মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কথাসাহিত্যে ইমদাদুল হক মিলনের অবদান

আগের সংবাদ

আপনার যাত্রা শেষ হয়নি

পরের সংবাদ

নিভৃতচারী সাহিত্যিক রমা চৌধুরীর জীবনপঞ্জি

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ , ৬:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯, ৬:৪৫ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

রমা চৌধুরী। জন্ম : ১৪ অক্টোবর ১৯৪১ সালে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে। বাবা স্বর্গীয় রোহিনী রঞ্জন চৌধুরী, মা স্বর্গীয় মোতিময়ী চৌধুরী।
শিক্ষা : ভট্টাচার্য্য স্কুল, পোপাদিয়া থেকে প্রাথমিক। কানুনগোয় পাড়া মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক (১৯৫২), কানুনগোয় পাড়া এসএটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (১৯৫৬), চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বিশেষ বাংলাসহ স্নাতক (১৯৫৯) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (১৯৬১)।
কর্মজীবন : বেঙ্গুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫৪-৫৬), প্রবর্তক বিদ্যাপীঠ (১৯৫৮-৫৯), মুক্তকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (১৯৫৯-৬২) সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন। কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬২-১৯৬৬), পটিয়া আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭), কাট্টলি বাসন্তি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭), হাওলা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৮-৭০), বিদগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৭০-৭১), ফটিকছড়ি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (১৯৭৪-৭৮) প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন। আদর্শগত সংঘাতের কারণে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর পোপাদিয়া নিজ গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে ঘুরে ঘুরে গৃহশিক্ষকতা (১৯৭৮-১৯৮৮)। পরবর্তী সময়ে পাক্ষিক নব রিপোর্ট পত্রিকায় নিজের লেখা প্রকাশ ও হকার হয়ে পথে পথে ঘোরা (১৯৯১-১৯৯৫)। নিজের প্রকাশিত গ্রন্থ (নিজের লেখা) নিয়ে পাঠকের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়া (১৯৯৫ থেকে আমৃত্যু)।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা : মাত্র তিন বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের অশেষ কষ্টে বেড়ে ওঠা। অন্য কোনো ভাই-বোন না থাকায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে আর্থিক অনটনের কারণে চাকরি নেয়া, দুঃসহ সংসারজীবনে প্রথম স্বামী ডা. নৃপেন চক্রবর্তীর অসহযোগিতা, অসহমর্মিতা ও নির্যাতনের কারণে নিজ সন্তানসহ আজন্ম পৈতৃক ভিটায় বসবাস। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বসতভিটাসহ সব সাহিত্যকর্ম অপ্রকাশিত অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর গান পাউডারের অগ্ন্যুৎপাতে ভস্মীভূত। যুদ্ধের কারণে প্রথম সন্তান সাগর ও দ্বিতীয় সন্তান টগরের মৃত্যুবরণ। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার। ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয়বার সংসার করতে গিয়ে স্বামী এডভোকেট দিলীপ দত্ত রায় কর্তৃক প্রতারিত। ১৯৭৭ সালে কনিষ্ঠ সন্তান দীপংকর টুনুর জন্ম। গৃহশিক্ষকতা করতে গিয়ে আলসারে আক্রান্ত হয়ে বারো বছর ধরে অসুস্থতা। ১৯৮৪ সালে মায়ের মৃত্যু। লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ। ১৯৯৮ সালের ষোলো ডিসেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় কনিষ্ঠ সন্তান কবি দীপংকর টুনুর মৃত্যুবরণ। সেই থেকে খালি পা। ২০০৫ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতায় দীর্ঘ দেড় বছর শয্যাশায়ী। নিজের লেখা, নিজের প্রকাশ করা বই বিক্রির অর্থ দিয়ে অনাথালয় গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে ছিল তাঁর পথচলা।

সন্তান :
১। সাগর : জন্ম ২০ মার্চ ১৯৬৬, মৃত্যু ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১।
২। টগর : জন্ম ১২ মে ১৯৬৮, মৃত্যু ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২।
৩। জহর লাল চক্রবর্তী : জন্ম ২১ জুলাই ১৯৭০ (বর্তমানে মায়ের আরাধ্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের সহযোগী)।
৪। দীপংকর দত্ত রায় টুনু : জন্ম ৫ অক্টোবর ১৯৭৭, মৃত্যু ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৮।
অবিস্মরণীয় ও অনন্য ঘটনাবলি :
২০১৩ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবনে দেখা করতে যান রমা চৌধুরী ও তার সহকারী প্রকাশক, ছায়াসঙ্গী আলাউদ্দিন খোকন। সেখানে প্রায় চল্লিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের ব্যতিক্রমী দীর্ঘ সংগ্রামের (খালি পায়ে ঝোলা কাঁধে বই বিক্রি ও অনাথালয়) কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীও তাঁর জীবনের উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখের কথা রমা চৌধুরীকে শোনান। উল্লেখ্য, রমা চৌধুরীর কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ এলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা বা সাহায্য না নেয়ার শর্তে রাজি হন গণভবনে যেতে। এই বিরল ঘটনা দেশে-বিদেশে আলোড়ন তোলে। এমন নির্লোভ মানুষ পৃথিবীতে আছে কি-না তা নিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
দেশের প্রায় সবগুলো সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন তাঁকে নিয়ে ছোট-বড় ডকুমেন্টারি তৈরি করে। প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়াও তাঁকে নিয়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, নিউজ, সাহিত্য সংখ্যাসহ সব রকমের কাভারেজ তৈরি করে। রমা চৌধুরী ও অন্য আরো দুজন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকারভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিষকাঁটা (পরিচালক ফারজানা ববি) বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার লাভ করে। মৃত্যুর পর প্রকাশিত দিলারা বেগম জলির পরিচালনায় জঠরলীলা নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রমা চৌধুরীকে নিয়ে করা একমাত্র একক চলচ্চিত্র, যা বোদ্ধামহলে বেশ আলোচিত হয়।
রমা চৌধুরীর আংশিক জীবনাবলম্বনে লেখা ও তাঁকে উৎসর্গ করা কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস প্রতিদ্বন্দ্বী ২০১৬ সালে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার পায়।
প্রকাশিত গ্রন্থ : রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য, নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, সপ্তরশ্মি (১ম খণ্ড), স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন-দর্শন, শহীদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়, অপ্রিয় বচন, যে ছিল মাটির কাছাকাছি, লাখ টাকা, হীরকাঙ্গুরীয়, একাত্তরের জননী (১ম খণ্ড), সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগুনরাঙা আগুনঝরা অশ্রুভেজা একটি দিন, রমা চৌধুরীর ১০০১ দিন যাপনের পদ্য, ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ও নির্বাচিত প্রবন্ধ।
পুরস্কার ও সম্মাননা : বিভিন্ন সংগঠন থেকে তিনি সম্মাননা পেয়েছেন। মৃত্যুর পর তাঁকে দেয়া হয় প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা বেগম রোকেয়া পদক ২০১৮ (মরণোত্তর)।
শেষ অধ্যায় : ২০১৭ সালের ৬ জুন অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টারে। টানা অসুস্থতার মধ্য দিয়েই ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ লুসাই ভবনের বারান্দায় বিড়াল ধরতে গিয়ে পড়ে যান। এতে কোমরের হাড় ভেঙে যায়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।