অন্যমানুষ

আগের সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কথাসাহিত্যে ইমদাদুল হক মিলনের অবদান

পরের সংবাদ

দোহারের ছদ্মবেশ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ , ৬:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯, ৭:০২ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

পর্ব: ৩

সেখান থেকে উদাসী রসিক একটু কঠোর চোখ খুদির দিকে তাকায়। কোণে ছোট দরজাটা তার বামের হাতায় ও পিছনে। সেদিকে বাইরে সে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর দাঁড়িয়ে পিছনে ঘরের দিকে গিয়ে জামটা ঘাড়ের উপর ফেলে বলে, ‘এহোন ভাসা যাই, দেহি রঘুরে পাই নিকি!’
এই প্রথম এমন রসিককে দেখেছে খুদি। অস্বাভাবিক। মুখে দুটো কথাই বললে হয়তো সে ওভাবে ভড়কাত না, মন খারাপও করত না। কিন্তু এভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া!
এখন পার্বতীকে ওই কথার সবটুকু না বললেও, এটা তো বলেছে, এমন আচরণ তার (রসিকের) কোনোদিন দেখেনি সে। তাতে তার মানুষটার জন্যে ভয় হয়। ভয় হয় তার নিজের জন্যেও। সে ভাবে এমন মানুষ হঠাৎ কোনো দিন কোথায়ও চলে যায়। যদি যায়? কিন্তু নিজের সেই সংকটের কথা না-বলে, সেই ভাবনার কথা না-বলে খুদি পার্বতীকে বলে অন্য কথা, ‘আর কইস না ভাই, যা স্বভাব মানুষটার! যে ভয় পাইছি।’
সম্পর্কে নাতবউ পার্বতী রসিকতা করতে ছাড়ে না, ‘ওইয়ে দিন দুইর মদ্যি পোষাইয়ে দেবেনে-।’ খুদি ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে। কিন্তু সে কথায় সায় দেয় বিড়বিড় করে। কেননা, ওই ঘটনার পরে রসিক তার সঙ্গে ভালো করে একবার কথাও বলেনি। এমনকি রত্নার কাছে যাওয়ার ব্যাপারে ভাসার রঘু দালালের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না সে কথা জিজ্ঞাসা করেও খুদি উত্তর পায়নি।
খুদির পর খারাপের গোপন কারণ তাই পার্বতীর কাছে পুরোপুরি খোলাসা হলো না।

৩.
এদিকে কেষ্ট মল্লিকের সঙ্গে তার ছেলে কৃপাসিন্ধু ও পুতের বউ পার্বতীর বিরোধ আজকাল পেকে উঠেছে। এখন ফাটতে বাকি। অনেকেই মনে করেছিল, আপাতত হয়তো বিষয়টা খানিকটা ছাপা পড়েছে। সামনে এমপি ইলেকশন। এ সময়ে জমি বিক্রির বিষয়টা হয়তো আর পার্বতীর মাথায় নেই। সে এখন আর এ বিষয়ে কৃপাসিন্ধুকে উতলা করে তুলবে না। আবার, যেখানে সিনেমা হল হওয়ার কথা, সেই সিনেমা হলই এখনও চালু হয়নি। হলে না পরে সেখানে জায়গার দাম, সামনে রাস্তার উলটো পাশে মার্কেট হওয়ার বিষয়টা আসবে। কিন্তু জমি বিক্রি হোক বা নাই হোক, যেহেতু কেষ্ট মল্লিক এ বিষয়ে রণজয়সহ অন্যদের কাছে দেন-দরবার শুরু করেছে, পার্বতীর একই গোঁ, বাঁধালের জমি বিক্রি হলে কচুয়ায় ওই সিনেমা হলের সামনের উলটো দিকের জমি চিনতেই হবে।
এ নিয়ে সুনীলের সঙ্গে কেষ্ট মল্লিকের কিছুদিন আগে কথা হয়েছিল। আজকাল কেষ্ট মল্লিক পারতপক্ষে পার্বতীর আর কৃপাসিন্ধুকে নিয়ে কারও সঙ্গেই কোনো বিষয়ে কথা বলে না। তবু এ কথা জানে কচুয়ায় সুনীলের বাড়ির কাছেই ওই সিনেমা হল, সুনীলের সঙ্গে এ নিয়ে পার্বতী কিংবা কৃপাসিন্ধুর আগে-পাছে কথা হয়েছে। এমনকি এও জানে সে, একদিন কৃপাকে পাঠিয়েছিল পার্বতী সুনীলের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলত। সে কথা তাকে সুনীল বলেনি অবশ্য, বলেছে কৃপার মামাতো ভাই রতন। রতন বাগেরহাটে থাকে। বাঁধালের যে জমি বেচার টাকায় কচুয়ার এই জমি কেনার কথা ভেবেছে তারা সে জমির দেখভালের দায়িত্ব রতনেরই। পেশায় মহুরি রতন সেসব বোঝেও ভালো।
তৃতীয়বার মেয়ের হওয়ার পরে, কেষ্টর দ্বিতীয় পক্ষের বউ সাবিত্রীর যখন শরীর শুকিয়ে কাঠে, সে সময়ে তাকে ডাক্তার দেখাতে বাগেরহাট নিয়ে গিয়েছিল। তার আগে উপজেলার ডাক্তারকে দেখালে, ডাক্তার তেমন কিছু ধরতে পারেনি। গ্রামে গ্রামে পরিবার পরিকল্পনার যারা কাজ করে আর মঘিয়ায় যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে সেখানকার দুই একজন স্বাস্থ্যকর্মী বলেছিল, সাবিত্রীর এমন শরীর, এই শরীরে প্রায় কিছু নেই, মানুষটাও খাটো খোটো- এইভাবে যদি একের পর এক বাচ্চা হয় তাহলে কয়দিন বাদে শরীরে হাড় ছাড়া আর কিছুই থাকপে না। সেকথা শুনে, কেষ্ট মল্লিক ডাক্তার কি স্বাস্থ্যকর্মী আর ওই ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের মাঠকর্মী- তারা যেই হোক, তাদের কেউই বলতে পারেনি যে, এই যে একের পর এক মেয়ে এইভাবে জন্মায় একি তার জন্যে? এ জন্যে একটুও দায়ী নয় সে। এই সবই সাবিত্রীর ইচ্ছা। সাবিত্রীর একটা ছেলে চাই। একটা ছেলে ছাড়া সে তো আগের পক্ষের একমাত্র ছেলে কৃপাসিন্ধুর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করতে পারছে না। এই যে বয়েসী কেষ্ট মল্লিক- এ যদি আজকে চোখ বোজে তাহলে মেয়েদের ভাগ একগাছা সুতোও তো পড়বে না। থাকার ভিতরে থাকবে ওইটুকু জমি যেটুকু লিখে দিয়ে ওই কেষ্ট মল্লিক সাবিত্রীকে বিয়ে করেছিল।
তবু নিজের শরীরের দিকে তো তার তাকানো দরকার। এ কথা যতবারই তাকে মনে করিয়ে দেয় কেষ্ট মল্লিক, ততবার ওই একই কথা সাবিত্রীর। তাছাড়া এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে প্রথম পক্ষের ছেলে কৃপাসিন্ধুর বউ পার্বতীর সঙ্গে এক উপরি টক্কর তো সাবিত্রীর লেগেই আছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কখনও কখনও কেষ্ট বা তার ছেলে কৃপাসিন্ধু তো একমাত্র দর্শকের ভূমিকাই পালন করে। সে এক অদৃশ্য লড়াই। জেদ আর ক্ষমতার জন্যে প্রতীক্ষার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে উপজেলা সদর কিংবা ইউনিয়ন কাউন্সিল হাসপাতাল থেকে সাবিত্রীকে নিয়ে ফেরে কেষ্ট মল্লিক। কেউ কেউ তখন কালীচরণ ওরফে কাল ডাক্তারের কথাও বলে, কিন্তু ও মুখো সে আর যাবে না কখনও। ওই ডাক্তারের কথা শুনে এখনও উদাসভাবে তার আশালতার মুখখানা মনে পড়ে। আর জ্ঞাতিভাই গুণধরের মুখ। আমাকে একবারে ওই ডাক্তারকে দেখানোর পরে সে বলেছিল, ‘ওই বালের একশিরার ডাক্তাররে দেখাইয়ে বউদিরে মারাত চাও?’ সেকথা মনে থাকায় এবার আর সাবিত্রী ওই ডাক্তারকে দেখানোর কথা মনেও আনেনি কেষ্ট। উপজেলার ডাক্তারের কথামতো বাগেরহাটে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে।
ডাক্তার দেখাতে যাওয়া নিয়েও ভিতরে ভিতরে নিজের মতো হিসেব করে নিয়েছিল কেষ্ট মল্লিক! বাগেরহাটে তেমন কিছু চেনে না সে। সুনীল চেনে। তাহলে আগে উপজেলায় সুনীলের কাছে যাবে কিনা ভেবেছে। সুনীলের আত্মীয়স্বজন আছে বাগেরহাটে। ওদিকে হরষিতের বন্ধুবান্ধবও আছে কিছু। সে ওখানে লেখাপড়া করেছে। আবার সুনীলের ভাই সঞ্জয়ের কারণে এখন তার গুষ্টির রণজয়ের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক, তাতে সুনীলের সঙ্গে ও বিষয়ে পরামর্শ করেছে এ কথা রণজয় শুনলে কী না কী ভাবে? আর কেষ্ট মল্লিকের সব সময়ই মনে হয়, পার্বতীর সঙ্গে সুনীলের তলে তলে ভীষণ খাতির, সুনীলই হয়তো কচুয়ার ওই জমি কেনার জন্যে কৃপাসিন্ধুকে এটা-ওটা বোঝাচ্ছে। তাই সুনীলের কাছে এখন যাওয়া এখন তার উচিত হবে না। ফলে এই সমস্ত দোটানায় থাকতে থাকতে কেষ্ট গুষ্টির লোক পরিতোষের সঙ্গে পরামর্শ করে। পরিতোষ ঘাগু লোক। মানুষ চেনে। সময়ে অসময়ে বাগেরহাটে যায়। পরিতোষ তাকে তার বাড়ির সামনে খালের ওপারে ঢালিবাড়ির প্রফুল্ল ঢালির সঙ্গে কথা বলতে বলে। প্রফুল তাকে জানিয়েছে ডাক্তারের নাম। এই ডাক্তার মেয়েদের রোগের জন্যে ভালো। যদি হাসপাতালে যাওয়া যায়, সেখানেও রুগি দেখে।
সেইমতো কেষ্ট হাসপাতালেই নিয়ে গিয়েছিল সাবিত্রীকে। বাগেরহাট শহরের প্রায় কিছুই চেনে না সে। বেমরতা মাঝিঘাট, কিংবা যাকে বলে ভদ্রপাড়ার খেয়াঘাট, খুব সকাল সকাল রাস্তাখালের গোড়া থেকে টাবুড়ে নৌকা ধরে সেখানে পৌঁছে কেষ্ট যদি জানত, রিকশায় হাসপাতালে যাওয়ার পথে রতনের সঙ্গে দেখা হবে, তাহলে লজ্জায় পড়ত না। আগের পক্ষের সম্বন্ধির ছেলে রতন। সে থাকে শহরের উত্তর মাথায় মুনিগঞ্জে। সেখানেই হাসপাতাল। আগে ছিল থানার কাছে। সেটা পুরনো হাসপাতাল। অনেকদিন আগে একবার বাপের সঙ্গে সেখানে এসেছিল কেষ্ট। সেদিনের কথা আজ আর তার প্রায় কিছুই মনে নেই তার।
এই সময়ে রতনের সঙ্গে দেখা হলে কেষ্ট মল্লিকের একটু লজ্জা পাওয়া স্বাভাবিক। রতন কোর্টের দিকে যাচ্ছে। প্যান্ট পরা। এমন রতনকে আগে বলতে গেলে সে দেখেনি। কেষ্টর পোশাক একই। শুধু গ্রামে সে যে খাটো ধুতি পরে, এখন তা পরেনি। সাধারণ গায়ে তার হাতঅলা গেঞ্জি থাকে, এখন সেখানে পাঞ্জাবি। তবে হাতে ছাতিটা আছে। এই ছাতিটাই কি বিয়ের সময়ে পেয়েছিল কেষ্ট মল্লিক? রতন সেকথা ভেবে হাসে। একসময়ের ছোট পিসেমশাই, যাকে সে জামাই বলে ডাকত, সেই মানুষটা ছোটবউসহ হঠাৎ এখানে, কোথায় যায়? যদিও সামনে একমাত্র হাসপাতালই আছে, সেখানেই যাচ্ছে, তাও বুঝতে পারে। যদিও জানতে চাওয়ার আরও বিষয় আছে, হাসপাতালে তো রুগিও দেখতে যেতে পারে। কেননা সাবিত্রীর তো দশা এমন নয় যে ভেবে নিতে হবে সে-ই রুগি। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে, সাবিত্রীকেই দেখানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে।
(চলবে)