ডেঙ্গু: সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৫ শতাংশ রোগী

আগের সংবাদ

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

পরের সংবাদ

সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান রমা চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ , ৭:০৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯, ৭:০৬ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

ছাপ্পান্ন হাজার ব-দ্বীপজুড়ে জেগে আছে শহীদের আত্মা। মাটি খুঁড়লেই পাওয়া যাবে তরতাজা রক্তছোপ। শহীদের রক্ত উর্বর করছে আমাদের জমি, সমৃদ্ধ করছে আমাদের চেতনার স্তরটিকে। আর মাটিতে? যেখানে ঘাস জন্মে, যেখানে ঘরবাড়ি, যেখানে বিস্তার হতে থাকে লক্ষ্মী আর সরস্বতী, যেখানেই আমাদের যাপন আর উদযাপনের সমূহ ভালোবাসা সেই মাটিই সিক্ত হয়ে আছে রক্তে-ত্যাগে। এখানে আমরা দিব্যি হেঁটে যাই, গেয়ে যাই সময়ের গান, লিপ্ত হতে থাকি বিশ্রিরকমের প্রতিযোগিতায়। একজন শহীদ জননী, একজন বীরাঙ্গনা, একজন মমতাময়ী মা এই মাটিতেই খুঁজে পায় শ্রদ্ধা আর অনুভবের সবটুকু। ফলত, আমরা নির্লজ্জ হাঁটতে পারি, গাইতে পারি- পারেন না একজন রমা চৌধুরী। তিনি খালি পায়ে হাঁটেন এ মাটিতে, জুতো তাকে নিতে পারে না সময়ের সাথে। তার কেবলই মনে পড়ে সন্তানের কথা, একাত্তরের শহীদের কথা। রমা চৌধুরী নিজেই জানান এভাবে, ‘যে মাটির নিচে আমার দু’দুটি সন্তান শুয়ে আছে, শুয়ে আছে লক্ষ লক্ষ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সে মাটিতে আমি দম্ভের সাথে জুতা পায়ে চলি কি করে? তাই জুতা পায়ে দেয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ যে জননী বাংলাদেশের, প্রিয় জন্মভূমির প্রতিটা ইঞ্চি মাটিতে জিইয়ে রাখেন তার সাধনা আর স্বপ্নের বীজ- তিনি যুগের অবতার হয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়ে যান কীভাবে ভালোবাসতে হয় মাটিকে-মানুষকে-স্বাধীনতাকে। এমনতর ভিন্ন জীবনধারা আর বিশ্বাসে জীবন কাটান প্রিয় মানুষ রমা চৌধুরী- সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
আমাদের গল্প-উপন্যাসে অহরহ দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষাবৃত্তি করছেন, মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে পতিতা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধার ভাই কি ছেলে ডাকাত হচ্ছে- সাহিত্য যদি সত্যিকার অর্থেই সমাজের দর্পণ হয় তবে মানতে হবে এসব। সেই তথাকথিত এবং প্রায়-প্রচলিত ধারণাটিকে রমা চৌধুরী বদলে দেন নিজের জীবন দিয়েই। তিনি জীবিকার মাধ্যম করে নেন লেখাকেই! যে দেশে অধিকাংশ লেখকই রয়্যালিটি পান না বলে শোরগোল তোলেন অথচ একজন রমা চৌধুরী জীবনের আর সবদিকে তো বটেই এখানেও অনন্য হয়ে আছেন। তিনি নিজে বই ছাপেছেন, নিজে নিজের বই বিক্রি করেছেন। বইয়ের ভূমিকায় রমা চৌধুরী তার পেশা-নেশা নিয়ে এভাবেই বলেছেন, ‘লেখা ছিল আমার নেশা, আর তা বিক্রি করাই ছিল একমাত্র পেশা। ঐ লেখা বিক্রির আয় দিয়েই আমি বহন করছিলাম আমার অনাথ আশ্রম দয়ার কুটিরের যাবতীয় ব্যয়ভার।’ এমনকি তাকে নিয়ে লিখে, তার সম্পত্তি অপদখলের পাঁয়তারাও দেখতে হয়েছে সময়কে। তার রচিত গ্রন্থাদি কি একেবারেই জলো ছিল? কিংবা ফেলনা? অথচ বিচিত্র বিষয়ে তার সাহিত্য রচনাগুলো ভাস্বর। প্রবন্ধের মতো কঠিন বিষয়েও তিনি পারঙ্গম- রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য, নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, সপ্তরশ্মি, যে ছিল মাটির কাছাকাছি, ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি গ্রন্থে প্রবন্ধকার রমা চৌধুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। এবং পাঠকদের কবুল করতে হয়, প্রবন্ধকার শুধু শখেই লেখেননি, তার হৃদয়ের বৌদ্ধিক ভাবনা দিয়েই এসব প্রবন্ধে নিজের ভাবনাপুঞ্জকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন অন্যের হৃদয়ে। রমা চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামে। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা চট্টগ্রামেই- যদিওবা জীবনের নানা বাঁকে তাকে নানাদিকে যেতে হয়েছে। এরপরও জন্মধাত্রী চট্টগ্রাম, বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রামের আলোকসামান্য মনীষাদের নিয়ে তার প্রবন্ধসংকলন ‘চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যে জীবন-দর্শন’ প্রসিদ্ধ। চট্টগ্রামে প্রচলিত সমাজমনস্ক লোকছড়া, লোকসাহিত্য, ছড়া ও প্রচলিত প্রবাদের ঐতিহাসিক সূত্র, ধাঁধার ভেতর থাকা রঙ্গ, প্রবাদের ভেতর দিয়ে সমাজের অসঙ্গতিতে বিদ্রƒপ ইত্যাদির সুলুকসন্ধান করেছেন রমা চৌধুরী ‘চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যে জীবন-দর্শন’ বইয়ে। এই প্রবন্ধগ্রন্থটি রমা চৌধুরীর উজ্জ্বল কাজগুলোর একটি। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের মাধ্যমে ছড়া কীভাবে আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, ইতিহাসকে কীভাবে ধারণ করে লোকছড়া, কীভাবে লোকছড়ায় ধরে রাখে বৈচিত্র্য, ধরে রাখে রচয়িতরা তা নানা আলোয় ব্যাখ্যা করেন রমা চৌধুরী প্রাগুক্ত গ্রন্থে। প্রবাদের মাধ্যমে স্থানিক ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসকে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি দারুণভাবে আলোকপাত করেন প্রবন্ধকার। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে রমা চৌধুরী তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিরাবরণ ও নির্মোহভাবেই তুলে আনেন পাঠকের সামনে। আমাদের হুজুগে সমাজে তার বৈচিত্র্যময় প্রবন্ধ ও চিন্তার যথাযথ ব্যাখ্যা তো হয়নি, উল্টো তার রচনাকে ভিত্তি করে নানাবিধ কথার ডালপালা গজাতে সুযোগ দিয়েছে আমাদের সমাজের পশ্চাৎপদ চিন্তাধারাই। ‘মেয়েদের মা হবার সুযোগ দাও’ প্রবন্ধের পাঠ ও মেজাজ ধরার মতো সময় কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এখনো হয়নি স্বাভাবিকভাবেই। ‘এখন আমার প্রশ্ন হলো প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বা মহামানবরা যদি সন্তানের জন্মদানে অমন স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন, তাঁদের সাত খুন যদি মাফ হয়ে যায় প্রয়োজনের অজুহাতে; বর্তমান যুগের হতভাগ্যমানব-সন্তানদের কেন এক খুন না করতেই বাপ পাকানো হবে? এখনকার কুন্তী-মাদ্রীরা কেন বীরমাতার মর্যাদা পাবে না, শুধু লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হবে এবং সমাজের অত্যাচার-উৎপীড়ন, নিগ্রহ-নিপীড়ন সইতে না পেরে আত্মহননে বাধ্য হবে?’ রমা চৌধুরীর এমনতর মতে অধিকাংশই একমত হবে না- ঝুঁকির কাজ এই, এই ডিসকোর্সে আলোচনার ক্ষেত্রও এখনো তৈরি করতে পারেনি আমাদের মানসকাঠামো। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, রমা চৌধুরী- যার জন্ম কি-না ১৯৩৬ সালে, তখন এই পরাধীন দেশের যে আর্থসামাজিক অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়, তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলেন নানান প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে, শিক্ষকতা করলেন, সন্তানের মা হলেন, স্বামীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজের ইজ্জত বিলিয়ে দিলেন- এসবই কি তার এমন চেতনা-গঠনের মূল কারণ? এর বহুবিধ ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা, রমা চৌধুরীর নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতা। আমরা যদি রমা চৌধুরীর জীবনকে গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করি তবে দেখবো, তার আপসহীন জীবনের সুষমা, ত্যাগের অনিঃশেষ মহিমা, মাতৃমমতা, সর্বোপরি দেশজননী হয়ে ওঠার অতিবাস্তব কিংবা শিউরে ওঠার মতন এক কাহিনী। তিনি বারবার পুরুষ দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন, সন্তানদের পিতৃপরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আমাদেরই বলশালী সমাজব্যবস্থার কারণে। ফলে, যে নারী একাত্তরের মহান প্রেক্ষাপটে সব হারানোর পরেও, নানা সুবিধা নেয়ার সুযোগ আসার পরেও- এমনকি তার বিনয়ের কাছে হার মানতে হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাসীন মানুষটিকেও, এমন মানুষ শতাব্দীতে খুব বেশি জন্মায় না, একজন রমা চৌধুরীকে রাষ্ট্র কিংবা পরিপার্শ্ব গড়ে তুলতে পারে না, হয়ে উঠতে হয় জীবন দিয়ে। এখানেই রমা চৌধুরীকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ কিংবা তার রচনার ব্যাখ্যা করার একটা যুক্তিযুক্ত পথ দেখা যায়। তবে এ দেশেরই মানসিক বিকাশের স্তরে যে বাধা ঐতিহাসিকভাবে বিরাজমান এবং মূর্খরা যে হারে জ্ঞানীর মুখোশ পড়ে হরহামেশাই আসর গরম করে তাতে সত্য এবং চর্চার পথ দিনদিনই সংকুচিত হয়ে আসছে, রমা চৌধুরীকে পড়া নয় শুধু দেশের সংবিধানটি পড়ে দেখার যে সুনাগরিকসুলভ আচরণ তা-ই তৈরি করতে পারেনি আমাদের শিয়ালপণ্ডিতের সমাজ। রমা চৌধুরীর আত্মজৈবনিক রচনা ‘একাত্তরের জননী’ আমাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটি বই। ‘একাত্তরের চিঠি’, ‘একাত্তরের ডায়রি’, ‘আমার একাত্তর’-এর মতোই মূল্যবান এবং সাহিত্যগুণ সম্পন্ন একটি স্মৃতিকথা একাত্তরের জননী। গ্রন্থটি পাঠে আমাদের বারবার চোখে ভাসে একাত্তরের দৃশ্য, বারবার ফিরে যাই রক্তাভ একাত্তরে। একজন দুঃখিনী মায়ের স্মৃতির সাথে তখন একাকার হয়ে যায় সারা বাংলার মায়েদের স্মৃতি। সন্তানদের নিয়ে অবিরাম সংগ্রাম, পালিয়ে বাঁচা, ইজ্জত হারানো, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, এ দেশীয় দালালদের ভূমিকা- প্রায় সবটারই দেখা পাই তার স্মৃতিকথায়। দশ খণ্ডে করার পরিকল্পনা নিয়ে রমা চৌধুরী তার স্মৃতিকে ধার দেন কলমের ডগায়।

‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’ গ্রন্থে রমা চৌধুরীর গবেষক পরিচয়কে বিস্তৃত করতে পারি যেনবা। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে গবেষণা করেছেন- তাদের সাহিত্য ও নানাদিক নিয়ে নিজের মত দিয়েছেন, ধীমান বিশ্লেষণ করেছেন, গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। যদিওবা রমা চৌধুরীর অনেক কাজের মতো এসব গবেষণাও তেমন একটা আলোচনায় নেই, কখনো ছিল না। এক্ষণে আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, রমা চৌধুরী আজ থেকে প্রায় আটান্ন বছর পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন, যা কি না অভূতপূর্ব বিষয়। তার জবানিতে, তারই গুরুত্বপূর্ণ আরেক স্মৃতিগদ্য বই ‘সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’-এ পাই এমনভাবে- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিই আমি ১৯৬১ সালে। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত, অর্থাৎ চট্টগ্রাম সদর দক্ষিণ দেশে বা পূর্ব পাকিস্তানে থাকা মেয়েদের বা ছাত্রীদের মধ্যে আমিই প্রথম এমএ বলেই জানি। আমাদের আগে চট্টগ্রাম থেকে অনেক মেয়েই বিএ, বিএসসি বা বিকম পাস করলেও এমএ পড়ার সদিচ্ছা বা সৎসাহস কেউই হয়তো পোষণ করেননি বা তাঁদের পক্ষে সুযোগ-সুবিধাও হয়তো জোটেনি।’ এ ছাড়া বাংলা বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনার ফলে রমা চৌধুরীর মানসে বাংলা সাহিত্য ও প্রধান সাহিত্যিকদের নিয়ে কাজ করার তাড়না উপলব্ধি হয়। তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে কাজ করার পরে ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন কবি জসীমউদ্দীনকে নিয়ে। ‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’ গ্রন্থেও প্রতিটি প্রবন্ধই জসীমউদ্দীনকে নিয়ে আঁকর গদ্য, মৌলিক চিন্তাপুঞ্জে পুষ্ট। ‘বেদনার কবি’, ‘বিয়োগান্তক কবর কবিতা’, ‘রাখালী একটি সার্থক পল্লীকাব্য’, ‘প্রেমিক কবির বালুচর কাব্য’, ‘বেদের মেয়ে আবহমানকালের নির্যাতিত বাঙালি নারীর করুণ জীবনালেখ্য’ পত্রস্থ প্রবন্ধগুলোতে জসীমউদ্দীন সম্পর্কে রমা চৌধুরীর মৌলিক ভাবনার চিহ্ন দেখতে পাই।

একজন রমা চৌধুরীকে চিনতে হলে আমাদের বারবার আশ্রয় নিতে হবে তার রচনাসমগ্রে। রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্দীন তার রচনায় আছে, আছে তার সময়। সেই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বাস্তবতা, যুদ্ধ-পূর্ব বাঙালি সমাজ সম্পর্কে জানতে হলে রমা চৌধুরীর রচনার দ্বারস্থ হতেই হয়। ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ স্মৃতিগদ্য গ্রন্থটি পাঠে একজন নারীর উঠে আসা, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পরিপার্শ্ব সম্পর্কে জানতে হলে বইটি পাঠ জরুরি। সময়ের সাথে রমা চৌধুরীর যুদ্ধ, পরিবেশ আর প্রতিকূলতার সাথে পাঞ্জা লড়ার নানা তথ্যে পূর্ণ গ্রন্থটি। ষাটের উত্তাল রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি শোষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপুঞ্জের বয়ান তার এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। ‘আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন’ গ্রন্থে গল্প ও গদ্যের সমাহারে রমা চৌধুরীর সংগ্রাম দেখতে পাওয়া যায় বিপুলভাবে। সন্তান হারানোর বেদনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ, পরিপার্শ্বের মানুষগুলোর মুখ আর মুখোশের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায় গ্রন্থটির লেখাগুলো। ফলে একরকম যুদ্ধ তার লেখালেখিতেও চালাতে হয়েছে রমা চৌধুরীকে! লোকচোখ, লোকভাবনার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করতে হয় বারবার। তিনি জিতে যান তারই স্বভাবজাত পবিত্রতার গুণে, হৃদয়ের অসীম ওজনদার সত্তায়। ‘স্বর্গে আমি যাব না’ গ্রন্থ কিংবা অন্যান্য কাব্যগ্রন্থেও আমরা রমা চৌধুরীর এই সহৃদয়তা দেখতে পাই তুমুলভাবে। তার লেখালেখির জগৎ ঘিরে ঘোরাঘুরি করতে থাকে তার মতো মহান সন্তানদের অংশীদারে গড়া এই দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বারবার দেশ নিয়ে হাহাকার করতে দেখা যায় তার রচনায়, বিষবাষ্প দূর করার বাসনা দেখা যায় তার রচনায়। তিনি আশাবাদী হয়ে উঠেন যাবতীয় অনাচার পেছনে ফেলে, তিনি হেসে উঠেন জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রং দেখে। তিনি বারবার কেঁদে উঠেন তার সন্তানের জন্য, তার প্রিয় বাংলাদেশের জন্য। জীবনব্যাপী এ যুদ্ধে তিনি কাউকে পাশে পান না পান, হাতে রাখেন কলম- হাতের দৃঢ়তায় ক্রমশ সাদা খাতায় দৃশ্যমান হতে থাকে বাংলাদেশ!
রমা চৌধুরীর দীর্ঘ যাপন আর বিশ্বাসের বিশদ খতিয়ান আমরা দেখতে পাই তারই রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে। তিনি জেগে থাকেন তার কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে, প্রবন্ধে এবং গবেষণায়। ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘সপ্তরশ্মি’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যে জীবন দর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়’, ‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’, ‘অপ্রিয় বচন’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘লাখ টাকা’, ‘হীরকাঙ্গুরীয়’, ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘একাত্তরের জননী’, ‘প্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’ ইত্যাদি গ্রন্থে আমরা পরিপূর্ণ রমা চৌধুরীকে আবিষ্কার করার সুযোগ পাই।