জালিয়াত জয়নাল নিয়োগ পান বিএনপি আমলে

আগের সংবাদ

ফুটপাতেও নিরাপদ নয় জীবন

পরের সংবাদ

যৌন সহিংসতা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ , ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯, ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

পণ্ডিত রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন তার ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘মানব সমাজ আজ যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে সেখানে পৌঁছাতে প্রারম্ভিক সময় থেকে আজ পর্যন্ত বড় বড় সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে তাকে আসতে হয়েছে।’
সভ্যতার পথে এগিয়ে আসতে নারী-পুরুষ সবারই ছিল সমান অবদান। আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় অর্থাৎ কৌম সমাজে নারী-পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করত। পরবর্তীকালে সভ্যতার ক্রমবিকাশে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতাদর্পী আধিপত্যবাদী পুরুষ নারীর সব অধিকার হরণ করতে শুরু করে। স্বার্থপর পুরুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বার্থপরতা বজায় রাখার জন্য কখনো বিধাতার ভয় দেখিয়ে, কখনো ধর্মের ভয় দেখিয়ে নারীর ওপর আরোপ করতে থাকে নানাবিধ বিধিনিষেধ। নারীর অবস্থান হতে থাকে গৃহকোণে। নারী তার দুর্ভাগ্যকে বিধির বিধান বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়। পুরুষ ধর্মকে ব্যবহার করতে থাকে নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে নারীর অবস্থান চলে যায় পশুর নিচে। ‘অভাগার গরু মরে, আর ভাগ্যবানের বৌ মরে’ এই প্রবাদ বাক্য তারই সাক্ষ্য বহন করে।
পৃথিবীর সব দেশেই সব সময় নারীর প্রতি এই সহিংসতা কম-বেশি ছিল। সামাজিক বৈষম্যের প্রথম ও প্রধান শিকার নারী। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পূর্বে আরব দেশে নারী শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো এবং মরুভ‚মির উত্তপ্ত বালুতে প্রখর সূর্যের নিচে মেয়ে শিশুকে বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখে হত্যা করা হতো। মহানবী হজরত মুহম্মদ (স.) এই নিষ্ঠুর প্রথার অবসান ঘটান। ভারত উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে জীবিত স্ত্রীকে চিতায় মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণে পুড়িয়ে মারা হতো। রাজা রামমোহন রায়ের চেষ্টায় এই নিষ্ঠুর ‘সতীদাহ প্রথা’ বন্ধ হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদের পুনরায় বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। অল্প বয়সী স্ত্রীদের আমৃত্যু বৈধব্য জীবনযাপন করতে হতো। যাবতীয় সুখ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত থাকত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আপ্রাণ চেষ্টায় হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তন করা হয়। শাস্ত্র পাঠে মেয়েদের অধিকার ছিল না। বাংলাদেশে আজো হিন্দু সমাজের মেয়েরা উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিভিন্ন মনীষী ও সমাজ সংস্কারকের প্রচেষ্টায় নারী পুরুষের অত্যাচারের হাত থেকে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেলেও আজো তারা নির্যাতনের হাত থেকে সম্পূর্ণ রেহাই পায়নি। তার সামাজিক ও মানবিক অধিকার সে ফিরে পায়নি। পুরুষ এখনো নারীকে তার ভোগ্যবস্তু বলেই মনে করে। বিজ্ঞাপনে নারীর প্রাধান্য এ কথাই মনে করিয়ে দেয়। এতদিন বাংলাদেশের সন্তানের পরিচয়পত্রে শুধু পিতার নাম উল্লেখ থাকত। সন্তান জন্ম দিয়েও তার পরিচয়ে মায়ের কোনো অধিকার থাকত না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নিয়মের পরিবর্তন করে সন্তানের পরিচয়পত্রে মায়ের নাম যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করেন। নারীর অধিকার অর্জনের ব্যাপারে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তার সক্রিয় সহযোগিতার ফলেই বর্তমানে আমাদের মেয়েরা লেখাপড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক বিষয়ে ব্যাপক অবদান রাখছে। অনেকে শীর্ষ পর্যায়েও অবস্থান করছে।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমাদের দেশে মেয়েরা ভালো নেই। নারী ও শিশুর প্রতি পুরুষের সহিংসতা বর্তমানে চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে অসংখ্য নারী ও শিশু ধর্ষণ, হত্যার ঘটনা চোখে পড়ে। তিন থেকে ষাট বছর বয়স পর্যন্ত নারী ধর্ষণ ও হত্যার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ‘চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২ হাজার ৮৩ নারী ও শিশু হত্যা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, উত্ত্যক্ত করাসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে’ (ইত্তেফাক : ২০.০৭.১৯)। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী এ বছর জুলাই মাসেই ১৭০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। হত্যা করা হয়েছে ১০ জনকে। ধর্ষণকারীরা যে কত নির্মম, নিষ্ঠুর, নৃশংস ও কুৎসিত হতে পরে তার দৃষ্টান্ত মেলে দুটি ঘটনায় ১. ‘ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে তিন বছরের এক শিশুকন্যাকে গণধর্ষণ করে শরীর থেকে মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। জামশেদপুর রেলস্টেশনে শিশুটি তার মায়ের সঙ্গে যখন ঘুমাচ্ছিল তখনই তাকে অপহরণ করা হয়।’ (ইত্তেফাক : ০২.০৮.১৯)।
২. ‘মিরসরাইয়ে মাত্র ১৭ মাস বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত মো. শিহাব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’ (জনকণ্ঠ : ১১.০৮.১৯)।
উক্ত খবরে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত শিহাব উদ্দিন মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের আবুরহাট বাজারের মো. আশরাফউদ্দিন জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে খন্দকার মুশতাক আহমদ ও জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক ‘ইনডেমনিটি’ আইন পাস করার পর দেশে প্রথম বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়। পরবর্তীকালে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও জেলে জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের বিচার করে এই অপসংস্কৃতির কিছুটা অবসান ঘটালেও দেশের প্রচলিত আইনের দুর্বলতার কারণে সামগ্রিক বিচারহীনতার রেশ থেকে যায়। ত্রু টিপূর্ণ বিচার ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার না করলে দেশে কখনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নারী-শিশুর ধর্ষক এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা তাই বিরল। এই সব ঘৃণ্য ব্যক্তি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এসে তাদের পুরনো অপকর্মের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। খ্যাতিমান কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান যথার্থই বলেছেন, ‘বিচারহীনতা সমাজে অপরাধ যেমন বাড়ায়, তেমনি অপরাধীরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া।’ (প্রথম আলো : ১০.০৮.১৯)।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহম্মদ ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী কোমলমতি শিশুদের ওপর মাদ্রাসার তথাকথিত হুজুরদের যৌন নির্যাতনের প্রবণতা লক্ষ করে বলেছেন, ‘নৈতিক শিক্ষা দেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতেই যে ভয়াবহ নৈতিক অধঃপতন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অশনিসংকেত।’ (প্রথম আলো : ১০.০৮.১৯)। একের পর এক শিশু ধর্ষণে অভিভাবক মহলের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, ‘নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতাদের মতে, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি হয় না বলেই বারবার এ ধরনের ঘটনা।’ (১০.০৮.১৯)।
দৈনিক প্রথম আলোর ‘শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ এফজেএফের’ শীর্ষক প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘বিচারহীনতা এবং ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না বলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছে গেছে।’ (১৯.০৮.১৯)।
একটি শিশু ধর্ষণ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্ষণ বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধ বেড়েই চলেছে। এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীর দ্রুততম সময়ে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার দায় মূলত রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়।’ (ইত্তেফাক : ২০.০৮.১৯)।
উল্লেখ্য, দেশে ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত সংসদ অধিবেশনে অবিলম্বে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন আইন’ সংশোধন করে তা আরো কঠোর করার প্রস্তাব করেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, সম্প্রতি ইউক্রেনের সংসদে নারী ও শিশু নির্যাতনকারী এবং ধর্ষকদের যৌন সক্ষমতা ধ্বংস করার ব্যাপারে একটি আইন পাস হয়েছে। ‘শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নকারীদের যৌন সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করে দেয়ার আইন পাস হয়েছে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে। বিশেষ ইনজেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তাদের যৌন সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা এ ধরনের অপরাধ আর না করতে পারে।… সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র কাজাখস্তানেও একই শাস্তি প্রচলিত আছে।’ (ইত্তেফাক : ১৩.০৭.১৯)।
ইউক্রেন ও কাজাখস্তানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশের সংবিধানেও ‘ধর্ষকদের যৌন সক্ষমতা ধ্বংস’ করার বিধান রাখলে বর্তমানে দেশে লাগামহীন ধর্ষণের যে জোয়ার বইছে তাকে রোধ করা সম্ভব হবে। নারী ও শিশুর প্রতি দুর্বৃত্তদের সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে এর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে করি না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

শাহ্জাহান কিবরিয়া : শিশু সাহিত্যিক, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা