শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয় বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিন

আগের সংবাদ

ক্রমবিকাশতাত্ত্বিক শিক্ষা দর্শন

পরের সংবাদ

দুর্গাপূজার ছুটি তিনদিন করা যেতে পারে

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ , ৯:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯, ১১:২৭ অপরাহ্ণ

অমিত গোস্বামী

কবি ও লেখক

ঈদ উপলক্ষে যখন ৭ থেকে ৯ দিনের ছুটি পাওয়া যায়। তখন দুর্গাপূজায় বাংলাদেশে কেন একদিন? অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন- ভারতে তো দুইদিন মাত্র ছুটি। ভারতে মুসলমানরা নিজস্ব ছুটির কোটা থেকে আরো ছুটি নিতে পারেন ও নেন। কিন্তু সেটা বিবেচ্য নয়। আজ বাংলাদেশ সরকার যখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তাদের উদ্যোগ প্রদর্শন করে চলেছে প্রতিনিয়ত, তখন দুর্গাপূজায় কমপক্ষে তিনদিন ছুটি দিয়ে একটি বার্তা এই উপমহাদেশে দিতে পারে।

আজ বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানদের ধর্মচর্চা ও উৎসব উদযাপন প্রসঙ্গে কিছু বলার তাগিদ অনুভব করছি। এই প্রসঙ্গের অবতারণার উদ্দেশ্য দুর্গাপূজা। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় একদিনের পরিবর্তে তিনদিন ছুটি ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে, করা হয়েছে মানববন্ধন। সেটাই এই প্রসঙ্গ অবতারণার সূত্রপাত। এই দাবি কারা করেছে? ছুটি বাস্তবায়ন কমিটি। এরা কারা? বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ, শারদাঞ্জলি ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার কমিটি, জাগো হিন্দু, বাংলাদেশ হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, হিন্দু লীগসহ আরো কয়েকটি সংগঠন নিয়ে ছুটি বাস্তবায়ন কমিটি। এদের বক্তব্য- এটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, এই উৎসব সমগ্র বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও মিলনের মহোৎসব।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত সাবেক পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশ ঘোষিত ইসলামিক দেশ। ভারত তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ ছেড়ে ক্রমে প্রবেশ করছে হিন্দু দেশ হওয়ার লক্ষ্যে। এতে অন্যায় কিছু নেই। কারণ দেশভাগের ভিত্তি ছিল ধর্ম। এ কথা সত্যি যে, আজো পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের ধারাটা এমন যে মুসলমানরা পাকিস্তান চাইল বলেই দেশ ভাগ হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তব কী? অবিভক্ত ভারতে মুসলমানরা চেয়েছিলেন মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। সে অধিকার স্বীকার করা হয়নি বলেই পাকিস্তানের দাবি ওঠে। কিন্তু সেটা মুখ্য নয়। বাঙালি চিরকালই সম্প্রীতি আবহাওয়ায় বাস করতে চেয়েছে। বাঙালির পূর্বপুরুষরা ছিলেন শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ। কিন্তু ধর্মীয় আগ্রাসন তাদের আজ হিন্দু বা মুসলমান করেছে। অর্থনৈতিক কারণে সৃষ্টি হয়েছিল বিভেদ। সেখান থেকে বৈরিতা। কিন্তু এই বৈরিতা কি এত প্রকট ছিল? নাহ, ছিল না। ততদিন ছিল না যতদিন মুসলমানরা মর্যাদা বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চায়নি। তাই প্রখ্যাত বাউল শিল্পী শাহ আব্দুল করিম গেয়েছিলেন- গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান,/মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম,/ আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।
২০১২-এর জনগণনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ৯.০৩ কোটি অধিবাসীর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ২৪.৬ লাখ। তবে সাম্প্রতিক ভোটার তালিকার হিসাব অনুযায়ী তা ৩০ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩% মতো। কিন্তু বাংলাদেশে বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০.৭%। ২০১৬ সালের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৮ লাখ। তার মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ। সংখ্যালঘুদের এই জনবিন্যাসে একটা কথা সহজবোধ্য যে বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা তুলনায় অনেক বেশি। তাই মানবতার নিয়ম অনুযায়ী সেখানে সংখ্যাগুরুদের দায়িত্ব সংখ্যালঘুদের প্রতি অনেক বেশি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠে যে তারা কি সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন? বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে দুর্গাপূজা হয় ৩০ হাজারের বেশি (২০১৮ সালে হয়েছে ৩১ হাজার ২৭২টি সর্বজনীন পূজা)। চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ হাজার ১৫০টি, রংপুর বিভাগে ৫ হাজার ১০টি, ঢাকা বিভাগে ৬ হাজার ৩৯৩টি, বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৬০১টি, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৩১৫টি, খুলনায় ৪ হাজার ৬৩২টি, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৮৫৪টি, সিলেটে ২ হাজার ৪৪০টি। বাংলাদেশে যদি ১ কোটি ৭০ লাখ হিন্দুর ৩০ হাজার পূজা হয়। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ৬০ হাজার পূজা হয় ৮.৭০ কোটি হিন্দুদের। বৈভবে ও চাকচিক্যে পশ্চিমবঙ্গের পূজা এগিয়ে থাকলেও ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগত ভিত্তিতে বাংলাদেশের হিন্দুদের উদ্যোগ অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ব্যথাটা কোথায়?
দুর্গাপূজা হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও এই সময়ে এসে তাদের এক প্রকার আতঙ্কেই থাকতে হয়। কখন হামলা হবে, কখন তাদের প্রতিমা ভাঙচুর হবে এই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম। কোনো কোনো জায়গায় পাহারা বসিয়েও কূলকিনারা করা যায় না। সরকার পুরোপুরি সজাগ থেকেও এই ঘটনা ঘটে। নেতারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন। বারেবারে বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। এমনকি ইসলাম ধর্মে অন্যের ধর্মাচরণে বাধা দেয়ার বিধান আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তবে কেন এমন ঘটে? এটা মূলত ঘটে কিছু অর্ধশিক্ষিত গোঁড়া হুজুরের উসকানিতে। মূর্তিপূজায় ধর্মীয়-নিষেধ থাকতে পারে। কিন্তু আনন্দানুষ্ঠান দেখার ক্ষেত্রে বাধা নেই। ধর্ম একান্তই নিজস্ব যাপন। কিন্তু সে উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিল্পের সঙ্গে ইসলামের সংঘাত কোথায়? তাহলে কেন এই শঙ্কা? ‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন- ‘সকল মানুষেরই আপন ধর্ম বলে একটা জিনিস আছে। কিন্তু সেটাকেই সে স্পষ্ট করে জানে না। সে জানে আমি খৃস্টান, আমি মুসলমান, আমি বৈষ্ণব, আমি শাক্ত ইত্যাদি। কিন্তু সে নিজেকে যে ধর্মাবলম্বী বলে জন্মকাল থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত নিশ্চিত আছে সে হয়তো সত্য তা নয়- যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় সেটা আমার সাম্প্রদায়িক ধর্ম। সেই সাধারণ পরিচয়েই লোকসমাজে আমার ধর্মগত পরিচয়। সেটা যেন আমার মাথার উপরকার পাগড়ি।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, মানুষের সত্যিকারের ধর্ম হলো ‘মাথার ভেতরকার মগজ, যেটা অদৃশ্য, যে পরিচয়টি আমার অন্তর্যামীর কাছে ব্যক্ত’।
এ কথা ঘোরতর সত্যি যে, বাংলাদেশে পূজার সংখ্যা বাড়ার প্রধান কারণ হলো স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও মূল্যবোধ যার অন্যতম ভিত্তি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারেবারে বলেছেন যে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এটাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধারণ করে আজ জনপ্রিয় স্লোগান হলো- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। কিন্তু বাংলাদেশে গোঁড়া ইসলামী হুজুররা কিন্তু ঠারেঠোরে এই উদ্যোগ বানচাল করতে ক্রমেই উদ্যোগী হয়ে উঠছে। গত বছর বাংলাদেশের কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও হয়েছে পূজা উদযাপন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারিভাবে এই দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে নতুন বস্ত্র বিতরণও করেছে পূজা উদযাপন পরিষদ। কিন্তু তা নিয়ে সমালোচনার তীর ছোড়া হয়েছিল সরকারের দিকে।
মণ্ডপ ও মূর্তি তৈরিতে এখন শিল্পসৃষ্টিই প্রধান হয়ে উঠেছে। মণ্ডপ সজ্জা থেকে মূর্তি তৈরিতে নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে। উঠে আসছে লোকশিল্পের নানা রূপ। থিমের পাশাপাশি ঐতিহ্যের মেলবন্ধনও ঘটছে। আগে মুসলমানরা পাশে থেকে পূজা উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতেন। কিন্তু এখন মুসলমানদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বেড়ে চলেছে। মূর্তি তৈরিতেও হাত লাগাচ্ছেন মুসলমান শিল্পীরা। অর্থনীতিতে একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে এই উৎসবের।
এবারে ফিরে আসি সেই প্রশ্নে যা দিয়ে শুরুতেই করেছিলাম। তিন দিনের ছুটির দাবি। ঈদ উপলক্ষে যখন ৭ থেকে ৯ দিনের ছুটি পাওয়া যায়। তখন দুর্গাপূজায় বাংলাদেশে কেন একদিন? অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন- ভারতে তো দুইদিন মাত্র ছুটি। ভারতে মুসলমানরা নিজস্ব ছুটির কোটা থেকে আরো ছুটি নিতে পারেন ও নেন। কিন্তু সেটা বিবেচ্য নয়। আজ বাংলাদেশ সরকার যখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তাদের উদ্যোগ প্রদর্শন করে চলেছে প্রতিনিয়ত, তখন দুর্গাপূজায় কমপক্ষে তিনদিন ছুটি দিয়ে একটি বার্তা এই উপমহাদেশে দিতে পারে। তা হলো কাগজে-কলমে যাই হোক বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ।

অমিত গোস্বামী : কবি ও লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা