প্রকল্পের টাকার সঠিক ব্যবহার হলে দেশ আরও উন্নত হত

আগের সংবাদ

গিনেস বুকে নাম লেখাতে চান রানী হামিদ

পরের সংবাদ

কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না পুলিশের অপরাধ সংযোগ!

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯ , ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯ , ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

খাগড়াছড়ি-৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে ৭১ লাখ টাকার সংস্কার কাজে ধরা পড়েছে বিশাল অনিয়ম। ৭টি মেরামত/সংস্কারকাজ, ২টি মডিউল ট্রেন্ড ও একটি ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরুর ২০ দিনের মধ্যেই ১০০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে তুলে নেয়া হয় পুরো টাকা। অথচ ৪ মাস পরে তদারক কমিটি দেখতে পায় কাজের মাত্র ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এমনকি টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিধি মোতাবেক তদারক কমিটির সদস্য সচিবের স্বাক্ষরও নেয়া হয়নি, যা দেখে হতবাক হয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। অভিযোগ, খাগড়াছড়ি-৬ এপিবিএনের তৎকালীন অধিনায়ক (বর্তমানে মাদারীপুরের এসপি) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করে এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ সদর দপ্তর। উল্টো ঢাকা রেঞ্জের মধ্যে চলতি বছরের আগস্ট মাসে শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপারের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার নবাবপুরের ২২১ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম শামসুল হক খানের ৪ কাঠার বাড়িটি দখল করে নেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

অভিযোগ ওঠে তৎকালীন লালবাগ জোনের ডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান ওই প্রভাবশালী মহলের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেন। পরে বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে পুলিশি তদন্তে ডিসি ইব্রাহীমের সঙ্গে বংশাল থানার সাবেক ওসি মো. সাহিদুর রহমান (বর্তমানে কোতোয়ালি থানার ওসি) এবং নবাবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাহাঙ্গীর আলমের কাজে গাফিলতি পাওয়া যায়। ডিসি ইব্রাহীমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও ওই ওসি ও এসআইয়ের কিছুই হয়নি। জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যান ওসি সাহিদুর রহমান।
শুধু পুলিশের এই কর্মকর্তারাই নয়, সারাদেশেই সুযোগ পেলেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ সদস্যরা। সবশেষ রাজধানীতে ক্যাসিনো বাণিজ্য ঘিরেও পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স, মতিঝিল বিভাগ ও থানা পুলিশের কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের ঘুষ নিতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি অপরাধ করে কম শাস্তি পাওয়ায় পুলিশের অপরাধ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ জন্য যথাযথ আইন অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করলে অপরাধ করার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের অপরাধের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ইন্সপেক্টরদের সংখ্যা হাতে গোনা। এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের সংখ্যাও একদম নগণ্য। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের এসব কর্মকর্তা বিভিন্ন অপরাধ করলেও প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যান।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে কনস্টেবল থেকে এএসআই পদপর্যাদা পর্যন্ত মোট শাস্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৫০৩ জনের। এদের মধ্যে লঘুদণ্ড হয়েছে ১২ হাজার ৮৫৮ জনের। গুরুদণ্ড হয়েছে ৫৬৩ জনের। চাকরিচ্যুত হয়েছে ৮২ জন। যার মধ্যে ৭ জনকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ বছর ৮১ জন পরিদর্শককে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ৬ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুত হয়েছে মাত্র ১ জন। এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব ৩ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২ জনের শাস্তি গুরুদণ্ড। ২০১৭ সালে কনস্টেবল থেকে এএসআই পদমর্যাদার ১৪ হাজার ৬৫৮ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ১৩৩ জনকে লঘুদণ্ড, ৪৮৯ জনকে গুরুদণ্ড ও ৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক পদে শাস্তি পেয়েছে ৪৬ জন। যার মধ্যে মাত্র ৮ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ বছর এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব ৮ জন কর্মকর্তা শাস্তি পেয়েছে। যার সবাই লঘুদণ্ড। ২০১৮ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩১৫ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ১৩ হাজার ৬১৪ জনকে লঘুদণ্ড, ৬০০ জনকে গুরুদণ্ড, ৭৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক পদে ১৮ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ১৪ জনকে লঘু ও ৪ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ইনস্টিটিউশনের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, অপরাধের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততা নতুন কিছু নয়। এক সময় মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুললেও এখন পুলিশের কিছু কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ কাজটি করছেন। এর প্রধান কারণ, ওই পুলিশ সদস্য যখন দেখেন অল্প সময়ে অবৈধ পথে উপার্জন করা অর্র্থে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে, তখন চাকরি থাকার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত অপরাধীদের প্রলোভনে অল্প সময়ে ভালো কোথাও পোস্টিং বা পদোন্নতির স্বপ্ন দেখা। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করলে পুলিশের অপরাধ কমে আসবে। পাশাপাশি পেশাগত মানদণ্ড সঠিক রাখার সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা ভোরের কাগজকে বলেন, ২ লক্ষাধিক পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে পুলিশ বাহিনী। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন অপরাধ করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। গত বছরও প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এরপরও যদি কেউ বলেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না সেটি ঠিক হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আর সবার ক্ষেত্রে যে আইন পুলিশের ক্ষেত্রেও একই আইন। কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলেই তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে প্রচলিত আইন ও নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হয়। প্রক্রিয়াগত কারণে এটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়