ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দিতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

আগের সংবাদ

হ্যারি কেনের হ্যাটট্রিকে শীর্ষে ইংল্যান্ড

পরের সংবাদ

মাথাব্যথা ‘গ্যাং কালচার’

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯ , ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯, ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

Avatar

রাজধানীসহ সারাদেশে উঠতি কিশোর, তরুণ ও যুবকদের ‘গ্যাং কালচার’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেগতিক পরিস্থিতিতে একযোগে শুরু হয়েছে অভিযান। কয়েক বছর ধরে গ্যাং কালচার গড়ে উঠলেও হালে ছড়িয়েছে এদের ডালপালা। অভ্যন্তরীণ বিরোধে ঘটেছে একাধিক হত্যাকাণ্ড। গ্যাং সদস্যদের সংগ্রহে রয়েছে আধুনিক অস্ত্র। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে উঠতি বয়সী ছেলেদের দ্বন্দ্বে এক কিশোর খুনের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাং। শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গাতেও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এরা। স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়ানো, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, ইভটিজিং, বাইক রেসিং দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে মাদক, চাঁদাবাজি ও খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল শনিবার জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্যাং কালচার প্রতিরোধে কাজ করছে। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার সন্তানদের দিকে লক্ষ্য রাখুন। তারা যেন কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে না পড়ে। সন্ধ্যার পর তারা কেন বাইরে থাকবে? কিশোররা হয় পড়ার টেবিলে থাকবে, না হয় বাসায়। তারা বাইরে থাকবে কেন? আমরা দেখছি কিশোররা অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে। তাদের দিকে খেয়াল রাখুন। যদি কোনো কিশোর অপরাধ করেই থাকে, তাহলে কিশোর আইনে তাদের বিচার হবে বলেও জানান মন্ত্রী। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ঢাকায় গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না। সবাইকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। গ্যাং কালচারের বিরুদ্ধে ডিএমপি শূন্য সহিষ্ণু নীতি অবলম্বন করছে। জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময় আটক হওয়া কিশোরদের পরিসংখ্যান আশঙ্কার মাত্রা বাড়িয়েছে। গত তিন বছরে কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় ৪০০ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে চলতি বছর ১৭৪ জন ও গত দুই বছরে ১৯০ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে তারা। এদিকে ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়টিকে ভাবিয়ে তোলার মতো উল্লেখ করে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোর অপরাধ রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নয়; পরিবারকেই মুখ্য ভ‚মিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া সমাজের সবাইকে কিশোর অপরাধ রোধে এগিয়ে আসতে হবে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে আদনান কবির হত্যার পর এই গ্যাং কালচারের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর এসব গ্রুপের ব্যাপ্তি আরো বেড়ে যায়। ১৫-২০ বছর বয়সী কিশোরদের প্রতিটি গ্রুপে ১০-২০ জন করে সদস্য থাকে। ডিসকো ভয়েস, নিউ নাইন স্টার, নিউ আইকন, ডেঞ্জার বয়েস, লাড়া দে, দেখে ল-চিনে ল, কোপাইয়া দে, বাংলা ও লাভলেট প্রভৃতি উদ্ভট নামে খোলা হয় এসব গ্রুপ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পেজ ও ম্যাসেঞ্জারে গ্রুপ খোলে তারা। এর মাধ্যমেই যোগাযোগসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীজুড়ে এরকম গ্যাং গ্রুপ রয়েছে প্রায় ৩০-৩২টি। এর মধ্যে ১৫-২০টি গ্রুপ অপরাধে জড়িয়ে গেছে। প্রায় প্রতি মাসে রাজধানীর কোনো না কোনো এলাকায় বখাটে কিশোর গ্রুপের মাধ্যমে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ঢাকায় চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কিশোর অপরাধের ঘটনায় প্রায় দুই ডজন মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যাদের মধ্যে ২৫ জনকে শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে শতাধিক কিশোরকে আটক করে পুলিশ। পরে ৮ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে কিশোর গ্যাং গ্রুপের দ্বন্দ্বে মহসিন নামে এক কিশোর খুন হয়। পুলিশ বলছে, নিহত মহসিন ও ঘাতক পারভেজের মধ্যে পূর্বশত্রুতা ছাড়াও কিশোর গ্যাং নিয়ে কোন্দল ছিল। পারভেজ ছিল ‘আতঙ্ক’ নামক গ্রুপের নেতৃস্থানীয়। নিহত মহসিন ‘ফিল্ম ঝিরঝির’ গ্রুপের সদস্য। এর আগে গত মঙ্গলবার গাজীপুরে কিশোর গ্যাং চক্রের হাতে নূরুল ইসলাম (১৫) নামে এক কিশোর খুন হয়। সিনিয়র এক কিশোর গ্যাং সদস্যকে তুই বলে সম্বোধন করার জেরে নূরুল ইসলামকে কুপিয়ে ওই চক্রের সদস্যরা হত্যা করে বলে অভিযোগ। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, গত দুমাসে আমরা অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ২০০শর মতো সদস্যকে আটক করে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছি। ২৪ আগস্ট রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে স্টার বন্ড গ্রুপের ১৭ সদস্যকে আটক করে ১ বছর করে সাজা দেয়া হয়। একই দিন বংশালে জুম্মন গ্রুপের প্রধানসহ ৫ সদস্যকে ধরা হয়। ২৫ আগস্ট মুগদায় অভিযান চালিয়ে চান-জাদু গ্যাং, ডেভিল কিং ফুল পার্টির, ভলিয়ম টু ও ভাণ্ডারি গ্রুপের ২৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সাজা দেয়া হয়েছে।
কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকার বাইরেও : ঢাকার বাইরে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় রয়েছে ২০-২৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। মাদক, ডিজে পার্টি ও চুরি-ছিনতাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে এই গ্যাংয়ের কিশোররা। এর জের ধরেই গত বছরের জানুয়ারিতে জামাল খান এলাকায় হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাই স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফারকে। একইভাবে ওই বছরের জানুয়ারিতে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে খুলনা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শেখ ফাওমিদ তানভীর রাজিমকে। খুলনা শহরে কিশোরদের অন্তত সাতটি গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে ভয়ঙ্কর গ্যাংগুলো হচ্ছে স্টার বয়েজ, হিরো বয়েজ, ডেঞ্জার বয়েজ, গোল্ডেন বয়েজ ও টিপসি। সিলেট শহরেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে কিশোরদের সাত-আটটি গ্যাং। দামি মোটরসাইকেলে করে শহরে ঘুরে বেড়ানো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, মাদকসেবনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ঈগল স্টার, আরজিএসসহ অন্তত ১০টি গ্যাং দাবড়ে বেড়াচ্ছে কুমিল্লা শহর। তারা জড়িয়ে পড়ছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, প্রকাশ্যে ধূমপান, গাঁজা সেবনসহ খুনখারাবির মতো ঘটনায়।
র‌্যাব লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম এ প্রতিবেদককে বলেন, পিউবিটি অর্থাৎ যখন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে তখন একটা হিরোইজমের চিন্তাভাবনা থাকে কিশোরদের মধ্যে। সে সময় থেকেই তারা নিষিদ্ধ জিনিসে আগ্রহবোধ করে বেশি। এ থেকেই গ্যাং কালচারটা গড়ে ওঠে। এরপর তারা কার বা বাইক রেস করে, মাদকে ঝুঁকে পড়ে, ছিনতাই, ইভটিজিং, বিভিন্ন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, দেয়াল লিখনে নিজেদের জানান দেয়। তবে কিশোর গ্যাং রোধে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ অভিযান চালাচ্ছি। বিভিন্ন সময় শতাধিকের বেশি কিশোরকে আটক করে কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সাইন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও বস্তুগত দিক উঠতি বয়সের ছেলেদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। আর এ বয়সে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আগ্রহ থাকে কিশোরদের। এটিও একটি কারণ। তবে এসব রোধে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে। আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে এ ধরনের অপরাধ রোধসহ সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা করা যায়।