না ফেরার দেশে আবৃত্তিশিল্পী কামরুল হাসান মঞ্জু

আগের সংবাদ

তালিকা ধরে অভিযান

পরের সংবাদ

নদী দূষণে এগিয়ে ওয়াসা

রাশেদ আলী :

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ , ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

নদী দূষণের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করলেও দেখা গেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এই কাজে। বুড়িগঙ্গার ৬৭টি বড় দূষণমুখের মধ্যে ৫৬টিই হচ্ছে ঢাকা ওয়াসার। আর তুরাগ-বালু-শীতলক্ষ্যা দূষণেও শিল্প-কারখানার চেয়ে পিছিয়ে নেই বিসিক, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। ঢাকার ৪ নদনদী দূষণের উৎস খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সম্প্রতি এমন তথ্য জানতে পেরেছে। গত আগস্টের শেষ দিকে চালানো ওই জরিপে ৪ নদীতে ১৯৪টি বড় আকারের দূষণমুখের সন্ধান পায় সংস্থাটি।

নদী দূষণ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। সবশেষ গত ২ মে আদেশে ৬ মাসের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের নদী দূষণকারী সব স্যুয়ারেজ লাইন, নালা বা দূষণমুখ ‘সিল’ করে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএকে ৪ নদীর দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করারও নির্দেশ দেয়া হয় এ সময়। তবে ঢাকা ওয়াসা এখন পর্যন্ত দূষণ বন্ধের কোনো প্রস্তুতি নেয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিন এ খানের মোবাইলে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে উক্ত আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৪ নদীর সঙ্গে এসে মেশা বিভিন্ন নালা, ড্রেন, স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন দূষণমুখ চিহ্নিত করতে গত আগস্টে বিআইডব্লিউটিএ সরেজমিন জরিপ চালায়। নদীতে পানি বেশি থাকায় ছোটখাটো অনেক দূষণমুখই এ সময় শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান জরিপে অংশ নেয়া কর্মকর্তারা। এতে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুর ১২০টি বড় দূষণমূখ শনাক্ত করা হয়। যার মধ্যে ৬২টি ঢাকা ওয়াসার, ১৩টি কেরানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের, ৯টি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের, ২টি টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীর ও ১টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নালা বা পাইপ সরাসরি নদীতে সংযুক্ত থাকতে দেখা যায়। শীতলক্ষ্যায় পাওয়া যায় আরো ৭৪টি দূষণমুখ। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৬টি রয়েছে।

বেসরকারি দূষণকারীদের মধ্যে আব্দুল্লাহপুরে আইচী হাসপাতাল, টঙ্গীতে বেঙ্গল ডায়িং, ফয়দাবাজে আজমিরী গার্মেন্টস, হাশিম ওয়াশিং, আনন্দ জেরিন টেক্সটাইল, হাজারীবাগের ঝাউচরে কেয়ার হাসপাতাল, মিরপুরের দ্বীপনগরে শাহ সিমেন্ট, মীর আক্তার ও এনডিএ রেডিমিক্স, ফতুল্লায় ফতুল্লা সুপার সল্ট, সিদ্ধিরগঞ্জে ডাচ-বাংলা পাওয়ার লিমিটেড, আম্বর পেপার মিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী পয়ঃবর্জ্যরে কোনো সংযোগই নদীতে মেশার কথা নয়। পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের পর নদীতে ফেলার জন্য ফতুল্লায় ঢাকা ওয়াসার একটি ট্রিটমেন্ট প্লান্টও রয়েছে। কিন্তু সেটি প্রায় অকেজো হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রয়োজনের তুলনায় এর সক্ষমতাও খুব কম। জানা গেছে, ফরাশগঞ্জ, ধোলাইখাল, মিলব্যারাক মাজার ও আরসিন গেটের স্লুইসগেট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় মিশছে, সেগুলো মূলত ওই ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ভেতর দিয়ে আসার কথা ছিল।

কিছু দিন আগেও হাজারীবাগ ট্যানারির তরল বর্জ্যকে বুড়িগঙ্গা দূষণের প্রধান কারণ বলে মনে করা হত। ট্যানারি পল্লী সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ায় বুড়িগঙ্গার দূষণ কিছুটা কমলেও বেড়েছে তুরাগের। এখন বুড়িগঙ্গা দূষণের তালিকায় সবার উপরে উঠে এসেছে ঢাকা ওয়াসার নাম। হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুর, নবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ওয়াসার খালে অসংখ্য পয়ঃনালি যুক্ত রয়েছে। আবার ঢাকা সিটি করপোরেশনের সারফেস ড্রেনেও অনেক স্থানে পয়ঃসংযোগ দেয়া হয়েছে। করপোরেশনের সারফেস ড্রেনের পানি শেষ পর্যন্ত ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন হয়ে নদীতেই মিশছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানান, নদী দূষণের জন্য ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের আউটলেটগুলো (সংযোগ পাইপ বা ড্রেন) পরিকল্পিত উপায়ে বন্ধ করা খুবই জরুরি। কেননা কলকারখানা ও আবাসিক সংযোগের বিরুদ্ধের ব্যবস্থা নেয়া সহজ। সেটি পরিবেশ অধিদপ্তর বন্ধ করে দিতে পারে, দায়ীদের শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। লাখ লাখ আবাসিক ও বাণিজ্যিক পয়ঃসংযোগ প্রথমে তাদের পাইপে এসে যুক্ত হয়। এরপর সেই যুক্ত ধারা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এখন যদি হঠাৎ করে আউটলেটের মুখগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই নগরীর বিশাল অংশ ময়লা পানিতে তলিয়ে যাবে।

উদাহরণ দিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, কয়েক বছর আগে সদরঘাটের কাছে ওয়াসার একটি নালার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ। আর তাতে কোতোয়ালি থানার সামনের রাস্তা পর্যন্ত ময়লা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। যদি সবগুলো আউটলেট বন্ধ করা হয়, তাহলে কী অবস্থা হবে ভাবা যায় না। তাই বর্জ্য পরিশোধনের জন্য জরুরিভিত্তিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে আদালতে রিটকারী আইনজীবী এডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ঢাকা ওয়াসার কারণে আমাদের নদনদীর পানি দূষিত হচ্ছে এটা আমরা আগেও বলেছি। কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সেটা মানতে নারাজ। তারা আদালতে দাবি করছে, ওয়াসা কোনো স্যুয়ারেজ বর্জ্য নদীতে ফেলছে না। তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি। বিআইডব্লিউটিএর প্রতিবেদনেও সেটি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এই মামলার পরবর্তী শুনানির সময় আমরা এ সংক্রান্ত তথ্য আদালতে উপস্থাপন করব। নদী দূষণ যেই করুক না কেন, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব উল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি সংস্থার যুগ্ম পরিচালক সাইফুল হক খানের নেতৃত্বে ওই জরিপের জন্য একটি কমিটি করে দেয়া হয়। রিপোর্টটি এখনো আমার হাতে আসেনি। তবে ঢাকা ওয়াসার এই দূষণের চিত্র আমাদের জানা। আদালতে এই প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হবে।

নদী দূষণ রোধ নিয়ে বিভিন্ন দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বেশ অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সামাদ। তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ নদী দূষণ করে না। কিন্তু তবুও দূষণ বন্ধে এ সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ‍ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। তাই আমরা চিন্তা করছি, দূষণ বন্ধে আমাদেরই মূল ভ‚মিকায় নামতে হবে। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে একটি বৈঠক করব এবং নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পথ বের করব।