঁরা জয়লাভ করেন। কারণ জগজ্জননী নিজেই মূর্ত্তব্রহ্মজ্ঞানস্বরূপিণী। আর ভক্তিপথের উপাসক ভক্তরা বনবাসী শ্রীরামচন্দ্রের ভূমিকায় নিরন্তরই ব্যথিত। তাঁদের হৃদয়ের ভক্তিরুপিণী রাবণ এই ভাবনা সর্বদাই তাঁদের বেদনাতুর করে। যোগমায়া কাত্যায়নীর আরাধনায় মহাপরাধরূপী দশাননের বধ হয় অষ্টমীতে, প্রেমরূপিণী সীতা উদ্ধার হয় নবমীতে, দশমীতে এই পরম সত্যানুভূতিকে হৃদয়ের গভীর তলদেশে চিত্ত দর্পণে নিরঞ্জন করে ভক্ত সাধক বিশ্ব মানবকে ভাই বলে আলিঙ্গন করেন। মানব সভ্যতা আজ ভোগমুখী। ভোগ প্রবণতাই অকাল। আমাদের অকাল বোধন সফল হোক। বৃক্ষের পরিচয় ফলে। বিশ্বমাতার পূজার পরিচয় বিশ্বভ্রাতৃত্বের প্রসারে। মহাপূজার আয়োজনে উৎসবমুখর আমাদের জীবন আকাশের মতো উদার হোক, বাতাসের মতো স্নিগ্ধ মধুর হোক। মায়ের প্রণাম মন্ত্র-
‘সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমস্তুতে।।’ (শ্রীশ্রীচণ্ডী ১১/১০)