পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া

আগের সংবাদ

দগ্ধ হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি

পরের সংবাদ

এক সংগ্রামী জীবন অধ্যায়

বিনয় দত্ত

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ , ৭:২১ অপরাহ্ণ

তিনি সব সময় নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতেন। দারিদ্র্য, ক্ষুধামুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখতেন। দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করার জন্য নিজের অবদানের কথা ভাবতেন। অনাথ আশ্রমের কথা ভাবতেন। তিনি আসলেই সার্থক মা, জননী। তিনি আসলেই মুক্তির সংগ্রামে যুদ্ধ করা একজন সফল যোদ্ধা।

‘…যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু,
নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,
তুমি কি বেসেছ ভালো।’
-প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

বাংলাদেশের বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী। যিনি একজন মা, একজন সন্তানহারা জননী, একজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা, একজন লেখিকা এবং গল্পকথক। এই গল্পকথক কোনো কাল্পনিক গল্পকথক নন। তিনি নিজের জীবনের গল্প সবাইকে বলেছেন। সবাই জেনেছেন বলেই আজ রমা চৌধুরী সবার নমস্য।
তিনি নিজ মহিমায় এই দেশকে ভালোবেসেছেন। ভালোবেসেছেন দেশের মানুষকে। নিজের জীবনের অন্ধকার সময়কে সরিয়ে আপন জ্ঞান-গরিমা দিয়ে আলোকিত করেছেন এই সমাজকে, সমাজের মানুষকে। তিনি দেশের জন্য তাঁর সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন, উৎসর্গ করেছেন জীবনের অনেক খ্যাতিময় অর্জন, রঙিন সময়, অজানা অধ্যায়। তাঁর ত্যাগের পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা গল্প, অজানা সত্য, অজানা ঘটনা।
রমা চৌধুরী বাঁচতে চেয়েছিলেন। ভয়ানক কষ্টে তার প্রতিটি দিন কাটতো তারপরও তিনি জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আমি বাঁচতে চাই।’
এই সমাজের কলুষতাকে ধুয়েমুছে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলেন। জীবনটাকে ভিন্নভাবে দেখার ইচ্ছায় তিনি সদা প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ছিলেন নীরব হুঁশিয়ারি একজন মানুষ। তাঁর শরীরে ডায়াবেটিস, গল ব্লাডারে পাথর, উচ্চ রক্তচাপসহ নানান জটিল রোগ বাসা বেঁধেছিল। কিন্তু তাঁর পথচলা কি থেমে ছিল? থেমে ছিল কি তাঁর স্বপ্ন দেখা?
যারা রমা চৌধুরী সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন তারা সকলেই বলতে পারবেন তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত থেমে থাকেননি। তিনি কবিগুরুর মতো বিশ্বাস করতেন এই কথাটি,

‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।’

নিজের ক্রন্দন, কষ্ট, যাতনা লুকিয়ে তিনি সকলকে আশার স্বপ্ন দেখাতেন। এই সমাজকে জানাতে চেয়েছেন নিজের কথা, যুদ্ধের কথা, মুক্তির কথা।
বয়স এবং অসুস্থতা দৃশ্যত রমা চৌধুরীকে ক্লান্ত করলেও মনের শক্তিতে তিনি অসীম শক্তির অধিকারিণী তখনো পর্যন্ত। যে বীভৎসতা, যে দুর্বিপাক, যে পীড়ন-নির্যাতন, কথার তীর্যক আঘাত, অপমান, গ্লানি তিনি দেখেছেন, সহ্য করেছেন তার তুলনায় তাঁর শারীরিক এেরপর ১৪ পাতায়

এক সংগ্রামী জীবন অধ্যায়
ষ ১৩-এর পাতার পর

অসুস্থতা কিছুই নয়। তিনি অসম্ভব তেজস্বী একজন নারী, এমন একজন মা, যার ছায়াতলে যুগের পর যুগ রইলেও তিনি ছায়া সরাবেন না, বরং পরম মমতায় কোলে তুলে নিবেন সকলকে। হুমায়ুন আজাদের মতো বলতে হয়,

‘…. আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিলো ধানক্ষেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।’

দুই.
রমা চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে। যে সময় তিনি জন্মেছেন সেই সময়টা বেশ আলোকিত এইটা বলার কোনো সুযোগ নেই। তখন নারীদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে সবার অনাগ্রহ ছিল। এইক্ষেত্রে রমা চৌধুরীও বাদ পড়েননি। তার মধ্যে ছিল আবার অর্থ কষ্ট।
তিন বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। পরিবারের একমাত্র অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী লোকটাকে হারিয়ে তাদের যাতনা বাড়তে থাকে। সেই সময় রমা চৌধুরীর মা মোতিময়ী চৌধুরী দমে যাননি। মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তার আগ্রহ এবং উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। মোতিময়ীর আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য রমা চৌধুরীও হাঁটা শুরু করেন। কবিগুরুর মতো বলতে হয়,

‘…আলো ভুবন ভরা
আলো নয়ন ধোওয়া আমার
আলো হৃদয় হরা।’

আজ আমরা রমা চৌধুরীর পথচলা, কর্মস্পৃহা নিয়ে কথা বলছি। রমা চৌধুরীর মা মোতিময়ী চৌধুরীও কিন্তু একই ধারার মানুষ ছিলেন। মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বোয়ালখালীর মুক্তকেশী গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৫৬ সালে কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
১৯৫৬ সাল। মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, দূরের সীমানা ছাড়িয়ে কক্ষপথের অবস্থান মাপার মতো একটা ব্যাপার। কিন্তু হয়েছেও তাই। মায়ের অনুপ্রেরণায় রমা ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।
মায়ের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনিই প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কবিগুরুর মতো বলতে হয়,

‘…আলোর স্রোতে পাল তুলেছে
হাজার প্রজাপতি
আলোর ঢেউয়ে উঠল মেতে
মল্লিকা মালতী।’

আলোর স্রোতে হাজার প্রজাপতির ভিড়ে রমা চৌধুরী নিজের অবস্থান শক্তভাবে করে নেন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। নিজেকে বারবার পড়াশোনার মধ্য দিয়ে আলোকিত করতে চাইতেন, আলোকিত হতে চাইতেন, শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হতে চাইতেন। আর তাইতো এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘সুযোগ পেলে আবার ভর্তি হতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মাস্টার্সটা করতে চাই ইংরেজিতে।’

তিন.
যে রমা চৌধুরী সব সময় নিজেকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছেন সেই রমা চৌধুরীর সংসার জীবন আলোকিত ছিল না। স্বামী-সংসার, সন্তান-সন্ততির মাঝে যে বাঙালি নারীরা সুখ খুঁজে পান, সেই সুখ রমার সইল না। ভাগ্য রমার সাথে প্রতি পদে পদে ছলনা করে গেল।
২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। শিক্ষকতায় ডুবে থাকা রমা শুরু করলেন সংসার। শিক্ষকতা এবং সংসারের মধ্যে নেমে আসে উনিশশ একাত্তর। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধের উত্তাপ একেক জায়গায় একেক রকম, একেক মানুষের বেলার একেক ধরন। রমা চৌধুরীর জীবনে যুদ্ধের উত্তাপ ছিল ভয়াবহ।
যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর স্বামী তাকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। একবারও ভাবলেন না রমার কথা। সাগর, টগর নামের দুটি সন্তানের কথা। স্বামী ভাবেননি দেখে কি রমা ভাববেন না তা তো হতে পারে না। তাই তিনি কবিগুরুর পথ অনুসরণ করলেন।

‘…যদি কেউ কথা না কয়,
ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে
সবাই করে ভয়
তবে পরান খুলে
ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা
একলা বলো রে।।
……………………………
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে।’

কবিগুরুর কথামতো রমা একাই চলেছেন। স্বামী সংসার ছেড়েছেন, দেশ ছেড়েছেন, তাতে কি রমা সন্তান ফেলে দিতে পারেন? সাগর, টগর আর মোতিময়ী চৌধুরীকে নিয়ে রমা পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় বসবাস শুরু করলেন।
এই যাপিত জীবনের মধ্যে নেমে আসে সেই কাল রাত্রি। ১৩ মে ১৯৭১। সকালবেলা। পোপাদিয়ায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা রমা চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সেদিন পাকিস্তানি এক সৈনিক তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। তাঁর ওপর চালায় শারীরিক নির্যাতন। এই ক্ষত তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি এই ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছেন। কবিগুরুর পদাঙ্ক তিনি প্রতি পদে অনুসরণ করেছেন।

‘…ও তুই রক্তমাখা চরণতলে
একলা দলো রে।।’

একাত্তরের যে সকল মা-বোনেরা নিজেদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের জীবনের কথা হাজার বছর ধরে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখলেও শেষ হবে না। সম্মান জানানোর যত ধরনের প্রক্রিয়া আছে তার সকল পদ্ধতিতে তাঁদের সম্মান জানালেও শেষ হবে না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রমা চৌধুরী সবচেয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই বীভৎস, কলঙ্কিত সময়ের কথা তিনি নিজে লিখে সবাইকে জানিয়েছেন।
আমি যতবারই রমা চৌধুরীকে জানি, যতবারই তাঁর সম্পর্কে পড়ি ততবার আমি একটি জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াই। একজন মা তার সমাজকে কতটা ব্যাপকভাবে দেখেছেন, তার সকল সন্তানকে মাতৃত্বের ছায়ায় এনে নিজের বীরত্বের কথা নিজে লিখেছেন। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুয়ে যায়।
সেই বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা রয়েছে তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ বইতে। বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’
এইটুকু পড়ে আমার বারবার নিজের মধ্যে আন্দোলন তৈরি হয়। কীভাবে একজন মা সহজ সাবলীলভাবে এইকথা লিখতে পারেন? আমি যতবারই পড়ি আমার মনে হয় তিনি নিজে আসলে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী। যে বিদ্রোহীর কথা কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, তারচেয়ে বড় বিদ্রোহী হলেন রমা চৌধুরী। এই বিদ্রোহে ক্রুরতা নেই, পাশবিকতা নেই। আছে শান্তভাব, শান্তভঙ্গিতে মানুষের মনকে, সমাজকে নাড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা। নজরুলের মতো বলতে হয়,

‘…আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই,
আমি মুক্ত জীবনানন্দ।’

চার.
সবকিছু হারিয়েও রমা চৌধুরী দমে যাননি। হানাদাররা তাঁর ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায় সম্পদ সবকিছুই পুড়িয়ে দিল। আত্মীয়রা অসহযোগিতা করল। তাতে কি রমা চৌধুরী দমে গিয়েছেন? না। তিনি দমে যাননি। তিনি দমে যাওয়ার মতো নারীই নন।
ঘরবাড়ি সহায়-সম্বলহীন বাকি আটটি মাস তিনি দুই পুত্র সাগর, টগর আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে দিন পার করেছিলেন। পোড়া ভিটায় কোনোরকমভাবে পলিথিন আর খড়কুটো মাথায় আর গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। প্রতিটা রাত এইভাবে পার করা যে কি কষ্টের, তা বর্ণনাতীত। তা আমরা এখন অনুধাবনও করতে পারবো না।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর ছেলে সাগর ছিল সাড়ে পাঁচ বছরের। দুরন্ত সাগর মিছিলের পেছনে পেছনে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়াত। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একসময় সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়। সাগরের মৃত্যুর ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় ৩ বছরের টগরও মারা যায়। ছেলেদের হিন্দু সংস্কারে না পুড়িয়ে তিনি মাটি চাপা দেন। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পরা বন্ধ করে দেন।
সন্তানহারা মা রমা চৌধুরী পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার ছেলেদের আমি পোড়াতে দিইনি। এই মাটিতে তারা শুয়ে আছে। আমি কীভাবে জুতা পায়ে হাঁটি। পারলে তো বুক দিয়ে চলতাম-ফিরতাম। তারা কষ্ট পাবে।’
রমা চৌধুরীর এই কথা শুনে আমার সুকান্ত ভট্টাচার্যের আগ্নেয়গিরি কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। সুকান্তের মতো বলতেই হয়,

‘…মুখে আমার মৃদু হাসি,
বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা।
সিংহের মতো আধ-বোজা চোখে আমি কেবলি দেখছি।’

পাঁচ.
শিক্ষকতার পর যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার কুষ্ঠিতে লেখা আছে আমি লেখ্যবৃত্তি গ্রহণ করেই জীবিকা নির্বাহ করবো। অনেকটা সে কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্যই লিখছি। আর এ ছাড়া এই অবস্থায় আমার অন্য কিছু করারও সুযোগ নেই। বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন। আমি কারো গলগ্রহ হতে কখনো পছন্দ করতাম না, এখনো করি না।’
প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। সম্মানীর বিনিময়ে তাঁকে পত্রিকার ৫০টি কপি দেয়া হতো। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। এই দুঃসহ জীবনকে তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছেন। কখনো তার মুখে হাসি ছাড়া কেউ কষ্টের ছাপ দেখেনি। চট্টগ্রামের পথে পথে তিনি হেঁটেছেন। কাঁধে ঝোলা, কানে হিয়ারিং এইড লাগানো রমা চৌধুরী হেঁটে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের ফুটপাত ধরে। এ দৃশ্য সকলের পরিচিত।
প্রথমে পত্রিকা, পরে নিজের লেখা বই নিজেই ফেরি করতেন। তিনি জানতেন এই পথ চলাটা তাঁর একার, এই সংগ্রামটা তাঁর একার, এই সমাজের কারো অর্থ সাহায্য না নিয়ে টিকে থাকার যুদ্ধটা তাঁর একার। সাথে ছিলেন আলাউদ্দিন খোকন ও তার স্ত্রী রিমঝিম আহমেদ। খোকন রমা চৌধুরীর ছায়াসঙ্গী এবং সমস্ত বইয়ের প্রকাশক। খোকন ছিল রমা চৌধুরীর সন্তানের চেয়ে বেশি।
ছায়াসঙ্গী খোকন, চারটি বিড়ালকে সাথে নিয়ে রমা চৌধুরী থাকতেন লুসাই ভবনের ৪০৮ নম্বর কক্ষে। এই কক্ষের প্রতিটি দেয়াল, দেয়ালে থাকা প্রতিটি ইট, ইটের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকা দালান জানে রমা চৌধুরীর সংগ্রামের গল্প। এই কক্ষে বসেই তিনি লেখালেখি করতেন। স্বপ্ন দেখতেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামের একটি অনাথ আশ্রম গড়ে তোলার। তিনি চেয়েছিলেন সকল ধর্মের অনাথরা সেই আশ্রমে থাকবে। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম চলবে। মনুষ্য দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে অনাথরা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।
নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতার মতো রমা চৌধুরীও চেয়েছিলেন মানুষের জয়গান গাইতে, মানবিক দীক্ষায় আশ্রম পরিচালিত করতে।
‘গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান,’

ছয়.
২০১৩ সালে রমা চৌধুরী সাক্ষাৎ করেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহেই এই সাক্ষাৎ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে রমা চৌধুরী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। খালি পায়ে তার সাথে সাক্ষাতে নিজের কষ্টের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহযোগিতা করতে চেয়েছিলেন। রমা চৌধুরী বিনয়ের সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন। বরং উল্টো তাকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন নিজের লেখা ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থটি।
গোটা জীবন পার করে ফেলেছেন কারো অর্থ সাহায্য না নিয়ে, শেষ সময়ে তিনি এই দিয়ে কি করবেন। জয় গোস্বামীর কবিতার মতো বলতে হয়,

‘আমরা তো অল্পে খুশি,
কী হবে দুঃখ করে?
আমাদের দিন চলে যায়
সাধারণ ভাতকাপড়ে।’

এই সাধারণ জীবনযাপনে চলা মানুষটি ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে নিজের জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত করে দেন।
রমা চৌধুরী এক সংগ্রামী জীবন অধ্যায়। তিনি কখনো হার মানেননি, সকলের তীর্যক কথা শুনেছেন কিন্তু দমে যাননি, নত হয়েছেন কিন্তু ভেঙে যাননি। তিনি এতটাই তেজস্বী ছিলেন যে, কারো দান দক্ষিণা গ্রহণ করতেন না, নিজের কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটেও বলতেন না।
তিনি সব সময় নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতেন। দারিদ্র্য, ক্ষুধামুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখতেন। দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করার জন্য নিজের অবদানের কথা ভাবতেন। অনাথ আশ্রমের কথা ভাবতেন। তিনি আসলেই সার্থক মা, জননী। তিনি আসলেই মুক্তির সংগ্রামে যুদ্ধ করা একজন সফল যোদ্ধা। তাঁর জীবনাদর্শ পড়লে সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো বলতে হয়,

‘…সামনে মৃত্যুকবলিত দ্বার,
থাক অরণ্য, থাক না পাহাড়,
ব্যর্থ নোঙর, নদী হব পার, খুঁটি শিথিল।
আমরা এসেছি মিছিলে, গর্জে ওঠে মিছিল।।’