পাক-ভারত সংকট ও এশিয়ার পথচলা

আগের সংবাদ

রাখাইনে ফের সংঘর্ষ, সেনাবাহিনীর বিমান হামলা

পরের সংবাদ

বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের পিতা শেখ মুজিব

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২৫, ২০১৯ , ৭:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০১৯, ৭:৫০ অপরাহ্ণ

মোস্তাফা জব্বার

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক

আজকের তরুণরা বঙ্গবন্ধুকে সেভাবে বুঝবেন না যেভাবে আমরা তাকে চিনি। তাকে বুঝতে হলে পড়তে হবে, জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুর বাঙালিত্ব, তার প্রতি একনিষ্ঠতা এবং জাতিসত্তা বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নীতিমালা আমার মতো লাখো লাখো তরুণকে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠনে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যে ভাষা রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন সেখানে থেকে সরে গিয়ে আমরা কোন জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলছি, সেটি আমি মোটেই বুঝি না। আসুন না সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষা রাষ্ট্রটাকেই বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করি।

 

(২য় কিস্তি)

চার দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলার মাটিকে রক্ত দিয়ে পবিত্র করে যাকে সপরিবারে শহীদ হতে হয়েছিল তার সম্পর্কে দুটি বাক্য লিখতে আর কার কী হয় জানি না, আমার তো হাত কাঁপে। কোনোভাবেই আমি তাকে নিয়ে লেখার সাহস পাই না। এত বড় মাপের মানুষ তাকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার মতো নগণ্য একজনের থাকতেই পারে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম সশরীরে দেখি ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। সেই থেকে ১৯৭৫-এর আগস্ট পর্যন্ত তাকে কাছে এবং দূরে থেকে দেখেছি। দেশের আরো রাজনৈতিক নেতাকেও দেখেছি। মাওলানা ভাসানী, কমরেড মনি সিংহ বা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদদের রাজনীতি পর্যবেক্ষণও করেছি। আজ এত বছর পরেও যদি সব রাজনৈতিক নেতাকে মূল্যায়ন করি তবে শ্রদ্ধায় অবনত হওয়ার মতো মানুষ একজনকেই পাই। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তার নাম শুনেছি ১৯৬৬ সালে, যখন ঢাকা কলেজে পড়ার সময়ে ছাত্রলীগ করা শুরু করি। সেখানেই ছয় দফা নামক একটি লিফলেট বিলাতে গিয়ে প্রথম জেনেছি যে বাঙালিরা তাদের প্রাপ্য পায় না। তার আগে সারাটা স্কুল জীবনে পাক সার জমিন সাদ বাদ গেয়ে পাকিস্তানি হওয়ার চেষ্টা করেছি। ১৯৬৫ সাল ছিল প্রথম যখন ঢাকা শহরে এসে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর কুশপুত্তলিকা জ্বালাতে দেখেছি। ছয় দফা পাঠ করে জীবনে প্রথম অনুভব করলাম, আমি বাঙালি এবং আমার একটি আলাদা ভাষা, আলাদা সংস্কৃতি ও আলাদা ভূখণ্ড রয়েছে। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শুনলাম, বাঙালিদের একজনই নেতা, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর ১১ দফায় সেই ছয় দফা যুক্ত হয় আর রাজপথে তার মুক্তির দাবিতে মিছিল করা দিয়ে নিজের স্লোগান দেয়ার ক্ষমতাকে শানিত করি। তাকে দেখি যে দিন তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয় সে দিন। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগণ্য একজন কর্মী হিসেবে তার সামনে যাওয়ার কোনো কারণই ছিল না। তবে যারা তার কাছে থাকতেন তাদের সঙ্গে আমরা দিন-রাত কাটাতাম বলে তার ব্যক্তিগত ভাবনা-জীবনাচার বা রাজনৈতিক দর্শন জানতে পারতাম। সেই মানুষটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
যে সময়ে ব্রিটিশরা পুরা উপমহাদেশটিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে কলঙ্কিত করে দুটি অদ্ভুত রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবং পুরো উপমহাদেশের তাবৎ বড় বড় রাজনীতিবিদরা সেই সাম্প্রদায়িকতাকেই মাথায় তুলে নিয়েছিলেন তখন তিনি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের বিপরীতে একটি ভাষাভিত্তিক আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের দূরদর্শী স্বপ্ন দেখেন। ভাবা যায় যে পাকিস্তান তৈরির ৫ মাসের মাঝে জিন্নাহর মুখের ওপর কেউ না না চিৎকার করে নিজের মাতৃভাষার দাবিকে উত্থাপন করতে পারেন। এই অঞ্চলে ভাষারাষ্ট্র ধারণা তখন মোটেই গুরুত্ব পায়নি। বঙ্গবন্ধু সেই মানুষটি যিনি বাংলাদেশের অন্তরকে অনুভব করেন এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাঙালি যে তার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সবার ওপরে ঠাঁই দেয় এবং তার এই জীবনধারায় ধর্ম যে প্রধান শক্তি নয় সেটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আমি নিজে অভিভূত হই যখন দেখি যে তিনি পাকিস্তানের কাঠামোতে থেকে তার রাজনৈতিক সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি উপড়ে ফেলে দিতে পারেন। যে মানুষটি নিজেকে স্পষ্ট করে দুনিয়ার কাছে তুলে ধরতে পারেন যে, তিনি বাঙালি, মানুষ এবং তারপরে মুসলমান, কেবল সেই মানুষটিই পাকিস্তানের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের চোখের সামনে পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে পারেন! আজ তার মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পর আমাদের আইনমন্ত্রীকে বলতে হয় যে, আমরা অবশ্যই ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাব। তিনি নিজেই অনুভব করেন যে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আমরা ফেরত যেতে পারিনি। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা দেশটিকে যেভাবে পাকিস্তানের দূরবর্তী অঙ্গরাজ্য বানিয়েছিল, সেটির জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রণীত সংবিধানে আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে ফিরে যেতে পারিনি। আমরা সংবিধানে কেবল বিসমিল্লাহ রাখিনি তাতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও রেখেছি। আমার জানা মতে তার হাতে তৈরি ১৯৭২ সালের সংবিধানটি হচ্ছে দুনিয়ার অন্যতম সেরা সংবিধান, যার সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো সংবিধান অন্তত এই অঞ্চলে পাওয়া যায় না।
আজকের তরুণরা বঙ্গবন্ধুকে সেভাবে বুঝবেন না যেভাবে আমরা তাকে চিনি। তাকে বুঝতে হলে পড়তে হবে, জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুর বাঙালিত্ব, তার প্রতি একনিষ্ঠতা এবং জাতিসত্তা বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নীতিমালা আমার মতো লাখো লাখো তরুণকে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠনে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যারা এখন মনে করেন যে, পাকিস্তান আমাদের ঠকিয়েছে, ন্যায্য পাওনা দেয়নি এবং বনিবনা হয়নি বলে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে তারা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শকে বুঝতেই পারেন না। কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি পাকিস্তানের কাঠামোতে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এমনভাবে গড়ে তোলেন যে সারা দুনিয়ার কাছে আমরা এটি প্রমাণ করেছি যে আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই তিনি বুঝেছিলেন যে, যে পাকিস্তানের স্বপ্ন বাঙালিরা দেখেছিল সেই পাকিস্তান জন্মই নেয়নি। কেবল তাই নয় হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান বিভাজনের সময় বাংলার বিভাজন ও বাংলার ন্যায্য পাওনা অঞ্চলগুলোকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানে বাঙালিদের সংখ্যা কমানোর প্রচেষ্টাতেই তিনি অনুভব করেছিলেন- পাকিস্তানের তথাকথিত স্বাধীনতা বাঙালির স্বাধীনতা নয়। এরপর ১৯৪৮ সালেই তিনি এটি বুঝেছিলেন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য নয়। সে জন্যই তিনি ভাবেন যে বাঙালিদের একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সে জন্য তিনি একদিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতিও গড়ে তুলেছেন।
বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বুঝতে হলে তার তৈরি করা ১৯৭২-এর সংবিধান বুঝতে হবে। তার ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল চারটি। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। ধীরে ধীরে আমরা সেই চার নীতির গণতন্ত্র ছাড়া বাকি সবগুলোকেই এড়িয়ে চলেছি। আজকের বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র শব্দটি কেউ উচ্চারণ করে না। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক ধারণার পথ ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই। হয়তো কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্র ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, কিন্তু ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করতে ডিজিটাল যুগের সমাজতন্ত্র ও তার ধারণা কাজে লাগানো ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। এক সময়ের কায়িকশ্রমনির্ভর মালিক-শ্রমিক কাঠামোটি দিনে দিনে মেধাশ্রমভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে শ্রেণিচরিত্র বা শ্রেণিসংগ্রামের সংজ্ঞা বদলাবে। কোনো এক মার্ক্সকে নতুন করে সমাজতন্ত্রের মূলকথা বর্ণনা করতে হবে- ব্যাখ্যা করতে হবে। তবে সমাজতন্ত্র যে বৈষম্যহীনতার ধারণাকে জন্ম দিয়েছে সেটি দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে না। বরং সমাজতন্ত্রের ডিজিটাল ধারাটির জন্য সারা দুনিয়ায় নতুন করে লড়াই চলবে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বাংলাদেশকে আবার লড়াই করতে হচ্ছে। জিয়া-এরশাদ-খালেদা বাংলাদেশকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার অপচেষ্টা করেছে এবং সারা দুনিয়ার ধর্ম পরিস্থিতি যেমনটা তাতে বাংলাদেশের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখাকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর যে অসাধারণ দৃঢ়তা ছিল মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতি, তার প্রথম স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পরপরই। তিনি কৃষিপ্রধান রাষ্ট্রের গরিব মানুষদের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ করে দেন এবং জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করে দেন। তিনি এটি স্পষ্টতই অনুভব করেছিলেন যে বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিভিত্তিক দেশের প্রধান সম্পদের নাম জমি। সেই কারণে ভূস্বামীদের হাতে জমি রাখা যাবে না। স্পষ্টতই তিনি শ্রেণিবৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর বাঙালির ভাষা আন্দোলনের বিষয়টির বাইরেও বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই ভাষণের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি, যেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সরকারি অফিসের সব কাজ বাংলাতেই হবে। আমি সেই মুজিবের কথা ভাবি যে, মুজিব অপটিমা মুনীর টাইপরাইটার বানিয়েছিলেন। শহীদ মুনীর চৌধুরীর ডিজাইন করা মুনীর কিবোর্ডকে ভিত্তি করে পূর্ব জার্মানির অপটিমা কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে তিনি অপটিমা মুনীর তৈরি করে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অফিস-আদালতে বাংলা ভাষা চালু করেন।
যে ভাষা রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন সেখানে থেকে সরে গিয়ে আমরা কোন জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলছি, সেটি আমি মোটেই বুঝি না। আসুন না সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষা রাষ্ট্রটাকেই বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করি। আসুন সব ক্ষেত্রে সেই একজন বাঙালিকেই অনুসরণ করি যার নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
(চলবে)

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।