নির্ভার

আগের সংবাদ

ইসি ভবনে আগুনে ক্ষতি তিন কোটি ৭৭ লাখ

পরের সংবাদ

দোহারের ছদ্মবেশ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯, ৭:০৬ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

পর্ব: ৪

কেষ্ট মল্লিক অনেক কষ্টে মনের তলানিতে থাকা ডাক্তারের নামটা খুঁজে ঠোঁটে আনে। রতনেরও ওই ডাক্তারের ব্যাপারে অনুমোদন আছে। তাতে প্রফুল্লর উপরেও কেষ্টর ভরসা হয়। যদিও গ্রামে তার ভরসার লোক দুইজন। রণজয় আর জগৎ মণ্ডল। জগৎ মণ্ডলের বয়েস হয়েছে। আর রণজয় হেডমাস্টার হওয়ার পরে শতেক কাজে ব্যস্ত। যদিও প্রফুল্লর সঙ্গে ডাক্তার বিষয়ে কথা হওয়ার পরে সব জগৎ মণ্ডলকে বলেছে সে। পরিতোষ জানে, প্রফুল্ল কিছুদিন আগে বউকে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে তাতেই জগৎ মণ্ডলের তাকে সায় দিতে আর আপত্তি ছিল না।
ওই সময়ে রতন জানায়, এত সকালে না আসলেও হতো। তবে এসেছে যখন ভালোই হয়েছে, আগে সিরিয়াল পাওয়া যাবে। তারপর যদি কোনো কিছু চেক করতে দেয় ডাক্তার, তাও সময় থাকবে। তবে যাই হোক, কেষ্ট মল্লিক যেন দেখানো হয়ে গেলে রতনের বাসায় যায়। একথা রতন বলবে জানত কেষ্ট। কিন্তু সাবিত্রীকে নিয়ে রতনের বাসায় একান্তই ঠেকায় না পড়লে যায় কী করে? কেষ্ট মল্লিক জানায়, বাড়িতে ছোট ছোট তিনটে মেয়ে রেখে এসেছে তারা। একজন তো দুধের বাচ্চা। যত দ্রুত সম্ভব ফিরে যাবে। এবার না-হয়, সামনে কখনও আসলে তখন আসবে।
কেষ্ট মল্লিক রিকশায় ওঠার সময়ে রতন জানতে চেয়েছিল, ‘ও জামাই, বাঁধালের জমি বেচা নিয়ে কৃপার সাথে আপনার কোনো কথা হইচে নিকি?’
প্রশ্নটা শুনেই কেষ্ট মল্লিক একটু থতমত খেয়েছে। কারণ কৃপাসিন্ধুর বাপ হিসেবে তার তো অল্প-বিস্তার যা-ই হোক জানার কথা। কিন্তু সে তো বাঁধালের জমি বেচা নিয়ে কিছু তো জানেই না, উলটো জানে আর শোনে কৃপা আর পার্বতী দিন কয়েক বাদে বাদে যুক্তি করে পরামর্শ করে ওই জমি বেচার পরে তারা কচুয়ায় সিনেমা হলের সামনে জমি কিনবে। সেই জমিতে একদিন মার্কেট হবে। যদি মার্কেট তারা নাও তুলতে পারে, তখন বেশি দামে বেচে দেবে। বাঁধালের জমির দাম যে হারে বাড়বে তার চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়বে এই জমির দাম। তাছাড়া বাঁধালের জমি তো রতনদের সঙ্গে ভাগে। তারা সে জমি বেচে দেবে। তার চেয়ে বড়ো কথা, যেটা আসল কথা সিনেমা হলটা পার্বতীর বাপের বাড়ির কাছে। ওখানে জমি কেনা হলে, কখনও সেখানে মার্কেট তুলতে পারলে তার দেখভালের দায়িত্ব পার্বতী তার ভাইদের দিতে পারবে। এদিকে সুনীলের সঙ্গে তলে তলে কিংবা উপরে পার্বতীর যে খায়খাতির তাতে সেও পার্বতীকে সময়ে অসময়ে সব ধরনের খবরাখবর দিতে পারবে। সুনীলের স্বার্থ হলো, পার্বতী ও কৃপার উপরে এক ধরনের কর্তৃত্ব করার সুযোগ হয়। অনেক দিন ধরে আছে থানা সদরে, বাড়িঘর তুলে সেখানকার এক স্বাবলম্বী মানুষ সুনীল!
কেষ্ট মল্লিক রতনের কথা শুনে ওই কথাটাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দিয়েছিল, ‘আর ব্যাডা, কী যে কও, কৃপা ওইয়ে নিয়ে আমার সাথে কথা ক’লি তো হইছিল!’ এ কথায় কেষ্ট মল্লিকের অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। সে অসহায়ত্বের মূলে তার দ্বিতীয় বিয়ে একটা কারণ সে জানে। আবার একই সঙ্গে ছেলের সঙ্গে তার দূরত্বও যে পার্বতীর কারণে, সেটাও চাইলে সে প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এখন রতনকে কি তা বলা যায়? নাকি বলবে?
রতন বলেছিল, ‘না, সে নয় না-কবে, কিন্তু সেই জন্যে একেবার কিছুই জানাবে না?’
‘না।’ কেষ্ট মল্লিক যাবার তৎপরতা দেখায়।
‘সুনীলের সাথে মাঝে মইদ্যেই কথা কয় আমার।’
‘সেইয়ে?’ কেষ্ট মল্লিক একটু বিস্ময় প্রকাশ করে। যদিও সে জানে সুনীলের সঙ্গে কৃপা নিশ্চয়ই কথা বলে। যদিও সুনীলে সঙ্গে কেষ্টর দেখা হলে সে কখনও জানতে চায়নি।
‘হয়।’ রতন বলে, ‘আমার সাথে সুনীলদের দেখা হ’লি তারপর ক’ল।’
মাঝখানে সুনীলের সঙ্গে কেষ্টরও দেখা হয়েছে, কিন্তু তাকে কিছু বলেনি। সেও জানতে চায়নি। কিন্তু এ কথার প্রতিক্রিয়ায় কেষ্ট কোনো মন্তব্য করার আগে রতন বরং ভিতরের কথাটাই বলে, ‘আমি সুনীলদারে ক’লাম, শোনো এহোনও বাঁধালের জমি বেচার কিছু হলো না। সামনে ইলেকশন আসতিছে। যদি আমলীগ আসে তা’লি? বিএনপি থাকতে হিন্দুগো জমির দাম পড়ে। আমলীগ আসলি কুইমে যায়। তারপর? সামনে আমলীগ আসতি পারে। এহোনো বাঁধালের জমিরই কিছু হলো না। তার আগেই জমি কেনার জন্যি এইভাবে মানুষ জানাইয়ে কোনো লাভ আছে?’
‘সুনীল কী কয়?’
‘এট্টু মনে হয় কিছু মনে করিচে। ওই যে মানুষ জানাইয়ে কইচি সেই জন্যি। কয়, “আমি তয় কৃপার জানানো মানুষ হইয়ে গেলাম। গেরাম সম্পর্কে খুড়া না? ওর চৌদ্দগুষ্টির প্রতিবেশী না? আমাগে লাগালাগি বাড়ি না? আমরা সুখদুঃখে এক সাথে, কৃপার আর আমার শ্বশুরবাড়ি এক গ্রামে। তারপর, ও রতন তুমি কইলা এত মানুষ জানানো?” তার কথায় আমি আর কী কব? আমি যে সেই মানুষ জানানোর কথা কইনি, সে কথা যদি সুনীলদা এট্টু বোঝদো।’
এবার কেষ্ট সুনীলের পক্ষেই বলে, ‘না, সুনীল সেরাম মানুষও না। কথা বেশি কয়। বোঝে সব। বারো পদের মানুষ চালাইয়ে খায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু না হলি কৃপারে জলে ফেলাবে না।’
রতন কেষ্ট মল্লিকের এই মন্তব্যে উপরে সায় দিতে পারলেও ভিতরে নিজের অবস্থান ঠিকই রাখে। সেও তো সুনীলকে চেনে। ব্যবসার কারণে তাদের বাঁধালের কেউ কেউ আরও ভালো চেনে সুনীলকে। এতদিন ধরে রতন বাগেরহাট শহরে থাকে, কিন্তু সাইকেল চালিয়ে যখন ইচ্ছে তো যায় সেখানে। আগে সুনীলের নামে যা-যা শুনেছে, তাতে একবাক্যে এখন তার এই ছোট জামাইয়ের কথায় সায় দেয় কী করে? তবু দেয়। সঙ্গে এইটুকু বলে সেও সাইকেলে ওঠে, ‘তয় কৃপা যা করুক তাকে যেন জিজ্ঞাসা করে করে, সেও তো দুই চারজন মানুষ চেনে।’ বলেই বোঝে, এ কথা কৃপাসিন্ধুর পর্যন্ত নাও পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ কেষ্ট মল্লিক ছেলেকে কিছুই বলবে না। তাই সে আরও বলে, ‘ও জামাই, কৃপারে কইয়েন এদিক আসলি যেন আমার সাথে এট্টু দেহা করে।’ তারপর সাবিত্রী আর কেষ্ট মল্লিককে ‘নমস্তে’ বলে সাইকেলে ওঠে। কেষ্ট বলে, ‘দণ্ডবৎ। হরে কৃষ্ণ!’
এই যে সুনীল আর কৃপার কাজকর্ম সম্পর্কে তার জানা, আর বাকি সব মিলিয়ে কেষ্ট মল্লিকের কিন্তু কৃপাসিন্ধুকে রতনের ওই কথাটা বলা হয়নি। বলা হবেও না। সে বলবে না। হয়তো বলত, কিন্তু বলা হয় না। তার আগেই প্রতিদিন মল্লিক বাড়ির এই অংশে এমন সব ঘটনা ঘটে, পারস্পরিক সম্পর্ক এমন জায়গায় নিয়ে পৌঁছে যে, একভিটায় থাকলেও তাদের মুখ দেখাদেখিই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তা সম্ভব নয় বলেই তাদের আবার দেখা হয়। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে, সে আলোতে ছায়া পড়ে। তারা মনে মনে ভাবে, যদি সুযোগ থাকে তারা পরস্পরের ছায়াও মাড়াবে না। কিন্তু তাই-বা কী করে সম্ভব? শত হলে কেষ্ট মল্লিক আর কৃপাসিন্ধু বাপ-পো। কৃপাসিন্ধু বড়ো। ছোটজন কান্তিময় কার প্রতি অভিমানে ওই হরিসভার পশ্চিমে হালদারদের বাগানের এক প্রান্তে আত্মত্যাগ করেছে, সে কথা আজও কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। তারও বছরখানেক আগে মরেছিল কেষ্ট মল্লিকের স্ত্রী আশালতা। তারপর থেকে একদমই কূলহারা মানুষ এই কেষ্ট মল্লিক। তার সঙ্গে তার বড়ো ছেলে কৃপাসিন্ধুর এমন বিরোধ। এ তো কোনোভাবেই ভালো কথা নয়। মানুষ শুনলে কী বলে। যদিও সেই বিরোধ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের দূরত্ব। কেউ কেউ তা মিট-মীমাংসাও করতে চায়।
প্রতিবেশী জগৎ মণ্ডল একদিন হঠাৎ শ্রীধরকে সে কথা বলেওছে। শ্রীধরের কচুয়ায় সাইনবোর্ড লেখার দোকান। সকালে বের হয় সন্ধ্যার পরে ফেরে। কচুয়া থেকে ভাসা পর্যন্ত রাস্তাটা পাকা হওয়ার পরে সাইকেলে আসত যেত। এখনও তাই যায়। তবে এই ভিতরের পথ দিয়ে। বড়ো রাস্তার সুড়কি উঠে যাওয়ার পরে কাউন্সিল পর্যন্ত যেতই পাছার ছাল প্রায় আর থাকে না। তার চেয়ে এই ভিতরের মাটির রাস্তা ভালো। ধীরে ধীরে যাওয়া যায়। যদিও সারাটা বর্ষাকাল সাইকেল ঘরেই পড়ে ছিল।
শ্রীধর কচুয়া যাওয়ার পথে জগৎ মণ্ডল তাকে থামিয়ে বলেছিল, ‘ও ভাইডি ছিরিধর, কেষ্ট সাথের কৃপা আর কৃপার বউর সম্পর্ক দিনকে দিন যে জাগায় যাতিছে, পরে না-জানি কোনো অনিষ্ট হইয়ে না যায়। কিছু একটা করা যায় নিকি?’
শ্রীধর যা শোনে তা বাড়ি ফেরার পরে ছবির কাছ থেকে। কোনওদিন শোনে আজকে সাবিত্রীর সঙ্গে পার্বতীর পুকুরপাড়ে একচোট হয়েছে। তার কারণ, সাবিত্রী তার শ্বশুরকে কেষ্ট বলে এই বাড়ির সামনের জমিটুকু লিখিয়ে নিয়েছে। যদিও সাবিত্রী বলেছে, তাকে বিয়ে করার সময়ে এই জমি সেধে দিয়েছে। যাক, এসব কথা হতেই পারে। কিন্তু খোঁচাটা অন্য জায়গায়। সেই জমি রক্ষার জন্যেই সাবিত্রী একের পর এক মেয়ে বিয়িয়ে এই বাড়িঘর ভরে তুলেছে। তারপর একদিন যখন তার শ্বশুর থাকবে না, তখন বড়োভাই হিসেবে ওই বোনদের টানতে হবে ওই কৃপাসিন্ধুকেই। যদিও সবাই জানে, সাবিত্রী এমনিতে পার্বতীর সঙ্গে কথা বলে না। এসব কথার উত্তর দেয় না। কিন্তু কখনও কখনও পার্বতীর ঠ্যাস-মারা কথা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে যে তার উত্তর না দিয়েও পারা যায় না। সম্পর্কে খুড়িশাশুড়ি হলেও এমন আচরণ ছবি কিংবা রেখার সঙ্গেও করে পার্বতী। যদিও রণজয়ের বউ গীতার সঙ্গে করে না। তবে যে বউ শাশুড়ির সঙ্গে অমন আচরণ করতে পারে তার খুড়িশাশুড়ি কিংবা খুদিও মতন দিদিশাশুড়ি নিয়ে কোনো বাছবিচার থাকার কথা নয়। তবে গীতার সঙ্গে পার্বতী কেন কখনওই উঁচু গলায় কিংবা ঠ্যাস দিয়ে কথা বলে না, তা আজও ছবি কিংবা রেখা দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারেনি।
যাক, জগৎ মণ্ডলকে নিজেদের বাড়িঘরের এইসব কথা বলা যায়। শ্রীধর তা বলেছিল। তাহলে সংকট সাবিত্রীর একের পর এক মেয়ে হওয়া আর তাকে কেষ্টর জমি লিখে দেওয়া? নাকি ওই পার্বতীর কথায় কৃপার মামাদের জমি বিক্রি করে নতুন জমি কেনা? সেসব যাই হোক, সবাই প্রায় সব কিছুই জানে। ধীরে ধীরে আরও জেনে যায়। কিন্তু তাতে তাদের প্রতিদিনের কোনো বদল আদৌ ঘটে না।
সে কথাটাই জগৎ মণ্ডল বলেছে। কেননা, সাবিত্রীকে কেষ্টর বিয়ে করায় তারও তো কিছু দায় আছে। আবার, শ্রীধরের গুষ্টির লোক কেষ্ট ও কৃপা- তারও দায় কম না। যদি শ্রীধরের ছোটভাই গুণধরের মতন সব কিছু তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিতে পারত, তাহলে এতকিছু ভাবার দরকার পড়ত না।
তাই হয়তো একদিন সন্ধ্যার পরে কচুয়া থেকে ফেরা ক্লান্ত শ্রীধরের হরিসভা মন্দিরের সামনে হারিকেনের আলো কমিয়ে বসে থাকা কেষ্টকে দেখে বড়ো কষ্ট হয়। সে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদের আলো আছে, তবু পথ চলতে টর্চ জ্বালে সে। ব্যাটারি প্রায় শেষদিকে। কিনতে হবে। এখনই এই সন্ধ্যারাতে পায়ের কাছে শ্রীধরের টর্চের মলিন আলো পড়ে। তার ওপর যে গরম পড়েছে সেই শেষ বিকেল থেকে তাতে কাজে কোনোভাবেই সে মন বসাতে পারেনি। আঁকা লেখা হাতের কাজ; মনেরও কাজ। তাতে মেজাজ এমন বিগ্রে থাকলে কার কাজে মন বসে? সামনে ইলেকশন আসছে, অনেক জায়গায়ই ব্যানার আর সাইনবোর্ডের কাজ আছে। তবে এই এমপি ইলেকশনের কাজ প্রায় সবই বাগেরহাটে হবে, শ্রীধর কাজ কমই পাবে। আবার ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানি মেম্বারির কাজে ব্যানার তেমন হয়নি। সুনীল কিংবা আন্ধারমানিকের অসীমকে বলতে হবে, তাকে যদি হিরুভাইর কিছু কাজ জোাগাড় করে দেয়। সে বাগেরহাটের চেয়ে কম পয়সায় করে দিতে পারবে। শ্রীধর বোঝে, সে কাজ একদম খারাপ পারে না। অনেকের কাজই তো এই জীবনে দেখেছে সে, তাদের তুলনায় তার কাজ মোটেও খারাপ না। আর ইলেকশনের ব্যানার লেখা সবচেয়ে সোজা কাজ!
আসার পথে এ কথা ভেবেছে শ্রীধর। আজ কাজ তেমন হয় না, কাল যদি গরম কম পড়ে তাহলে খুব সকালে গিয়ে কাজ ধরবে। আর অবশ্যই অবশ্যই সুনীলকে বলবে হিরুভাইর কাজের কথা। সুনীল চাইলে একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। আগের চেয়ারম্যান মাহাতাবউদ্দিনের বাড়ি ছাড়ানোর পরে ডানে বামে বিস্তীর্ণ ক্ষেতের বাতাস তার গায়ে লাগলে শ্রীধর এসব ভুলে যায়। এই বাতাস সারাটা বিকাল কি সন্ধ্যা কোথায় ছিল? কোথায় আর থাকবে? দিনে দিনে কচুয়ার খালের এপাড়ে ওপাড়ে দালান হচ্ছে। টিনের এক চালা দোলা দোকান উঠছে। তার পুব দিকে বলেশ্বর মরে যাচ্ছে, তাহলে বাতাস আসবে কোত্থেকে। যদিও বাতাস তার দক্ষিণ থেকে আসার কথা। এখন শ্রীধরের পিছন সেদিকে। কিন্তু উন্মুক্ত প্রান্তরে এই যে বাতাস উঠে আসছে তাতো প্রায় চারদিক থেকেই। তাতে এতক্ষণের ক্লান্ত পা হঠাৎ একটু সচল।
এই সময়ে রাস্তা থেকে দূরে হরিসভা মন্দিরে চোখ পড়লে দেখে সেখানে হারিকেনের আলো। আর এই যেন প্রথম বাড়ির কাছে এসে শ্রীধর নিজের টর্চের আলোর দিকে তাকিয়ে দেখে তাও মলিন। ব্যাটারির দাম বেড়েছে। হক ব্যাটারি ভালো কিন্তু দাম বেশি, আজকাল অলিম্পিকও ভালো। শ্রীধর সব সময় হক ব্যাটারি কেনে।
পায়ে পায়ে একটু এগিয়ে রাস্তা থেকেই সে হরিসভার দিকে তাকিয়ে বোঝে, মন্দিরের বারান্দায় বসে আছে কেষ্ট মল্লিক। ওপাশের বারোয়ারি দুর্গা মন্দির অন্ধকার। ওটা এমনিতে তাই থাকে। ভর সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। একসময় বাতাসে কিংবা তেলের অভাবে সে প্রদীপ নিভেও যায়। পাশের হরিসভায় অবশ্য সন্ধ্যার পরেও কেষ্ট মল্লিক থাকে। সেখানে প্রদীপ নিভে গেলেও জ্বলে তার হারিকেন। সে আলোয় সে ভাবগৎ পড়ে। আজকাল অবশ্য কেষ্টর এসবও কিছু বদলে গেছে। একটার পরে একটা তিনটা মেয়ে আর কৃপার ঘরে দুই নাতি। তবু সে সময় পেলে নিজের রাধামাধবকে ডাকতে ভোলে না।
কিন্তু এখন মন্দিরের সামনের ছোট বারান্দায় পাশে হারিকেন রেখে ওই ভাবে বসে আছে কেন কেষ্ট মল্লিক? কিছু হয়েছে। এতটা দূর থেকে পাশের হারিকেনের অস্পষ্ট অলোয় তো বোঝা যায় লোকটা কেষ্ট। শ্রীধরের এতক্ষণের ফুরফুরে মেজাজ উবে যায়। সে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ ভাবে, ডাক দেবে, নাকি কাছে যাবে? নাকি ভাগবতেরই কোনো পদ ওইভাবে মাথা গুঁজে আওড়াচ্ছে কেষ্টদা? তাই-বা কী করে হয়? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। যখনই শ্রীধর, পরিতোষ হরষিত পুলক কিংবা অমলের সঙ্গে আলাপ করে কেষ্টকে নিয়ে তখন তো তারা বলে লোকটার হইতে আর কিছু বাকি নেই। যা হওয়ার সব হইয়ে গেছে। সব সময় আছে কৃপার বউ পার্বতীর মুখের ওপর। তারপর এই বয়েসে বিয়ে করছে, হয়েছে তিনজন মেয়ে।- এইসব রেখে কোথায় যাবে? আজকাল যে একটু কৃষ্ণ নাম করবে সে উপায়ও নেই। তারপর কৃপাসিন্ধুটা যদি একটু বাপের দিকে দেখতে, তাও কথা ছিল।
শ্রীধর রাস্তা থেকে নেমে এগিয়ে যায়। মন্দিরে সামনে দাঁড়ায়। অন্ধকার জমেনি পুরোপুরি, কিন্তু ছায়া তো পড়ার কোনো সুযোগ নেই, তাই এখন পায়ের শব্দ না-হলে কেষ্ট মল্লিকের মাথা তুলে তাকানোর কোনো কারণ নেই। তবু শ্রীধর ভাবে, একবার গলা খাঁকারি দেবে। আবার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালে যদি আচমকা চমকে যায় কেষ্ট। তার চেয়ে আছে যেতে যেতে মাটিতে টর্চের আলো ফেললে তা দেখতে পারে। কিন্তু তাতেও কেষ্ট মল্লিক নড়ে না। ওই একইভাবে হাঁটুতে মাথা গুঁজে থাকে। শ্রীধর অসহনীয় ধন্দে পড়ে। ঘটনা কী?
এবার শ্রীধর ডাক দেয়, ‘ও কেষ্টদা, কেষ্ট দা?’
এই ডাকে আচমকা মাথা তোলে কেষ্ট। সে কোনোভাবেই যেন ভাবেনি এখন তাকে শ্রীধর ডেকে তুলতে পারে। ফলে, শ্রীধরকে দাঁড়ানো দেখে কেষ্ট একটু বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, ‘তুই এই জায়গায়? এত তাড়াতাড়ি আসলি যে?’
‘আজই যে গরম পড়ছে। আর ভালো ঠেকতিল না। ভাবলাম বাড়ি চইলে আসি। তাই চইলে আসলাম।’
‘তা ভালো। তা ভালো। তোর হাতের কাজ, রোজ তো একরহম ভালো লাগেও না। কী করবি- চইলে আসলি-’
শ্রীধরের মনে হয়, কেষ্ট একটু অসংলগ্ন কথা বলেছে। (চলবে)