শারদীয় শুভেচ্ছা

আগের সংবাদ

মাঝিবিহীন নৌকা ভ্রমণ, ডুবে প্রাণ হারালো দুই ছাত্র

পরের সংবাদ

বাঙালির দুর্গাপূজা ও অসাম্প্রদায়িকতা

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ , ৮:২২ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০১৯, ৮:২২ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

বাঙালির ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতিরও মর্মমূলে নিহিত আছে ধর্মনিরপেক্ষ অন্তঃসার, তার ধর্মীয় উৎসবও সর্বজনীনতার সম্পদে সমৃদ্ধ এবং সদা গতিশীল ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদী। সাম্প্রদায়িক মানস প্রতিবন্ধে আক্রান্ত সমালোচকরা যাই বলুন, সুস্থ বাঙালি সংস্কৃতির সাধকদের কেউই সাম্প্রদায়িক হিন্দু, খ্রিস্টান, ব্রাহ্ম বা মুসলমান নন- তাঁরা কেবলই মানুষ।

দুর্গোৎসবে আধুনিক মাত্রা ও তাৎপর্যও যুক্ত হয়েছে অনেক। সেসবের স্বরূপ সন্ধানের জন্য উদ্যোগী পর্যবেক্ষকদের এগিয়ে আসা উচিত। বিশেষ করে বিগত পঞ্চাশ বছরে বাঙালির সমাজ জীবনের ভাঙা-গড়ার সঙ্গে তাল রেখে দুর্গোৎসবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে ও এর বহিরঙ্গীয় বিন্যাসে কত যে চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটেছে এবং এসবের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য যে কত গভীর- তা নিয়ে তেমন কোনো পর্যালোচনাই এ পর্যন্ত হয়নি। অথচ সে রকম পর্যালোচনার প্রয়োজনকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যায় না।
আমরা অবশ্য এখানে সে পর্যালোচনায় প্রবৃত্ত হচ্ছি না, শুধু বিষয়টির প্রতি এ যুগের মেধাবী তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তবে দুর্গোৎসবের প্রসঙ্গ সূত্রে আমরা মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল- বাংলার এই তিন দিকপাল কবির ভাবনার কথা স্মরণ করতে চাই। ধর্মসাম্প্রদায়িক বিচারে এঁরা কেউই ‘হিন্দু’ নন। একজন খ্রিস্টান, একজন ব্রাহ্ম ও আরেকজন মুসলমান। এঁদের এই ‘অহিন্দু’ পরিচয়ে অনেক সাম্প্রদায়িকতাবাদী সাহিত্য-সমালোচক খুবই আনন্দিত হয়েছেন। যেমন, প্রয়াত কবি গোলাম মোস্তফা। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ‘হিন্দু’ ও ‘অহিন্দু’ রূপসন্ধানের অপপ্রয়াসে তাঁর মধ্যে এক ধরনের মানস প্রতিবন্ধের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রতিবন্ধ থেকেই তিনি প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন যে, বাংলাভাষার সৃষ্টিতে ‘হিন্দু’দের কোনো অবদান তো নেই-ই, আর আধুনিক বাংলা সাহিত্যও তৈরি হয়েছে ‘খ্রিস্টান’ মাইকেল, ‘ব্রাহ্ম’ রবীন্দ্রনাথ ও ‘মুসলমান’ নজরুলের হাতে। এ রকম সাম্প্রদায়িক মানস প্রতিবন্ধ এখনো অনেকের মধ্য থেকে দূর হয়নি। এখন তো বরং ভারত ও বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের প্রাদুর্ভাবে সংস্কৃতির সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা অনেক বেশি জোরদার হয়ে উঠছে। এ রকম এক কাল পটভূমিতে আমরা যখন বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গরূপে দুর্গোৎসবের বহুমুখী তাৎপর্য সন্ধানে নিরত হয়েছি, তখন গোলাম মোস্তফা কথিত তিন ‘অহিন্দু’ কবির দুর্গোৎসববিষয়ক ভাবনার পরিচয় নিলে অবশ্যই লাভবান হব।
প্রথমেই ধরা যাক ‘খ্রিস্টান’ মাইকেল মধুসূদনের কথা। হিন্দুদের কূপমণ্ডূকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্যই যে তিনি খ্রিস্টান হয়েছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সে জন্য কি তিনি বাঙালির সংস্কৃতি সম্পদকে ‘হিন্দু’ আখ্যা দিয়ে পরিত্যাগ করেছিলেন? করেননি যে তার প্রমাণ তো তার সমগ্র সাহিত্যকর্মেই বিধৃত হয়ে আছে। বিদেশে গিয়ে তিনি বাঙালি সংস্কৃতির ধর্মীয় উপাদানের ধর্মনিরপেক্ষ তাৎপর্য বেশি করে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর সে উপলব্ধি রূপ পেয়েছে ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র মধ্যে। অন্তত দুটি সনেট- ‘আশ্বিন মাস’ ও ‘বিজয়া-দশমী’ তো মাইকেল মধুসূদনের দুর্গোৎসব-স্মৃতি নিয়ে রচিত। সে স্মৃতি কোনো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করেনি, সাংস্কৃতিক সর্বজনীনতাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে।
‘খ্রিস্টান’ মাইকেলের মতো ‘ব্রাহ্ম’ রবীন্দ্রনাথও একই পথের পথিক। কট্টর পৌত্তলিকতাবিরোধী কবি সার্বভৌমের পক্ষেও পৌত্তলিক দুর্গোৎসবের সাংস্কৃতিক আনন্দ উপভোগে কিছুমাত্র অসুবিধার সৃষ্টি হয়নি। শরৎকালের বাংলায় তিনি ঠিকই অনুভব করেন যে, ‘আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে।’ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দেখেন, ‘ওই ধনীর দুয়ারে দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে।’ পূজার দিনের ভোরবেলায় উৎসবের হাসি কোলাহল শুনতে পেয়ে নিজের নিরানন্দ ঘর ছেড়ে কাঙালিনী মেয়েটি ছিন্নমলিন বসন পরে ধনীর দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে ঐশ্বর্যরাশির মধ্যে এই অনাথা কাঙালিনী মেয়েটি তো মূর্তিমতী অসঙ্গতি। এই অসঙ্গতি দূর না-করে যে দুর্গোৎসব প্রকৃত আনন্দময় ও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে না- রবীন্দ্রনাথ এ কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন,
অনাথ ছেলেরে কোলে নিবি
জননীরা আয় তোরা সব,
মাতৃহারা মা যদি না পায়
তবে আজ কিসের উৎসব!
দ্বারে যদি থাকে দাঁড়াইয়া
ম্লানমুখ বিষাদে বিরস,
তবে মিছে সহকার-শাখা
তবে মিছে মঙ্গল কলস।

মাতৃপূজার অনুষ্ঠান যদি মায়ের সন্তানদের প্রতি সক্রিয় স্নেহ-মমতারই উদ্বোধন না ঘটাতে পারে, তবে সে তো নিতান্তই জড় আনুষ্ঠানিকতা। এ রকম আনুষ্ঠানিকতায় উৎসবের উত্তুঙ্গ মহিমার প্রকাশ ঘটে না, উৎসব নামটিই তার ব্যর্থ হয়ে যায়। মাতৃপূজার উৎসবকে সার্থক করে তোলার জন্যই তো কবি ডাক দেন-
এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান-
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খ্রিস্টান।
এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার-
এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার।
মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা, মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা
সবার পরশে-পবিত্র করা তীর্থনীরে-

এখানে যে ‘মার অভিষেকে’র কথা কবি বলেছেন সেই ‘মা’ অবশ্যই দেশমাতৃকা। বাঙালির মাতৃপূজাও তো আসলে দেশমাতৃকার পূজা থেকে আলাদা নয়। বিদেশি শাসনবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের যুগে মাতৃপূজায় এই বিশেষ মাত্রাটি যুক্ত হয়। এতকাল মাতৃপূজার মণ্ডপে ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল একত্রে মিলিত হতে পারত না, বারোয়ারি পূজাতেও ‘সবার পরশে পবিত্র-করা তীর্থনীরে’ মঙ্গলঘট ভরা হতো না। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই এ অবস্থার পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। সবাই যখন দেশ মায়ের ডাকে একত্রে মিলিত হয়, তখন দুর্গা মায়ের পুজারিদের মধ্যেও রূপান্তরের ছোঁয়া লাগে, দুর্গোৎসবও অধিক পরিমাণে সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

এই সর্বজনীনতারই আরো সম্প্রসারণ ঘটে ‘মুসলমান’ নজরুলের কবিতায়। মুসলমানত্বের কোনো রূপ ব্যত্যয় না ঘটিয়েই নজরুল বাঙালিত্বকে সমগ্র সত্তায় ধারণ করতে পেরেছিলেন। তাই বাঙালির দুর্গোৎসবে দেশের সংকটকালে দুর্গা দেবীকে কবি অভিমানক্ষুব্ধ কণ্ঠে অনুযোগ জানান-
আর কতোকাল থাকবি, বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল।
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক কবিতার প্রথম দুই পঙ্ক্তিতে যে ‘স্বর্গে’র কথা কবি বলেছেন, সে স্বর্গ যে তাঁর মাতৃভূমি আর ‘অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল’ যে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী- এ কথা তো সহজেই বোঝা যায় এবং শাসকরাও তা ঠিকই বুঝেছিল। আর এরই জন্য রাজদ্রোহের অভিযোগে কবিকে দেয়া হয় কারাদণ্ড। নজরুলের এই কবিতা ও কবিতার জন্য দণ্ডলাভ- বাঙালির দুর্গোৎসবে আরো একটি নতুন মাত্রা যোগ করল। দুর্গোৎসব শুধু গতানুগতিক ধর্মীয় উৎসব যে নয়, এর মধ্যে যে আছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও বিদ্রোহেরও উপাদান- নজরুল সে সত্যেরও উন্মোচন ঘটালেন। সে সত্যের প্রতি সব বাঙালির সক্রিয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই তিনি লিখলেন আরেকটি অসাধারণ কবিতা- ‘পূজা-অভিনয়’। প্রতি বছরের নিষ্প্রাণ ও গতানুগতিক দুর্গাপূজাকে তিনি নিতান্ত অভিনয় ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেননি। তিনি এর পৌরাণিক উৎসটির কথা স্মরণ করেই বললেন-
এমনি শরৎ সৌরাশ্বিনে অকাল বোধনে মহামায়ার
যে পূজা করিল বধিতে রাবণে ত্রেতায় স্বয়ং রামাবতার,
আজিও আমরা সে দেবী-পূজার অভিনয় ক’রে চলিয়াছি।
পৌরাণিক কাহিনীর রাম-রাবণের যুদ্ধের এক নতুন তাৎপর্যও তিনি নিষ্কাশন করেন। তাঁর মতে ‘সীতা’ হচ্ছে শস্য, ‘রাবণ’ হচ্ছে সেই লোভী ধনিক যে কৃষকের উৎপাদিত শস্য হরণ করে নিয়ে যায়, আর ‘রাম’ হচ্ছেন সেই কৃষক-নেতা যিনি অত্যাচারী ও শোষক রাবণকে উৎখাত করার শক্তিলাভের বাসনাতেই অকাল বোধনে মহাশক্তি দুর্গা দেবীর পূজা করেন। অথচ এ কালে আমরা শ্রীরামচন্দ্রের দুর্গাপূজার আসল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে পূজার অভিনয় নিয়েই মেতে রয়েছি। তাই কবির ক্ষুব্ধ জিজ্ঞাসা-
কে ঘুচাবে এই পূজা-অভিনয়, কোথায় দূর্বাদল-শ্যাম
ধরণী-কন্যা শস্য-সীতারে উদ্ধারিবে যে নবীন রাম!
কবি অবশ্যি প্রচণ্ড আশাবাদী। এই বাংলার বুকেই সেই নবীন রামের অভ্যুদয় সম্ভাবনা ব্যক্ত করেন তিনি-
দশমুখো ঐ ধনিক রাবণ, দশদিকে আছে মেলিয়া মুখ,
বিশ হাতে করে লুণ্ঠন তবু ভরে না ক ওর ক্ষুধিত বুক।
হয়ত গোকুলে বাড়িছে সে আজ, উহারে কল্য বধিবে যে,
গোয়ালার ঘরে খেঁটে-লাঠি করে হলধর-রূপী রাম সেজে!
অন্য সব কথা বাদ দিলাম। বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গোৎসবের বিচিত্র মাত্রাগুলোর প্রতিই যদি শুধু দৃষ্টি দিই তাহলেও দেখব যে- বাঙালির ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতিরও মর্মমূলে নিহিত আছে ধর্মনিরপেক্ষ অন্তঃসার, তার ধর্মীয় উৎসবও সর্বজনীনতার সম্পদে সমৃদ্ধ এবং সদা গতিশীল ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদী। তাই কোনো উৎসব যদি বাহ্যত হিন্দুর ধর্মীয় উৎসবও হয় তবু তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে খ্রিস্টান, ব্রাহ্ম বা মুসলমান কবির বাধে না। সাম্প্রদায়িক মানস প্রতিবন্ধে আক্রান্ত সমালোচকরা যাই বলুন, সুস্থ বাঙালি সংস্কৃতির সাধকদের কেউই সাম্প্রদায়িক হিন্দু, খ্রিস্টান, ব্রাহ্ম বা মুসলমান নন- তাঁরা কেবলই মানুষ।
কিন্তু কোটি কোটি সন্তানকে ‘মুগ্ধ জননী’ এখনো যে কেবলই ‘বাঙালি’ করে রেখেছেন, ‘মানুষ’ করেননি- কবির ব্যথাদীর্ণ অন্তরের এই অভিযোগ আজো মিথ্যা হয়ে যায়নি। এখন তো আবার ‘মানুষ’ দূরে থাক ‘বাঙালি’ হওয়াটাও অপরাধ বলে বিবেচিত হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক পরিচয়কেই সর্বার্থসার করে তোলা হচ্ছে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও সংস্কৃতির সাম্প্রদায়িক ভাষ্য প্রচারে আদাজল খেয়ে লেগে গেছেন। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পরাজয়ে উল্লসিত হয়ে বাঙালি হিন্দুরা মহাধুমধামের সঙ্গে দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেছিল- এমন অভিনব তথ্যও আমাদের শুনতে হয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কর্তৃত্ববান ব্যক্তির মুখ থেকে।
হায় মা তারা, দাঁড়াই কোথা?

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা