নিজভূমে পরবাসী আজমউল্লাহ ও ৬০০ পরিবার!

আগের সংবাদ

লেমোসকে ছাড়ছে না আবাহনী

পরের সংবাদ

গানের বাজার এখন যেমন

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৩১, ২০১৯ , ২:০৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০১৯, ৩:০০ অপরাহ্ণ

Avatar

পাটুয়াটুলী ও নবাবপুর এলাকায় এখন আর নেই গানের বাজার। অথচ কয়েক বছর আগেও সারা বছরই এখানে শোনা যেত গানের আওয়াজ। এখানে পথে চলতে গেলে ভেসে আসত নতুন কাগজের গন্ধ। এলাকার ভবনগুলোর দেয়ালে থাকত নতুন অ্যালবামের পোস্টার। ঈদ এলে এখানে রীতিমতো উৎসব লেগে যেত। শত শত এমনকি হাজারো নতুন অ্যালবামের মুক্তির স্রোত বয়ে যেত এই বাজারে। দেশের অডিও বাজার নিয়ন্ত্রণ হতো এই এলাকা থেকে। তাহলে কোথায় গেল আগের সেই সরগরম অডিও বাজার? দেয়ালে দেয়ালে নেই নতুন অ্যালবামের পোস্টারের ছড়াছড়ি, নেই শত শত ক্যাসেট কিংবা সিডি। নেই অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরও কোনো কার্যালয়। কয়েক বছর আগে যেখানে ছিল শুধু ক্যাসেট সিডির দোকান, এখন সেখানে মোবাইল, মেমোরি কার্ড, ঘড়ি, বোরকা এমনকি বিরিয়ানির দোকান। নবাবপুরের পাহলোয়ান ইলেকট্রিক মার্কেটে ছিল শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেকের দোকান। এখন সেখানে একটি ইলেকট্রনিক পণ্যের গোডাউন। কয়েক বছর আগে সাউন্ডটেক এখানে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছে। পাটুয়াটুলী রাবেয়া ইলিয়াস মার্কেটে একসময় প্রায় সবগুলো দোকান ছিল অডিও ক্যাসেট ও সিডির পাইকারি ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। সেখানে এখন ঘড়ির দোকান। পাটুয়াটুলীর নুরুল হক মার্কেটের দোতলায় ছিল দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সঙ্গীতার মূল বিক্রয় কেন্দ্র ও অফিস। একটি ফ্লোরের পুরোটা জুড়ে ছিল সঙ্গীতার কর্মকাণ্ড গোডাউন ও বিক্রয় কেন্দ্রের কিছু অংশ ছিল অন্য ফ্লোরেও। সেখানে এখন ছোট ছোট দোকান করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি অডিও বাজার চট্টগ্রামের চিত্র একই। শহরের রেয়াজউদ্দিন বাজারের শীর্ষস্থানীয় অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আমিন স্টোর, বিনিময় স্টোর, জাহেদ ইলেকট্রনিকস, ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক, শাহ আমানত অডিও কমপ্লেক্স এখন আর গানের অ্যালবামই বের করে না। অনেক নামি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। জানা গেছে, ছোট ও মাঝারি সবগুলো প্রতিষ্ঠানই এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
যেভাবে ধস নামে অডিও শিল্পে
সারা দেশের অডিও বাজারের প্রথম ধস নামে যখন এমপি থ্রির দৌরাত্ম্য শুরু হয়। যদিও কয়েকজন প্রযোজকের দাবি, মূলত পাইরেসির কারণেই ব্যবসার ধসে পড়েছে অডিও শিল্প। তবে এ কারণকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না অনেক প্রযোজক। মূলত কয়েকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে বিদেশি অ্যালবাম পাইরেসি করে স্থানীয়ভাবে প্রকাশ করত। এ ক্ষেত্রে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হতো। অডিও বাজার প্রথম ধাক্কা খায় এমপি থ্রির দৌরাত্ম্যে। শুরুতে একটি সিডিতে এমপি থ্রি ফরম্যাটে অনেকগুলো গানের অ্যালবাম করে ফুটপাতে বিক্রি করা হতো। কিছুদিন পর এমপি থ্রি ফরম্যাটে একসঙ্গে অনেকগুলো অ্যালবামের গান বিক্রি শুরু হয়। একসঙ্গে এক সিডি বা এমপি থ্রি যন্ত্রে অনেকগুলো অ্যালবামের গান পেয়ে শ্রোতারা নতুন গানের বৈধ অ্যালবামের প্রতি বিমুখ হন। কমে যায় অ্যালবাম বিক্রির পরিমাণ। দ্বিতীয় ধাক্কা আসে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কাছ থেকে। এক সময় বিষয়টি সিডিতে সীমিত থাকেনি। পুরোপুরি নির্ভর হয়ে পড়ে ইন্টারনেট এবং মোবাইলে। হয়ে পড়ে ইউটিউবনির্ভর। শেষ হয় বহু গানের অ্যালবামের যুগ। শুরু হয় এক গানের এক অ্যালবামের যুগ। এ পরিস্থিতিতে মাঝে কিছুদিন বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোও কিছু বুঝতে না পেরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। পরে ছোট পরিসরে কেউ কেউ আবার ব্যবসা শুরু করেন।
কারা আছে কারা নেই
পাটুয়াটুলী নবাবপুরের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান মগবাজারে একটি গলিতে চলে আসে। মূলত গানের বাজারের পাটুয়াটুলী নবাবপুরের রাজত্ব এখন মগবাজারে। অবশ্য কেউ কেউ আলাদাভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাগজে-কলমে দেশে এখন এমআইবিভুক্ত নিবন্ধিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮০। তবে সক্রিয়ভাবে গান প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত আছে ২৫টির মতো। দেশে নিয়মিত গান প্রকাশ করে চলছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাউন্ডটেক, সঙ্গীতা, লেজার ভিশন, জি-সিরিজ, সিডি চয়েজ, গানচিল, ঈগল মিউজিক, অনুপম রেকর্ডিং, সুরঞ্জলি, মাই সাউন্ড, সিডি জোন, ইমপ্রেস অডিও ভিশন, সিডি প্লাস, চেনা সুর ইত্যাদি।
বড় প্রকাশক যখন মোবাইল অপারেটর
দেশের মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। সিডি প্লেয়ার, ক্যাসেট প্লেয়ারের বদলে শ্রোতাদের গান শোনার মাধ্য হয়ে উঠেছে তাই মোবাইল ফোন। গ্রাহকদের সুবিধা ও ব্যবসার কথা চিন্তা করে মোবাইল অপারেটররা গানের বাজার বিনিয়োগ করেছেন বড় মূলধন। জিপিস্টোরের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুধুমাত্র গান শোনাই যাচ্ছে না, সরাসরি এখান থেকে গান প্রকাশিতও হচ্ছে। অপারেটরগুলো হয়ে উঠেছে সঙ্গীতের বড় প্রকাশক। দিনশেষে অবশ্য গান প্রকাশনায় তারা ঢিলেঢালা। প্রকাশকদের কাছ থেকে গান কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতেই তারা স্বচ্ছন্দ। এ জন্য শুরুর মতো আর অ্যালবামে পুঁজি ঢালছেন না তারা।
গান শোনার সর্ববৃহৎ মাধ্যম ইউটিউব
ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউব হয়ে উঠেছে গান দেখা ও শোনার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। এ জন্য গান প্রকাশকরা ইট-কাঠের অফিস ঘর পাল্টে ইউটিউবে খুলেছেন নিজস্ব চ্যানেল। চ্যানেলের গ্রাহক বাড়াতে চালাচ্ছেন নানা কৌশল। ইউটিউবে অবাধ ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতা করছেন ভেরিফায়েড চ্যানেলের জন্য। এতে ব্যবসায় আসছে স্বচ্ছতাও। কিন্তু কয়েক বছর আগেও ইউটিউব থেকে ভালো টাকা পেত গানের পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। ইউটিউবে গান প্রকাশ করে সাবস্ক্রাইবার বাড়ানো এবং শিল্পী ও প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ছাড়া সেই অর্থে আর বেশি কিছু জুটছে না। শুরুতে বেশ বড় বাজেটে ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপলোড করা হলেও এখন সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। অল্প বাজেটে গান তৈরি করে ইউটিউবে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভাইরাল জ্বরে কাঁপছে গানের বাজার
গানের বাজার এখন পুরোপুরি ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে সঙ্গীতাঙ্গন ‘যা ইচ্ছে তাই’-এর কবলে পড়েছে।
বাজার এখন ‘ভাইরাল জ্বর’-এ আক্রান্ত। যার ফলে কেউ কেউ উদ্ভট, মানহীন, দুর্বল কথার গানের পাশাপাশি কুরুচিপূর্ণ মিউজিক ভিডিওর আশ্রয় নিচ্ছেন। এখন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রযোজকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না গান প্রকাশের জন্য। সুরকার, শিল্পী, গীতিকার, ইভেন্ট অর্গানাইজার, সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট এমন অনেকেই নিজেদের মতো গান তৈরি করে অনলাইনে ছাড়ছেন। সেখান থেকে বিক্রি-বাট্টাও খারাপ আসছে না। এ জন্য গানের বাজার হয়ে পড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং লাগামহীন।