ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

শাড়ি যৌনাবেদনপূর্ণ পোশাক, জানতাম না

পরের সংবাদ

দোহারের ছদ্মবেশ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ , ৭:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

অমলের দোকানের সামনে অজিয়রের সঙ্গে কথা এই নিয়ে বলেছে হরষিত। সেখানে একটু ক্ষণের ভিতর স্বপন আসবে, আসবে পরিতোষ, গুণধর পুলক কিংবা খালের ওপারের ধীরাজ আর নিতাই। এই দোকানে অপেক্ষাকৃত কম বয়েসীরা বসে। দিনে রসিকের দোকানে বসায় কোনো তারতাম্য না হলেও, এমনকি বিকালে না-হলেও সন্ধ্যার পরে সে দোকানের সঙ্গে অমলের দোকানের এই তফাৎটুকু ধরা পড়ে।

পর্ব: ৫

এই ‘অসংলগ্ন’ শব্দটা খুব বলত খাঁবাড়ির সরোদ প্রম্পটমাস্টার। কারও সংলাপ যদি একটু প্রলাপের মতন হতো তখন। বলত, ‘এই কথাগুলো এখন অসংলগ্ন শোনাবে।’ সরোজটা কথা জানত। শ্রীধর ভাবে, সে কথাই জানতে চাবে নাকি যে, কেষ্টদা তোমার কথা এমন অসংলগ্ন শোনাচ্ছে কেন? কিন্তু তা কি বুঝবে সে। না, বুঝবে। এতকাল চৈতন্যভাগবৎ পড়া মানুষ কেষ্ট মল্লিক, এই কথা বুঝবে না? তবু তা না বলে শ্রীধর বলে, ‘কী হইচে তোমার, ও কেষ্টদা, তোমার কথা এইরাম শুনোতেছি কেন?’
‘কীরম, ক দেহি-?’
‘এই কেমন যেন!’
হারিকেনের আঁচ একটু বাড়িয়ে কেষ্ট উঠে দাঁড়িয়েছে। তাতে যদিও কেউ কারও মুখ স্পষ্ট দেখতে পারছে না। সে ওই অবস্থায় শ্রীধরের ঘাড়ের কাছে হাতে দিয়ে বলে, ‘আমার কিছু ভালো লাগে না ছিরিধর। কিছু ভালো লাগে না। এই সংসার-ধর্ম, এই জীবন, এই ঘরবাড়ি, এই যে হরিসভা মন্দির যেখানে আমি দিনের মদ্যি কত সময়ে যাহি- এই সমস্ত কোনো কিছু আমার ভালো লাগে না!’ অন্ধকারে শ্রীধর এক অবাক করা কেষ্ট মল্লিককে দেখে। এই প্রথম কেষ্টর মুখে কিছু ভালো না লাগার কথাটা শোনে। আর পরে এ কথা কেষ্ট আরও কতবার বলবে তাও সেদিনের কথায় মনে হয় শ্রীধরের। সে বলে, ‘এহোন বাড়ি চলো।’

৪.
এমপি ঘনিয়ে আসলে একদল মানুষের ভিতরের উৎসাহ তৈরি হয়। মঘিয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলোয়ও তাই হওয়া স্বাভাবিক। তবে, ছোট ও বড়ো আন্ধারমানিক, কুচিবগা আর চরসোনাকুরে যে হিসাব কচুয়া উপজেলা সদরে একবারে কাছে মঘিয়া, শপথকাঠি সম্মানকাঠিতে তার কিছু এদিক সেদিক আছে। সেখানে রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিংবা হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যাও বিষয়। মঘিয়া কাউন্সিল অফিসের কাছে শপথকাঠি-সম্মানকাঠিতে বিএনপির সমর্থক আছে, আছে মঘিয়াও। কিন্তু ওই আন্ধারমানিক কুচিবগা আর চরসোনাকুরে প্রায় নেই। মঘিয়ার কাছে হওয়ায় এই বড়োপুকুরিয়া কিংবা ভাসা বা সানপুকরিয়া কিংবা তালেশ্বরেও বিএনপির সমর্থক আছে কিছু। সমস্যা সেখানে নয়। ওইসব গ্রামে থাকলে, সেখানে কৈফিয়ৎ তলব হলে উত্তর দেওয়ার মানুষও আছে, কিন্তু এই বড়পুকুরিয়ায় ধানের শিষের পক্ষে মানুষজন উদয় হলে পরে সৈয়দ হিরুর কাছে এই গ্রামের যারা মাথাগোছের তারা উত্তর দেবে কী? এই যে জগৎমণ্ডল, তার সঙ্গে সৈয়দ হিরু বাবার চিন-পরিচয় ছিল। হিরুর বড়োভাই সৈয়দ কামালের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কচুয়া গেলে দেখা হয়। হেসে দুটো কথা জিজ্ঞাস করে। এই গ্রামের ভালোমন্দ নিয়ে খোঁজখবর নেয় গত বছরের পর বছর। সেই স্বাধীনতার পর থেকে এই গ্রামের কোথাও কোনো উন্নয়ন তো হয়নি। হওয়ার ভিতরে কাউন্সিল থেকে ভাসা পর্যন্ত রাস্তাটা। তাও গত বর্ষার পরে গেল প্রায় ভেসে। এখন ওই রাস্তার দশা কী! সে রণজয় ভালো জানে। এই অবস্থায় এই গ্রামের মানুষের বাগেরহাটের কর্নেল রহমানকে সমর্থ করার তো কোনো কারণ নেই। আগেও করেনি, পরেও করবে না। এ কথা জগৎ মণ্ডল কিংবা বীরেন্দ্রনাথ হালদার কিংবা কুচয়ায় থাকা সুনীল বা সেখানে কাজে যাওয়া শ্রীধর জোনে। কিন্তু মাঝে মাঝে কেউ কেউ গজায়। অথবা উজাজি মাছের মতো উজায়। তাকে দক্ষিণে অর্থাৎ মঘিয়ার কেউ কেউ বেশ কুরুৎ-ও (মদৎ/ লেজে নাড়া) দেয়। তারপর থেমে যায়।
যেমন হবি সারাটা জীবন নৌকা মার্কা। স্বাধীনতার আগে শেখ সাহেবের মিটিং শুনতে গোপালগঞ্জে গেছে, আর তার ছেলে কার বুদ্ধিতে ভাসা গিয়ে নাম লেখাল ধানের শিষে! আর তাতে বাতাস দিয়েছে পরিতোষ। যাক, কী যে অবস্থা! কয়দিন কয়টা টাকা আয়ের জন্যে দল বদল। নাকি ধরে নিয়েছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে না। পরিতাষ তা ভাববার লোক না। তবে আজগর ভাবতে পারে। কাজ পেয়েছে। বিএনপির কন্ট্রাকটর বলেছে, তাই সে-দল করতে তাই রাজি হয়েছে। তারপর রাস্তার কাজ খারাপ হলে পিছিয়ে এসেছে। আরে হিন্দুপ্রধান গ্রামের হিসাব ওই শপথকাঠি কি সম্মানকাটির সঙ্গে মেলাল হয়? এখানে মানুষজনকে অন্যভাবে হিসাব করতে হয়। আর গ্রামের ঢোকার সামনের দিকে খালের দুপাশে নয়খানা মুসলমানবাড়ি, তারাও বছর বছর ধরে নৌকামার্কা। একা আজগর সেখানের গুড়েবালি ঢেলে দিয়েছে। আর তার সঙ্গে আছে পরিতোষ।
এই ঘটনার ফয়সালা যদিও আগেই হয়েছে। তবে ইলেকশনে যদি আওয়ামী লীগ জিততে না-পারে তাহলে হয়তো এই গ্রামের কারও কারও কিছুদিন উত্তরে অর্থাৎ ভাসা আর দক্ষিণে কচুয়া যাওয়া বন্ধ থাকতে পারে। আর আজগর তার বড়োভাই অজিয়র ওপর গরজরাতে পারে। তা আর কয়দিনের ভিতরেই বোঝা যাবে।
অমলের দোকানের সামনে অজিয়রের সঙ্গে কথা এই নিয়ে বলেছে হরষিত। সেখানে একটু ক্ষণের ভিতর স্বপন আসবে, আসবে পরিতোষ, গুণধর পুলক কিংবা খালের ওপারের ধীরাজ আর নিতাই। এই দোকানে অপেক্ষাকৃত কম বয়েসীরা বসে। দিনে রসিকের দোকানে বসায় কোনো তারতাম্য না হলেও, এমনকি বিকালে না-হলেও সন্ধ্যার পরে সে দোকানের সঙ্গে অমলের দোকানের এই তফাৎটুকু ধরা পড়ে। এর কারণ যে সামনে ইলেকশন, শুধু তাই নয়; অমলের দোকানে তার বাপ জগৎ মণ্ডল সাধারণত বসে না। হয়তো অমল তার বন্ধুদের সঙ্গে বিড়ি সিগারেট খায় কিংবা নানান গুলতানি মারে। তাছাড়া সন্ধ্যার পরে যখন বীরেন হালদার কিংবা হরষিতের কাকা যতীন মাঝি অথবা শ্রীধরদের চেয়ে বয়েসে বড়ো রণজয় কিংবা কেষ্ট মল্লিকের সব কথা বলার সুযোগও ঘটে না।
এখন অবশ্য বিষয় সামনের নির্বাচন। যদিও তা এই এখানে আলোচনায় তেমন কিছু আসবে যাবে না। মঘিয়া স্কুলে হয়তো নির্বাচনী জনসভা হবে অথবা হবে কাউন্সিলের মাঠে। আর এই গ্রামে যারা সৈয়দ হিরুর পক্ষে কাজ করবে, তারা কিছু লিফলেট দেবে। আর কোনো গাছে কিংবা ঘরের গায়ে তক্তার অথবা বাঁশের বড়োয় বেড়ায় পড়বে পোস্টার। ধানের শিষের পোস্টার কোনো ঘরের গায়ে পড়ার সম্ভাবনা কম, কিন্তু নারকেল কি মেঘনিস গাছে সেই পোস্টারও দুই-একখানা দেখা যাবে। লাঙল মার্কার পোস্টার দেখা যাবে না, সে মার্কায় দাঁড়িয়েছে তাও কেউ জানবে না। সেই যে তৌহিদ এরশাদের সময় দাঁড়িয়েছিল, তার খোঁজ আর কেউ রাখে না। তবে মশাল কিংবা অন্য কোনো পোস্টার একটা আধটা দেখে যেতেও পারে। এই গ্রামের ছেলেরা কেউ কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার নয়। তা যা দুই একজন আছে তারা আন্ধারমানিকের দিকে। এ গ্রামের সবারই জানা আছে ভোটাভুটি শেষ পর্যন্ত নৌকা আর ধানের শিষের। আগের বার নৌকা অল্প কয়েক ভোটে হরেছে, এবার এই দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কে জিতবে কে হারবে তা নিয়ে সকলেই সংশয়ী। তবে এখনকার সবই চায়, সৈয়দ হিরু জিতুক। এছাড়া তাদের এই এলাকার কোনো উন্নয়ন হবে না। কচুয়া উপজেলায় ধান সুপারি পানসহ এত ধরনের ব্যবসাপাতি তবু আজ পর্যন্ত এই এলাকার উন্নতি হলো না। ব্রিজ-কালভার্ট প্রায় নেই। নেই পাকা রাস্তা। বর্ষার সময় পুরো উপজেলার প্রায় সব রাস্তারই হাঁটু পর্যন্ত কাদায় তলায়। তখন বাড়িতে বসে থাকা ছাড়া আর কাজ কী করার থাকে? কোথাও বের হবার সে উপায় থাকে না। অথচ এই উপজেলায়ই বাঁধাল বা সাইনবোর্ডের মতন গঞ্জ, ব্যবসার মোকাম। সেখান থেকে ঢাকার বাস যায়। বাস যায় পাবনা রাজশাহী ও রংপুরে। সুপারির আড়তদার মহাজনের অভাব নেই। আর জেলা সদরের সবচেয়ে কাছে এই উপজেলা। খুলনা-বাগেরহাট-পিরোজপুর-বরিশাল হাইওয়ে গেছে এর পেটের ভিতর দিয়ে। ভাসার পরে উত্তরে এগিয়ে চিতলমারি হয়ে যাওয়া যায় গোপালগঞ্জ মাদারীপুর ভাঙা ও মাওয়া। তাই যদি রাস্তাঘাট ঠিকঠাক মতন হয়, তাহলে এই উপজেলার মানুষের দিন ফিরবে। সেই স্বাধীনতার পরে আর সৈয়দ হিরু এমপি হননি, একমাত্র তার নির্বাচিত হওয়াতেই এই এলাকার মানুষের উন্নয়ন হবে।
অজিয়রের সঙ্গে হরষিতের এসব কথা হয়। এমনকি সেখানে উপস্থিত পুলক কিংবা পরিতোষ আর স্বপনও তাই বলে। কেউ কেউ এও বলে, এটা মেয়ার রাজ্য, এ জায়গায় যেই হোক, তাতে আমাগো মতন নোমোছোমোর কোনো লাভ নেই। সে কথা ফিরিয়েও দেয় আর একজন, কেননা পাশের উপজেলা চিতলমারী, সেখানেও তো হিন্দুপ্রধান। সেখানকার মানুষ বাণিজ্য করে না? দরকার ভালো নেতৃত্বের। এলাকার ছেলে জয় লাভ। ওই কর্নেল সাহেব বড়ো মন্ত্রী, কিন্তু বাগেরহাট সদরের, আর সারাবছর থাকেন ঢাকায়। ফলে, এই যে বাগেরহাট আর কচুয়া নিয়ে এই যে আসেন, এখানে এই কচুয়ার দিকে তার প্রায় চোখই পড়ে না।
একজন অন্যজনকে তাও বলে।
যদিও হরষিতের সঙ্গে কথা বলার সময়ে অজিয়র একটু দোটানায়ই আছে, আজগরের বিষয়টার কোনো ফয়সাল প্রায় হয়নি। আবার আজগর নিজেও আছে সংকটে। সে বাড়ি থেকেই বেরুতে পারছে না। এতদিন পাওয়ার পার্টির সঙ্গে কাজ করেছে। এখন ইলেকশনের সময়ে তাদের সঙ্গেই থাকার কথা, তাকে এত সুবিধা দিল তারা, আর সে কিনা তার বড়োভাইয়ের জন্যে ঘরে বসে। বড়োভাইয়ের জন্যে শুধু নয়, তার বাপ হবিও বলেছে ধানের শিষের ক্যানভাসে না যেতে। সেখানেও তার দোটানা। যদি ধানের শিষ জেতে, তাহলে হবির ছেলে অজিয়রের ভাই ওই দলের কাজ করেছে, তারা কী উত্তর দেবে? আবার নৌকা জিতলেও, হবি বা অজিয়রকে পরে সবাই মনে করবে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা গুষ্টি। আজগরের মনে হয়, এর চেয়ে একটু দক্ষিণে শপথকাঠির মানুষ হওয়াই ছিল ভালো। সেখানে এক বাড়ির উপরে দুই ঘরে দুই পার্টি। এমনকি কোনো কোনো বাড়ি তিন পার্টিও আছে। নৌকা, ধানের শিষ আর লাঙল। সেসব বাড়ির মানুষের কোনো ভয় নেই, একদল হলেই হলো। কিংবা সম্মানকাঠি বা মঘিয়া রাজবাড়ির কাছে- সেখানেও একবাড়িতে দুই দলের লোক আছে। অথচ ইউনিয়নের এই উত্তর দিকেই যত সমস্যা। আজগর ভাবতেই পারে, কেন যে এই নোমোপাড়ার মুখে তাদের বাড়ি!
কিন্তু চাইলেই বাড়িঘর তো আর তুলে নেওয়া যাবে না। কিংবা বাপ কি বড়োভাইয়ের রাজনীতিকে বাতিল করে দেয়া যাবে না। ওসব পারে পরিতোষ! ওর তালের ঠিক নেই। বাতাস দিতে ওস্তাদ। জীবনে কতবার যে পাতে খাইল সেই পাতে হাগল। সেই পরিতোষের বাতাসেই অজিয়রের মতন ছেলে এমন কাজ করেছে। যদি এ কথা এখন এখানে কেউ সরাসরি বলে, তাহলে বাধবে ঝগড়া। সেদিন তো রণজয় অজিয়রকে সব বুঝিয়ে পাঠিয়েছিল সৈয়দ হিরুর ছোটভাই আর জ্ঞাতি চাচার কাছে। তার আগে কথা বলতে বলেছিল সুনীলের সঙ্গে। সুনীলের সঙ্গে ধানের কারবারের কারণে সৈয়দ কামালের বেশ জানা শোনা আছে। তার ধানের মিলে অনেকবারই ধান ভাঙানোর কাজ করেছে সুনীল। এখনও ঠেকায় পড়লে তার শরণাপন্ন হয়। যদি সঞ্জয় আর রচনার ঘটনায় সুনীলের সঙ্গে একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তবে গ্রামের এমন প্রয়োজনে রণজয় অজিয়রকে সুনীলের কাছে পাঠাতে ভুল করেনি। সেই ঘটনার এই মাসখানেক বাদে, এখন সামনে ইলেকশনের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া অজিয়রের আর কী করবার আছে।
এদিকে হরষিতের শহরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এক সময়ের ওঠাবসা, কলেজে নির্বাচনে দুই দল থেকেই তার সহপাঠীরা ভোটে দাঁড়িয়েছে, আজ তারাই এই জেলার এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা। তার কাছে লালমোহনের মতন মানুষ তো জানতে চাইতেই পারে এবারের ইলেকশনের ঘটনা কী হবে? নাকি জেঠাতভাই লালমোহনকে এ কথা জিজ্ঞাস করার জন্যে শিখিয়ে দিয়েছে স্বপন। হতে পারে। সঞ্জয়ের ঘটনার পরে স্বপন তো তলে তলে একটু ধান্দে আছে, মল্লিকগুষ্টির যারেই পারে, যে জায়গায় পারে একটা ডলা দিতে। নয়তো লালমোহনের এত বুদ্ধি হবার কথা নয়। ওদিকে দেবুকে দিয়ে হবে না। দেবু গোড়াখালের দীনেশের কাছ থেকে লোন নেবে, সে জন্য রণজয়কে দরকার। সে কথা একেবারে স্পষ্ট করে বলেছেও, ‘স্বপনদা, আইজে আমার হাত-পা বান্ধা, অভাবে পড়ছি, নয়তো যা কইতা তাই শোনতাম। ওই রসিক জেঠা আমার আপন জেঠামশাইর নামে ওইভাবে অপবাদ দেতে পারে? আর সঞ্জয়ের ঘটনার জন্যে সেই পঞ্চাশ বছর আগের কথা এইভাবে বাতাস দিয়ে বাওয়াইয়ে দিতি হবে? আইজকের কেউর তো সে কথা মনেও নেই।’
ইলেকশন সামনে পড়ায় তাই হয়তো ভিতরে ভিতরে এইটুকু সুবিধাই হয়েছে। এখন পরিতোষকে যদি একটু বাটে ফেলানো যায়। আর অজিয়রের সামনে এটাই সুযোগ। স্বপনের জানা আছে, পুলক হাজরা তার পক্ষে। কেননা তার বাপের সঙ্গে ধীরেন ঘরামির মায়ের একটা সম্পর্কের কথা ওই পরিতোষই একসময় প্রচার করেছে। পরে সেই বাড়ির মেয়ে রিক্তাকে বিয়ে করার পর ও সে কথা বারবার তুলেছে। অবশ্য এইসব গুপ্তকথা খুঁজে বের করে, তাই দিয়ে প্যাঁচ লাগানো পরিতোষের জুড়ি নেই। একসময় এমন কাজ রণজয়ও করেছে। তবে হরষিতের কাকা যতীন মাঝির মতো এই বিষয়ে ওস্তাদ ছিল না তারা কেউ। বয়স হওয়ায় এখন আর এসব একটু দম পড়েছে, যদিও সে বিরতির বহর কত দূর পৌঁছায় সে নিয়ে সন্দেহ আছে।
যাক, সম্পর্কের এমন চক্রাকার বিষয় গ্রামব্যাপী সব সময়েই বহমান। ভিতরে ভিতরে টক্কর, উপরে খাতির। আবার একজন অন্যজনের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়েও পড়ে। আবার জমিদারি ব্যবস্থার সেই সাড়ে সাত আনি সাড়ে আট আনিতে ভাগ হয়ে সামাজিকতার তফাৎ দেখায়। তখন শুরু হয় আর এক জটিল অবস্থা! যদিও এখন বিষয়টা কোনোভাবেই তা নয়। স্বপনের জন্যে সুযোগ। আর পরিতোষের জন্যে একটু আত্মরক্ষা!
তাই লালমোহনের মতো দুনিয়ার প্রায় কোনো খোঁজখবর না রাখা লোকের মুখে অমন প্রশ্নের হরষিতের মতন প্রায় সবজান্তা মানুষের একটু টক্কর দিয়েই কথা বলা স্বাভাবিক। হরষিত বলে, ‘কোনতা জিগোতিচো? আমি গেছি নাই (নাকি) দুই একদিনে বাগেরহাট কি কুচয়ায় যে কব ইলেকশনের এহোন কী বুজদিচি?’ একথা একটু ঝাড়ি দিয়ে বললেও হরষিতের কেন যেন মনে হয়, লালমোহনের তলে কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাই হঠাৎ এখানে অজিয়রকে দেখে ইলেকশনের খবরাখবর জানতে চেয়েছে।
পুলক বলে, ‘না যাও, তুই তো নানান জনরে চেনো, খবরাখবর রাহো, তাতে ইলেকশনের ভাব গতি বোঝো কী?’
হরষিতের ঝাড়িতে একটু যেন ভ্যাবাচেকা খেয়েছে লালমোহন। পুলকের কথায় তার কথা বলায় সায় পায়। সে বলে, ‘আচ্চা ও হরো, তুই অতো সেরাইয়ে উঠলি কী জন্যি? আমার জানা শোনা কম সেই জন্যি জিগোইচি-’ বলেই সে স্বপনের দিকে তাকায়। যদিও দোকনের সামনে ঝুলছে একটা হারিকেন। আর প্রায় প্রত্যেকেরই হাতে এক-একটা টর্চলাইট। সে আলো মুখে কি চোখের কোনায় পৌঁছায় কেউ যদি কোনো কারণে মাটিতে আলো ফেলে। তা ফেলেনি। ফলে লালমোহনের তাকানোয় স্বপন প্রায় কিছুই বোঝে না। কিন্তু লালমোহন যে তার দিকে তাকিয়েছে তা বুঝতে পেরেছে।
এদিকে সমস্ত কথায় সারকথা বলেই ফেলে অজিয়র, ‘হরষিতকা, আর কী কব? এই ইলেকশনের ভাবগতিক কচুয়ায় একরাম ওদিক বাগেরহাট একরাম। দুইজন এমপি ক্যানডিডেটের দুইজনের দুই জায়গায় বাড়ি।’
‘সেয়া হলিও-’ পরিতোষ বলে, ‘হিরু ভাইর বাগেরহাটেও কিছু বান্দা ভোট আছে। আবার আমাগে এদিক গোপালপুর রাঢ়ীপাড়া আর ওই তালেশ্বর ধোপাখালি এই নাটাইখালি কি আমাগে মঘিয়া শপথকাঠির এদিক কর্নেল সাহেবেরও কিছু ভোট আছে। সেই আমলে মুসলিম লীগ করা কিছু মানুষ আছে না, মইরে গেলিও আমলিগরে ভোট দেবে না-’
‘এ এক খেল,’ অজিয়র বলে, ‘বিএনপির কেউ কেউ কয়, হিন্দুপাড়ার মইরে গেলিও বিএনপিরে ভোট দেবে না যেন হিন্দু এলাকা দে কোনোদিনও কোনো বিএনপি নেতা জিতি নিই!’
‘তুই দেহি, অজি-’ এইবার স্বপন যেন আসল কথাটা বলার সুযোগ পেয়েছে, ‘আজগর বিএনপি করার পর বিএনপি আমলিগ রাজনীতি ভালোই বুঝিচিস।’
অজিয়র হাসে। স্বপন খোঁচাতে শুরু করেছে। তখনই পুলক বলে, ‘এ স্বপন, এবার যদি হিরুভাই হ’তি পারে, এই দুইদিনের চান্সে যারা বিএনপি হইল, তাগে দশাডা হয় কী দেহিস!’
‘আমি আবার বিএনপি হলাম কবে?’ পরিতোষ নিজেকে সামলায়। দিন দুই ভাসার হাটখোলায় ওই চালা ঘরে মাহফুজ চেয়ারম্যানের সাথে বইচি- সেই জন্যি বিএনপি হইয়ে গেলাম?’
‘না তুই হইসনি। তয় ওই আজগরে পক্ষ নিয়ে মাহফুজ চেয়ারম্যানের কাজে ঢুকোইচিস্্, সেয়া তো সত্যি?’
‘হ, আমাগে আজগর তো কচি খোকা? ওরে ওর পরিতোষকা দিন দুই পক দেলো, আর যাইয়ে মাহফুজ ভাইর সাথে কাজে জুইড়ে গেল!’
পরিতোষের কথায় বোঝা যায়, সে এখানকার অন্যদের চেয়ে মাহফুজ চেয়ারম্যানের একটি বেশি ঘনিষ্ঠ! আবার অন্যদের কারও কারও সঙ্গেও সে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, তা কোনোভাবেই লেনদেনের বিষয় নয়। গ্রামের কেউ কেউ তো অন্য কথাও বলে, এই গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া এই রাস্তা যেনতেনভাবে হলেও পরে এর যে কোনো প্রতিক্রিয়া সামাল দেবে পরিতোষ তেমন কথা সে মাহফুজ চেয়ারম্যানকে দিয়েছে। পরিতোষ নাকি বলেছে, রণজয় তার গুষ্টির লোক, কাজ যাই হোক, এ কথা কোনোভাবেই এমপির কানে পৌঁছবে না। (চলবে)