উত্তর ভারতে বন্যায় ২৮ জনের মৃত্যু

আগের সংবাদ

আজ থেকে কাঁচা চামড়া বিক্রি করবে আড়তদাররা

পরের সংবাদ

ঢাকাকে পাশে চায় দিল্লি

ঝর্ণা মনি :

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৯, ২০১৯ , ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

কাশ্মির ইস্যুতে বাংলাদেশকে পাশে চায় ভারত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠী যেন কোনো সাম্প্রদায়িক উসকানি সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকেও নজর রয়েছে দেশটির। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। একই ইস্যু নিয়ে গত সপ্তাহে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর আজ সোমবার তার ঢাকায় আসার কথা। পাশাপাশি আগামী অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দ্বিপক্ষীয় যেসব বিষয়ে আলোচনা হবে তাও চূড়ান্ত করা হবে তার এ সফরকালে। ক‚টনীতিকরা বলছেন, কাশ্মির ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে উপমহাদেশজুড়ে। একদিকে পাকিস্তান জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক ক‚টনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা চীন ছাড়াও বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের সমর্থনও পেয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকে পাশে পেতে চাইছে ভারত। এই তৎপরতার অংশ হিসেবেই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দৌড়ঝাঁপ।
এস জয়শঙ্কর একজন পেশাদার ক‚টনীতিবিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের কেবিনেটে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান জয়শঙ্কর। তার ঢাকা সফর পূর্ব নির্ধারিত। এই সফরে আগামী অক্টোবরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া তার সফরে অবৈধ অভিবাসন ও অনুপ্রবেশ, কানেক্টিভিটি, রোহিঙ্গা সংকট এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির বণ্টন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সেই সঙ্গে উপমহাদেশের বার্নিং ইস্যু কাশ্মির নিয়ে আলোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। আগামী বুধবার (২১ আগস্ট) নয়াদিল্লি ফিরে যাবেন তিনি। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, এস জয়শঙ্করের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। তার সফরে দুদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
তবে কূটনীতিবিদদের মতে, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে কাশ্মির ইস্যুও আলোচনায় আসবে। কারণ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ বাতিলে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান ও চীন। বিজেপি নেতা মোদির কড়া সমালোচনা করে সম্প্রতি ইমরান খান সংসদে বলেছেন, ভারত নিজেদের এবং আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে। শান্তি ফেরাতে কাশ্মির ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তাও চেয়েছেন ইমরান খান। অন্যদিকে মোদির সিদ্ধান্তের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রতিবেশী চীনও। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইয়াং এক বিবৃতিতে বলেন, নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন বাতিলে ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ণ করছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে নিজেদের সমর্থন আদায়ে এখন ছুটে বেড়াচ্ছে ভারতও।
এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির ভোরের কাগজকে বলেন, কাশ্মির ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে। ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নষ্ট হবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া ঠিক হবে না। উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হোক এটা আমরা চাই না। বেলুচিস্তানের মন্দিরে হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘুরও মানবিক অধিকার রয়েছে, ভারত নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনা করবে।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির ভোরের কাগজকে বলেন, দ্বিপক্ষীয় এই আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মির ইস্যু আসবে। ভারত বাংলাদেশের কাছে সমর্থন চাইতেই পারে। তবে সরকার কোন অবস্থান নেবে এ ব্যাপারে তারা এখনো খোলাসা করেনি বা করার সময় আসেনি। এটি উপমহাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। কাশ্মিরের জনগণের মতামত ও প্রত্যাশা জানা প্রয়োজন। কিন্তু এটি উপস্থাপন করা হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান সমস্যা হিসেবে। অথচ এটি ভারত-পাকিস্তান ইস্যু নয়; এটি কাশ্মিরের জনগণের ইস্যু। তারা কী চান, এটাই বড় কথা। আর এই ব্যাখ্যায় না গিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলছে। দুই দেশের উচিত কাশ্মিরের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো।
এদিকে কাশ্মির ইস্যুতে মাঠ গরমের চেষ্টা করছে বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠীও। এরই মধ্যে ‘কাশ্মিরের জনগণের প্রতি সংহতি’ জানিয়ে হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘কাশ্মিরি সংহতি পরিষদ’। গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের গেটে সমাবেশ করেছে তারা। হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরের আমির নূর হোসেন কাশেমী বলেছেন, কাশ্মিরি জনগণকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। কাশ্মিরের সংকট শুধু কাশ্মিরিদের নয়, বরং বাংলাদেশেরও।
অবশ্য কাশ্মির ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তার এই বক্তব্য থেকে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে আঁচ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে কাশ্মির ইস্যুতে জোর করে সমর্থন আদায়ের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, কাশ্মির ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছে ভারতের সমর্থন চাওয়ার মতো পর্যায় এখনো আসেনি। এ ছাড়া জাতিসংঘে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে রাশিয়াসহ স্থায়ী এবং অস্থায়ী সদস্য দেশগুলো উপস্থিত ছিল। তিনি বলেন, কাশ্মির দীর্ঘদিনের পুরনো সমস্যা। এটি কাশ্মিরের জনগণ এবং ভারত-পাকিস্তানের বিষয়। বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবে সবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখবে। আগ বাড়িয়ে কিছু করার প্রয়োজন নেই।