টেকনাফে যুবলীগনেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা

আগের সংবাদ

থমথমে কাশ্মিরে শুক্রবার নামাজের পর বিক্ষোভের ডাক

পরের সংবাদ

৩ মাসে খেলাপি বেড়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২৩, ২০১৯ , ১২:০৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ২৩, ২০১৯, ১২:০৩ অপরাহ্ণ

Avatar

ঋণখেলাপিদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানা সুবিধার ঘোষণার মধ্যেও ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা; মোট খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও শতকরা হারে এটি বিগত প্রান্তিকের তুলনায় কম। এদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, এ বছর ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ঋণ পরিশোধের জন্য ঘোষিত বিশেষ সুবিধা নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। এ কারণে মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যদিও যেসব সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে, তা এখনো কার্যকর হয়নি। সূত্রমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন বাদে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর বাইরে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে আরো ৪০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এটি যোগ করলে প্রকৃত খেলাপিঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে (মার্চ-জুন) মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এদিকে মার্চ প্রান্তিকের পর জুন প্রান্তিকেও খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো অনেক খেলাপি ঋণ কৌশলে লুকিয়ে রাখে। কারণ ডিসেম্বর মাস ব্যাংকের বার্ষিক হিসাবের সমাপনী প্রান্তিক হওয়ায় খেলাপি ঋণ কম দেখাতে পারলে ব্যাংকের লাভ। লুকিয়ে রাখা এসব খেলাপি ঋণ জুন প্রান্তিকে হিসাবে এসে ঢুকেছে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে অনেক বছর ধরেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এটা কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ঋণকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত করার সময়সীমাও বাড়িয়েছে। যদিও নিয়ম শিথিলের এই প্রভাব মার্চ প্রান্তিকে পড়েনি, সেটি আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পড়বে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা করেছে তা একটা ভুল পদ্ধতি বলে মনে করেন সাবেক এ ডেপুটি গভর্নর। এতে প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ কমবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সার্বিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণের কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ খেলাপি ঋণ আদায় করার ব্যাপারে যে সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত, সেটা আসলে হচ্ছে না। উল্টো ঋণখেলাপিদের ছাড় দিতে সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। ঋণ অবলোপনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৩ বছর করা হয়েছে। ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমায়ও ছাড় দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা করা হয়েছে। এসব সুবিধা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, অনেক গ্রাহক গত ডিসেম্বরে ঋণ পুনঃতফসিল করেছিলেন। কিন্তু পরের তিন মাস নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। নতুন করে তারা খেলাপি হয়ে পড়ায় প্রথম প্রান্তিকে মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আবার দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে তা অনেকাংশেই কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে বেসরকারি ৪০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ এক হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা বেড়েছে। জুন শেষে বেসরকারি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক শূন্য ১৩ শতাংশ। গত মার্চ শেষে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে তাদের বিতরণ করা ঋণের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। জুন শেষে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। সে হিসেবে গত মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ১৩৫ কোটি টাকা। জুন শেষে বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত মার্চ শেষে এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ২৫৬ কোটি ৫১ টাকা যা বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। আর দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের (কৃষি ও রাকাব) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, গত মার্চ শেষে যা ছিল ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
ব্যাংক খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা মহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে ব্যাপক সরব। খেলাপি ঋণ কমাতে গত ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে নতুন নীতিমালা জারি করে। এতে খেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১৬ মে তারিখে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন ঋণ পরিশোধসংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করে। এর মাধ্যমে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে (এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ) পরিশোধের সুবিধা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত অর্থেই খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা দরকার। গ্রাহককে যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালক বা রাজনৈতিক প্রভাবে গ্রাহকের বিচার করলে চলবে না। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।