চামড়া শিল্পের জন্য সহায়ক নীতি প্রয়োজন

আগের সংবাদ

গাইবান্ধায় মাদ্রাসাছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

পরের সংবাদ

ফসকে পড়া খুচরা জীবন

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৮, ২০১৯ , ৯:৩৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০১৯, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ

জোবাইদা নাসরীন

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা কেন জানি মেনে নিয়েছি বা একভাবে এটি চলমান হয়ে গেছে যে বাংলাদেশে ঈদের সময় বেশ কিছু মানুষ মারা যাবেন। প্রতি বছরের এই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমরা এমনই সয়ে নিয়েছি যে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের মানুষকে রক্ষা করার তাগাদা তৈরি করায় না বরং এক ধরনের অভ্যস্ততায় আত্মস্থ হতে শেখায়। এত মৃত্যু সংবাদের অভিজ্ঞতা কেন আমাদের মৃত্যু ঠেকাতে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তোলে না?

বলা হয় যে, ঈদে বেশিরভাগ মানুষ ‘নাড়ির’ টানে ঘরে ফেরে। যদিও এই নাড়ির টান মানুষ সবসময় বোধ করে না, শুধু ঈদ এলেই শোনা যায়। অন্য সময়গুলোতে সবাই চায় নগরে থাকতে। ঈদের সময় এই টান এত বেশি বোধ করে যে তখন জীবন হাতে নিয়ে হলেও সবাইকে যেতে হয় গ্রামের বাড়ি। দুর্ঘটনা-আতঙ্ক নিয়েও মানুষ যায় প্রিয়জনদের কাছে। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি ঘটে দুই ঈদে এবং আমরা কেন জানি মেনে নিয়েছি বা একভাবে এটি চলমান হয়ে গেছে যে বাংলাদেশে ঈদের সময় বেশ কিছু মানুষ মারা যাবেন। প্রতি বছরের এই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমরা এমনই সয়ে নিয়েছি যে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের মানুষকে রক্ষা করার তাগাদা তৈরি করায় না বরং এক ধরনের অভ্যস্ততায় আত্মস্থ হতে শেখায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণার তথ্য মতে, গত ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭২টি এবং প্রাণ হারান ১৫৪ জন। উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ঈদের আগের সাত দিনে ৫০টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং ঈদের দিন থেকে পরের আট দিনে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১২২টি। ঈদের আগে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৭২ জনের। পরের আট দিনে প্রাণ হারান দ্বিগুণ, ১৪৪ জন।
এবারের ঈদুল আজহার চিত্র প্রথমদিকে অর্থাৎ ঈদের আগে একটু ভিন্ন এবং আশাপ্রদ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত চিত্র একই হয়ে গেছে। ঈদের ফিরতি যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই শুরু হয়েছে মৃত্যুর সংবাদের। এমনকি গত বৃহস্পতিবার একদিনেই সড়ক থেকে চলে গেছে ২৫ জনের প্রাণ। আরো সংবাদ আসতে থাকবে।
এগুলো নতুন নয়। ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যাও নড়াচড়ার জন্য ভিন্ন অর্থ বহন করে না। এই মৃত্যু নিয়ে আসলে আমাদের অভিজ্ঞতা কী বলে? ঈদের আগে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ এক ধরনের আর ঈদের পরে আরেক ধরনের। ঈদের আগে যানজট থাকে, গাড়ির চালকরা চাইলেও খুব বেশি সামনে এগোতে পারেন না, একে অন্যকে টপকিয়ে যেতে পারেন না। সব রাস্তাতেই ছোট-বড় গাড়ি থাকে। এই কারণে গাড়ির গতিও কম রাখতে হয় চালকদের। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক হয়ে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নেন। এ সময় লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। কারণ আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা।
কিন্তু ঈদের ফিরতি যাত্রায় এই চিত্রের ব্যতিক্রম ঘটে। সড়ক থাকে অনেকটাই ফাঁকা। চালকরা ইচ্ছেমতো গাড়ি চালান। রাস্তা ফাঁকা থাকায় তারা লোভী হয়ে ওঠেন বাড়তি পয়সা পাওয়ার জন্য। দ্রুত গাড়ি চালিয়ে পৌঁছাতে পারলেই করা যাবে আরেকটি ট্রিপ। যতদিন রাস্তা ফাঁকা থাকবে ততদিনেই চলবে বাড়তি ট্রিপ। ঈদের আগে এবং পরে এই দুই সময়েই চালকরা খুব বেশি বিশ্রাম এবং ঘুমের সময় পান না। দিন-রাত ব্যস্ত থাকেন, গাড়ি চালান। এ ছাড়া দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ, চালকের ক্লান্তি। কারণ ঈদের আগে থেকে একটানা গাড়ি চালান চালকরা। মালিক এবং চালক দুই পক্ষই বাড়তি আয়ের নেশায় বিরামহীনভাবে গাড়ি নিয়ে ছোটেন কিংবা ছুটতে বলেন। তাই অনেক সময় চালকরা ঘুমন্ত অবস্থায় গাড়ি চালান কিংবা আশপাশ লক্ষ না করে অভ্যস্ততার ওপর গাড়ি চালান। যার ফলে কোনো কোনো সময় গাড়ি ধাক্কা লাগান গাছ কিংবা ব্রিজের সঙ্গে। আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় নিহত আর আহতের হিসাব।
অথচ এ রকম হওয়ার কথা নয়। পৃথিবীর সব দেশেই চালকের বিরামহীন গাড়ি চালানোর নজির আছে। নিয়মানুযায়ী একজন চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টা যানবাহন চালাতে পারেন। এরপর তাকে বিরতি নিতে হয়। তারপর এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা চালানোর সুযোগ রয়েছে। এর বাইরে কোনোভাবেই নয়। বিভিন্ন দেশে একটি গাড়িতে দুজন চালক থাকেন, যেন একজন বিশ্রাম নিতে পারেন কিংবা একজনের কোনো ধরনের অস্বস্তি কিংবা হঠাৎ অসুস্থতায় অন্যজন গাড়িটিকে চালিয়ে নিয়ে যান। এ ছাড়া অনেক দেশেই গাড়ির বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত বা বিকল্প চালক থাকেন। কিন্তু এ দেশে বিকল্প চালক নেই। মাঝে মাঝে হেলপার বা সহকারীরাই বিকল্প চালক হিসেবে গাড়ি চালান। পূর্ণাঙ্গ গাড়িচালক হিসেবে ট্রেনিং এবং লাইসেন্স না থাকায় আরো বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ। বিদ্যমান শ্রম এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮তেও শ্রমিক এবং চালকের বিশ্রাম ও কর্মঘণ্টা মানার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা থাকলেও তা পরিবহন মালিক-শ্রমিক কেউই মানছেন না। আর তাতেই ঘটে দুর্ঘটনা।
মৃত্যুই যে সবসময় ঘটে তা নয়, অনেকে সারা জীবনের জন্য অকেজো বা পঙ্গু হয়ে পড়েন এসব দুর্ঘটনার ফল হিসেবে। এআরআই আরো আমাদের জানায় যে, ২০১৬ থেকে গত ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৬১৩ জন। প্রতি ঈদের আগে-পরের সময়টাতে গড়ে প্রাণ হারান ২৩০ জন মানুষ। অবশ্য যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব একটু ভিন্ন, সংখ্যাটা আরেকটু বেশি। তাদের মতে, ঈদের আগে-পরের ১৩ দিনে গড়ে ৩০০ মানুষের প্রাণহানি হয়। এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মোট ২৫৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
এত প্রাণহানির কারণগুলো কী কী? হয়তো সব কারণই আমরা কমবেশি জানি। বাংলাদেশে একই সড়কে বিভিন্ন ধরনের যান চলাচল করে। কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট আবার কোনোটি মাঝারি। সেসব যানের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির আকার, গতি এবং চালানোর ধরনে ব্যাপক পার্থক্য আছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে মাল বোঝাই ট্রাক। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, ফাঁকা সড়কে বেশি গতির যানবাহনগুলো কম গতির যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময়ই জন্ম দেয় অনেক দুর্ঘটনার। ফাঁকা সড়ক পেয়ে বাসের গতি বাড়িয়ে দেন চালক। দেখা যায়, মহাসড়কে দূরপাল্লার পথের বাস ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতেও চলছে। শুধু নিজ চলা পর্যন্তই স্থির থাকে না, তাদের মধ্যে থাকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গবেষণা বলছে, প্রতি এক মিনিট পরপর এসব বাস অন্য যানকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পেরিয়ে যাওয়ার (ওভারটেক) চেষ্টা করে। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ১৭ আগস্ট)।
প্রতি বছরই যখন কমবেশি এই চিত্র আমরা পাই তখন স্বভাবতই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই জায়গা থেকে উত্তরণের আসলেই কি কোনো পথ নেই? কেন একটা বিশেষ সময়ে এত মানুষের মৃত্যু নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না? এত মৃত্যু সংবাদের অভিজ্ঞতা কেন আমাদের মৃত্যু ঠেকাতে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তোলে না? কী কারণে আমরা এই ঈদকালীন দুর্ঘটনা নিয়ে উচ্চবাচ্য করি না? নাকি আমরা ধরে নিয়েছি এত জনসংখ্যার দেশে আমাদের প্রতি বছরই কিছু খুচরা জীবন ঝরে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই এটি প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা না নিলেও হবে। এই জীবনগুলোর মূল্য যদি সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে থাকত তাহলে এর বিহিত আরো আগে হয়ে যেত। ঈদের পরের দিন থেকেই গাড়ি এবং রাস্তার ওপর নজরদারি রাখা দরকার, যাতে কিছুটা হলেও দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।

জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।