জিএম কাদেরের সংবাদ সম্মেলন

আগের সংবাদ

দোহারের ছদ্মবেশ

পরের সংবাদ

অন্যমানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ , ৬:৩২ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯, ১০:৩৩ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

অন্ধকার জীবনে পথ চলতে গিয়ে কতো বিচিত্র নারীর দেখা পেয়েছে ইমরান। মা-খালার বয়সী নারী থেকে শুরু করে কলেজ-ভার্সিটি, ও লেভেল, এ লেভেল পড়ুয়া মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে গড়তে আজকাল অরুচি ধরে গেছে। কিন্তু এ পথে উপার্জন করে পুরো সংসরটা চালাতে পারছে সে সাবলীল স্বাচ্ছন্দ্যভাবে। এমনি এমনি তো কেউ তাকে এত টাকা দেবে না- এটা মনে হতেই ইমরান তার অন্ধকার জীবনের গ্লানি, দুঃখ, লজ্জা, অসহায়ত্ব সবই ভুলে যায়। সন্তান হিসেবে, বড় ভাই হিসেবে পারিবারিক দায়বদ্ধতা মেটাতে অন্ধকার জীবনের গণ্ডি থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারে না।

‘হাই হ্যান্ডসাম!’
পাশ থেকে মিষ্টি নারীকণ্ঠের ডাক শুনে কিছুটা সচকিত হয় ইমরান। নারীকণ্ঠে তাকে সম্বোধন করে এমন কামনা মদির ডাক আজই প্রথম শোনেনি সে। একই ভঙ্গিমায় নারীকণ্ঠের ডাক শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম পুলকিত হলেও আজকাল মনে তেমন ভাবান্তর ঘটায় না। তারপরও কৌতূহলী হয়ে পাশ ফিরে তাকায়।
আবছা আলো-আঁধারীতে শাড়ি পরা এক নারী মূর্তিকে দেখতে পায় ইমরান। মহিলাকে দেখে দুর্দান্ত সুন্দরী মনে হয় প্রথম দর্শনেই, তবে তার বয়স অনুমান করা যায় না। চেনাজানা কেউ নয়, আগে কখনো দেখা হয়েছে বলে মনে হয় না। তারপরও তার কণ্ঠে আন্তরিকতা এবং এক ধরনের আমন্ত্রণের সুর অনুভব করে ইমরান।
ড্যান্স ফ্লোরে সবাই জোড়ায় জোড়ায় নাচছে। ইমরান বিত্তবান শ্রেণির কেউ না হলেও গত কয়েক বছরে তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে অনেক কিছুই রপ্ত করে ফেলেছে। বিত্তবান শ্রেণির রুচি, চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ অনেকটাই তার জানা এখন।
কৌতূহলী হয়ে পাশ ফিরে তাকিয়ে সুন্দরী নারীকে দেখে ইমরান। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে অচেনা সুন্দরী তার কাছে এগিয়ে আসে। একদম শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার শরীরের উত্তাপ টের পায় সে। এক অদ্ভুত নেশা ধরানো সৌরভ অনুভব করা যায়। এটা তার শরীরের গন্ধ আর পারফিউম মিলেমিশে সৃষ্টি হয়েছে। অনুভব করে ইমরান।
‘ডু ইয়্যু ইন্টারেস্টেড ড্যান্স উইথ মি?’ মাদকতা ছড়িয়ে বলে সুন্দরী নারী। এক মুহূর্ত দেরি কিংবা দ্বিধা সংকোচ না করে ‘শিওর, হোয়াই নট?’ বলে ইমরান। অচেনা সুন্দরীকে কোনোভাবেই হতাশ করতে চায় না সে। এমন কারো মনোরঞ্জনে নিজেকে নিবেদন করতেই তো তার এখানে আসা।
‘আমি মনিকা, মনিকা রহমান। বনানীতে থাকি। ইয়্যু ইমপ্রেসড মি টু মাচ। তোমাকে ড্যান্স পার্টনার হিসেবে পেয়ে ভীষণ ভাল্লাগছে। তোমাকে এক নজর দেখেই আমার ভালো লেগে গেছে’ ফিসফিস করে জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বলে ইমরানকে জড়িয়ে ধরে সুন্দরী।
‘আই অ্যাম ইমরান, আই অলসো ইমপ্রেসড বাই ইয়্যু। আই ফিল প্লেজার উইথ ইয়্যুর কোম্পেনি। ইয়্যু আর মেকিং ক্রেজি মি। মনিকা তোমায় নিয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিতে রাজি আমি, তুমি রাজি তো?’ মনিকার কানের কাছে ফিস ফিস করে নেশা ধরানো গলায় কথাগুলো বলে ইমরান তাকায় তার দিকে। কাস্টমারকে কীভাবে সর্বোচ্চ আনন্দ উত্তেজনা শিহরণ দিতে হয়, তার সব কৌশলই জানা তার।
কথায় কাজ হয়েছে মুহূর্তেই টের পায় ইমরান।
এরকম পরিবেশে তেমন রঙ বেরঙের কতো নারীর ঘনিষ্ঠ সঙ্গ লাভের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তার গত কয়েক বছরে। কারো সঙ্গে ঘুরেফিরে বেশ কয়েকবার। আবার কারো সঙ্গে শুধুই একবার। কেউ বয়সে তার চেয়ে ১০ থেকে ১২ বছরের বড়, আবার কেউ সমবয়সী। বয়সে তার চেয়ে ছোট এমন কিছু মেয়ের একান্ত সান্নিধ্য লাভেরও সুযোগ হয়েছে ইমরানের। গত কয়েক বছরে যত নারীর সংস্পর্শে এসেছে তাদের প্রত্যেকের রুচি, পছন্দ, মেজাজ-মর্জি একেক রকম। অনেকের জঘন্য রুচি বিকৃতির কুৎসিত প্রকাশ দেখে অবাক হয়েছে। অথচ বাইরে থেকে দেখে তার বোঝার কিংবা উপলব্ধি করার অবকাশ নেই। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত খানদানি শিক্ষিত প্রভাবশালী অর্থ বিত্তবান পরিবারের বধূ মাতা কন্যাদের জীবনের অন্ধকার দিকটা দেখতে দেখতে এক ধরনের ঘৃণা জেগে উঠেছে তার মনে। আজকাল এ ধরনের নারীদের দেখে মনে শ্রদ্ধা ভালোবাসা জাগার বদলে কেবলই ঘৃণার পাহাড় জমে।
‘ওহ ডার্লিং, এভাবেই কি ড্যান্স ফ্লোরে বাকি রাতটা কাটিয়ে দিতে চাও? আমরা সেই জার্নিটা শুরু করবো কখন?’ মনিকার কণ্ঠে এক ধরনের অস্থিরতা ঝরে পড়ে।
‘ডিয়ার মনিকা, মাই সুইট বেবি! আই অ্যাম রেডি অ্যাট ইয়্যুর সার্ভিস,’ গাঢ় গলায় উচ্চারণ করে ইমরান। কথার মোহজালে মনিকাকে আরো ভালোভাবে জড়াতে চায় সে।
‘তাহলে আমরা দেরি করছি কেন এখানে অযথা সময় নষ্ট করে কী লাভ? লেটস এনজয় আওয়ার টাইম, উই মাস্ট মেক প্লেজেন্টফুল আওয়ার মোমেন্টস’, আগের মতো কণ্ঠে অস্থিরতা নিয়ে উচ্চারণ করে মনিকা।
এরপর মনিকা ফিস ফিস করে বলে, ‘ফলো মি, আমরা এখন যাবো ধানমন্ডিতে। আজ আমি বনানীর বাসায় যাবো না। বাসায় বলে এসেছি লায়লার বাসায় থাকবো রাতে।,
হোটেলের কার পার্কিং লটে লেটেস্ট মডেলের একটা পার্ল কালারের টয়োটা এক্সিও দাঁড়িয়ে। গাড়িতে ড্রাইভার বসে নেই। তার মানে, মনিকা রহমানই গাড়িটা নিজে চালিয়ে এসেছে এখানে।
বসুন্ধরা মার্কেটে ক্রস করে পান্থপথ ধরে ধানমন্ডির দিকে এগোতে থাকে মনিকার গাড়ি। রাত তেমন বেশি না হলেও রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। জ্যাম নেই তেমন। চমৎকার হাতে স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে মনিকা। চেহারায় কিছুটা উত্তেজনা ভাব ফুটে উঠেছে। গাড়িতে এসি চলার পরও গালে, নাকের ডগায়, চিবুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বেশ মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে সে। মনিকার গাড়ি চালানো দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় ইমরান। তেমন কোনো কথা বলছে না সে। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামার আগে লায়লার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছে মনিকা।
‘লায়লা মাই সুইট ডার্লিং, আমি কিন্তু আসছি। ঘুমিয়ে পড়িস না আবার। তোর জন্য দারুণ ইন্টারেস্টিং চার্মিং একটা সারপ্রাইজ আছে। আজকের রাতটা হবে সুপার এনজয়েবল। ইয়্যু ক্যান্ট ইমাজিন হাউ ইট উড বি এক্সাইটিং’। হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে মোবাইলটা পার্সে রেখে দেয় সে। লায়লা আমার কাজিন আবার ক্লোজ ফ্রেন্ডও। ধানমন্ডিতে লেকের পাশে ওর ফ্ল্যাট। হাসবেন্ড চাকরি করে একটা বিদেশি বড় এনজিওতে। বছরের বেশির ভাগ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয়। সারা দুনিয়া টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। ছেলেমেয়ে দুটি অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করতে গেছে। একাকী বিরাট ফ্ল্যাটে থাকতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে লায়লা। এক সময় একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়াতো। কি মনে করে সে কাজটা ছেড়ে এখন নিজেকে ঘরবন্দি করেছে। আমি মাঝে মাঝে ওকে কোম্পেনি দিই। কেউ তাকে বুঝতে চায় না। আমি কিন্তু লায়লার সব ফিলিংস বুঝতে চেষ্টা করি এবং পারিও। রাস্তার দিকে গভীর মনোযোগ রেখেই কথাগুলো বলে মনিকা।

ধানমন্ডি লেকঘেঁষে বেশ কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। বাইরে থেকে দেখেই অনুমান করা যায় অনেক দামে কেনা প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট। এখানে যারা বসবাস করে তাদের অর্থবিত্তের প্রাচুর্য অনেক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লিফটে চড়ে পাঁচতলায় ওঠার সময় মনিকা ইমরানের শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়।
ফোর ডি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে কলিংবেল বাজাতেই সালোয়ার-কামিজ পরা দুর্দান্ত সুন্দরী এক নারী দরজা খুলে দাঁড়ায়। ইমরানকে এক নজর দেখে তার মুখে হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
‘মনিকা, আয় ভেতরে আয়’, বলে আহ্বান করে নারী। তাকে দেখে ইমরান ভেতরে ভেতরে অনেকটাই চমকে ওঠে। বেশ কয়েক বছর পর লায়লা আনজুম ম্যাডামকে দেখেছে সে। ওদের ইউনিভার্সিটিতে সোসিও ইকনমিক ডাইমেনশন বিষয়ে বেশ কয়েকটি ক্লাসে তার লেকচার শুনেছে ইমরান। লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে এমএস করে আসা লায়লা ম্যাডামের ক্লাসে অন্য অনেক ছাত্রের মতো ইমরানও মুগ্ধ হয়ে তার লেকচার শুনতো। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী শিক্ষকের প্রতি ভেতরে ভেতরে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলেও কোনো ছাত্র তার কাছে ভিড়তে সাহস করেনি। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার সৌন্দর্য মিলে অদ্ভূত এক আবেশ সৃষ্টি করেছিল। ছাত্ররা সাধারণত সহপাঠী কিংবা জুনিয়র ছাত্রীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে কিংবা দুর্বল হয়ে থাকে। কিন্তু সুন্দরী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লায়লা আনজুম শিক্ষক হয়েও অধিকাংশ ছাত্রের মনে নানা ফ্যান্টাসি ছড়িয়ে রাখতেন। অনেক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে একজন ইমরান হাসানকে আলাদাভাবে মনে রাখার কথা নয় তার। আজ সেই ফ্যান্টাসির নায়িকা লায়লা ম্যাডামের অ্যাপার্টমেন্টে এসেছে মনিকার সঙ্গে।

দুই.
পড়াশোনা শেষ করে নানা জায়গায় অ্যাপ্লাই করে যখন চাকরি না পেয়ে নিজের জীবনের প্রতি গভীর হতাশা ক্রমেই গাঢ় হচ্ছিল, অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা গ্রাস করছিল। তখন হঠাৎ করে একটি দুর্ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। গুলশানের একটি অফিসে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে বের হওয়ার পর রাস্তা পেরোতে গিয়ে একটি গাড়ির সামনে পড়ে গিয়েছিল। এতে অবশ্য গাড়ি চালকের কোনো দোষ ছিল না। ইমরান নিজেই অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটে রাস্তা ক্রস করছিল। আচমকা গাড়ির সামনে পড়ে গিয়ে হাতে পায়ে সামান্য ব্যথা পেয়েছিল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যাচ্ছিল সে নিজের ভুলের জন্য গাড়ির চালকের কাছে ক্ষমা চেয়ে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটা এসে তার পাশে এসে থামে। গাড়ি থেকে মধ্যবয়সী সুন্দরী এক নারী নেমে ইমরানের সামনে দাঁড়ায়। এতে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ে সে।
‘এই যে আপনি তো হাঁটতে পারছেন না, ব্যথা পেয়েছেন বুঝতে পারছি, গাড়িতে উঠুন, আপনার ফাস্ট এইড দরকার। এভাবে হেঁটে কতদূর যেতে পারবেন?’ মহিলা উদ্বিগ্ন হয়ে বলতে বলতে তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে গাড়ির দিকে নিতে উদ্যত হয়।
‘ম্যাডাম, ইটস অলরাইট, ডোন্ট অরি ফর মি। আমার নিজের দোষেই তো অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি। আমার জন্য কেন অযথা ভাবছেন। আমি নিজেই চলে যাবো বাসায় একটা রিকশা নিয়ে,’ বিনয়ী ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে সে।
‘অ্যাই ছেলে। তুমি বললেই আমি বিশ্বাস করবো, তোমার কিছু হয়নি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি, কোনো একটা ক্লিনিকে নিয়ে তোমার ফাস্ট এইড দেয়া দরকার, আগের মতো দুহাতে জড়িয়ে ধরে মহিলা তাকে পার্ক করা নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলেন।
ক্লিনিকে যাওয়ার পর ইমরানের হাত ও পায়ের যে জায়গায় আঘাত লেগে রক্ত ঝরছে সেখানে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন ডাক্তার। সাথে সাথে হাত ও পায়ের এক্স-রে করানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্টও চলে আসে। সৌভাগ্যক্রমে বোন ফ্রাকচার হয়নি ডাক্তার হাসতে হাসতে জানিয়ে দেন। ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা শেষে ইমরান নিজের উদ্যোগে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আবার তাকে পাকড়াও করেন সেই মাঝবয়সী সুন্দরী ভদ্রমহিলা।
দশ পনেরো মিনিট চলার পর গাড়িটা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটা বড়সড় বাড়িতে গিয়ে ঢোকে গেট পেরিয়ে। বেশ চমৎকার ছবির মতো সাজানো ডুপ্লেক্স বাড়ি। লোকজন বলতে তেমন কেউ নেই। চাকরবাকর, আয়া-বাবুর্চি ছাড়া আশপাশে অন্য কাউকে দেখতে পায় না, ইমরান। ভদ্রমহিলাই তাকে ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান।
ভদ্রমহিলা তাকে সোফায় বসিয়ে বাড়ির ভেতরে গেছেন। দশ-পনেরো মিনিট পর কিছু ফলমূল, নাস্তা এবং জুস নিয়ে আসে কাজের বুয়া। তার সঙ্গে ভদ্র মহিলাও আসেন। এসে সোফায় তার পাশে একদম শরীর ঘেঁষে বসেন। অস্বস্তিবোধ করে সরে বসতে চাইলে মহিলা ইমরানের দিকে চোখ পাকিয়ে শাসনের সুরে বলেন, ‘অ্যাই ছেলে তুমি এমন কেন, একদম রসকসহীন। তোমার মধ্যে এমন নিস্পৃহ ভাব দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। অ্যাই তোমার কী হয়েছে? গুলশানে কী কাজে এসেছিল? আর হ্যাঁ, তোমার নামও তো জানলাম না। কি অদ্ভুত ব্যাপার! তাই না?
ইমরান নিজের পরিচয় দিয়ে জানায়, মাস্টার্স পাস করে একটা ভালো চাকরির সন্ধানে রয়েছে। বাবা সরকারি চাকুরে। অবসর নেয়ার সময় এসে গেছে। তার ছোট এক ভাই এবং এক বোন রয়েছে। তারাও পড়াশোনা করছে কলেজ-ভার্সিটিতে। এখন যদি একটা চাকরি জোগাড় করা না যায় তাহলে পরিবারের দায়িত্ব নেবে কীভাবে? বাবা রিটায়ার্ড করলে পরিবারটা চলবে কীভাবে’ এতসব কথা বলতে বলতে ইমরান কিছুটা হাঁপিয়ে ওঠে। ক্লান্তিভাব ভর করে তার মধ্যে। এটা বুঝতে পারেন ভদ্রমহিলা। তারপর তিনি নিজেই তার হাতে ফলের জুসের গ্লাস তুলে দেন। এটা খেয়ে নাও। আমি নিজে তোমার জন্য স্পেশালি বানিয়ে এনেছি, জুসটা খেলে অনেক রিল্যাক্স ফিল করবে।
জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে এক সময় পুরোটাই খেয়ে ফেলে ইমরান। বেশ ভালো লাগে জুসটা। ভদ্র মহিলার দেয়া জুসটা সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদের মনে হয়। তার হাতের গ্লাসের জুসটা খাওয়া শেষ করে ফেলেছে দেখে ভদ্র মহিলা উৎসাহী হয়ে বলেন, ‘কি ভালো লাগছে জুস? আরেক গ্লাস এনে দিই।’
অল্পক্ষণের মধ্যে আরেক গ্লাস জুস চলে আসে। এটাও তার হাতে তুলে দেন মহিলা। জুসের দারুণ স্বাদ গ্রহণ করতে করতে এই গ্লাসটা কয়েক চুমুকে শেষ করে দেয় ইমরান। কিছুক্ষণ পর ইমরানের শরীরটা কেমন টলমল করে ওঠে। সামনের সব কিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে যেন। এমন লাগছে কেন, বুঝে উঠতে পারে না ইমরান। ক্রমশ নিজের শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে উপলব্ধি করে। মহিলার দেয়া জুস খেয়ে তার এই অবস্থা বুঝতে পারলেও এখন তার করার কিছু নেই এটাও ঠিক উপলব্ধি করে। এরপর তার আর কিছু খেয়াল থাকে না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। এভাবে কতটা সময় পেরিয়ে যায়, অনুভব করতে পারে না সে।
যখন তার আচ্ছন্ন ভাব কেটে যায় তখন নিজেকে মাঝ বয়সী সুন্দরী মহিলার একান্ত শারীরিক সান্নিধ্যে আবিষ্কার করে অবাক হয় ইমরান। সে নিজের বয়স, সামাজিক অবস্থান, রুচি-পছন্দ, মূল্যবোধ সব ভুলে গিয়ে অন্য আরেক মানুষে রূপান্তরিত হয়।
ধীরে ধীরে ইমরানের সব মনে পড়ে। গুলশানে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা চলন্ত গাড়ির সামনে পড়ে সামান্য আহত হওয়ার পর থেকে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সিনেমার মতো স্লো মোশনে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। মহিলাটি তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের ছুতোয় নিজের বাড়িতে ডেকে এনে ফলের জুসের সঙ্গে নেশা জাতীয় কিছু খাইয়ে তার আচ্ছন্নতার সুযোগ নিয়ে নিজের যাবতীয় শারীরিক আকাক্সক্ষা পূরণ করেছে।
এক অদ্ভুত অনুভূতি তার দেহমনে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই বিরাট ঢাকা শহরে সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে কতো কী ঘটনা ঘটে যায় প্রতিদিন, তার সব কথা সবাই জানতে পারে না। কিন্তু আজকের ঘটনা ইমরানের মনে নতুন বোধ সৃষ্টি করে দেয়। কিছুক্ষণ পর মহিলা স্লান সেরে কাপড় চোপড় পরে একটা খাম এনে ইমরানের হাতে ধরিয়ে দেন।
সে অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘এই খামে কী রয়েছে?’
মহিলা হেসে জবাব দেন, ‘তোমার পুরস্কার, হ্যান্ডসাম বয়। এটা তোমার প্রাপ্য। ইমরান নিজের অন্যরকম যোগ্যতা উপলব্ধি করে এবার। এই শহরে কতোজন কতোভাবে টাকা উপার্জন করে, তার হিসাব কে রাখে? উপলব্ধি হয় তার।
সেই থেকে জীবনের মোড় ঘুরে যায় ইমরানের। অযথা চাকরি খোঁজার চেষ্টা বাদ দিয়ে ভিন্ন এক জীবনে জড়িয়ে ফেলে নিজেকে। নিজের শরীরটাকে ধনাঢ্য পরিবারের বিভিন্ন বয়সী নারী, তরুণীর ভোগের সামগ্রী করে তোলে। তাদের কেউ স্বামী পরিত্যক্ত, বিধবা কিংবা কারো স্বামী অসুস্থ বউকে শারীরিক তৃপ্তি দিতে পুরোপুরি অক্ষম। এখন ইমরানের মোবাইল নম্বর এই শহরের অনেক নামি দামি ভদ্র বিত্তশালী পরিবারের নারীর মোবাইলে সেভ করা আছে। প্রয়োজন হলে তারা কল দেয়, এবং তাতে সাড়া দিয়ে জায়গামতো পৌঁছে যায় সে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে।
অন্ধকার জীবনে পথ চলতে গিয়ে কতো বিচিত্র নারীর দেখা পেয়েছে ইমরান। মা-খালার বয়সী নারী থেকে শুরু করে কলেজ-ভার্সিটি, ও লেভেল, এ লেভেল পড়ুয়া মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে গড়তে আজকাল অরুচি ধরে গেছে। কিন্তু এ পথে উপার্জন করে পুরো সংসরটা চালাতে পারছে সে সাবলীল স্বাচ্ছন্দ্যভাবে। এমনি এমনি তো কেউ তাকে এত টাকা দেবে না- এটা মনে হতেই ইমরান তার অন্ধকার জীবনের গ্লানি, দুঃখ, লজ্জা, অসহায়ত্ব সবই ভুলে যায়। সন্তান হিসেবে, বড় ভাই হিসেবে পারিবারিক দায়বদ্ধতা মেটাতে অন্ধকার জীবনের গণ্ডি থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারে না। নিজের এই অসহায়ত্ব, অক্ষমতা, ব্যর্থতা এবং সীমাবদ্ধতা ইমরানকে শুধুই কুড়ে কুড়ে খায়। কেউ জানে না, কেউ বুঝতে পারে না তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের রক্তক্ষরণের দুঃখ-যন্ত্রণা।
পরিবারের সবাই, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব চেনাজানা সবাই জানে ইমরান কয়েক বন্ধুর সঙ্গে মিলে বিভিন্ন অফিসে স্টেশনারি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করে। এর বাইরে কনসালটেন্সি কাজও করে সে।

তিন.
মনিকা ও লায়লা দু’জনে পর্যায়ক্রমে মেতে উঠে ইমরানকে নিয়ে নিজেদের আদিম বাসনা মেটানোর উদ্দাম লীলায়। একসময় ক্লান্তিতে ইমরানের সারা শরীর ভেঙে আসতে চাইছে। ওপাশে বিছানায় মনিকা এবং লায়লা ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাদের মৃদু নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
বিছানা ছেড়ে এটাচড বাথরুমে ঢোকে ইমরান। লাইফ সাইজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে কিছুক্ষণ। তারপর মুখে এক ধরনের বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে। নিজেকে উদ্দেশ্য করেই বলে সে, ‘বাহ, ইমরান বাহ। চালিয়ে যাও। এভাবে আর কতদিন? বলতে বলতে এক সময় ভীষণ কান্না পায় ইমরানের। কিন্তু কাঁদতে পারে না। বুকের মধ্যেই আটকে থাকে সেই কান্না।
রাত শেষে ভোরের আভাস ফুটে উঠেছে বাইরে খোলা প্রকৃতিতে। একটু পরেই পুব আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করবে সূর্যটা। প্রকৃতিতে চমৎকার একটা নিটোল শান্ত সুনিবিড় পরিবেশ ছড়িয়ে আছে। এ সময় পৃথিবীটাকে অনেক শান্ত, স্বস্তিকর, পবিত্র মনে হয়। এমন পরিবেশে চমৎকার পৃথিবীটাকে দেখতে দেখতে মুগ্ধ ইমরান ভুলে যেতে থাকে রাতভর ঘটে যাওয়া সব ঘটনার কথা।