প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর

আগের সংবাদ

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ও কবি নজরুল

পরের সংবাদ

ইতিহাস এবং সাহিত্যের পরিচায়ক দুর্গোৎসব

বিশ্বজিৎ দত্ত অমিত

প্রকাশিত হয়েছে: October 3, 2019 , 7:43 pm

বছর ঘুরে আবারো শরতের আগমনে ধরণীবাসীর মন আনন্দে উদ্বেল, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হৃদকমল পুনরায় মহামায়া দেবী দুর্গার আগমনী ধ্বনিতে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। পারিবারিক এবং সর্বজনীন পূজামণ্ডপে মায়ের আসন পেতে মাতৃসন্তানরা অধীর আগ্রহে মায়ের আগমনের অপেক্ষায়। যখনই জগতে অসুর রিপুধারীদের অত্যাচারে ঈশ্বরের সৃষ্টি তাপিত, অত্যাচারিত হয়েছে তখনই ভগবান নানা সময়ে, নানারূপে অবতীর্ণ হয়ে অসুর বিনাশ করে জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। রক্ষা করেছেন আপন সৃষ্টিকে। দেবী যোগমায়াও ঈশ্বরের অভিন্ন অংশ। শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ থেকে আমরা পাই- ভগবান যোগমায়াকে বলেছিলেন যে, দেবী আপনি কংসের কারাগারে আমার জন্ম সম্পন্ন হওয়ার পর পৃথিবীতে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে এবং রূপে পূজিতা হবেন। এরপর থেকেই দেবী যোগমায়া পৃথিবীর একেক স্থানে একেক নামে এবং রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন। দেবী যোগমায়া স্বয়ং বৈষ্ণিবীরূপিণী। শ্রীশ্রী চণ্ডী বলছেন-

ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরনন্তবীর্য্যা
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া।
সম্মোহিতং দেবী! সমস্তমেতৎ-
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতু ॥
-একাদশ অধ্যায়, পঞ্চম শ্লোক।
অর্থাৎ- তুমি মহাবিষ্ণুর শক্তিরূপে অবস্থিতা, তোমার বীর্য অপরিসীম, তুমি বিশ্বের মূল কারণ এবং পরম মায়ারূপে এই সমস্ত জগৎ সম্মুগ্ধ করে রেখেছ, তুমি প্রসন্না হলে মুক্তি প্রদান করে থাক।
‘বৈষ্ণবী’ নামের সাথে ‘বিষ্ণু’ নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেবীকে গরুড়বাহনাও বলা হয়েছে। বৈষ্ণবীশক্তি বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে দেবী দুর্গা হচ্ছেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পালনী শক্তি। অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান শ্রীবিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী। তিনি মাতৃস্বরূপে সমগ্র বিশ্বের সকল সন্তানকে পালন করছেন। সন্তানদের যেমন মা নিজের সর্বস্ব দিয়ে রক্ষা করেন সকল আপদ-বিপদ থেকে, দেবী মহামায়াও একইভাবে সন্তানদের সকল দুঃখ এবং ক্লেশ দূর করেন। কেবল মানুষ নয়, বনের হিংস্র পশু পর্যন্ত সন্তানের জন্য বিপজ্জনক বস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুকে ধ্বংসের প্রচেষ্টা করে তেমনি মা দুর্গাও তাঁর নিরীহ সন্তানদের ওপর যখন হিংস্র অসুরতার কলুষতা গ্রাস করে তখনই দেবী অবতীর্ণ হয়ে নাশ করেন অসুরকুলকে। তাই দেবীর অপর নাম অসুরবিনাশিনী। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বর্ণিত আছে বৈষ্ণবীশক্তিরূপিণী অসুরবিনাশিনী দেবী দুর্গার রূপের কথা। ‘মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী’-
অর্থাৎ ‘দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন’। অপার করুণাময়ী দেবী দুর্গা শাস্ত্রমতে প্রতি বছর হিমালয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন বসন্তকালে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে। দেবীর সঙ্গে বাহনসমেত আসেন দেবীর চার ছেলেমেয়ে। কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী এবং সরস্বতী। শরৎকালে দেবীর পূজাকে ‘অকাল বোধন’ বলা হয়। যার পেছনে রয়েছে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র চরিত কৃত্তিবাস রচিত ‘শ্রীরামায়ণ’-এর উপাখ্যান। লঙ্কার রাজা রাবণ ছিলেন মহাকালের সেবক। দেবাদীদেব সর্বদা রাবণকে রক্ষা করতেন। শিবের কৃপায় সর্বদা বিজয়চিহ্ন রাবণের ললাটে চিত্রিত থাকত। রাবণকে বধ করা তাই শ্রীরামচন্দ্রের পক্ষে কঠিন হয়ে গিয়েছিল। দেবতারা শ্রীরামচন্দ্রের মঙ্গলের কথা ভেবে মহাদুশ্চিন্তায় পড়লেন। দেবতারা সবাই মিলে ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ব্রহ্মা পরামর্শ দিলেন একমাত্র দেবী ভগবতীর কৃপা হলে রাবণ বধ সম্ভব। কিন্তু তখন ছিল শরৎকাল। শরৎকালে দক্ষিণায়ন বিদ্যমান। অর্থাৎ দেব-দেবীগণ তখন নিদ্রায় থাকেন। ব্রহ্মা তখন দেবতাদের নিয়ে দেবীর স্তব করতে আরম্ভ করলেন। স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী ‘কৌমারী’ মূর্তি রূপে আবির্ভূতা হলেন। কৌমারী দেবীকে বলা হয় কুমার কার্তিকের শক্তি। তিনি ব্রহ্মাকে বললেন যে, আপনারা আগামীকাল বিল্ববৃক্ষমূলে মায়ের বোধন করবেন। জগন্মাতা জাগ্রত হয়ে কৃপা করলে শ্রীরামচন্দ্রের কার্যসিদ্ধি হবে নিশ্চিত। পরদিন ব্রহ্মা মর্ত্যে একটি নির্জন স্থানে একটি বিল্ববৃক্ষ দর্শন করলেন। তিনি সেই বৃক্ষের এক মনোহারিণী কিশোরীকে বিনিদ্রিতা অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি সেই কিশোরীকে দেবী জ্ঞান করে বোধনস্তবপূজা করতে লাগলেন। ব্রহ্মার স্তবে দেবী জাগ্রত হয়ে চণ্ডিকারূপ ধারণ করলেন। ব্রহ্মা তখন করজোড়ে দেবীকে অকালে বোধন করার কারণ জানালেন। ব্রহ্মা বললেন, ‘তোমাকে অকালে আহ্বান করেছি শ্রীরামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্য, অনুগ্রহ করার জন্য। রাবণ বধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা তোমার আরাধনা করব। আমরা যে প্রকারে বোধন করে তোমার পূজা করেছি সেইভাবে জগতের সকল নর-নারী সৃষ্টির অন্তিমকাল পর্যন্ত তোমার পূজা করবে। তুমি কৃপা করে রাবণ বধে শ্রীরামচন্দ্রের সহায়ক হও’। দেবী তখন বললেন, ‘আমি সপ্তমী তিথিতে শ্রীরামচন্দ্রের দিব্যধনুর্বাণে প্রবেশ করব। অষ্টমীতে রাবণের সাথে শ্রীরামের যুদ্ধ হবে এবং অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমাথা ভূলুণ্ঠিত হবে। দশমীতে শ্রীরামচন্দ্র বিজয়োৎসব করবেন। এভাবে ব্রহ্মা কর্তৃক ভগবান শ্রীরামচন্দ্র দেবীকে অকালে আহ্বান করলেন। আশ্বিনের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে দেবীর পূজা শুরু করলেন। সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী তিথিতে মহাআড়ম্বরে দেবী দুর্গার পূজা করলেন যথারীতি এবং বিধি অনুসারে। অষ্টমী তিথিতে ১০৮টি পদ্মফুল দ্বারা মায়ের পূজার আয়োজন করেছিলেন ভগবান শ্রীরাম। কিন্তু দেবী পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে ফেললেন। পূজার সময় ভগবান যখন দেখলেন একটি পদ্মের জন্য পূজা অসম্পূর্ণ হবে তখন ভগবানের মনে পড়ে গেল যে উনার আরেক নাম ‘পদ্মলোচন’ অর্থাৎ চোখ পদ্মের ন্যায়। তৎক্ষণাৎ ভগবান উদ্যত হলেন নিজের চোখ উৎপাটন করার জন্য। সাথে সাথে দেবী মহামায়া পুনরায় অবতীর্ণ হলেন এবং শ্রীরামচন্দ্রকে রাবণের সাথে যুদ্ধ করার কথা বললেন। শুক্লপক্ষের অষ্টমী এবং নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে এক মুহূর্ত অর্থাৎ ৪৮ মিনিট যুদ্ধ করার পর শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করলেন। তাই শরৎকালে এই দুই তিথির সন্ধিক্ষণে ‘সন্ধিপূজা’ করা হয়। এ সময় কেউ কেউ ১০৮টি প্রদীপ প্রজ¦লন করেন। দেবী মহামায়ার কৃপায় রাবণকে বধের পর শ্রীরামচন্দ্র যথাযথ শ্রদ্ধাসহিত দেবীর নবমীবিহিত পূজা সম্পন্ন করে সীতা দেবীকে উদ্ধার করে দশমী তিথিতে বিজয়োৎসব উদযাপন করলেন। তাই দশমী তিথিকে ‘বিজয়া দশমী’ বলা হয়। কিন্তু বসন্তকালের দুর্গাপূজার দশমী তিথিকে বিজয়া দশমী বলা হয় না। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে শরৎকালের দুর্গাপূজাকে বলা হয় ‘অকাল বোধন’। ভগবানের সেই অকাল বোধনই বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বছরের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়।
দেবী মহামায়ার কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে আমরা দেবীর পূজার আয়োজন করি। কারণ শাস্ত্র বলছে যে, দেবী যোগমায়ার কৃপা না হলে ভগবানের কৃপা লাভ করা অনেক দুরূহ। পরম কৃপালু ভগবানের কৃপার ভাণ্ডারের রক্ষাকর্ত্রী মহামায়া দেবী দুর্গা। রক্ষাকর্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হলে ভাণ্ডারে সঞ্চিত কৃষ্ণপ্রেমধন পাওয়াও অনেক কঠিন বিষয়। দেবী মহামায়া সকলের পুজ্য। সনাতন ধর্মাবলম্বী সকল বর্ণের, গোত্রের এবং জাতির পরম পুজ্য দেবী দুর্গা। বর্ণভেদে দেবীর আরাধনার পদ্ধতি বিভিন্ন হলেও মহামায়া দেবী দুর্গার পূজা করা সকলের অবশ্য পালনীয় ধর্ম। পূজা মানে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন। পরিবার মিলে সেই শ্রদ্ধা নিবেদনকে বলে ‘পারিবারিক পূজা’ এবং কয়েকটি পরিবার মিলে শ্রদ্ধা নিবেদন করলে তখন তাকে বলে ‘বারোয়ারি পূজা’ বা ‘সার্বজনীন পূজা’। দেবী দুর্গার পূজা বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোথাও বারোয়ারিভাবে, কোথাও পারিবারিকভাবে। স্থানভেদে কোনো কোনো স্থানে এই উৎসবের নাম শারদোৎসব আবার কোনো কোনো স্থানে ‘নবরাত্রি’ নামেও উদযাপিত হয়। পুরনো পারিবারিক পূজাগুলোকে ‘বনেদি বাড়ির পূজা’ বলা হয়। পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত সম্ভ্রান্ত এবং ধনী পরিবারগুলোতেই বেশি আয়োজিত হয়। পারিবারিক পূজাগুলোতে শাস্ত্রাচার পালনে আধিক্য থাকে। অন্যদিকে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা মিলে বারোয়ারি পূজা উদযাপিত করেন। শোনা যায়, বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম বারোয়ারি বা সার্বজনীন পূজার প্রচলন শুরু হয়। মূলত দেবী দুর্গার প্রতি মাতৃত্ববোধ থেকেই পরবর্তীতে দেশমাতা বা ভারতমাতা বা মাতৃভূমির জাতীয়তাবাদী ধারণার জন্ম নেয় যা পরে বিপ্লবের আকার ধারণ করে। দেবী দুর্গার মাতৃস্বরূপ ভাবনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি রচনা করেন যা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুভাষচন্দ্র বসুসহ অনেক স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রমুখ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সার্বজনীন পূজার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

শরৎকালের দুর্গাপূজা শারদীয় দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। পূজা বিষয়টি নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের অংশ হতে পারে কিন্তু উৎসব সর্বদা সার্বজনীন হয়ে থাকে। তাই শারদোৎসব সকলের উৎসব। উৎসব সর্বদা সামাজিক মিলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সমাজ বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতা, মানুষে মানুষে বিভেদ-মতভেদ, অন্যায়-অবিচার-ব্যভিচারসহ সকল অমানবিক এবং জগৎবিধ্বংসী কার্যকলাপে পরিপূর্ণ। শারদোৎসবের মতো সার্বজনীন মহোৎসব মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে এবং সমাজে শান্তি এবং সৌহার্দ্য স্থাপন করে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, গোত্র এসব থেকেই মূলত মতপার্থক্যের সূচনা হয়। সামাজিক সেতুবন্ধন নষ্ট করে সাম্প্রদায়িকতা। আর সমাজের সেতুবন্ধনকে সুদৃঢ় করে সামাজিক উৎসব এবং অনুষ্ঠানাদি। বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক দেশ। এ দেশের প্রায় সকল মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করেও অন্যদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। প্রতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসবেও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে অন্যান্য জাতি-ধর্মের মানুষরাও উৎসবে অংশগ্রহণ করে। আমি মনে করি অসাম্প্রদায়িক সমাজে সর্বদা শান্তি এবং সমৃদ্ধি বিরাজ করে। সুতরাং দেশে সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হলে দুর্গোৎসবের মতো সামাজিক উৎসবগুলো স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অবস্থানপূর্বক যথাযথ মর্যাদায় পালন করা উচিত। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বর্তমানে একসাথে দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে যা প্রমাণ করে দুর্গোৎসব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস এবং সাহিত্যের পরিচায়ক এবং পরিবাহক।