নরসিংদীর শিবপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪

আগের সংবাদ

পাবনায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ২

পরের সংবাদ

লক্ষ্য থেকে সরেনি জঙ্গিরা

কামরুজ্জামান খান :

প্রকাশিত হয়েছে: August 17, 2019 , 11:35 am

দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ১৪ বছর পরও জঙ্গিরা লক্ষ্য থেকে একচুলও সরেনি। নাম পরিচয় পাল্টে একই কায়দায় বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বহাল রয়েছে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা করে উল্লসিত জঙ্গিরা বারবার বোমা হামলা চালিয়েছে। গাজীপুর ও ঝালকাঠিতে আদালতে হামলা করে বিচারকসহ সাধারণ মানুষ হত্যা করেছে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে গেলেও তারা বারবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে দেশীয় জঙ্গিরা যোগাযোগ রাখছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী ও ধনীর দুলালদের টার্গেট করে অনলাইনে চলছে তাদের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম। জঙ্গি কার্যক্রম ভেঙে দিতে পুলিশ ও র‌্যাবের নিয়মিত ইউনিটের বাইরে কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিটসহ (এটিইউ) বিভিন্ন ইউনিট গড়ে কেনা হয়েছে ড্রোনসহ আধুনিক সরঞ্জাম।
এদিকে, জঙ্গিরা নতুন নামে অবস্থান জানান দিলে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), শাহাদাত আল হিকমা, আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এখনো গোপনে তৎপর নিউ জেএমবি। এদের শেকড় উপড়ানো যায়নি। ১৪ বছরেও শেষ হয়নি বীভৎস সিরিজ বোমা হামলা মামলার বিচার কাজ।
আজ থেকে ১৪ বছর আগে ২০০৫ সালের এইদিন সকালে মুন্সীগঞ্জ ছাড়া রাজধানীর ৩৪ স্থানসহ দেশের ৬৩ জেলার ৪৩৪টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায় জেএমবি। সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয় ১৬১টি। তদন্ত শেষে ১৪৩টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়। ১৪৩ মামলায় আসামি করা হয় ১ হাজার ১৫৭ জনকে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তর করা হয়েছে ১০২৩ জনকে। এর মধ্যে রায় দেয়া হয়েছে ১২৮টি মামলার। বর্তমানে ৩৩টি মামলা বিচারাধীন আছে। ওইসব মামলায় ৩৩৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে ৩৫ জনকে। ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হলেও বাকি ২৯ জন এখনো পলাতক। ১৩১ জনকে যাবজ্জীবন ও ১৮৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। এসব মামলায় খালাস দেয়া হয়েছে ৩৪৯ জনকে। চ‚ড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে ১০টি মামলার। এখনো বিচারাধীন মামলায় আসামির সংখ্যা ৩৮৬ জন।
সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সর্বোচ্চ ২৩টি মামলা হয় পুলিশের ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জে। সর্বনিম্ন ৩টি করে মামলা হয় খুলনা মহানগর ও রেলওয়ে রেঞ্জে। মহানগরীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় ডিএমপিতে। ডিএমপিতে ১৯টি মামলা হলেও ৯টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। চ‚ড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে ৯টির। ১৪ বছরে মোট ৭ জন আসামির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় বোমা হামলার ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে তেজগাঁও ও বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা দুটি মামলার রায় হয়েছে। পুলিশ ৮টি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন) জমা দিয়েছে। বাকি ৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ চলছে। অনেক মামলায় আসামিদের নাম ও ঠিকানা কিছুই নেই বা ছিল না। সাক্ষীদেরও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতেও আসেন না। বেশির ভাগ সাক্ষীর ঠিকানাও পরির্বতন হয়েছে। এরকম নানা কারণে মামলা শেষ করতে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। আবার সাক্ষীরা ঠিকমতো না আসায় জঙ্গিদের শাস্তিও সঠিকভাবে হচ্ছে না। তবে এসব মামলায় বাকি সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারেন আদালত। আশা করি এই বছরের মধ্যে এই ৮টি মামলার বিচার কার্য শেষ হতে পারে।
ঢাকায় সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ মামলায় তিন জেএমবি সদস্যের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত। দণ্ড প্রাপ্তরা হলো- আবুল আল ফাত্তাহ ওরফে শাকিল, রেজাউল করিম ও তারেক ইকবাল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেট ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় তেজগাঁও থানায় দায়ের হওয়া মামলায় এই রায় দেয়া হয়। এরপর ওই বছরের শেষ দিকে সিরিজ বোমা হামলাসংক্রান্ত বিমানবন্দর থানার একটি মামলায় পাঁচ আসামির সবাইকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়।
২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, হাফেজ মাহমুদসহ প্রায় সাড়ে সাতশ’ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ সাতজনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম, খালেদ সাইফুলাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর এই মামলার ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্ত আসামি আসাদুল ইসলাম আরিফের ফাঁসি কার্যকর হয়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের ইতিহাসের সব চেয়ে বড় জঙ্গি হামলা হয় গুলশানের হলি আর্টিজানে। এক সপ্তাহের মাথায় ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত চলাকালে প্রকাশ্যে জঙ্গিরা হামলা চালায়। ২০০০ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে জেএমবির কার্যক্রম শুরু করে। জেএমবির কার্যক্রম যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বরং জেএমবি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে। গত বছরের ৭ আগস্ট ভারতের ব্যাঙ্গালুরু এলাকা থেকে জেএমবির দুর্ধর্ষ পলাতক জঙ্গি বোমারু মিজানকে গ্রেপ্তার করে এনআইয়ে টিম।
গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে পুলিশ বক্সের পাশে রাখা বোমায় ৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ২৭ মে মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বোমা হামলায় পুলিশসহ তিনজন আহত হয়। ২৩ জুলাই রাতে খামারবাড়ি ও পল্টন পুলিশ বক্সে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা দুইটি শক্তিশালী আইইডি যুক্ত বোমা রেখে যায়। পুলিশ ওই দুইটি বোমা নিষ্ক্রিয় করে। এসব ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এই মুহূর্তে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালানোর ক্ষমতা জঙ্গিদের থাকলেও তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এসব বোমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্ট্রেট (আইএস) জড়িত বলে দাবি করা হলেও পুলিশ তা অস্বীকার করেছে।
জঙ্গি দমনে প্রধান ভূমিকা রাখা র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র‌্যাব জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। র‌্যাবের অভিযানে জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা গ্রেপ্তার হয়। তাদের বিচারের মুখোমুখিও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জঙ্গিরা এখন সাইবার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। তবে র‌্যাবের সাইবার মনিটরিং সেল জঙ্গিদের কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখেছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত অপরাধ করার সময় বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে। জঙ্গিদের কঠোর নজরদারি করতে র‌্যাব সদর দপ্তরসহ প্রতিটি ব্যাটালিয়ন সজাগ রয়েছে।

বিষয়: