বিচারকের ভূমিকায় ফারহানা মিলি

আগের সংবাদ

ছাত্রলীগকে সংযমের সঙ্গে চলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

পরের সংবাদ

আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃতির অসমাপ্ত অধ্যায়

আবুল আহসান চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ , ৮:৩৩ অপরাহ্ণ

সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তি গীতিকার ও বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বহুমুখী প্রতিভার একটি অনন্য নাম আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মন ও মেজাজে, মেধা ও মননে, সৃষ্টি ও কৃতিতে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও প্রায় তুলনাহীন। তিনি ছিলেন ‘একাধারে কবি-প্রাবন্ধিক-সমালোচক-গবেষক-স্মৃতিরচয়িতা, গায়ক-গীতিকার, অধ্যাপক, প্রশাসক, কথক-বাগ্মী-টিভি-উপস্থাপক- এক কথায়, অসাধারণ এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রয়াণের ৩০তম বার্ষিকী। প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

একজন সক্রিয় সৃষ্টিশীল মানুষের যে কোনো বয়সেই দেহান্ত অকালমৃত্যু বলে বিবেচিত হতে পারে। আবু হেনা মোস্তফা কামালের (১৯৩৬-১৯৮৯) মতো একজন বড় মাপের অসাধারণ মানুষের হঠাৎ চলে যাওয়া, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে, এই ধারণাকে আরো পোক্ত করে। কেননা স্বল্পপ্রজ এই লেখক-মানুষটি তখনো সৃষ্টিকর্মে দারুণ নিমগ্ন। তাঁর কাছে সমাজের প্রত্যাশা ছিল জাগ্রত। তাঁর প্রয়াণের দুই যুগ পরেও বেদনার্ত ও শোককাতর হতে হয় এইসব কথা ভেবে। সৃষ্টিকর্মে তিনি যখন আরো পরিণত হচ্ছেন- শ্রেষ্ঠ কাজটির জন্য হয়তো মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক সেই সময়েই পৃথিবীর বন্ধন ছিন্ন হলো তাঁর।

দুই.
মন ও মেজাজে, মেধা ও মননে, সৃষ্টি ও কৃতিতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন স্বতন্ত্র ও প্রায় তুলনাহীন। সব মিলিয়ে ‘অসাধারণ’ ও ‘বহুমাত্রিক’ এই অভিধায় তাঁকে চিহ্নিত করা চলে অনায়াসেই। তাঁর মূল্যায়নের ভূমিকা রচনা করতে গিয়ে এক প্রাজ্ঞ সমালোচক মন্তব্য করেছেন এই বলে যে, তিনি ছিলেন ‘একাধারে কবি-প্রাবন্ধিক-সমালোচক-গবেষক-স্মৃতিরচয়িতা, গায়ক-গীতিকার, অধ্যাপক, প্রশাসক, কথক-বাগ্মী-টিভি-উপস্থাপক- এক কথায়, অসাধারণ এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্মারকগ্রন্থ : সম্পাদকের ভূমিকা)। তাঁর সম্পর্কে এই কথার যথার্থতা নিয়ে তিলমাত্র সংশয় জাগার কোনোই সুযোগ নেই।

তিন.
জন্মেছিলেন ১২ মার্চ ১৯৩৬-এ পাবনার এক প্রত্যন্ত গ্রাম গোবিন্দায়। মধ্যবিত্ত এই পরিবারে শিক্ষা ও সংস্কৃতির আবহ ছিল, আবু হেনার মানসগঠনে তার প্রভাব পড়েছিল। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন- প্রবেশিকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা পর্যন্ত ফলাফলে তার প্রমাণ মিলবে। বিলেতে গিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি উপাধি অর্জন করেন, এ ক্ষেত্রেও বিদেশি শিক্ষক-তত্ত্বাবধায়ক-পরীক্ষকদের মনোযোগ ও প্রশংসা পান। পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম- দেশের এই তিনটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। কর্মজীবনের সূচনাপর্বে অবশ্য সামান্য কিছুকাল পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ ও রাজশাহী সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু স্থায়ী পদের অভাবে কোথাও থিতু হতে পারেননি। এক সময়ে একটা অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তাঁর মধ্যে কাজ করেছে তাঁর মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষকতার ক্ষেত্রে কোনো ভালো চাকরি না পাওয়ার কারণে। তাই অতৃপ্তি সত্ত্বেও তাঁকে জনসংযোগ পরিদপ্তরে সহকারী পরিচালকের চাকরি গ্রহণ করতে হয়। ১৯৬৩ সালের গোড়ার দিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তারপর রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে থাকার সময়ে ছুটি নিয়ে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও শেষে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা একাডেমিতে কর্মরত থাকাকালেই তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। শিক্ষক হিসেবে যেমন, জাতীয় সারস্বত প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবেও তেমনি যোগ্যতা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ও অনন্য। ছিলেন মজলিশি মেজাজের বড় আড্ডাপ্রিয় মানুষ- বৈঠকি গল্পে তাঁর জুড়ি ছিল না। পরচর্চাও যে কত শিল্পিত ও উপভোগ্য হতে পারে তার প্রমাণ মিলবে তাঁর আড্ডার স্মৃতিতে। কী শ্রেণিকক্ষে, কী সভা-সমিতিতে তাঁর ভাষণ-বক্তৃতা শ্রোতাকে প্রায় সম্মোহিত করে রাখতো- শব্দচয়ন, বাক্যনির্মাণ, বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপন-কৌশলে তাঁর বক্তৃতা এক অনবদ্য বাকশিল্পে উত্তীর্ণ হতে পারতো। তাঁর ছাত্রছাত্রী ও সুধী শ্রোতা এ বিষয়ে নিশ্চয়ই সাক্ষ্য দেবেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ ছিলেন এবং সেইসঙ্গে কাজে যথেষ্ট শ্রম ও সময়ও দিতেন। নিখুঁত কাজের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর- গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নিয়মমাফিক তদারকির ফলে শিল্পকলা ও বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল। তবে এ কথাও বলতে হয়, বিদ্বৎসমাজের স্বীকৃতি-সমাদর যেমন পেয়েছেন, নিন্দা-সমালোচনার কাঁটাও তাঁকে কম বিদ্ধ করেনি- আরোপিত কলঙ্ক ও অনুচিত অবমাননাও তাঁকে সইতে হয়েছে। আহত হয়েছেন- হৃদয়ে গোপন বেদনার রক্তক্ষরণ হয়েছে কখনো-কখনো। আবার অপরপক্ষে ব্যক্তি ও সমাজ তাঁর শানিত বিদ্রƒপ-ব্যঙ্গ-পরিহাসে আক্রান্ত হয়েছে- এইভাবে অনেক সময় তিনি মনের ক্ষোভ মিটিয়েছেন- তাঁর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে কৌতুক- তবে সমালোচনাযোগ্য ব্যক্তির প্রতি তাঁর বিরক্তি ও করুণা থাকলেও কখনো বিদ্বেষ ছিল না। আবু হেনা রুচি ও চিন্তায় ছিলেন আধুনিক ও উদার এবং সেইসঙ্গে সাহিত্যের মনন-সৃজন দুই ক্ষেত্রেই তাঁর প্রজ্ঞা-প্রতিভার পরিচয় প্রতিফলিত। তাঁর লেখায় এই বৈশিষ্ট্যের ছায়া বেশ ভালোভাবেই পড়েছে। আত্মপ্রকাশের তাগিদ থাকলেও আত্মপ্রচারের আকাক্সক্ষা ছিল না তাঁর।

চার.
আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখকসত্তার পরিচর্যা হয়েছে দুইভাবে : সৃষ্টিশীলতা ও মননচর্চায়। তাঁর সৃষ্টিধর্মী শিল্পকর্মের প্রধান নিদর্শন কবিতা। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান ও স্মৃতিচর্চা- তাঁর অগ্রন্থিত দু-চারটে গল্পও এখানে শামিল হতে পারে। আর মননচিন্তার পরিচয় আছে সমালোচনা-প্রবন্ধ-গবেষণা-জর্নালে। অনুবাদেও তিনি হাত দিয়েছেন। সম্পাদনার কাজেও তাঁর উৎসাহ-উদযোগের কথা জানা যায়।
আবু হেনা প্রচুর লিখেছেন এমন বলা যায় না। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। তাঁর অপ্রকাশিত ও নানা পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগ্রন্থিত রচনা বই হিসেবে বের হলে এই সংখ্যা কিছু বাড়বে। তিনি মূলত ‘কবি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। এ যাবৎ তাঁর তিনটি কবিতার বই বেরিয়েছে : ‘আপন যৌবন বৈরী’ (১৯৭৪), ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪) ও ‘আক্রান্ত গজল’ (১৯৮৮)। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছু নির্বাচিত গান গ্রথিত হয়েছে ‘আমি সাগরের নীল’ (১৯৯৫)- এই নামে। তিনি বাংলা একাডেমির ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকায় শিশু-কিশোরদের জন্য কয়েক কিস্তিতে তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচর্চা করেন- ‘ইচ্ছামতীর সোনালী-রূপালী’ (২০০২) নামেই সেটি প্রকাশ পায়। এটিও তিনি বেঁচে থাকতে বের হতে পারেনি। ‘কবি’ পরিচয়ের পরেই তাঁকে চিহ্নিত করতে হয় প্রাবন্ধিক-সমালোচক-গবেষক হিসেবে। এ যাবৎ তাঁর মাত্র দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে- ‘শিল্পীর রূপান্তর’ (১৯৭৫) এবং ‘কথা ও কবিতা’ (১৯৮১)। এর বাইরে তাঁর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ অসংকলিত রয়ে গেছে। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি ‘ঞযব ইবহমধষর চৎবংং ধহফ খরঃবৎধৎু ডৎরঃরহম’ নামে ১৯৭৭-এ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। অ্যান টেরি হোয়াইটের জর্জ ওয়াশিংটন কার্ভারের জীবনীগ্রন্থটি তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন এবং তা প্রকাশ পায় ১৯৬২ সালে। ‘পূর্ব বাংলার কবিতা’ (১৯৫৪) নামে একটি কবিতা-সংকলন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের যৌথ সম্পাদনায় বের হয়। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ তাঁর ভূমিকাসহ প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য সমিতি থেকে ১৯৭৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ পায় জর্নাল-জাতীয় লেখাগুলোর প্রথম খণ্ড ‘কথাসমগ্র’ (২০০০) নাম দিয়ে। পাঠক-সমালোচকের মনোযোগ লাভ করলেও তিনি এক ‘একুশে পদক’ (১৯৮৭) ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি-সম্মাননা-পুরস্কার লাভ করেননি। অজ্ঞাত কারণে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম কখনো বিবেচিত হয়নি।

পাঁচ.
লেখক হিসেবে আবু হেনা মোস্তফা কামালের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে তাঁর কবিতা। তিনি প্রথমত ও প্রধানত কবি। কবিতা দিয়েই লেখক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। কিন্তু তাঁর কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে অনেক দেরিতে। সমালোচক আবিষ্কার করেছেন, বইয়ে ‘তাঁর প্রাথমিক দুই দশকের কবিতা প্রায় অনুপস্থিত’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্মারকগ্রন্থ : পৃ. ৩৭৮)। ফলে তাঁর কবিতার বিবর্তন রেখাটির সঙ্গে পাঠকের অপরিচয়ের দূরত্ব থেকেই যায়।
পূর্ববঙ্গের কবিতার ইতিহাসে পঞ্চাশের দশকের গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। দেশভাগের পর কবিতায় নতুন বৈশিষ্ট্য, রূপ ও রীতি পঞ্চাশের দশক থেকেই ফুটে ওঠে। তিরিশের কবিদের প্রেরণায় এই দশকের কবিরা আধুনিকতার এক নতুন ভুবন সৃষ্টিতে মন দিলেন- প্রসঙ্গ ও প্রকরণে। পঞ্চাশের দশকের কবিরা পূর্ববঙ্গের কবিতার যে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তার প্রভাব পরের কয়েক দশক পর্যন্ত প্রসারিত। আবু হেনা মোস্তফা কামাল এই পঞ্চাশ দশকেরই অন্যতম কবি।
আবু হেনা জন্ম-রোম্যান্টিক। তাঁর কবিতায় প্রবল রোম্যান্টিকতার বোধ ও সেইসঙ্গে নাগরিকচেতনা আবিষ্কার তাই সহজেই সম্ভব। প্রেমের নানা মাত্রা ও নারীর বিচিত্র রূপ নিয়েই মূলত তাঁর কবিতার শরীর নির্মিত। কখনো আবার তাঁর কবিতার বিষয়-বলয়ে প্রবেশ করে প্রকৃতি, মৃত্যুচেতনা, নৈরাশ্য-নিঃসঙ্গতা, সমাজ ও স্বদেশও- আবার কখনো সুন্দরের অর্চনা ও স্মৃতির আবেশের দেখাও মেলে। শব্দসচেতন কবি তিনি- নির্বাচিত শব্দাবলি দিয়ে তাঁর কবিতার সৌধ তৈরি- সেইসঙ্গে উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের কারুকাজে তা সজ্জিত। দীর্ঘকাল ধরে কবিতা লিখলেও তাঁর কোনো বই বের হয়নি ১৯৭৪ সালের আগে। আর তাঁর কবিতাচর্চায় কখনো কখনো ভাটা পড়েছে নানা কারণে, এতে ক্ষুণ্ন হয়েছে ধারাবাহিকতা। কবিতা-লেখার সূচনাপর্বের প্রায় কুড়ি বছর পর তাঁর ‘আপন যৌবন বৈরী’ নামে যে কবিতার বই বের হয় বা তার দশ বছর পর ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪) এবং এর চার বছর পর ‘আক্রান্ত গজল’- এসব বইয়ের কবিতার রচনাকাল চিহ্নিত না থাকলেও অনুমান করা চলে এগুলো ১৯৭২ থেকে ১৯৮৮, অর্থাৎ বাংলাদেশ-সময়ে লেখা। এই উত্তরপর্বে কবি হিসেবে তিনি যে অনেক পরিণত- তার সাক্ষ্য মিলবে প্রকাশিত তিনটি কবিতার বইয়ে। এই সময়কালে লেখা অগ্রন্থিত কবিতার মূল সুরও মোটের ওপর প্রায় একই রকমের।
আবু হেনার প্রকাশিত তিনটি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত কবিতার সংখ্যা ১২৪। আমরা এইসব কবিতার আলোকে তাঁর কবিমানস ও কবিতার বৈশিষ্ট্যকে দ্রুত দৃষ্টিপাতে চিনে নিতে চেষ্টা করবো। প্রেম ও নারী তাঁর কবিতার মূল বিষয়- এর সঙ্গে মিশে আছে নারীর ‘অধরা মাধুরী’র রহস্য আর ছলনার মায়াজাল, কবির নৈরাশ্য ও অপ্রাপ্তির বেদনা- বিরহের সূক্ষ্ম অনুভূতি ও মনোচাঞ্চল্য। প্রেমের অনন্ত উৎস যে নারী, কুহকের জাল বিছিয়ে সে শুধুই বিভ্রান্ত করে- তাকে ‘স্বৈরিণী’ বলে উল্লেখ করলেও তার কাছেই বারবার যেতে হয় কবির বিক্ষত অন্তরের শুশ্রƒষার জন্য। অস্থির চিত্ত আর মানসিক দোটানা তাঁকে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি কখনো হতে চাননি- তাঁর কবিতার ভাষায় : ‘এক রমণীর প্রেমে নিঃশেষিত সরল নায়ক’- কেননা তাঁর আন্তরিক আকাক্সক্ষা ‘অস্থির কবির কণ্ঠস্বর’ হওয়ার।
কবি তাঁর সবটুকু ভালোবাসা আর অনুরাগ দিয়ে রচনা করেছেন তাঁর মানসীপ্রতিমা ‘অরুন্ধতী’কে। তাঁর সব কল্পনা-স্বপ্ন-কৌতূহল-বিস্ময়কে ঘিরে আছে অরুন্ধতী। তার উদ্দেশে কবির উচ্চারণ :
একি জলতরঙ্গ মোহন কণ্ঠে বাজালে তুমি
সাজালে তোমার সোনার অঙ্গ
একটি মাত্র অলঙ্কারে অরুন্ধতী
বাধা না-মানা অরুন্ধতীর আগমন- সে তো কবির পরম প্রাপ্তি, দুর্লভ অর্জন :
কতো বাঁকা চাউনির উৎরাই ভেঙে এসেছো তুমি
হেসেছো স্বচ্ছ নদীর মতোন
অর্গলহীন, অপরাহ্নের স্রোতস্বতী
[‘অরুন্ধতী’, আপন যৌবন বৈরী]
কবিতায় আবু হেনা একমাত্রিক নন, শুধু যে প্রেম ও নারী- এই ভুবনেই তিনি বন্দি, তা কিন্তু নয়- তাঁর অন্য স্বাদ ও আবহের কবিতাও আছে, যার ভেতর দিয়ে কবির ভিন্ন কণ্ঠস্বর শোনা যায়। মাঝেমধ্যেই তিনি স্মৃতি ও স্বজনের কাছে পৌঁছে যান মূলত নিজেকে আবিষ্কার ও উন্মোচনের জন্য- এমন কবিতার মধ্যে ‘আত্মজ’, ‘একজন অপুর ইচ্ছা’ ও ‘স্মৃতি’র কথা বিশেষ করে বলতে হয়। আত্মজের মধ্যে কবি নিজের অস্তিত্ব- আপন ছায়া খুঁজে ফেরেন, তাই গাঢ়কণ্ঠে বলে ওঠেন :
তুমি কি জানতে হে যুবক মধ্যরাতে তোমার জনক
স্বপ্নের বাগানে ঘোরে তন্দ্রাতুর
কৈশোরের খোঁজে? কোথায় আকন্দ বন, মাছরাঙা, সাদা বক,
দূরগামী ট্রেন স্মৃতির পসরা নিয়ে নিরুদ্দেশ
এবং সর্বত্র শুধু বিরুদ্ধ সিগন্যাল!
তবুও তোমার মধ্যে বেঁচে থাকি হে দীঘল যুবা
স্বার্থের কুটিল দ্বন্দ্বে যখন বাতাস রুদ্ধ তুমি
কী সহজে খুলে দাও একে একে সকল জানালা।
[‘আত্মজ’, যেহেতু জন্মান্ধ]
ইছামতী একটি নদীর নাম। যে নদীর সঙ্গে আবু হেনার আশৈশব সখ্য- তাঁর স্বপ্ন-কল্পনা-স্মৃতি-ভালোবাসার একটি প্রতীক। এই ইছামতীও স্মৃতির তরণী বেয়ে বারবার তাঁর কাছে আসে কবিতার ভেতর দিয়ে।
আবু হেনার নাগরিক-মন সময় পেলেই গৃহ-পলাতক বালকের মতো গ্রামীণ নিসর্গের বুকের ভেতরে মিশে যায়। লোকজ জীবন ও সংস্কৃতি থেকে তুলে আনেন তাঁর কবিতার উপকরণ- উপমা-রূপক-চিত্রকল্প। এ বিষয়ে তাঁর অনুরাগ বারবার ধাবিত হয় মরমি বাউলের প্রতি- সেখানে উঠে আসেন লালন-হাসনের মতো মহাকালের চিরায়ত মরমি মহাজন। লোকভুবনের গানে যাঁরা বাঙালির মনকে উদাস-উতলা করে তোলেন সেই আব্বাসউদ্দীন ও আবদুল আলীমও তাঁর কবিতার সঙ্গে মিশে যান। তাঁর আবির্ভাব-দশকের দু’জন প্রধান কবি- শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের কবিতাতেও বাউলপ্রেম ও লোকজ জীবনকে চিত্রিত করার প্রয়াস প্রবলভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। আবু হেনার ‘বাংলা’ (আপন যৌবন বৈরী), ‘অপ্রস্তুত’ (যেহেতু জন্মান্ধ), ‘নিহত বাউল’ (যেহেতু জন্মান্ধ), ‘হাসানের ঘরবাড়ি’ (যেহেতু জন্মান্ধ), ‘প্রথম সম্রাট’ (আক্রান্ত গজল), ‘রোদের বারান্দা’ (আক্রান্ত গজল), ‘জাতিস্মর’ (আক্রান্ত গজল) এবং আরো কিছু অগ্রন্থিত কবিতায় বাউল ও লোকজ ভুবনের কথা উচ্চারিত হয়েছে। এ থেকে বেশ বোঝা যায় আবু হেনা বাঙালি ঐতিহ্যের শিকড়-ছিন্ন কোনো কবি নন।
আবু হেনা তাঁর কবিতায় নারী ও প্রেমের কাছেই শুধু সমর্পিত, সমাজ কিংবা স্বদেশ সম্পর্কে তেমন আগ্রহী নন, এমন ধারণা কেউ কেউ ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই অনুমান যে ভ্রান্ত তাঁর সাক্ষ্য দেয় তাঁর বেশকিছু কবিতা, যেমন- ‘বাংলা’ (আপন যৌবন বৈরী), ‘জন্মদিন ’৭৩’ (আপন যৌবন বৈরী), ‘আমার অগ্রজ’ (আপন যৌবন বৈরী), ‘ছবি’ (আপন যৌবন বৈরী)। দেশপ্রীতির এক অনন্য ভাষ্য রচিত হয়েছে ‘বাংলা’ কবিতায়। প্রচলিত ধারণায় স্বদেশ এখানে জননী নয়, ‘তুই চিরদিন আমার রাধিকা’ হিসেবে চিহ্নিত। ভাষা সংগ্রামের স্মারক ‘আমার অগ্রজ’ কবিতাটি। আর ‘জন্মদিন ’৭৩’ একুশে ফেব্রুয়ারি-সম্পর্কিত বাংলা ভাষায় রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা- অথচ অজ্ঞাত এবং উপেক্ষিত। সংযত আবেগে সজ্জিত উজ্জ্বল পঙ্্ক্তিমালা পাঠকের চেতনায় তীব্র নাড়া দেয় :
মা, তোমার উষ্ণ কোলে আহত অবুঝ মাথা রেখে
আমি শুধু শুয়ে থাকবো, আমার সোনালী লম্বা চুলে
তোমার নিঃশ্বাস ঢেউ তুলে যাবে, আমি, আজ কিছুই করবো না, শুধু
চেয়ে চেয়ে দেখবো এক অলৌকিক গর্বে দীপ্ত সম্রাজ্ঞীর মতোন তোমাকে॥
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আবু হেনার একাধিক কবিতার উদাহরণ আমাদের হাতে নেই- একটি মাত্র আছে, যার নাম ‘ছবি’। ধ্বংস-নির্মমতা-সংগ্রামের এক অসামান্য কথাচিত্র। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অকাট্য সাক্ষ্য যেন এই কবিতা :
খাঁটি আর্যবংশ সম্ভূত শিল্পীর কঠোর তত্ত্বাবধানে ত্রিশ লক্ষ কারিগর
দীর্ঘ ন’টি মাস দিনরাত পরিশ্রম করে বানিয়েছেন এই ছবি।
এখনো অনেক জায়গায় রং কাঁচা- কিন্তু কী আশ্চর্য গাঢ় দেখেছেন?
(‘ছবি’, আপন যৌবন বৈরী)

আবু হেনা পেশাসূত্রে ছিলেন শিক্ষক। তাই তাঁর আলোচনা-গবেষণা মোটের ওপর পেশাগত প্রেরণারই ফসল। তবে মনে রাখা প্রয়োজন অ্যাকাডেমিক প্রয়োজনে তিনি নিছক পেশাদার সমালোচক বা গবেষকে পরিণত হননি। তাঁর শিল্পমানস ছিল সৃষ্টিধর্মী, তাঁর রচনায় এর স্বাদ অনুভব করা যায়।

ছয়.
আবু হেনা মোস্তফা কামাল কবিতার পাশাপাশি সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই গান লিখতে শুরু করেন। তাঁর কবিতা ও গান শিল্প হিসেবে পরস্পরের পরিপূরক। তাঁর সংগীতপ্রেম শুধু গীতরচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, গায়ক হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিতি ও গীতরচয়িতা হিসেবে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছিলেন। গানের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন অকালপ্রয়াত আবুবকর খান, আনোয়ারউদ্দীন খান, আসাফউদ্দৌলাহ্্ ও কাজী আনোয়ার হোসেন- এই চার বন্ধুকে। পরে আবু হেনার সংগীতভাবুকের পরিচয় মেলে গান ও শিল্পী সম্পর্কে তাঁর নানা লেখায়। এর মধ্যে ‘বাংলা গান’, ‘আব্বাসউদ্দীন : কিংবদন্তির নায়ক’, ‘আবদুল আলীম : জননন্দিত শিল্পী’, ‘গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার’, ‘ঝড়হমং ধহফ গঁংরপ রহ ইধহমষধফবংয’- এই লেখাগুলোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে গীতরচয়িতা হিসেবে আজিজুর রহমান, কে. জি. মোস্তফা, সাঈদ সিদ্দিকী, সিকান্দার আবু জাফর যে ধারা তৈরি করেছিলেন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলেন। সে ভিন্নতা বিষয়ের যেমন, তেমনি প্রকাশভঙ্গিরও- শব্দচয়ন, অলঙ্কার-প্রয়োগ ও কাঠামোগত বিন্যাসে তিনি বাংলা গানে নতুনত্ব এনেছিলেন। এই নিরীক্ষা সম্ভব ও সফল হয়েছিল তিনি কবি বলেই হয়তো। তাঁর অনেক গানেই সুর-যোজনা করেছিলেন আবদুল আহাদ, কাদের জামিরী, আবুবকর খান, আনোয়ারউদ্দীন খান, সমর দাশ, মীর কাশেম খানের মতো সংগীতগুণীরা। ‘কথা দিলাম আজকে রাতে’ বা ‘স্নেহ চম্পানদীরও তীরে’- এই গানগুলি অনেক নামি শিল্পীর কণ্ঠে গীত হয়ে এক সময়ে জনপ্রিয় হতে পেরেছিল। আবু হেনা মূলত বেতারের জন্যই গান লিখেছেন। এ ছাড়া নানা অনুষ্ঠান ও উপলক্ষকে কেন্দ্র করেও তাঁকে গান লিখতে হয়েছে- চলচ্চিত্রের জন্যেও। তাঁর লেখা চলচ্চিত্রের বেশকিছু গান বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল।
আবু হেনা কত গান রচনা করেছিলেন সে তথ্য অজ্ঞাত। ১৯৯৫ সালে তাঁর ২০৭টি গানের সংকলন প্রকাশ পায় ‘আমি সাগরের নীল’ নামে। দুটি গীতিনাট্যসহ গানগুলি প্রেম, নিসর্গ, ভাষা ও দেশ, উৎসব এবং পাঁচমিশেলি গান পর্যায়ে বিন্যস্ত। এই গীতিসংকলনের ভূমিকা লিখতে গিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যে কথা বলেছেন তা স্মরণযোগ্য : ‘আবু হেনা মোস্তফা কামালের সর্বাধিক সাফল্য প্রেমের গানে, কিন্তু নিসর্গ ও স্বদেশ, গণচেতনা ও উৎসব-বিষয়ের তিনি যে উৎকৃষ্ট গান লিখেছিলেন, তা আমাদের অজানা নয়’ (আমি সাগরের নীল, ঢাকা, এপ্রিল ১৯৯৫)। ‘অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে/সেদিন বর্ণমালা’, ‘এই বাংলার হিজল তমালে’ এবং ‘যায় যদি যাক প্রাণ/তবু দেবো না দেবো না দেবো না গোলার ধান’- ভাষা ও গণচেতনার এই তিনটি গানের উল্লেখ করে আনিসুজ্জামান মন্তব্য করেছেন : ‘এসব গানের আবেদনও চিরন্তন’ (আমি সাগরের নীল, পূর্বোক্ত)। আবু হেনা বাংলা গানের বাণীকে যে মানে উত্তীর্ণ করেছিলেন, বাংলাদেশে তা আজো কেউ অতিক্রম করতে পারেননি।

সাত.
মননচর্চায় আবু হেনা মোস্তফা কামালের যে ভূমিকা ও অবদান, তাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। প্রাবন্ধিক-সমালোচক-গবেষক হিসেবে তাঁর অর্জন ও সিদ্ধির সংক্ষিপ্ত পরিচয় আমরা এখানে গ্রহণ করবো।
তথ্য ও বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ আবু হেনার উনিশটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে ‘শিল্পীর রূপান্তর’ এবং ‘কথা ও কবিতা’য়। এর বাইরেও যে তাঁর বিক্ষিপ্ত প্রবন্ধের সংখ্যা কম নয় সে তথ্য জানা যায় ‘আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্মারকগ্রন্থে’র সম্পাদক-সংকলকের সৌজন্যে। তিনি প্রবন্ধ-সমালোচনা-স্মৃতিকথা মিলিয়ে আবু হেনার চব্বিশটি অগ্রন্থিত রচনার হদিস দিয়েছেন। এর বাইরেও অগ্রন্থিত-অপ্রকাশিত আরো প্রবন্ধ যে থাকবে তাতে সন্দেহ নেই।
‘শিল্পীর রূপান্তর’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই আটটি প্রবন্ধ : ‘নতুন জীবন : নতুন সংস্কৃতি’, ‘ভবানীচরণ ও কলিকাতা কমলালয়’, ‘বিদ্যাসাগর ও মাইকেল’, ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, ‘রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতা ও পুনশ্চ’, ‘নজরুলকাব্যে শব্দ-ব্যবহার’, ‘পদ্মা নদীর দ্বিতীয় মাঝি’, ‘জসীমউদ্্দীনের কবিতা : জীবন ও শিল্প’। প্রথম প্রবন্ধে পলাশীর যুদ্ধের পরে বাঙালি সমাজের রূপান্তর, প্রতিষ্ঠা ও প্রবণতার এক তথ্যনির্ভর ছবি এঁকেছেন। বাঙালির বিত্ত সঞ্চয়ের উৎস, ভোগ-বিলাস, অমিতাচার, নব্য ধনীদের পরস্পর প্রতিযোগিতা, শাসক ইংরেজের মনোযোগ ও আনুকূল্যলাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা আঠারো-উনিশ শতকের বিত্তবান বাঙালিসমাজে দেখা দিয়েছিল। আবু হেনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, এই ভূঁইফোড় নব্যধনী বাঙালি ‘নানারকম সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডের ভেতর দিয়ে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর কাছাকাছি হলেও ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য জীবনবোধের মর্মবাণী এদের সবাইকে তখনো সমানভাবে স্পর্শ করেনি।’
ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রম্যকথনে ‘কলির শহর কলকাতা’র যে অনবদ্য রূপ আবিষ্কার করেছেন তার প্রধান স্বাক্ষর ‘কলিকাতা কমলালয়’। ভবানীচরণের এর অনুষঙ্গী নকশাগুলির কথাও সমান উল্লেখ্য। আবু হেনা তাঁর অভিসন্দর্ভে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মধুসূদনের এক আত্মিক সম্পর্ক রচিত হয়েছিল। গুণগ্রাহী বিদ্যাসাগর মধুসূদনের সাহিত্যপ্রতিভারই শুধু অনুরাগী ছিলেন না, তাঁর সমস্যা-সংকট-প্রয়োজনেও তিনি আন্তরিক সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। বিদ্যাসাগরের প্রশ্রয়-প্রেরণা-সহায়তা তাই মধুসূদনকে অনেকখানি নির্ভর ও কৃতজ্ঞ করে তুলেছিল। ‘বিদ্যাসাগর ও মাইকেল’ প্রবন্ধে আবু হেনা এই দুই কীর্তিমান বন্ধুর সম্পর্কের খতিয়ান পেশ করেছেন।
মধুসূদনের ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’ কিংবা নজরুলের কবিতায় শব্দ-ব্যবহার নিয়ে লেখা তাঁর এই তিন প্রবন্ধ প্রায় পুরোপুরিই অ্যাকাডেমিক ধাঁচের। তবুও লেখক তাঁর নিজস্ব বিবেচনা ও বিশ্লেষণে বিষয়কে গতানুগতিক আলোচনার বলয় মুক্ত করেছেন।
‘পদ্মা নদীর দ্বিতীয় মাঝি’ এই বইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। নামকরণেই আছে ব্যতিক্রমী ব্যঞ্জনা। এই দ্বিতীয় মাঝির নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়- আর প্রথম মাঝি ছিলেন ‘পদ্মা-প্রবাহ-চুম্বিত’ শিলাইদহের কবি-জমিদার রবীন্দ্রনাথ। এই দুই মাঝির দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লেখকের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। প্রথমজনের আরাধ্য কোমল-পেলব-স্নিগ্ধ-শ্যামশ্রী পল্লিবাংলা আর দ্বিতীয়জনের গ্রাম দারিদ্র্য-দুঃখে কবলিত নিরানন্দ জনপদ। আবু হেনা জানিয়েছেন : ‘… বাইরের লোক হিসেবে গ্রামবাংলাকে দেখেছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথের শিল্পদৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কুশ্রিতা অথবা অশিক্ষা ও অস্বাস্থ্যের ভয়াবহতা ততো মুখ্য নয়। বরং দূর-থেকে-দেখা গ্রামীণ জীবনকে তিনি তাঁর স্বভাবজ আনন্দে ভাস্বর করে এঁকেছেন।’ পাশাপাশি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য প্রয়াসে পদ্মাতীরবর্তী অন্ত্যজ শ্রেণির জীবনচিত্র অঙ্কনে যে আন্তরিক উদযোগ সে সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের প্রতিবেদন এইরকম : ‘শিল্পের উপকরণের জন্য পদ্মার তীরে দ্বিতীয়বার নৌকো ভিড়িয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়…। … পূর্ব বাংলার মাঝিদের সঙ্গে জীবনযাপনের দুঃসাহস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল। অতএব কল্পনার বদলে প্রত্যক্ষ বাস্তবের অন্তরঙ্গ বিবরণ এসেছে সহজেই।’ আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে প্রাবন্ধিক সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন : ‘… রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির পটভূমিতে মানুষকে দেখেছিলেন- মানুষের অন্তরের সঙ্গে প্রকৃতির সহজ সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছিলেন; আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকৃতির মতোই দুর্জ্ঞেয় এক শক্তি- মানুষের প্রবৃত্তিকে দেখেছিলেন তার অন্তরের গুহায়িত আসনে। পঞ্চাশ বছর আগে পদ্মানদীতে নৌকো ভিড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ যে উপকরণ তুলে এনে শিল্প রচনার সূত্রপাত করেছিলেন- পঞ্চাশ বছর পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজবিকাশের উত্তরগতিতে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ লিখে ঐতিহাসিক ধারার পরিণতি দান করলেন।’
‘শিল্পীর রূপান্তর’ প্রবন্ধ-সংকলনের শেষ রচনাটি কবি জসীমউদ্্দীনের জীবন ও শিল্প নিয়ে লিখিত। এই প্রবন্ধে লোকজ জীবন ও সংস্কৃতি কীভাবে জসীমউদ্দীনের কবিমানসকে নির্মাণ করেছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তিনি নাগরিক চেতনার অভিঘাতকে অগ্রাহ্য করে কাব্যভুবন গড়ে তুলেছেন- তার অন্তরঙ্গ পরিচয় মিলবে এই লেখায়। সমসাময়িক কবিরা যখন প্রতীচ্যের চেতনা ও অনুকরণে কবিতাচর্চায় মগ্ন- নাগরিক আবহে স্নাত- জন্ম গ্রামে-মফস্বলে হলেও অনেকেই শহরে এসে বুকের মধ্যে একটি কৃত্রিম আধুনিকতার অস্থায়ী উপনিবেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী হন- জসীমউদ্্দীন তখন তাদের প্রতিবেশী হয়েও স্বতন্ত্র পথে হেঁটেছেন লোকজ ঐতিহ্যের শিকড়ের সন্ধানে। সেই পথে জসীমউদ্্দীন ছিলেন নিঃসঙ্গ পথিক- কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন সগৌরবেই। কবি হিসেবে তাঁর সাফল্য কোথায় তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল নির্ভুল শনাক্ত করতে পেরেছিলেন : ‘… তাঁর কাব্য পাঠের পর পাঠকের চিত্ত পরিপূর্ণ আনন্দের ভারে নম্র হয়ে আসে। আশ্চর্য সংগীতের কুহকে সমস্ত সংশয় ও অতৃপ্তি শান্ত হয়ে আসে।’
‘কথা’ ও ‘কবিতা’ বইয়ের প্রথম দুটি প্রবন্ধ ‘সংবাদপত্রে সমাজ-সমালোচনা’ ও ‘নববিবিবিলাস’- আবু হেনা মোস্তফা কামালের গবেষণা-অভিসন্দর্ভের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত, যেমন ‘শিল্পীর রূপান্তর’ বইয়ের ‘নতুন জীবন : নতুন সংস্কৃতি’ এবং ‘ভবানীচরণ ও কলিকাতা কমলালয়’ রচনা দুটি। ‘কথা ও কবিতা’য় এ ছাড়া আরো মনোযোগ পেয়েছেন মীর মশাররফ হোসেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক এবং এর সঙ্গে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য-কবিতা ও গদ্য।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ মশাররফের স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি। তাঁর খ্যাতি ও পরিচিতির মূলে এই উপাখ্যানের রয়েছে অসামান্য ভূমিকা। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদ একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন ‘শাশ্বত বঙ্গে’ (১৩৫৮)। এতে তিনি মশাররফের মানস বিশ্লেষণ করে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র তাৎপর্য উদঘাটন করেন। মুনীর চৌধুরী তাঁর ‘মীর-মানসে’ (১৯৬৫) ‘বিষাদ-সিন্ধু’র বিশদ আলোচনা করেছেন। এরপর আবু হেনা মোস্তফা কামাল ‘বিষাদ-সিন্ধু’র পুনর্মূল্যায়নে আগ্রহী হন। শতবর্ষের পুরনো একটি আখ্যান কেন উত্তরকালেও সমান সমাদৃত- এর জবাব খুঁজতে গিয়ে তিনি এর কাহিনী, শিল্পরূপ, ভাষাশৈলী, চরিত্রের বৈশিষ্ট্য-বিকাশ ও এর স্রষ্টার অভিপ্রায় সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর বিবেচনায় : ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক সাধনার তৎকালীন প্রাণকেন্দ্র কলকাতা থেকে বহু দূরে এক বিরুদ্ধ প্রতিবেশের সঙ্গে দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হয়েও যে শিল্পী বাংলা সাহিত্যের প্রাণবান ধারাটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ বংশধরদের যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন- তাঁর সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তিই ‘বিষাদ-সিন্ধু’। সে কারণেই, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র শিল্পমূল্য অকিঞ্চিৎকর নয়- এবং তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।’
কথাশিল্পী হিসেবে শরৎচন্দ্রের অস্তিত্ব যখন সংকটাপন্ন, তাঁর জনপ্রিয়তা নিম্নগামী, তাঁর শিল্পসিদ্ধি যখন প্রশ্নবিদ্ধ- এমন এক সময়ে শরৎচন্দ্রের মূল্যায়নে ব্রতী হন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। দীর্ঘ আলোচনায় তিনি এসবের কারণ অনুসন্ধান করেছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে। তিনি ‘শরৎসাহিত্যের জনপ্রিয়তার প্রকৃত কারণ’ এবং ‘তার বর্তমান অবমূল্যায়নের হেতু নির্দেশ করার চেষ্টা’ করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণের ফলাফল হলো এই : ‘… স্বীকার করতেই হবে- সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট জগৎ একদিন বাঙালি পাঠকের কাছে সত্যের মতোই জীবন্ত, স্পন্দিত ও বাস্তব হয়ে উঠেছিল।’
মুনীর চৌধুরী ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রিয় শিক্ষক ও অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর নাটক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবু হেনা যে মন্তব্য করেছেন তাতে নাটকের বিষয়-আশয় নিয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা মেলে : মুনীর চৌধুরীর ‘নাট্যসাধনার কাল ১৯৪৩ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত’ প্রসারিত। এই সময়সীমার ভেতরে রাজনৈতিক ভাঙা-গড়া এবং অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে বাংলাদেশে যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে, মুনীর চৌধুরীর নাটক প্রধানত তারই প্রতিকৃতি।’ সতর্ক বীক্ষণে আলোচকের চোখে ধরা পড়ে : ‘তুলনামূলকভাবে মুনীর চৌধুরী মৌলিক নাটক লিখেছেন কম। অনুবাদ ও রূপান্তরে মনোযোগ দিয়েছেন বেশি। পরিণামে, আমাদের নাট্য-সাহিত্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি তাঁর নাট্যিক সামর্থ্যরে পরিপূর্ণ বিকাশ হয়েছে বিড়ম্বিত।’ তাঁর মৌলিক নাটক বা একাঙ্কিকা সংখ্যায় কম হলেও তা চিরায়ত নাটক-একাঙ্কিকার মর্যাদা পেয়েছে, যেমন ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘কবর’। বাংলাদেশের নাট্যশিল্পে মুনীর চৌধুরীর অবদান সম্পর্কে আবু হেনার মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ : ‘আমাদের চিত্রশিল্প ও নৃত্যকলায় জয়নুল আবেদিন এবং বুলবুল চৌধুরী যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন- নাটকের মতো সমবায়ী শিল্পে মুনীর চৌধুরী এককভাবে সেই ভূমিকাই পালন করেছেন…।’
বাংলাদেশের কথাসাহিত্য, কবিতা এবং গদ্যচর্চা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন আবু হেনা তাতে তাঁর উপস্থাপনের কৌশল, বক্তব্যের ঋজুতা, বিশ্লেষণের শক্তি এবং বিষয়জ্ঞান স্বাদু গদ্যের আশ্রয়ে প্রকাশিত।

আট.
পূর্ণ বিকশিত হওয়ার আগেই চলে যাওয়া আবু হেনা মোস্তফা কামালের জীবন যেন একটি অসমাপ্ত কবিতা। তাঁর ‘দূর যাত্রার পারানি’ নামের কবিতায় তো প্রস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিতই তিনি দিয়েছিলেন মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে :
দুরন্ত বাতাসে উড়ে যাচ্ছে টাইমটেবিলের হলুদ পত্রালি
এখন যেতে হবে সুদীর্ঘ ভ্রমণে, সবুজ ট্রেন আসবে ঝমঝমিয়ে
সমস্ত স্টেশন তোলপাড় করে
বিদায়, বিদায় আমার প্রিয়তম সরাইখানা
বিবর্ণ ইস্কুলবাড়ি, ইছামতী, ম্রিয়মাণ বাসস্ট্যান্ড, বিদায়;
আবার কি দেখা হবে? না।
অবশেষে তাই-ই সত্য হলো। আসলেই কি তিনি মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন? আবু হেনা মোস্তফা কামাল মেধাবী শিক্ষক, প্রতিভাবান লেখক ও অনন্য মজলিশি মানুষ হিসেবে বাঙালির স্মৃতি-শ্রুতি-পঠনে বহুকাল বেঁচে থাকবেন।