আইভী রহমানের ১৫তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ

আগের সংবাদ

চুয়াডাঙ্গায় ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় যুবককে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

পরের সংবাদ

নির্দেশনার পরও টাওয়ার সরানোর উদ্যোগ নেই

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০১৯ , ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২৪, ২০১৯ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ

সিদ্ধেশ্বরী সড়কের ৬২/এ নম্বর ভবনের ছাদে রয়েছে একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বেস টান্সিভার স্টেশন (বিটিএস) টাওয়ার। ভবনটি আবাসিক। এর দুইশ গজের মধ্যেই ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ আর মনোয়ারা হাসপাতাল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবাসিক ভবন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিটিএস টাওয়ারগুলো সরিয়ে নেয়ার কথা। কিন্তু ওই নির্দেশনার ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও টাওয়ার অপসারণের উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। শুধু সিদ্ধেশ্বরীর এই ভবনেই নয়, রাজধানীসহ দেশের সব এলাকায় বিটিএস টাওয়ার নিয়ে একই নৈরাজ্যকর চিত্র বিরাজ করছে। টাওয়ার বিকিরণ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিভিন্ন গবেষণা উঠে এলেও মোবাইল ফোন কোম্পানি ও টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ভিন্ন কথা বলছে।
তাদের মতে দেশের টাওয়ারগুলো থেকে ক্ষতিকর বিকিরণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গড়ালে গত ২৫ এপ্রিল ক্ষতিকর রেডিয়েশনের বিষয়ে সমীক্ষা করে ৪ মাসের মধ্যে বিটিআরসিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। পাশাপাশি এ বিষয়ে ১১ দফা নির্দেশনাও দেন তারা।
এসর নিদের্শনার মধ্যে রয়েছে, মোবাইল টাওয়ার বাসার ছাদ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, কারাগার, খেলার মাঠ, জনবসতি এলাকা, হেরিটেজ ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাসহ ইত্যাদি স্থানে না বসানো এবং যেগুলো বসানো হয়েছে সেগুলো অপসারণ করা। টাওয়ারের রেডিয়েশন মাত্রা বিটিআরসি ও অপারেটরগুলোকে স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান অনুসারে পরিমাপ করতে হবে। কোনো টাওয়ারের রেডিয়েশন মাত্রা বেশি হলে তা অপসারণ করে নতুন টাওয়ার বসাতে হবে। এ বিষয়ে আরো গবেষণা বাড়ানোসহ বিভিন্ন নির্দেশনাও দেয়া হয় ওই সময়। বিটিএস টাওয়ারের গ্রহণযোগ্য রেডিয়েশনের মাত্রা নিয়ে সারা বিশ্বেই বিতর্ক রয়েছে। দেশে এ বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ায় ২০১২ সালে। ওই সময় বেসরকারি চ্যানেল একুশে টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে উচ্চ আদালতে রিট করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে দেশে ব্যবহৃত টাওয়ারের বিকিরণ আন্তর্জাতিক মাত্রার তুলনার বেশি। আমাদের দেশে টাওয়ার স্থাপনে স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বিবেচনায় আনা হয়নি। ফলে দেখা গেছে, বাসা-বাড়ি, স্কুল, হাসপাতালসহ যত্রতত্র টাওয়ারগুলো বসানো হয়েছে। আমরা আদালতের গাইডলাইন চেয়েছিলাম। গাইডলাইনে রেডিয়েশন মাত্রা আন্তর্জাতিক নন আয়জনিং রেডিয়েশন প্রতিরক্ষা কমিশনের (আইসিএআইআরপি) নির্দেশনা মতো দশ মেগাহার্টজে সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়। কিন্তু আমরা মনে করি জনসংখ্যা ঘনত্ব ও পরিবেশ বিবেচনায় এটি বাংলাদেশে হওয়া উচিত এক মেগাহার্টজ। বিশেষজ্ঞরা জানান, যে কোনো বিকিরণই প্রাণীদেহের জন্য ক্ষতিকর। শরীরের কোষগুলোর স্বাভাবিক যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বিকিরণ। ফলে দেখা দিতে পারে ক্যান্সার, জিনগত পরিবর্তন, রক্তরোগ, মানসিক জটিলতাসহ বিভিন্ন রোগসহ বিভিন্ন সমস্যা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে প্রকৃতিতেও। আইসিএআইআরপির তথ্য মতে, মোবাইল ফোনের টাওয়ার ও সেট থেকে সৃষ্ট বিকিরণ মানব দেহকোষের ক্রোমোজম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে কানে ও মস্তিস্কে টিউমার হতে পারে যা ক্যান্সার করতে পারে। এ ছাড়াও মাথাব্যথা, হৃদরোগসহ, ঘুম ঘুম ভাব, নিদ্রাহীনতা কাজের ব্যাঘাত ঘটাসহ অনেক আশঙ্কার কথাও জানায় সংস্থাটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ড. গোলাম মোহাম্মদ ভূঞা মোবাইল ফোনের টাওয়ার বিকিরণ নিয়ে কয়েক বছর ধরে একটি গবেষণা চালান। তার গবেষণায় দেখা যায়, টাওয়ার বিকিরণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। তিনি জানান, শিশুদের শরীরে তরল (ফ্লুইড) বেশি থাকায় বিকিরণের প্রভাবে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে তারা। শিশুদের প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রেডিয়েশন ভ‚মিকা থাকার আশঙ্কা আছে। অবসন্নতা, লিউকেমিয়াসহ আরো কিছু রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে রেডিয়েশনের কারণে। প্রযুক্তিবিদ ড. সাইফুল্লাহ জানান, আমাদের দেশে মূলত যে ধরনের প্রযুক্তি সম্পন্ন বিটিএস টাওয়ার ব্যবহার করা হয় সেটি আগের প্রজন্মের। সাধারণত ২৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে টাওয়ারগুলো সিগন্যাল আদান প্রদান করতে পারে। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে অনেক বেশি ভবন হওয়ায় সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কম এলাকায় বেশি টাওয়ার বসাতে হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক কোম্পানি আলাদা আলাদাভাবে টাওয়ার বসানোয় বিকিরণ ঝুঁকি আরো বেশি হয়। উন্নত বিশ্বে ব্যবহারিত টাওয়ারগুলোর রেডিয়েশন কম হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদেরও সে প্রযুক্তির দিকে যেতে হবে।
মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের সূত্র মতে দেশে বর্তমানে ৫ অপারেটরের ৪০ হাজারের বেশি বিটিএস টাওয়ার রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে টাওয়ারগুলোর বিকিরণমাত্রা আন্তর্জাতিক মান অনুসারে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এরপরও উচ্চ আদালতের নির্দেশে তারা টাওয়ারগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবেন তারা। পরে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক জানান, দেশে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। ঝুঁকি কমাতে যথাসম্ভব নিরাপদ জায়গায় টাওয়ারগুলোকে নতুনভাবে স্থাপন করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ৪টি প্রতিষ্ঠানকে। তারা বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে যত্রতত্র স্থাপিত টাওয়ার সরিয়ে ফেলবে। আবার টাওয়ার শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে সব অপারেটর একই টাওয়ার ব্যবহার করবে। কিছু দিনের মধ্যেই এ কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়