প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু

আগের সংবাদ

চাঁদের বুকে চিরঘুমে ল্যান্ডার ‘বিক্রম’

পরের সংবাদ

উপাচার্যের তুঘলকি কাণ্ড

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯ , ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯, ১২:১৯ অপরাহ্ণ

Avatar

ভোল পাল্টে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্যের পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি প্যানেলের শিক্ষক সংগঠন ‘সোনালি দলের’ নির্বাচিত কমিটির সাবেক সদস্য ড. খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন। প্রথম দফায় চার বছর এই পদে দায়িত্ব পালনের পর কয়েক মাস আগে দ্বিতীয় দফায় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়ে বিশ^বিদ্যালয়টিতে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করছেন তিনি। তার পদত্যাগের দাবিতে সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন। একইসঙ্গে খন্দকার নাসির উদ্দিনের ‘তুঘলকি’ কারবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ফেসবুকে লেখাসহ নানা কারণে গত এক বছরেই অন্তত ২৭ শিক্ষার্থীকে তিনি বহিষ্কার করেছেন। অবশ্য পরে তিনি বহিষ্কারাদেশ তুলেও নিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ভীতি সৃষ্টি হয়েছে, বাকি শিক্ষাজীবনটা একদিনে শেষ করতে পারলে বাঁচেন তারা।

কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখি এবং প্রশাসনকে বিব্রত করার চেষ্টার কথিত অভিযোগে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হলে গত ১৮ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে যথারীতি বহিষ্কারাদেশ তুলে নেন উপাচার্য।

খন্দকার নাসির উদ্দিন শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদেরও হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মধ্যেই ‘সচেতন শিক্ষক সমাজের অবস্থান’ শীর্ষক এক লিফলেট বিলি করে ১৬ দফা দাবির কথা জানানো হয়েছে। এতে উপাচার্যের উদ্দেশে এক নম্বর দাবি হচ্ছে- বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের জারি করা কারণ দর্শানো নোটিশ প্রত্যাহার করতে হবে।

এদিকে কথায় কথায় বহিষ্কারের ঘটনার রেশ ধরে বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। বুধরাত রাত থেকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে দাবি আদায়ে স্লোগান গান দিতে থাকেন তারা। গতকাল তাদের ১৪ দফা দাবি মেনে নিলেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন বন্ধ করবেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ১৯৮৯ সালের ১১ নভেম্বর ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন। সেখানে শুরুতে তিনি বিএনপির রাজনী?তি কর?তেন। বিএন?পি-জামায়াত প্যানেল ‘সোনালি দল’ থেকে ১৯৯৩-৯৪ সালে ওই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন নির্বাচন করেন এবং সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর নি?য়ে?ছেন নানারকম সুযোগ-সুবিধা। ২০০৪ সালে বিএনপির প্যা?নে?ল থেকে উপাচার্য হওয়ারও চেষ্টা করেন। কিন্তু হতে পারেননি। বিএনপির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি ভোলপাল্টে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আর এতে করেই উপাচার্য হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হয় তার। গোপালগঞ্জে বাড়ি- শুধু এই পরিচয়েই তিনি শক্ত লবিং করে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। নানা অনিয়ম দুর্নীতির পরও চলতি বছর তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি করা হয়। ড. খন্দকার নাসির উদ্দিনের স্ত্রী অধ্যাপক রমিজা বেগম এখনো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং তিনিও বিএনপির সোনালী দলের প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমানে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবীরের ভায়রা ভাই অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্রপ বোটানি’ বিভাগের অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন-২ ভোরের কাগজকে বলেন, অধ্যাপক ড. খন্দকার নাসির উদ্দিন ১৯৯৩-৯৪ সালে কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন সোনালি দল থেকে নির্বাচন করে সদস্য নির্বাচিত হন। পরে সরকার পরিবর্তন হলে কিভাবে তিনি উপাচার্য হয়েছেন তা বলতে পারব না।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জহির উদ্দিন ভোরের কাগজকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, এত আগের ঘটনা নিয়ে কেন খোঁচাখুঁচি হচ্ছে। আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না। অন্য জায়গা থেকে তথ্যগুলো নিন। আর সরকার যেখানে তাকে উপাচার্য বানিয়েছে, সেখানে এসব তথ্য খোঁজাও অবান্তর।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ও খন্দকার নাসির উদ্দিনের স্ত্রী রমিজা বেগমের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই আমি। বিএনপির প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছেন কিনা- জানতে চাইলে বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন কোনো তথ্য দেননি। তিনি বলেন, এসবের কোনো কিছুই বলব না। তবুও জানতে চাইলে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বহিষ্কার নিয়ে কোনো বক্তব্য জানতে চাইলে সেটির জবাব দেব। কিন্তু ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে কি রাজনীতি করেছি সে বিষয়ে জানতে চাইলে ফোন কেটে দেব এবং একসময় তিনি ফোন কেটেও দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব?বিদ্যালয়ে ভীতির রাজ্য কায়েম করেছেন। এ অবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন তুলে বলছেন, শ্রেণিকক্ষ অপরিষ্কার থাকা নি?য়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া এবং বিশ্ব?বিদ্যাল?য় প্রধা?নের কাজ নি?য়ে প্রশ্ন তোলায় যিনি শিক্ষার্থী ব?হিষ্কার করেন, তি?নি কী করে উপাচার্য থাকেন।

সম্প্রতি ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের পর পদ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেন খন্দকার মো. নাসির উদ্দিন। আর তাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর একদিনের মধ্যেই তাদের ১৪ দফা দাবি মেনে নিয়েছে বশেমুরবিপ্রবি প্রশাসন। এই ১৪ দফা দাবির মধ্যে ১২ নম্বর হচ্ছে- ফেসবুকের স্ট্যাটাস-কমেন্টকে কেন্দ্র করে কাউকে বহিষ্কার করা হবে না। দিনের পর দিন যে প্রশাসন ফেসবুকে কমেন্ট করলেই বহিষ্কার করে সেই প্রশাসন ১৪ নম্বর দাবি মেনে নিয়ে বলছে, আন্দোলনের পরেও কাউকে বহিষ্কার করা হবে না। এ ক্ষেত্রে ১৪ দফা মেনে নেয়ায় প্রমাণ হয়েছে, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন দিনের পর দিন সেখানে ভয়াবহ অন্যায় চালিয়ে ছিল। যদিও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের ১৬ দফাও। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সরোয়ার জাহান বলেন, আমরা বাকস্বাধীনতাসহ ১৪ দফা নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। ভোররাতে সব দাবি মেনে নিয়েছে প্রশাসন। এখন উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চলছে।

সম্প্রতি ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী’ এই বাক্যটি ফেসবুকে পোস্ট করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে অবৈধ, অমানবিক, স্বাধীন মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধক ও সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানায় বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। বুধবার খুলনা বিশ^বিদ্যালয় এবং গতকাল বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে খন্দকার নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে।

তবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার মো. নাসির উদ্দিন বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ১৪টি দাবি ইতোমধ্যে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এরপরও তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য এবং সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য এই আন্দোলন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে একটি চক্র এক হয়ে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সহযোগিতা করছে।