পুরান ঢাকার হোসেনি দালান থেকে বের হয়েছে তাজিয়া মিছিল

আগের সংবাদ

‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’

পরের সংবাদ

ডিএমপিতে এত মধু!

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ , ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯, ১:০১ অপরাহ্ণ

Avatar

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানায় ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৫০ কর্মকর্তাই অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে ঘুরেফিরে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় এক দশক ধরে এ-থানা ও-থানা করে তারাই আছেন ঢাকায়। কারো কারো অন্যত্র বদলির আদেশ হলেও তদবিরের জোরে তা বাতিল হয়ে যায়! অনেক ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বছর ধরে একই থানায় থেকে পদোন্নতি পেলেও ডিএমপির বাইরে বদলি হননি এসব কর্মকর্তা। আবার শাস্তি বা অন্য কোনো কারণে কোনো কর্মকর্তা ডিএমপির বাইরে বদলি হলেও কিছু দিন পরই তাকে আবার ডিএমপিতে ফিরে আসতে দেখা যায়। পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো পুলিশ সদস্য দুই বছর এক স্থানে থাকতে পারবেন না। এ কারণে মাঝে মাঝে থানা বদল করলেও ডিএমপিতেই আছেন তারা। এখন থানায় ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার তিনজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। অফিসার ইনচার্জ ছাড়াও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) এবং ইন্সপেক্টর (অপারেশন) নামে এরা পরিচিত। এর সবই ঘুরছে একই বৃত্তে। যদিও এ নিয়ে তাদের ব্যাচমেটদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একই থানায় অবস্থান করলে ওই এলাকার অপরাধী এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে ওই এলাকার ভিকটিমদের সঠিক বিচার না পাওয়া ও সামগ্রিক অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি কিছু কর্মকর্তা প্রভাব খাটিয়ে পছন্দসই থানায় দায়িত্ব পালন করলে বাহিনীর অন্য সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করে।

ডিএমপির সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো পুলিশ সদস্য দুই বছর এক স্থানে থাকতে পারবেন না। তবে বিশেষ প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে সময়ের মেয়াদ কিছু দিন বাড়াতে পারে। এ নিয়ম ডিএমপিতে খাটে না। নির্দিষ্ট সময় পর ওসি পরিবর্তন করতে গেলে উপর থেকে বিভিন্ন ধরনের চাপ আসে। অতীতে এসব ওসির বেশির ভাগ বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাস করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এরা রাতারাতি জার্সি বদল করে নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে প্রচার শুরু করেন। এ কারণে ওসিদের পরিবর্তন করতে গেলেই ডিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তারা অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যান।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, রমনা মডেল থানার ওসি মাইনুল ইসলাম আগে খিলগাঁও থানার ওসি ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ইসির নির্দেশে তাকে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে বদলি করা হলেও কিছুদিন পরই প্রভাব খাটিয়ে আবার রমনা থানায় ফিরে আসেন। শাহবাগের আবুল হাসান আগে কোতোয়ালিতে, ধানমন্ডির ওসি আবদুল লতিফ ডিবিতে, হাজারীবাগের ইকরাম আলী মিয়া চকবাজার ও ভাটারায় ইন্সপেক্টর (অপারেশন্স), নিউমার্কেটের আতিকুর রহমান ক্যান্টনমেন্টে, কলাবাগানের ইয়াসির আরাফাত নিউমার্কেটে, লালবাগের ওসি কে এম আশরাফউদ্দিন সূত্রাপুরের ওসি ও খিলক্ষেতের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), কোতোয়ালির ওসি মো. শাহিদুর রহমান বংশালে, কামরাঙ্গীরচরের ওসি এ বি এম মশিউর রহমান কোতোয়ালির ওসি (এর আগে ছিলেন তেজগাঁওয়ের ইন্সপেক্টর-তদন্ত), চকবাজার থানার ওসি সোহরাব হোসেন সবুজবাগে, বংশালের ওসি মো. শাহিন ফকির আগে কামরাঙ্গীরচরের ওসি এবং রূপনগর ও শাহবাগে ইন্সপেক্টর তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনে ডিএমপি থেকে বদলি হতে হয়নি তাকে।

সূত্রাপুরের ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী কদমতলী, বাড্ডা ও রামপুরায়; ডেমরার ওসি মো. সিদ্দিকুর রহমান ডিএমপিতে, শ্যামপুরের মিজানুর রহমান মিরপুরে ইন্সপেক্টর (তদন্ত), কদমতলী থানার ওসি জামালউদ্দিন মীর মোহাম্মদপুরে, যাত্রাবাড়ীর মাজহারুল ইসলাম তেজগাঁও ও কদমতলীতে, গেণ্ডারিয়ার ওসি মো. সাজু মিয়া কদমতলী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছিলেন, ওয়ারীর ওসি আজিজুর রহমান যাত্রাবাড়ীতে, মতিঝিলের ওমর ফারুক আগে মুগদায় থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে মতিঝিলে দায়িত্ব পালন করছেন। পল্টনের ওসি মাহমুদুল হক ডিবিতে, সবুজবাগের ওসি মাহবুব আলম গুলশান থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), খিলগাঁওয়ের মশিউর রহমান রমনায়, রামপুরার আবদুল কুদ্দুস ফকির সবুজবাগ ও বংশালে, শাহজাহানপুর থানার ওসি শহিদুল হক খিলক্ষেত ও পল্টনে, মুগদার প্রলয় কুমার সাহা রামপুরার ওসি ও পল্টনের ইন্সপেক্টর (তদন্ত), তেজগাঁওয়ের শামীম অর রশিদ তালুকদার চকবাজার ও দক্ষিণখানে, মোহাম্মদপুরের গোপাল গণেশ বিশ্বাস শেরেবাংলা নগর ও ডিবিতে, হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশিদ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের মো. আলী হোসেন খান উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানার ওসি ছিলেন।

আদাবরের এস এম কাউসার আহমেদ দীর্ঘদিন ডেমরা থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। শেরেবাংলা নগরের জানে আলম মুন্সি রমনা থানার ওসি ও কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), মিরপুরের দাদন ফকির পল্লবীতে, পল্লবীর নজরুল ইসলাম মিরপুর ও ভাষানটেকে, শাহআলীর সালাউদ্দিন মিয়া গুলশান থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), কাফরুলের ওসি সেলিম উজ্জামান শাহআলী ও দারুস সালামে, দারুস সালামের আসলাম উদ্দিন কাফরুল ও মিরপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), রূপনগরের আবুল কালাম আজাদ এক সময় ডিএমপিতে, ভাষানটেক থানার মুন্সি ছব্বির আহমেদ শেরেবাংলা নগরের ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছিলেন।

গুলশানের এস এম কামরুজ্জামান ভাটারায়, বাড্ডার রফিকুল ইসলাম ওয়ারী ও পল্টনে ওসি এবং রামপুরায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ছিলেন, ক্যান্টনমেন্টের ওসি কাজী শাহান হক রামপুরার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), খিলক্ষেত থানার মো. মোক্তাজিরুর রহমান ডিএমপিতে, ভাটারার আবু বকর সিদ্দিক শাহবাগ ও গুলশানে, বনানীর বি এম ফরমান আলী বিমানবন্দর ও মতিঝিলে, উত্তরা পূর্ব থানার নূরে আলম সিদ্দিকী ডেমরা ও বংশালে, তুরাগের নুরুল মুক্তাকিম ভাটারা, লালবাগ ও ডেমরায় ছিলেন; দক্ষিণখানের ওসি শিকদার মোহাম্মদ শামীম হোসেন কাফরুলে, উত্তরখানের হেলাল উদ্দিন এক সময় ধানমন্ডিতে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে উত্তরখানে রয়েছেন, বিমানবন্দরের নূরে আযম মিয়া আগে ধানমন্ডি ও গুলশানে, উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা ওয়ারী ও দক্ষিণখানের ওসি ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ভোরের কাগজকে বলেন, বহুকাল ধরে সব ধরনের সরকারি কর্মচারীদের ৩ বছরের বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে না থাকার বিধান আছে। এটি বহুদিন ধরে বহুকারণে স্বীকৃতও। পুলিশের ক্ষেত্রে এ সময়টা আরো কম। এই প্রেক্ষাপটে ডিএমপির একই থানায় দীর্ঘদিন অবস্থান করা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও পক্ষপাতিত্বের ফল। এক প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট এই আইনজীবী আরো বলেন, সাধারণত এক স্থানে অবস্থান করার প্রশাসনিক যে নীতি রয়েছে, তা উপেক্ষিত হতে পারে দুই কারণে। প্রথমত, দলীয় আনুগত্য, দ্বিতীয়ত অর্থের বিনিময়। স্পষ্টত একটি বাহিনীর এত অধিক সংখ্যক কর্মকর্তার বেলায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে এক জায়গায় থাকার জন্য নিয়ম যখন লঙ্ঘিত হয়, সেটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি বললে ভুল হবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি এডভোকেট সুলতানা কামাল ভোরের কাগজকে বলেন, কোনো এলাকায় যদি কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে থাকেন তাহলে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে তার একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। তখন তিনি আর নৈর্ব্যক্তিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এ জন্য সময়মতো বদলি করাই উচিত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, নির্দিষ্ট এলাকায় কোনো কর্মকর্তা নিজে থাকছেন না। তাদের রাখা হচ্ছে। সুতরাং কারা কী কারণে তাদের একই এলাকায় রাখছেন সেগুলো তদন্ত করে দেখা উচিত।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, অপরাধ দমন ও ভিকটিমের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি থানার গুরুত্ব অনেক। কিন্তু থানাগুলোর ওসি বদলির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু ডিএমপি নয়, পুরো পুলিশ প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ওসিরা যখন একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তখন তাদের নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। অপরাধ চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। ফলে অপরাধ বাড়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি ওই নির্দিষ্ট থানাগুলোতে বদলি হতে না পেরে বাহিনীর অন্য সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তৌহিদুল হক জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, পুলিশের যেসব সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাদের সঙ্গে অপরাধ চক্রের সদস্যদের সুসম্পর্ক হতে দুই বছরই যথেষ্ট। অর্থাৎ সমন্বিতভাবে চোখের ইশারায় অপরাধ সংগঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামীণ এলাকায় সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালালে সাধারণ জনগণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে ভয়হীন মনোভাব সৃষ্টি হবে।