সাকিবের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

আগের সংবাদ

ফিটনেস ও কৌশলে গুরুত্বারোপ জেমির

পরের সংবাদ

ভারত থেকেও আসছে ইয়াবার চালান

কামরুজ্জামান খান :

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২৫, ২০১৯ , ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের মধ্যেও হরদম হাতবদল হচ্ছে ইয়াবার চালান। এতদিন কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন সীমান্ত পথে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান ঢুকলেও এখন ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকছে এর চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিন গড়ে এক লাখ পিস ইয়াবার চালান আটক হলেও হাতবদল হচ্ছে আরো কয়েক লাখ পিস। সেবনকারীরা পর্যায়ক্রমে খুচরা বিক্রেতা হওয়ায় প্রতিদিন বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা। গত বছরের ৪ মে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৪ শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী। তবুও বন্ধ হয়নি ভয়ানক এই মাদকের বিকিকিনি। সাঁড়াশি অভিযানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৫৪ জন মাদক কারবারি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে দুই নারীসহ ৩৩ জন রোহিঙ্গা।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের মাদকসেবীদের কাছে ভারতীয় ফেনসিডিলের কদর কমে যাওয়ায় এবং সেখানে মাদক প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ার সুযোগে মাদক কারবারিরা ইয়াবার চালান এনে সেগুলো এদেশে পাচার করছে। এরসঙ্গে মিয়ানমার, ভারত ও দেশীয় চক্র জড়িত। একাধিক চালান আটকের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এমন তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন। র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ, টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল হাসান খাঁন, কোস্টগার্ড ও জেলা পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের কথা জানালেও থামছে না ইয়াবার ঢল।
বিজিবি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পথ ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে মাদক নির্মূলে চলমান অভিযানের কারণে মাদক কারবারিরা রুট বদল করে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পথে ইয়াবা পাচার করছে ভারতে। এসব ইয়াবা ঘুরপথে ঢুকছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। সেখান থেকে সীমান্ত পথে ঢুকছে বাংলাদেশে।
একাধিক সূত্র মতে, সম্প্রতি কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ওই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করেছে। সেসব ইয়াবার গন্তব্য বাংলাদেশ বলেও দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বিজিবি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মিয়ানমার ছাড়া ভারতেও ইয়াবা তৈরি হচ্ছে যার লক্ষ্য বাংলাদেশের বাজার। ইয়াবা তৈরির উপকরণ অ্যামফিটামিন, মেটাফিটামিন ও সিউডোফিড্রিন ভারতের বাজারে সহজলভ্য এবং এসব ক্রয়ে কাউকে ঝামেলা পোহাতে হয় না। বাংলাদেশে চাহিদা থাকায় ভারতেও ইয়াবা তৈরি হচ্ছে এমন আশঙ্কা করছেন দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর তথ্য মতে, সিলেট বিভাগের চারটি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসছে দেশে। সিলেটের জকিগঞ্জ ছাড়াও সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও টেকেরঘাট এবং হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা আসছে। ভারতের মিজোরাম রাজ্য থেকে আসাম ও মেঘালয় হয়ে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায়। জেলার জকিগঞ্জ ও বাল্লা সীমান্তের ওপারে (ভারতের অংশে) গড়ে উঠেছে ইয়াবা তৈরির ছোট ছোট কারখানা। এ ছাড়া রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরাসহ ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এতদিন বড় বড় চালানের ইয়াবা এলেও এবার ছোট ছোট চালানে ইয়াবা প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি হিলি সীমান্তের অন্তত ৩৫টি পয়েন্ট দিয়েও ভারত থেকে ইয়াবা আসছে। হিলি সীমান্তের ফুটবল খেলার মাঠ, জিলাপি পট্টি, পুরিপট্টি, মণ্ডলগেট, কামালগেট স্টেশন, বালুরচর, ডাব বাগান, ফকিরপাড়া, হিন্দু মিশন, নওপাড়া, হাঁড়িপুকুর, নন্দিপুর, ঘাসুরিয়া এবং পাঁচবিবি সীমান্তের কয়া, চেঁচড়া, ভুঁইডোবা, রামভদ্রপুর, উত্তর গোপালপুর, উচনাসহ ৩৫টি পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা বিজয়নগর, আখাউড়া ও কসবা দিয়েও প্রতিদিন ছোট-বড় ইয়াবার চালান ঢুকছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করা হয় উভয় দেশের সীমান্ত নদী কুশিয়ারা ও সুরমা। ভারতের করিমগঞ্জ থেকে পলিথিন ব্যাগে ইয়াবার চালান ঢুকিয়ে লম্বা রশি লাগিয়ে ফেলে দেয়া হয় নদীতে। এপারে বাংলাদেশ সীমান্তে তখন মাছধরার নৌকা নিয়ে মাছধরার ছলে অপেক্ষায় থাকে মাদক কারবারিরা। নদীর স্রোতের টানে পলিথিনে থাকা ইয়াবার চালান ভাসতে থাকে। বাংলাদেশের মাদক কারবারিরা তখন কৌশলে সেই চালান তুলে নেয় নৌকায়। সুযোগ বুঝে তা তুলে নিয়ে আসা হয় পাড়ে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে ইয়াবার চালান পলিথিনে ভরে সাঁতরেও পার করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জকিগঞ্জের সেনাপতির চকের বিপরীতে ভারতের কাঁটাতারের নিচ দিয়ে গোপন রাস্তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, ভারত থেকে আসা ইয়াবার চালান সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সিলেট শহরে আনতে আগে যে রুট ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে সেটি পাল্টে ফেলেছে মাদক কারবারিরা। আগে সিলেট শহরে ইয়াবার চালান নিয়ে আসতে জকিগঞ্জ-শ্যাওলা-সিলেট রুট ব্যবহার করা হতো। তারপর সে চালান ছড়িয়ে যেত সারাদেশে। তবে ওই রুটে বর্তমানে পুলিশের কড়া তল্লাশি থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা জকিগঞ্জ-কালিগঞ্জ-সিলেট ও জকিগঞ্জ-আটগ্রাম-সিলেট রুট ব্যবহার করছে। সিলেট শহর থেকে বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবার চালান পাঠানো হচ্ছে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরাসহ সীমান্তবর্তী অন্যান্য জেলা দিয়েও নানা কায়দায় ঢুকছে ইয়াবা।
এ ব্যাপারে মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়াসহ বিভিন্ন প্রবেশপথে অভিযান ও তল্লাশি জোরদার হওয়ায় মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইয়াবার চালান দেশে ঢুকছে। এরমধ্যে ভারত থেকে আসা ইয়াবার বেশ কয়েকটি চালান আটক হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে যারা ইয়াবার কারখানা খোলার চেষ্টা করেছিল তাদের আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ইয়াবার চালান ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে মাদক সমস্যায় পড়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে দেশে অবৈধ মাদক প্রবেশ করে। ইয়াবা আসছে মিয়ানমার থেকে, ভারত থেকে আসে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইনজেক্টিং ড্রাগ। তিনি জানান, ২০১৮ সালে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এক লাখ ৬১ হাজার ৩২৩ জন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৭৮টি মামলা দায়ের করেছে। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে ছয় হাজার ৬৭১ জন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে ছয় হাজার ১৫৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মাদক নির্মূল করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা মাদকের ডিমান্ড, সাপ্লাই রোধ করে এবং মাদকসেবীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সমানতালে কাজ করছি। মাদকের ডিমান্ড হ্রাসের ক্ষেত্রে আমরা সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করার দিকে জোর দিচ্ছি। এ আন্দোলনে সর্বস্তরের জনগণকে যুক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি জানান, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭ হাজার ৮৯৮টি সভা আয়োজন করেছে। ২৮ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাদকের সাপ্লাই হ্রাস করতে বর্ডার এলাকায় বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করা হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।’ মাদকের চোরাচালান যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যারা মাদকের চোরাকারবার করে আসছে, তাদের আর এ কাজ করতে দেয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারিরা আত্মসমর্পণ করছে।