সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগী হোন

আগের সংবাদ

রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে থাকা প্রসঙ্গ

পরের সংবাদ

তেলে টান : সৌদি অর্থনীতিতে লাল বাতি

মোস্তফা কামাল

সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ , ১০:১৬ অপরাহ্ণ

রক্ষণশীলতার আগল ভেঙে সৌদি আরবের সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা পরিবর্তনের পেছনে অর্থনীতি মূল টার্গেট বলে ধারণা দেশটিতে যাওয়া বা প্রবাসে থাকা সাধারণদের। বিগত বছরগুলোতে নানা কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে তেলের দাম পড়ে গেছে, তা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদনকারী এই দেশটির শাসকদের বাধ্য করছে পরিবর্তনের গতি বাড়াতে। অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।

তেলের বাহাদুরিতে আর কুলাতে পারছে না সৌদি আরব। ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ অন্য আরবীয়দেরও তেলের গরমে টান পড়েছে। সৌদি আরবের তেল উত্তোলন ক্ষমতা কমে গেছে এক ধাক্কায় অর্ধেকে। আবার বেশুমার অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র থাকার পরও ড্রোন শনাক্তে ফেল করছে তারা। এতে আবারো প্রমাণ হলো সমরাস্ত্র থাকাই বড় কথা নয়, সেগুলো চালানোর মতো দক্ষ মানুষ থাকতে হয়। পৃথিবীতে গত কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বেশি সমরাস্ত্র কিনেছে এই সৌদি আরব। অথচ যুদ্ধ ময়দানে একের পর এক ধরা পড়ছে দেশটির আনাড়িপনা।
সৌদির তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার তিনি আবারো এ অভিযোগ করে বলেছেন, এর প্রমাণ ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে। ওই হামলায় ইরানি অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট-ন্যাটো বলছে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ইরান বলছে, এটি ‘ধোঁকাবাজি’। তবে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ওয়াশিংটন এবং রিয়াদ তা মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগের আঙুল কেবল ইরানের দিকে।
সামরিক ও স্নায়ু উত্তেজনার পাশাপাশি তেলকে ঘিরে ধাক্কা খেয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব অর্থনীতি। সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইসে দুটি তেল ক্ষেত্রে হামলার পর বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে গত চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ব্যারেলপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৭২ ডলার। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার বিষয়টি অনুমোদনের পর জ্বালানি তেলের দাম আবারো কমতে শুরু করেছে। মুসলিম বিশ্বের বাদশাহীর স্টিয়ারিংয়ে থাকা সৌদি আরব পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক। প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করে দেশটি। টার্গেট করে বুঝেশুনেই হামলা চালানো হয়েছে সৌদি আরবের তেল শিল্পের কেন্দ্রে অবস্থিত বৃহৎ দুটি শোধনাগারে। তেল দৃষ্টেই তৈরি হয় সৌদিদের বাজেট। এ হামলার আগে থেকেই বেশ কিছুদিন ধরে এই তেল বা জ্বালানি ভরসায় ছেদ পড়েছে। তাদের অর্থনীতি দুলছে পেন্ডুলামের মতো। বাধ্য হয়ে বখিলি-কৃচ্ছ্রর পথ ধরেছে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব থেকে শুরু করে ছোট দেশ বাহরাইন, কুয়েতও।
অর্থের প্রশ্নে বাধ্য হয়ে সৌদির অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। আশপাশে খোঁজা হচ্ছে আরো নানা খাত-উপখাত। ভবিষ্যতে এসব খাত থেকে বিশাল অঙ্কের প্রবৃদ্ধি আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে এরই মধ্যে সুদাসলে লোন নিয়েছে বেসরকারি খাত থেকে। রাজকোষের আয় বাড়াতে বিদ্যুৎ এবং পানির দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের বেতন এবং কিছু সুযোগ-সুবিধাও কাটছাঁট করেছে। চেষ্টা করছে নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানির প্রসার ঘটাতে। পর্যটন থেকেও আয় বাড়াতে চায়। ঐতিহাসিক এবং দর্শনীয় স্থানগুলোতে নতুন করে ধোয়ামোছায় হাত দিয়েছে।
সরকারি, বেসরকারি চাকরিতে লোকালদের অগ্রাধিকার দেয়া শুরু করেছে। সৌদিতে টেলিকম সেক্টরে শতভাগ সৌদিকরণ হয়ে গেছে এরই মধ্যে। সৌদি নাগরিক ছাড়া কেউ এখন দোকানে মোবাইল ফোন বিক্রি করতে পারবে না। একই প্রক্রিয়া স্বাস্থ্য খাতেও। ফলে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরছে লাখ লাখ প্রবাসী। তেলে টান পড়াতে কৃচ্ছ্র আনা ও কামাই-রোজগার বাড়ানোর নানা কৌশল খুঁজছে কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, ইয়ামেনও। কোনোটির অবস্থাই সুখকর নয়। অর্থনৈতিক প্রশ্নে কট্টর ধ্যান-ধারণার বাইরে আসার চেষ্টায় গত কয়েক বছরে আমূল পরিবর্তন এসেছে সৌদি আরবের সামাজিক জীবনে। সিনেমা হল চালু, ড্রাইভিং, পুরুষসঙ্গী ছাড়া দেশ-বিদেশে একা ঘোরাফেরার ছাড়পত্র পাওয়ার বাইরেও বহু স্বাধীনতা ভোগ করছে সৌদি নারীরা। নারী-পুরুষ সমানাধিকারের কথা শোনা গেছে সৌদি যুবরাজের মুখে। সরকারি বৃত্তির আওতায় হাজার হাজার সৌদি ছেলেমেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এসেছে। এরা এখন কাজ খুঁজছে। কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের নিগড়ে বাধা স্বদেশে বিনোদনের জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সৌদি সরকারের ‘জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি’র নানা পদক্ষেপে বেশ খুশি তারা। আর্ট ফেস্টিভ্যাল থেকে লাইট শো, এমনকি মিউজিক কনসার্টেরও অনুমতি দিচ্ছে এই অথরিটি।
সৌদির এ বিপ্লবের পেছনে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বিশাল। সৌদি সরকারের ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য সেটাই। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হজকেও অর্থযোগের মৌসুম হিসেবে নিয়েছে সৌদি আরব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক অনুষ্ঠান হজকে ঘিরে আর্থিক লেনদেন থেকে তাদের প্রাপ্তি বাড়ছে বছর বছর। বছর কয়েক আগের হিসাবে জানা গেছে, হজভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৌদি আরবের মোট দেশজ উপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ জোগান দেয়। বাস্তবে অঙ্কটি আরো বেশি। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে চারটি শহর মক্কা, মদিনা, জেদ্দা ও তায়েফের অর্থনীতিতে বিশাল জোগান দেয় পবিত্র হজ ও ওমরাহ। গালফ নিউজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হজকেন্দ্রিক আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ অন্তত তিন হাজার কোটি ডলার। বিজনেস মনিটর ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষা অনুসারে হজের সময় উপহারসামগ্রী ও স্মারক বেচাকেনার পরিমাণ অন্তত ১১০ কোটি ডলার। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে টুপি, তসবিহ, জায়নামাজ, স্কার্ফ, হিজাব ইত্যাদি।
ঘটা করেই পর্যটন ও হজকেন্দ্রিক আয় আরো বাড়াতে চায় সৌদি আরব। ২০৩০ সাল নাগাদ ৩০ মিলিয়ন ওমরাহপ্রার্থী টার্গেট তাদের। সেই টার্গেটে এরই মধ্যে হজ ও ওমরাহর জন্যই বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেলের সংখ্যা বাড়ছে। লেনদেনের জন্য বাড়ছে নগদ অর্থের বদলে ইলেকট্রনিক পদ্ধতি বা কার্ডের ব্যবহারও। সৌদি সরকার ওমরাহ যাত্রীদের দেশটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরার সুযোগ বাড়িয়েছে। আগে ওমরাহর সময় শুধু মক্কা-মদিনা-জেদ্দার সীমিত জায়গায় যাতায়াত বৈধ ছিল।
আগে পর্যটকদের তাদের পর্যটন প্রোগ্রামের সঙ্গে নিবন্ধিত হওয়ার শর্তে তাদের ভিসা পর্যটক ভিসায় রূপান্তর করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। সেটিও তুলে নেয়া হয়েছে। রক্ষণশীলতার আগল ভেঙে সৌদি আরবের সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা পরিবর্তনের পেছনে অর্থনীতি মূল টার্গেট বলে ধারণা দেশটিতে যাওয়া বা প্রবাসে থাকা সাধারণদের। বিগত বছরগুলোতে নানা কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে তেলের দাম পড়ে গেছে, তা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদনকারী এই দেশটির শাসকদের বাধ্য করছে পরিবর্তনের গতি বাড়াতে। অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।