প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে

আগের সংবাদ

বার্তাটি কি সবার কানে পৌঁছাবে?

পরের সংবাদ

সংস্কৃতি বনাম মিডিয়া সংস্কৃতি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

নূর ইসলাম হাবিব

সহকারী পরিচালক, আইএসপিআর

আমাদের চৈতন্যে ও মননে মিডিয়া সংস্কৃতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং চিন্তার বিকাশ ব্যাহত করে মনোবিকৃতি ঘটাচ্ছে। ফলে চিন্তাশীলতার বিনাশ হচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সমালোচনাধর্মী, বিশ্লেষণমূলক সিরিয়াস বিষয়ের প্রতি যে অনীহা, তার পেছনে মিডিয়া সংস্কৃতির প্রভাব কতখানি তাও দেখতে হবে। পাশাপাশি আমাদের জীবনে অভিজাত সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতির গুরুত্বও অনুধাবন করতে হবে।

মানুষের জীবনে সংস্কৃতির রয়েছে শক্তিশালী প্রভাব। মানুষের সংস্কৃতি এতই শক্তিশালী যে, হাতের কাছে খাদ্যদ্রব্য থাকা সত্ত্বেও সে অভুক্ত অবস্থায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। অর্থাৎ সংস্কৃতি যে খাদ্য গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা গ্রহণ না করে মানুষ মৃত্যুর পথ বেছে নিচ্ছে। সংস্কৃতি তাই জীবনের চেয়েও শক্তিশালী। সংস্কৃতিবোধ থেকেই একজন মানুষ তার প্রবল যৌনক্ষুধাকে অবদমিত করে রাখতে পারছে। এভাবে আজো বিবাহপূর্ব সতীত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। আবার কেউ কেউ চিরকুমারত্ব বরণ করে নিচ্ছে স্বেচ্ছায়। সংস্কৃতির প্রভাবে একজন মানুষ অপমানের গ্লানিবোধ থেকে বাঁচার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আমাদের সমাজে ধর্ষণের শিকার অনেকেই অপমানের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছা মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। এসবই হয়েছে সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাবে।
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় অনেক লোক না খেতে পেরে মারা গেছে, যদিও অনেকের ঘরেই পর্যাপ্ত খাবারের মজুদ ছিল। অভুক্ত মৃত্যুপথযাত্রী মানুষগুলো বাঁচার জন্য লুণ্ঠন কিংবা সমাজবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করেনি। এ জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা সংস্কৃতিকে জীবন-মৃত্যুর চেয়েও শক্তিশালী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বাধীনতা লাভের জন্য লাখ লাখ মানুষ যে হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়, জাতীয় সম্মান রক্ষার্থে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে জীবনকে তুচ্ছ করে, এসবই সম্ভব সংস্কৃতির প্রভাবে। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ত্রিশ লাখ বাঙালি আত্মত্যাগ করতে পেরেছে, তা শুধু সংস্কৃতির জোরেই সম্ভব হয়েছিল। জেনেশুনেও মানুষ হাসিমুখে এই মৃত্যুকে মেনে নেয়। আবার বিশেষ বিশেষ মৃত্যুকে মানুষ মহিমান্বিত করে, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় করে রাখে। কোনো কোনো মৃত্যুকে মানুষ ভুলতে পারে না। এ জন্য মানুষ মারা গিয়েও অমর হয়ে থাকে। এসবই সংস্কৃতির ফল।
সংস্কৃতির প্রধানত দুটো বিভাগ রয়েছে। যেমন- অভিজাত সংস্কৃতি (ঊষরঃব ঈঁষঃঁৎব) এবং লোক সংস্কৃতি (ঋড়ষশ ঈঁষঃঁৎব)। সংস্কৃতির এই অকৃত্রিম দুটো ধারার বিপরীতে বর্তমানে আরেকটি সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে। নতুন এ সংস্কৃতির নাম পপুলার কালচার বা জনপ্রিয় সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির মিডিয়ার সাহায্য নিতে হয় বা এর প্রচারের প্রধান ভূমিকা গণমাধ্যম বা মিডিয়ার। এ জন্য এটাকে মিডিয়া সংস্কৃতিও বলা হয়ে থাকে। অভিজাত সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে বিজ্ঞান, দর্শন, সিরিয়াস গল্প-উপন্যাস, কাব্য মতাদর্শ, ইতিহাস, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ধ্রুপদী সঙ্গীত ইত্যাদি। এগুলো এখন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ তা পরিণত হয়েছে কমার্শিয়াল আর্টে। ভাস্কর্য তেমন বিকাশ লাভ করছে না ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে। সমাজবিজ্ঞানী ডরষবহংশু বলেন, অভিজাত সংস্কৃতির দুটো বৈশিষ্ট্য। এটা নির্মাণ করেন অভিজাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা, যাদের রয়েছে সৌন্দর্যবোধ, গভীর সাহিত্য জ্ঞান ও বিজ্ঞান চেতনা। এরা তুলনামূলকভাবে আধুনিক। কখনো কখনো বর্তমান সময়ের চেয়েও অগ্রগামী। এরা ব্যাপক পড়াশোনা ও সাধনা করে থাকেন। কখনো কোনো বিষয়ে গবেষণা করে সে জ্ঞান সৃষ্টিশীলতার কাজে লাগান। সাধারণত পাঠকদের কথা চিন্তা করে এরা তাদের সাংস্কৃতিক পণ্য সৃষ্টি করেন না। তারা তাদের সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টি করেন বিশেষ শ্রেণির দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের জন্য। কোনো জার্নালে প্রকাশিত লেখা, কিংবা সিরিয়াস সাহিত্যকর্ম এ জন্যই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় না। অভিজাত সংস্কৃতির নির্মাতারা তাদের সৃষ্টিকর্মে অনুসরণ করেন জটিল ফরম ও বিশেষ পদ্ধতি। তাদের সৃষ্টিতে থাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ, গবেষণার ছাপ। তাদের সৃষ্টি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল কিনা তা নিয়ে তারা সব সময় ভাবেন না। তারা তাদের সৃষ্টির গুণগত মান নিয়েই তৃপ্ত।
লোকসংস্কৃতি, সংস্কৃতির আরেকটি সমৃদ্ধ ও অকৃত্রিম ধারা। মিডিয়া আবিষ্কারের পূর্বে এ সংস্কৃতি ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে খুবই প্রিয় ছিল। লোকজ ও প্রাকৃত উপাদানের কারণে এটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ ধরনের সংস্কৃতি তৈরির পেছনে তেমন কোনো উদ্দেশ্য কাজ করে না। এটা তৈরি করা হয় অবচেতন মনে, মনের খেয়ালে। এ ধারাটি চলে আসছে আবহমানকাল ধরে। এর নির্মাতাদের বিশেষ কোনো পরিচয় নেই, নেই তেমন কোনো খ্যাতি। লোকশিল্পীরা খ্যাতিমান হওয়ার জন্য কিংবা আর্থিক লাভের জন্য শিল্প সৃষ্টি করেন না। তারা এগুলো সৃষ্টি করেন আপন মনে, সৃষ্টির আনন্দে। তারপরেও আমরা এমন সব লোকশিল্পী ও লোকসংস্কৃতির নির্মাতাদের নাম খুঁজে পাই যাদের সত্যিই মনে না রেখে, ভালো না বেসে, শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না। আমরা ভুলতে পারি না মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেবের কথা, রামায়ণের রচয়িতা বাল্মীকির কথা, ইলিয়াড ও ওডেসির রচয়িতা হোমারের কথা। নীতিগল্পের রচয়িতা ঈশপের নামও আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত। তার পরবর্তী সময়ের লালন শাহ, হাছন রাজা, আব্বাস উদ্দিন, আবদুল আলীম, শাহ আব্দুল করিম প্রমুখও আমাদের ভালোবাসার জন। বাউল গানের স্রষ্টাদের নাম হয়তো আমরা খুঁজে পাই না তেমন, তবু তারাও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন পরম শ্রদ্ধায়, মমতায়। প্রাচীন বাংলার প্রখ্যাত মহিলা জ্যোতিষী খনার নাম প্রোজ্জ্বল হয়ে আছে বাংলাদেশের জলবায়ুনির্ভর কৃষিতত্ত্ব বিষয়ে উপদেশমূলক অজস্র ছড়া লেখার জন্য।
বর্তমান বিশ্বে হাইড্রোজেন বোমার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তু মনে করা হয টেলিভিশনকে। আর টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পেছনে মানুষ ব্যয় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়। ভায়োলেন্স চিত্রের আধিক্যের ফলে টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রের দর্শক-শ্রোতাদের বিশেষ করে বালক-বালিকাদের সুকুমার অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটি শক্তিশালী মাধ্যম ইন্টারনেটও আমাদের জীবনে অধঃপতন ডেকে আনছে। এ মাধ্যমটির অপব্যবহারের ফলে লোকজন বেশি করে অপরাধের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সমাজে এর কুপ্রভাব পড়ছে। এজন্য বাড়ছে সামাজিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। সাম্প্রতিককালের এক জরিপে দেখা গেছে, এশিয়ানরা এখন আরো বেশি মাত্রায় ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আর এ বিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ছাত্র এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তারা। নেটভ্যালু নামের একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এ রকম জরিপের পর ছাত্রছাত্রীদের মা-বাবার মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। মিডিয়ার সামাজিক প্রভাব নিয়ে বর্তমানে অনেক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। মিডিয়া সংস্কৃতি এমনই এক সংস্কৃতি যার সঙ্গে প্রায় সব সংস্কৃতির লোকই নিজেদের একাত্ম করে নিতে পারে। গণসমাজের বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি রেখেই এ সংস্কৃতি নির্মাণ করা হয়। এখানে বিশেষ শ্রেণি-পেশার দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের চিন্তাই এ সংস্কৃতি নির্মাতার মাথায় কাজ করে। মিডিয়া সংস্কৃতি নির্মাণ করা হয় বৃহত্তর বাজারের জন্য। এজন্য এখানে থাকে সর্বজনীনতা নিয়ে আসার প্রচেষ্টা। এখানে গণআচরণ, গণরুচির প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। এ সংস্কৃতি নির্মাণের সময় দেশের উঁচু স্তরের সংস্কৃতিবান এলিট বুদ্ধিজীবী সমাজ কী ভাবল, সেদিকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। মিডিয়া সংস্কৃতির কাছে অভিজাত সংস্কৃতি বা এলিট কালচার একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মিডিয়া সংস্কৃতি বিশ্বতান্ত্রিক সমাজের অনিবার্য ফল। মিডিয়া সংস্কৃতি গণবিনোদন ভিত্তিক। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে সমগ্র বিশ্ব আজ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার।
যোগাযোগ প্রযুক্তির শক্তিধর সব আবিষ্কারই যুক্তরাষ্ট্রের অবদান। সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই মিডিয়া সংস্কৃতির পক্ষের যুক্তিগুলোকে তেমন জোরালোভাবে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হচ্ছে না। মিডিয়া সংস্কৃতি গণরুচিতে যে প্রভাব ফেলছে, তা মানুষকে বিকারগ্রস্ত করে দিচ্ছে বলে সমালোচকরা অভিযোগ তুলেছেন। বলা হচ্ছে, আমাদের চৈতন্যে ও মননে মিডিয়া সংস্কৃতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং চিন্তার বিকাশ ব্যাহত করে মনোবিকৃতি ঘটাচ্ছে। ফলে চিন্তাশীলতার বিনাশ হচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সমালোচনাধর্মী, বিশ্লেষণমূলক সিরিয়াস বিষয়ের প্রতি যে অনীহা, তার পেছনে মিডিয়া সংস্কৃতির প্রভাব কতখানি তাও দেখতে হবে। পাশাপাশি আমাদের জীবনে অভিজাত সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতির গুরুত্বও অনুধাবন করতে হবে।

নূর ইসলাম হাবিব : সহকারী পরিচালক, আইএসপিআর। 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা